দশমহাবিদ্যা

দশমহাবিদ্যা Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from দশমহাবিদ্যা, Hindu temple, চুঁচুড়া, হুগলী, Chinsurah.
(1)

দশমহাবিদ্যা, তন্ত্র-বিদ্যা এবং মহাবিদ্যার স্বরূপ এবং বিশ্লেষণ জানতে "দশমহাবিদ্যা" পেজটি লাইক, ফলো এবং সাবস্ক্রাইব করুন।। যাঁরা দশমহাবিদ্যা সম্পর্কে আগ্রহী তাঁরাও ফলো করে রাখতে পারেন।

🙏🌺 #তন্ত্রে_পঞ্চ_ম_কার_সাধনা_আসলে_কি?🌺🙏🕉️ 🕉️ অনেকের ভিতর  #পঞ্চ-মকার সাধনার যথার্থতা নিয়ে ভ্রান্তি আছে......সেই বিষয়টিকে...
10/06/2026

🙏🌺 #তন্ত্রে_পঞ্চ_ম_কার_সাধনা_আসলে_কি?🌺🙏

🕉️ 🕉️ অনেকের ভিতর #পঞ্চ-মকার সাধনার যথার্থতা নিয়ে ভ্রান্তি আছে......সেই বিষয়টিকে আমি বড় বড় লেখকের বিভিন্ন লেখনী হতে তাঁদের পরম জ্ঞানলব্ধ সংগ্রহ ও চর্চার সার নিয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরবো! যে পঞ্চ-মকার সাধনা আসলে কি-----

🔱 ঠাকুর রামকৃষ্ণ মা-কালী সাধক হওয়ার পাশাপাশি একজন পরম সিদ্ধ তান্ত্রিক ছিলেন! ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে #ভৈরবী নামক এক #তন্ত্রসিদ্ধা ও #শাস্ত্রজ্ঞা #যোগিনীর নিকট প্রথম তিনি তান্ত্রিক দীক্ষা গ্রহণ করেন।

🕉️ 🕉️ তিনি ভৈরবী প্রদর্শিত পথে ৬৪ প্রকার তন্ত্র-সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। তিনি তন্ত্রোক্ত বামাচারী হয়ে তিনি পঞ্চ ম-কারের সাধনা করেন। তবে তিনি পঞ্চ ম-কারের মদ্য ও মৈথুন বর্জন করেছিলেন। তিনি ভৈরব মতেও সাধনা করেছিলেন। ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তোতাপুরি নামক এক বৈদিক নাগা-সন্ন্যাসীর নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর উনার নাম হয় শ্রী রামকৃষ্ণ, এবং সাথে পরমহংস উপাধি যোগ হয়!

🔱 তন্ত্রে স্বয়ং #শিব 🙏পঞ্চ-ম-কার সাধনার কথা উল্লেখ করেছেন। এই পঞ্চ-ম-কার সাধনায় সাধকের অতুল সিদ্ধি লাভ হয়, পুনর্জন্ম হয় না। কিন্তু এই পঞ্চ ম কার নিয়ে নানা ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে। আজ আমি সেই ভ্রান্ত ধারনার ওপর একটু আলোকপাতের চেষ্টা রাখছি।

🕉️ 🕉️ পঞ্চ ম এর মধ্যে পড়ে - #মদ্য, #মাংস, #মৎস্য, #মুদ্রা ও #মৈথুন। যে কোন অল্প অভিজ্ঞ বা অনভিজ্ঞ ব্যাক্তিই এই কটির নাম শুনলেই একটু হলেও ভিতরে ভিতরে সঙ্কুচিত বোধ করেন। ঈশ্বরের উপাসনায় আবার এসব কি ? এই অনেকেরই মনোভাব.....

🔱 কিন্তু আজ যে সূক্ষ্ম তত্ত্ব আমি বলবো, তাতে আশা করি সেই অজ্ঞানতার অন্ধকার কিছুটা দূরীভূত হবে।

🕉️ 🕉️ প্রথমে উল্লেখ্য যে স্বয়ং শিব এই তন্ত্রের প্রবক্তা, সুতরাং স্বয়ং শিব নিশ্চয় এই আপাত ঘৃণিত বস্তু দ্বারা কোন ব্যাভিচারের কথা বলবেন না! নিশ্চয় এর কোনও না কোন সূক্ষ্ম তত্ত্ব আছেই।
অনেকেই মনে করেন পঞ্চ-ম কারের সাধনা আসলে নিজের সুপ্ত ভোগ বাসনা চরিতার্থ করারই নামান্তর, কিন্তু আদপেই তা নয়! তবে শুনুন সেই শিববাক্য যা অত্যন্ত গূঢ় সাধন রহস্য যা আমাদের পরমব্রহ্ম স্বরূপিণী জগজ্জননীর সঙ্গে মিলিত হবার পবিত্র তন্ত্র সাধনা.....

🙏) #মদ্য -- মদ সম্পর্কে শিব মা-পার্বতীকে বলছেন...
"সোমধারা ক্ষরেদ্‌ যা তু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ্‌ বরাননে।
পীত্বা আনন্দময় স্ত্বাং যঃ স এব মদ্য সাধক;।।

🕉️ 🕉️ অর্থাৎ, হে বরাননে পার্বতী, সাধক যখন গাঢ় ধ্যানে অথবা সমাধি অবস্থায় অবস্থান করে, তখন তার সহস্রার পদ্মের ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে যে অমৃত ধারা ক্ষরিত হয়, তাকেই তন্ত্রে সোমরস বা সুরা বলা হছে, সেই অমৃত ধারা সাধক পান করে নিজের ইষ্টসানিধ্য উপলব্ধি করে। এই প্রকার সাধককেই তুমি মদ্যসাধক বলে জেনো। এরই নাম মদ্য সাধন।

🙏) #মাংস -- মাংস সম্পর্কে শিব বলছেন...
"মা শব্দাদ্‌ রসনা জ্ঞেয়া তদ্‌ অংশান রসনাপ্রিয়ে।
সদা যো ভক্ষয়েৎ দেবী স এব মাংস সাধকঃ।।"
হে রসনাপ্রিয়ে মহাদেবী, "মা" শব্দের নামান্তর রসনা, এবং বাক্য সেই রসনা সম্ভুত, সুতরাং ব্যাক্তি সত্য বাক্য ভক্ষন করে অর্থাৎ বাক্‌সংযম এবং মৌনাদিব্রত পালন করে ইষ্টধ্যানের মগ্ন হয় সেই ব্যাক্তি কেই মাংস-সাধক বলে জেনো।
"এবং মাং সনোতি হি যৎকর্ম তৎ মাংস পরিকীর্তিতম।
ন চ কায় প্রতীকন্তু যোগিভির্মাংসম্‌ উচ্যতে।।"
অর্থাৎ, যোগী নিজের সকল সৎকর্মের ফল নিষ্কল পরমব্রহ্মে সমর্পণ করে সেই যোগীই মাংস সাধক, এবং এরই নাম মাংস সাধন।

🙏) #মৎস্য -- মৎস্য সম্পর্কে শিববাক্য নিম্নরূপ...
"গঙ্গা যমুন্যোর্মধ্যে মৎস্যৌ দ্বৈ চরতঃ সদা।
তৌ মৎস্যৌ ভক্ষয়েদ যস্তু স ভবেৎ মৎস্য সাধকঃ।
হে ভগবতী, মনুষ্যদেহ মধ্যে "ঈড়া ও পিঙ্গলা" নামে যে দুই প্রধান নাড়ী আছে, যোগশাস্ত্রে তাদেরই গঙ্গা ও যমুনা বলা হয়, এই দুই নাড়ী পথে অনবরত প্রশ্বাস ও নিঃশ্বাস নামে দুই মৎস্য বিচরণ করে। যে ব্যাক্তি প্রাণায়াম দ্বারা সেই দুই মৎস্যের গতি নিয়ন্ত্রণ করে কুম্ভকের পুষ্টি সাধন করে এবং প্রাণের গতিকে সুষুম্নানাড়ী তে চালনা করে সেই ব্যাক্তি কেই মৎস্য সাধক বলে জেনো, ইহাই মৎস্য সাধন।
"মৎস্যমানং সর্ব্বভূতে সুখদুঃখম্‌ ইদম্‌ প্রিয়ে।
ইতি যৎ সাত্ত্বিকং জ্ঞানং তৎ মৎস্য পরিকীর্তিতঃ।।"
আমার মতন, যে যোগী সর্বভুতে সুখ ও দুঃখ কে সমান জ্ঞান করে, সেই মৎস্য সাধক।

🙏) #মুদ্রা -- মুদ্রা সম্পর্কে ভগবান-শিব বলেন...
"সহস্রারে মহাপদ্মে কর্ণিকামুদ্রিতাচরেৎ।
আত্মা তত্রৈব দেবেশি কেবলঃ পারদোপমঃ।।
সূর্য্যকোটী প্রতীকাশ শ্চন্দ্রকোটী সুশীতলঃ।
অতীব কমনীয়শ্চ মহাকুণ্ডলিনীযুতঃ।
যস্য জ্ঞানোদয়স্তত্র মুদ্রাসাধক উচ্যতে।।
অর্থাৎ, হে দেবী, মনুষ্য মস্তকস্থিত সহস্রদল পদ্মে মুদ্রিত কর্ণিকার অভ্যন্তরে শুদ্ধ পারদশিবলিঙ্গ তুল্য আত্মার অবস্থিতি। যদিও এই শিবলিঙ্গের তেজ কোটী সূর্যের সমান কিন্তু কোটী চন্দ্রের কিরণের ন্যায় তা সু-শীতল। এই পরম পদার্থ অতিশয় মনোহর, এবং কুণ্ডলীনিশক্তি যুক্ত হলে শিব পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হন। যে সাধক এই জ্ঞানের অধিকারী হয়, সেই সাধককে মুদ্রা সাধক বলে জেনো।

🙏) #মৈথুন -- মৈথুন প্রসঙ্গে দেবাদিদেব শিব বলছেন...
"মৈথুনং পরমং তত্ত্বং সৃষ্টি স্থিতি অন্ত কারণম্‌।
মৈথুনাৎ জায়তে সিদ্ধির্ব্রহ্মজ্ঞানম্‌ সুদুর্লভং।।
কুলকুণ্ডলীনিশক্তির্দেহিনাং দেহধারিণী।
তয়া শিবস্য সংযোগো মৈথুনং পরিকীর্তিতম্‌।।
হে ভগবতী, মৈথুন অতি পরম তত্ত্ব, এই মৈথুন তত্ত্বের ওপরেই সৃষ্টি স্থিতি ও সংহার নির্ভর করে। মৈথুন সাধনার মাধ্যমে সাধকের অতুল সিদ্ধি সহিত সুদুর্লভ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়। সেই মৈথুন কি রকম? প্রত্যেক মানুষের আধারপদ্মস্থিত কুলাকুণ্ডলীনি শক্তিকে সহস্রারপদ্মের পরম-শিবের সঙ্গে মিলন ঘটাতে হয়.....
যে সাধক এই কুণ্ডলীনি শক্তিকে ষটচক্র ভেদ করিয়ে পরম-শিবের সঙ্গে মিলন করাতে সক্ষম হন, তাকেই মৈথুন সাধক বলে জেনো, আর ইহাই মৈথুন সাধন।

🔱 মানব-দেহের মৈথুনে যেমন #আলিঙ্গন, #চুম্বন, #শীৎকার, #অনুলেপ, #রমণ ও #রেতোৎসর্গ এই ছয় টি অঙ্গ আছে, তেমন এই সূক্ষ্ম মৈথুনেও এই ছয়টি বিভাগ আছে।

আবার------
১) যোগক্রিয়া,
২) মাতৃকাদি,
৩) ঋষ্যাদি,
৪) তত্ত্বাদি মিলিত হয় তাকে তন্ত্রে "ন্যাস" বলা হয় এবং এই পুরো প্রক্রিয়াকেই বলে আলিঙ্গন! ইষ্টধ্যানের নাম হল চুম্বন!

আবার ইষ্ট আবাহনের নাম শীৎকার!

ইষ্টের উদ্দেশ্যে নিবেদিত নৈবেদ্য হল অনুলেপন!
জপ হল রমণের নামান্তর! দক্ষিণাদান হল রেতঃ পাতের নামান্তর.....

এই বলে শিব পার্বতীকে বললেন এই গুহ্যাতিগুহ্য তত্ত্ব তুমি সর্বদা গোপন করে রেখ দেবী.....🔱 🔱
🙏🌺🙏🌺🙏🌺🙏🌺🙏🌺🙏

✍️ মাননীয় শ্রী #বিশাল_স্বামী মহাশয়।

#দশমহাবিদ্যা

★ বগলামুখীর ৬টি ধ্যান মন্ত্র ★ (1) প্রথম ধ্যান- ওঁ পীতাম্বরাং পীতমাল্যাং পীতাভরণ ভূষিতাম্। পীতকঞ্জপদদ্বন্দ্বাম্ বগলাম্ চ...
06/06/2026

★ বগলামুখীর ৬টি ধ্যান মন্ত্র

★ (1) প্রথম ধ্যান-
ওঁ পীতাম্বরাং পীতমাল্যাং পীতাভরণ ভূষিতাম্। পীতকঞ্জপদদ্বন্দ্বাম্ বগলাম্ চিন্তয়েহর্নিশম্ ॥

★ (2) দ্বিতীয় ধ্যান-
ওঁ সুরাসুরাধ্য সরোজপাদুকাং পীনোন্নতাপীতপয়োধরার্ঙ্গীম্। লীলারবিন্দাসরসন্নিবাসিনীং
পীতাম্বরাং তাং মনসা স্মরামি।

★ (3) তৃতীয় ধ্যান-
ওঁ সৌবর্ণাসনসংস্থিতাং ত্রিনয়নাং পীতাংশুকোল্লাসিনীম্। হেমাভাঙ্গরুচিং শশাঙ্কমুকুটাং স্রক্-চম্পকস্রগযুতাম্ ॥ হস্তৈর্মুদগর পাশবদ্ধরসনাং সম্বিভ্রতীং ভূষণব্যাপ্তাঙ্গীং। বগলামুখীং ত্রিজগতাং সংস্তম্ভিনীং চিন্তয়ে ॥

★ (4) চতুর্থ ধ্যান-
ওঁ গম্ভীরাঞ্চ মদোন্মত্তাং স্বর্ণকান্তিসমপ্রভাম্।
চতুর্ভুজাং ত্রিনয়নাং কমলাসন সংস্থিতাম্ ॥
মুদ্গরং দক্ষিণেপাশং বামে জিহ্বাঞ্চ বজ্রকম্। পীতাম্বরধরাং দেবীং দৃঢ়পীণ পয়োধরাম্ ॥ হেমকুণ্ডলভূষাঞ্চ পীতচন্দ্রার্দ্ধশেখরাম্।
পীতভূষণভূষাঞ্চ রত্নসিংহাসনে স্থিতাম্ ॥ (প্রচলিত)

★ (5) পঞ্চম ধ্যান-
ওঁ পীতাম্বর পরিধানাং পীনোন্নত পয়োধরাম্।
জটামুকুট শোভাঢ্যাং পীতভূমি সুখাসনাম্ ॥
শত্রোর্জিহ্বাং মুদ্গরঞ্চ বিব্রতীং পরমাং কলাম্।
সর্ব্বাগম পুরাণেষু বিখ্যাতাং ভুবনত্রয়ে ॥

★ (6) ষষ্ঠ ধ্যান-
ওঁ মধ্যে সুধাব্ধিমণিমণ্ডপরত্নবেদী সিংহাসনোপরিগতাং পরিপীতবর্ণাম্।
পীতাম্বরা ভরণমাল্যবিভূষিতাঙ্গীং দেবীং
স্মরামি ধৃতমুদ্গরবৈরি জিহ্বাম্ ॥
জিহ্বাগ্রমাদায় করেন দেবীং বামেন শত্রুন্ পরিপীড়য়ন্তীম্।
গদাভিঘাতেন চ দক্ষিণেন
পীতাম্বরাঢ্যাং দ্বিভুজাং নমামি ।। (প্রচলিত)

★ বীজ মন্ত্র - হ্লীং।
★ পূজা মন্ত্র- ওঁ হ্লীং বগলামুখী সর্বদুষ্টানাং বাচং মুখং স্তম্ভয়। জিহ্বাং কীলয় কীলয় বুদ্ধিং নাশয় হ্লীং ওঁ স্বাহা ৷৷

★ গায়ত্রী: বগলামুখ্যৈ বিদ্মহে স্তম্ভিণ্যৈ ধীমহি তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ।

#দশমহাবিদ্যা

🔱 মহাতীর্থের মহাকোষ: বাংলার বিভিন্ন জাগ্রত শক্তিধামে মায়ের পছন্দের রাজকীয় 'ভোগ সমূহ' 🔱​"যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধা-রূপেণ ...
31/05/2026

🔱 মহাতীর্থের মহাকোষ: বাংলার বিভিন্ন জাগ্রত শক্তিধামে মায়ের পছন্দের রাজকীয় 'ভোগ সমূহ' 🔱

​"যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধা-রূপেণ সংস্থিতা..."

​বাঙালির তন্ত্রসাধনা আর শাক্ত ঐতিহ্যের অন্তরে মা যেমন রুদ্রাণী, তেমনই তিনি অন্নদাত্রী। কোথাও তিনি শ্মশান-কালী রূপে কড়া তান্ত্রিক আমিষ ভোগে সন্তুষ্ট, আবার কোথাও তিনি ভবতারিণী বা আদ্যা মা রূপে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও নিরামিষ ব্যঞ্জনে পরম তৃপ্ত। সতীর দেহাংশ যেখানে যেখানে পড়েছে, সেখানে কেবল আধ্যাত্মিক শক্তিপীঠ গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে এক একটি অনন্য এবং আদি 'ভোগ-পরম্পরা'।

​আজকের এই শাক্ত আড্ডায় আসুন জেনে নিই পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জাগ্রত শক্তিধামে মায়ের সেই সুপ্রাচীন, রহস্যময় ও রাজকীয় ভোগের অন্তর্কথা—যা কেবল ধর্ম নয়, জড়িয়ে আছে শত শত বছরের লোক-ইতিহাসের সাথে! পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শক্তিপীঠে মায়ের পছন্দের ভোগ স্থানভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। কোথাও নিরামিষ অন্নভোগ, আবার কোথাও আমিষ পদ-যেমন মাছ, এমনকি বলি দেওয়া পাঁঠার মাংসও দেবীকে পরম তৃপ্তিতে নিবেদন করা হয়। নিচে বাংলার কয়েকটি প্রধান শক্তিপীঠের ভোগের বিবরণ দেওয়া হলো:

🕉 তারা মায়ের ভোগ (তারাপীঠ, বীরভূম):

বীরভূমের এই মহাশ্মশানে মা তারা কেবল বিশ্বজননী নন, তিনি বামাখ্যাপার পরম আরাধ্যা 'বড় মা'। এখানে দেবীর নিত্য পুজোয় মিষ্টি, মিছরি ও লুচি-সুজির শীতল ভোগ দেওয়া হলেও, মধ্যাহ্ন ও রাতের প্রধান আকর্ষণে থাকে এক্কেবারে কড়া শাক্ত মেজাজ। মন্দির চত্বরে উৎসর্গীকৃত ছাগ-বলির কষা মাংস এবং মহাশ্মশানের ঐতিহ্যবাহী পোড়া শোল মাছ ও কারণ-বারি (মদ) ছাড়া মা তারার প্রধান অন্নভোগ সম্পূর্ণ হয় না! এখানে দেবীর নিত্যপুজোয় দিনের বিভিন্ন সময়ে মিষ্টি, মিছরি, লুচি ও সুজির শীতল ভোগ দেওয়া হয়। তবে দুপুর ও রাতে প্রধান ভোগে থাকে অন্ন, ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি। বিশেষত, মা তারার সবথেকে পছন্দের ভোগ হলো মন্দির চত্বরে বলি দেওয়া পাঁঠার মাংস এবং পোড়া শোল মাছ ও পোলাও বা খিচুড়ি। সাথে থাকে মা তারার প্রিয় ল্যাংচা, ক্ষীর ও ছানার মিষ্টি, ক্ষীরের তৈরি নানা পদ, রাবড়ি, মিষ্টি, মিছরি, লুচি ও সুজির শীতল ভোগ। মহাশ্মশানের আদি তান্ত্রিক মতে এখানে কড়া আমিষ ভোগ বাধ্যতামূলক।

🕉 মা কালীর ভোগ (কালীঘাট, কলকাতা):

৫১ সতীপীঠের অন্যতম প্রধান এই ক্ষেত্রে দেবীর আদি ও অকৃত্রিম রূপে আমিষ ভোগের দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। সুগন্ধ সুবাসিত ঘিয়ে ভাজা চালের 'কালা ভাত', পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া পাঁঠার বলির নিরামিষ মাংস এবং কাতলা বা চিংড়ির মালাইকারির রাজকীয় ভোগ মাকে নিবেদন করা হয়। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মিষ্টি রহস্য হলো—রাতের শয়নের আগে মাকে নিবেদন করা হয় বিখ্যাত হারান মাঝির মিষ্টির দোকানের ১৬০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী 'চ্যাপ্টা রসগোল্লা' বা ক্ষীরমোহন! আমি ব্যক্তিগত ভাবে ভালোবাসে ওটাকে রসচ্যাপ্টা বলে ডাকি। কালীঘাটে মূলত আমিষ ভোগ নিবেদনের দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। মায়ের প্রধান ভোগ হিসেবে অন্ন বা খিচুড়ির সঙ্গে মাছের পদ (বিশেষ করে কাতলা মাছ বা চিংড়ি মাছের মালাইকারি) এবং পাঁঠার মাংসের ভোগ অত্যন্ত পছন্দের। এছাড়াও মায়ের প্রধান মধ্যাহ্ন ভোগে থাকে বোয়াল বা আর মাছের ঝোল সাথে মা দক্ষিণাকালীর প্রিয় খাঁটি ক্ষীরের সন্দেশ, পান এবং বড় বড় ছানার মিষ্টি। এই রাজকীয় ভোগ পাওয়ার জন্য আগে থেকে বুকিং করা বাধ্যতামূলক।

🕉 কঙ্কালীতলা মন্দিরের ভোগ (বীরভূম):

শান্তিনিকেতনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা কোপাই নদীর তীরে এই সিদ্ধপীঠে দেবীর কোনো মূর্তি নেই। এক অলৌকিক কুণ্ডে সতীর দেহাংশ পূজিত হয়। এখানকার পরিবেশের মতোই মায়ের ভোগও অত্যন্ত শান্ত ও সাত্ত্বিক। মায়ের ছবিতে প্রতিদিন নিবেদন করা হয় সাদা অন্ন বা নিরামিষ খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, লাবড়া, মিষ্টি দই এবং গুড়ের তৈরি সুস্বাদু সন্দেশ। এখানে দেবীর কোনো মূর্তি নেই, একটি কুণ্ডে সতীর দেহাংশ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। কোপাই নদীর তীরের এই সিদ্ধপীঠে ভক্তরা সাধারণত দুধ, ফল, মিষ্টি এবং সাধারণ নিরামিষ অন্নভোগ মায়ের ছবিতে নিবেদন করেন। সম্পূর্ণ শান্ত ও সাত্ত্বিক নিরামিষ অন্নভোগ, খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, লাবড়া এবং পায়েস মায়ের ছবিতে নিবেদিত হয়। সাথে থাকে ক্ষীর, ছানাবড়া, গুড়ের সন্দেশ এবং মিষ্টি দই। কুণ্ডের জল ও মায়ের ছবিতে দুধ, ফল ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়। এক্কেবারে শান্ত পল্লী-প্রকৃতির এখানে মায়ের স্বাত্তিক ভোগ পাবার আশায় উপচে পড়ে ভক্ত দের ভিড়। মায়ের অত্যন্ত প্রিয় খাঁটি মিষ্টি দই এবং ছানার গোল সন্দেশ।

🕉 মায়ের ভোগ (বক্রেশ্বর, বীরভূম):

অষ্টাবক্র মুনির এই তপোভূমিতে মা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে আসীন। এই আদি ক্ষেত্রে তান্ত্রিক মতে অন্নভোগ, পাঁচ তরকারি ও ভাজার সাথে বলির মাংস ও মাছ নিবেদন করার সুপ্রাচীন প্রথা আজও কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। মায়ের মিষ্টির থালায় থাকে খাঁটি ছানার মিষ্টি ও রাবড়ি। উষ্ণ প্রস্রবণের জন্য বিখ্যাত বক্রেশ্বরে মায়ের মহিষমর্দিনী রূপ পূজিত হয়। এখানে মা কালীর মতোই অন্নভোগ, পাঁচ তরকারি, ভাজা এবং তান্ত্রিক মতে আমিষ ভোগ বা বলির মাংস ও মাছ নিবেদন করার প্রথা রয়েছে। মায়ের প্রিয় খাঁটি ছানার মিষ্টি, পেঁড়া এবং রাবড়ি ও বক্রেশ্বরের বিখ্যাত ক্ষীর।। উষ্ণ প্রস্রবণের এই সিদ্ধপীঠে তান্ত্রিক ও শাক্ত মূর্তির সহাবস্থান। এখানে মায়ের মহিষাসুরমর্দিনী রূপ কে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, মাছের ঝোল এবং বিশেষ তিথিতে বলির মাংস।

🕉 ​শ্রী রামকৃষ্ণের নিজের হাতে সেবা করা মা ভবতারিণীর ভোগ এক্কেবারে রাজকীয়! এখানে বলি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তাই কোনো মাংসের পদ থাকে না। কিন্তু নিরামিষ পদের পাশাপাশি মাছের ভোগ এখানে বাধ্যতামূলক! ঘি-ভাত, পোলাও, শুক্তো, পুঁইশাক আর ছানার ডালনার সাথে মাকে নিবেদন করা হয় পাঁচ রকমের মাছের পদ (রুই, কাতলা, কই, পার্শে এবং গলদা চিংড়ি)। শেষে থাকে চাটনি, রাবড়ি ও ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর-ছানার বিভিন্ন মিষ্টি। দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীকে প্রতিদিন রাজকীয় অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। এই ভোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিরামিষ পদের পাশাপাশি মাছের ভোগও দেওয়া হয়। মা ভবতারিণীর রাজকীয় অন্নভোগ: ঘি-ভাত, পোলাও এর পাশাপাশি সাদা ভাত, পুঁইশাক, শুক্তো, ছানার তরকারি এবং পাঁচ রকমের মাছ (রুই, কাতলা, কই, পার্শে, ভেটকি বা গলদা চিংড়ি অথবা ইলিশ) ও নিবেদন করা হয়। মায়ের খাস নৈবেদ্য হলো সন্দেশ, রসগোল্লা, রাবড়ি এবং ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর-ছানার বিভিন্ন মিষ্টি। এখানে বলি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! তাই মাছেদের রাজকীয় পদ থাকলেও কোনো মাংসের পদ দেওয়া হয় না। শ্রী রামকৃষ্ণের নিজের হাতে সেবা করা ভবতারিণী মায়ের ভোগে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি, মায়ের খাস পছন্দের রাজভোগ, ছানার সন্দেশ এবং রাবড়ি।

মা ভবতারিণীর ভোগে সাধারণত যেসকল পদ

থাকে:

প্রধান অন্ন: ঘি-ভাত, পোলাও ও সাদা ভাত।

ভাজা ও শাক: পাঁচ রকমের ভাজা এবং পুঁইশাক।

তরকারি ও ডাল: শুক্তো, ছানার তরকারি এবং ডাল।

মাছ: পাঁচ রকমের মাছের পদ (রুই, কাতলা, কই, পার্শে এবং ভেটকি বা গলদা চিংড়ি)।

মিষ্টি ও অন্যান্য: চাটনি, পায়েস, ক্ষীর, দই এবং নানা রকমের মিষ্টি।

🕉 আদ্যাপীঠ (কলকাতা): জগৎ-কল্যাণের অলৌকিক সাত্ত্বিক অন্নক্ষেত্র

ব্রহ্মচারী অন্নদা ঠাকুরের এই মহাসাধনাক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরামিষ ও সাত্ত্বিক অন্নকূটের ছোঁয়া পাওয়া যায়। মায়ের মহাতৃপ্তির ভোগ তালিকায় থাকে খিচুড়ি, বাসন্তী পোলাও, আলুর দম, পাঁচমিশালি তরকারি ও ছ্যাঁচড়া। আর মিষ্টির পাতে মায়ের সবচেয়ে পছন্দের পদ হলো সুস্বাদু মালপোয়া ও মিছরির জল। আদ্যাপীঠে দেবী আদ্যার ভোগ প্রসাদ অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি বিভিন্ন সুস্বাদু পদের সমাহারে প্রস্তুত করা হয়। আদ্যাপীঠে ব্রহ্মচারী অন্নদা ঠাকুরের ধামে সম্পূর্ণ নিরামিষ সমৃদ্ধ ভোগ: খিচুড়ি, বাসন্তী পোলাও, ভাত, আলুর দম, মিক্সড ভেজ, ছ্যাঁচড়া ও চাটনি নিবেদন করা হয়। মায়ের বিশেষ পছন্দ মালপোয়া, পায়েশ, নানা রকম মিষ্টি এবং মিছরির জল। ব্রহ্মচারী অন্নদা ঠাকুরের এই ধামে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়।

মায়ের বিশেষ পছন্দ মালপোয়া এবং মিছরির জল। মায়ের পছন্দের ভোগগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদগুলি হলো:

খিচুড়ি

বাসন্তী পোলাও

ভাত

আলুর দম | আলুর তরকারি

মিক্সড ভেজ (কুমড়ী বা সবজির তরকারি)

পাঁচমিশালি তরকারি

ছ্যাঁচড়া

চাটনি

পায়েশ

মিষ্টি

🕉 নলহাটী (বীরভূম): নলাটেশ্বরীর পছন্দ সুগন্ধি বোঁদে ও পেঁড়া।

সতীর কণ্ঠনালী বা নলা যেখানে পতিত হয়েছিল, সেই নলহাটী দুর্গে মা নলাটেশ্বরীর নিত্য পুজোয় গোবিন্দভোগ চালের সুগন্ধি খিচুড়ি ও পোলাও দেওয়া হয়। তবে মিষ্টির দিক থেকে এখানকার বিশেষ আকর্ষণ হলো মায়ের প্রিয় পেঁড়া, ক্ষীরকদম, রসগোল্লা এবং ক্ষীরের কাঁচাগোল্লা।। নলাটেশ্বরী মায়ের নিত্য ভোগে সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি, পোলাও এর সাথে থাকে নিরামিষ তরকারি। ভক্তদের প্রধান নৈবেদ্য পেঁড়া, ক্ষীরকদম এবং রসগোল্লা ও সুগন্ধি বোঁদে।

🕉 নৈহাটির বিখ্যাত বড় মাকে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিভিন্ন ধরনের ভোগ নিবেদন করা হয়। এই ভোগের থালায় প্রধানত থাকে সাদা অন্ন, পোলাও, খিচুড়ি, লুচি এবং সুজি। এর সঙ্গে আমিষ ও নিরামিষ নানা পদ যেমন- এঁচোড়ের তরকারি, ছানার তরকারি, পনিরের তরকারি, অরহর ডাল, পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি ও পায়েস দেওয়া হয়। অন্নকূট উৎসবের সময় এই আয়োজনে আলুর দমও যোগ হয়। আমাদের জাগ্রত বড় মায়ের রাজকীয় ভোগে থাকে স্তূপাকার করা সাদা অন্ন, পোলাও, খিচুড়ি, লুচি এবং সুজি। এর সঙ্গে এঁচোড়ের তরকারি, পনির ও ছানার ডালনা তো থাকেই, কিন্তু অন্নকূট উৎসবের সময় মায়ের ভোগের প্রধান ইউএসপি হয়ে ওঠে জাঁদরেল আলুর দম। আর মিষ্টির থালায় সাজানো থাকে হাজার হাজার কেজি কালো জাম ও ল্যাংচা! এবং দীপাবলিতে কয়েকশো কেজি ফল ও মিষ্টি মা কালীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়।

🕉 শান্তিপুর আগমেশ্বরী (নদীয়া): ৩৬ রকমের নিরামিষ ব্যঞ্জনের মহাসমাহার

​সর্বানন্দী তন্ত্রের আদি দেবী আগমেশ্বরী মায়ের পুজোয় কোনো পশুবলি হয় না। সম্পূর্ণ নিরামিষ মেজাজে মাকে ৩৬ রকমের ব্যঞ্জনে ভোগ দেওয়া হয়! বিউলি ও মুগ ডাল, ৩ রকমের শাক (লাল, কচু, পালং), চালকুমড়ো, এঁচোড় ও ছানার ডালনার সাথে শেষ পাতে থাকে চালতার চাটনি এবং শান্তিপুরের বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী নিখুঁতি মিষ্টি। নদীয়ার শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী মা আগমেশ্বরীর পুজোয় মাকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ৩৬ রকমের ব্যঞ্জনে ভোগ নিবেদন করা হয়। এই প্রাচীন পুজোয় কোনো পশুবলি হয় না। এখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ ৩৬ রকমের ব্যঞ্জনে মহাতৃপ্তির যে ভোগ গুলি থাকে তার মধ্যে পোলাও, বিউলি ও মুগ ডাল, শুক্তো, ৩ রকমের শাক (লাল, কচু, পালং), চালকুমড়ো, কচুর দম, এঁচোড় ও ছানার ডালনা। শান্তিপুরের বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী নিখুঁতি, হরেক রকমের মিষ্টান্ন এবং পায়েস এবং ক্ষীরের ছাঁচ সন্দেশ।

মা আগমেশ্বরীর পছন্দের ভোগ তালিকায় মূলত যে পদগুলি থাকে, তা হলো:

মূল পদ:

পোলাও

ডাল: বিউলি ও মুগ ডাল

শুক্তো

ভাজা ও শাক:

তিন রকমের শাক (লাল শাক, কচু শাক, পালং শাক)

বিভিন্ন ধরনের ভাজা

তরকারি ও নিরামিষ পদ:

চালকুমড়ো ও মিষ্টি কুমড়োর তরকারি

কচুর দম ও বাঁধাকপির তরকারি

এঁচড়ের তরকারি এবং ছানার

ডালনা

চাটনি ও মিষ্টি:

চালতা ও টমেটোর চাটনি

হরেক রকমের মিষ্টান্ন এবং পায়েস

এছাড়া সেই ঋতুতে লভ্য প্রায় সব ধরনের ফলই মাকে অর্পণ করা হয়।

🕉 পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রামের জাগ্রত সতীপীঠ ও শক্তিপীঠ মা যোগাদ্যার (ভদ্রকালী) ভোগে সাধারণত আমিষ পদ নিবেদন করা হয়। মঙ্গলকোটের এই জাগ্রত শক্তিপীঠে মা যোগাদ্যা (ভদ্রকালী) রূপে পূজিত হন। মায়ের প্রিয় ভোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আমিষ ও মিষ্টান্নের এক অদ্ভুত যুগলবন্দী। দীপাবলি ও নিত্য পুজোয় ছাগ-বলির মাংস এবং গঙ্গার খাঁটি মাছের আমিষ অন্নভোগ যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনই নামের স্বার্থকতা বজায় রেখে মায়ের পাতে দেওয়া হয় ঘন ক্ষীর, পায়েস এবং সুস্বাদু লুচি। এই আদি সতীপীঠের ভোগে আমিষ ও মিষ্টির এক অদ্ভুত তান্ত্রিক ভারসাম্য রয়েছে ।

🕉 পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম মা বর্গভীমার প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী ভোগ হল

শোল মাছের টক। ৫১ সতীপীঠের অন্যতম প্রাচীন এই ভীমরূপা সতীপীঠের ভোগ পরমাশ্চর্য! যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথা অনুযায়ী, দেবীর প্রতিদিনের নিত্য ভোগে পাকা তেঁতুল দিয়ে রান্না করা শোল মাছের টক (অম্বল) নিবেদন করা অবধারিত! বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে মায়ের এই মাছের টকের সাথে রাজভোগ ও চন্দ্রপুলি মিষ্টি সাজিয়ে দেওয়া হয়। রাজভোগ: বিশেষ উৎসব বা পূজার দিনগুলোতে (যেমন কালীপূজা) দেবীকে রাজবেশে সাজিয়ে মাছের পাশাপাশি অন্ন ও অন্যান্য ভোগও দেওয়া হয়।

🕉 কীরীটকোণা অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের শ্রী কিরীটেশ্বরী শক্তিপীঠ মন্দিরে দেবীকে অন্নভোগ, নানা রকমের মিষ্টি ও পায়েস নিবেদন করা হয়। এছাড়াও, বিশেষ পূজা ও উৎসবে (যেমন দুর্গাপূজার অষ্টমীতে) আমিষ ভোগ হিসেবে বিভিন্ন মাছের পদ, বিশেষ করে ইলিশ ও শোল মাছের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

নিত্যদিনের নিবেদন:-

অন্নভোগ: ভাত, ডাল ও নিরামিষ তরকারি।

মিষ্টি ও পায়েস: ক্ষীর, সুস্বাদু পায়েস এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি।

ফলমূল: মরসুমি ফল।

বিশেষ উৎসবের ভোগ (যেমন অষ্টমীর ভোগ)
মাছ: রুই, কাতলা ও বিশেষ করে ইলিশ মাছ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ভক্তদের জন্য এই রাজরাজেশ্বরী অন্ন প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থাও থাকে।

🕉 অট্টহাস সতীপীঠ মায়ের ভোগ ও পছন্দের মিষ্টান্ন।

পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের কাছে অবস্থিত অট্টহাস সতীপীঠে (যেখানে সতীর অধরোষ্ঠ বা নিচের ঠোঁট পড়েছিল) দেবী চামুণ্ডা বা অধরেশ্বরী রূপে পূজিতা হন। তান্ত্রিক ও শাক্ত মতে দেবীর নিত্যপূজা ও ভোগের আয়োজন করা হয়।

নিত্যভোগ নিবেদনের উপকরণ:

অন্ন ভোগ: দেবীকে প্রতিদিন দুপুরে মূল ভোগ হিসেবে অন্ন, ডাল এবং ভাজা নিবেদন করা হয়।

তরকারি ও ব্যঞ্জন: বিভিন্ন মরসুমি শাকসবজির তরকারি ও পাঁচমিশালি তরকারি দেওয়া হয়।

মিষ্টি ও ফল: দুধ, ক্ষীর বা পায়েস, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি এবং নানান ধরণের ফল প্রসাদ হিসেবে নিবেদন করা হয়।

এছাড়াও বিশেষ তিথি ও অমাবস্যায় দেবীর ভোগের আয়োজনে বিশেষ বৈচিত্র্য আসে। দর্শনার্থীদের জন্য মন্দির চত্বরে স্বল্প মূল্যে অন্নভোগ প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থাও রয়েছে

🕉পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সাঁইথিয়ায় অবস্থিত নন্দীকেশ্বরী সতীপীঠে দেবীকে প্রধানত বৈষ্ণব ও তান্ত্রিক মতে সম্পূর্ণ নিরামিষ ‘অন্নভোগ’ নিবেদন করা হয়। মা'কে সাধারণত অন্ন, পাঁচ রকম ভাজা, ডাল, চাটনি, তরকারি, মাছ এবং পায়েস ও মিষ্টি এবং বিভিন্ন মরসুমি সব্জির তরকারি নিবেদন করা হয়।

নিত্যদিনের ভোগের উপকরণ:

প্রধান অন্ন: সুগন্ধি চালের ভাত বা পোলাও

ব্যঞ্জন: ঘি-ভাত, ডাল, নানা রকমের ভাজা, শুক্তো এবং একাধিক তরকারি

মিষ্টান্ন ও ক্ষীর: ক্ষীর, পায়েস এবং বিভিন্ন ধরনের খাঁটি ছানার মিষ্টি এবং রসগোল্লা থাকে।

এছাড়া বিশেষ পূজা বা তিথিতে (যেমন বৈশাখী পূর্ণিমা বা শিবরাত্রিতে) ভক্তদের পক্ষ থেকে মা নন্দীকেশ্বরীকে ফলমূল এবং মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়।

পোলাও: শনি ও মঙ্গলবার মা-কে বিশেষ করে অন্নভোগের বদলে সুগন্ধী চালের পোলাও নিবেদন করা হয়।

শীতকালীন ভোগ: বিশেষ উৎসবের দিনগুলিতে স্থানীয় মিষ্টি ও ক্ষীর নিবেদনের প্রচলন রয়েছে।

অনেক ভক্ত মায়ের উদ্দেশ্যে মাছও ভোগ হিসেবে নিবেদন করে থাকেন।

🕉বীরাচারীদের ভূমি বীরভূম। পঞ্চসতীপীঠের অন্যতম লাভপুরের ফুল্লরা দেবী। ‘অট্টহাসে ওষ্ঠ পাতো দেবী সা ফুল্লরা স্মৃতা।বিশ্বেশো ভৈরব স্তত্র সর্বাভীষ্ট প্রদায়ক।

বীরভূমের লাভপুরে অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম ফুল্লরা সতীপীঠে মা জয়দুর্গাকে নিত্যদিন অন্নভোগ বা ভাত এবং বিশেষ দিনে আমিষ ও নিরামিষ দুই ধরনের ভোগই নিবেদন করা হয়। দুপুরে দেবীকে অন্ন, ডাল, ভাজা ও বিভিন্ন তরকারির সাথে আমিষ ভোগ (মাছের পদ) নিবেদন করা হয়। মা ফুল্লরার পরম পছন্দের মিষ্টি হলো ক্ষীর ও ক্ষীরভোগ, রসগোল্লা, মিহিদানা, এবং সন্দেশ।এছাড়া স্থানীয় নানা মিষ্টির দোকানে তৈরি খাঁটি ছানার মিষ্টান্নও মাকে দেওয়া হয়।

নিত্যদিনের ভোগ: অন্ন, ডাল ও বিভিন্ন ধরনের তরকারি

আমিষ ও অন্যান্য বিশেষ ভোগ: বিশেষ করে মায়ের ভোগে টক মাছ এবং মাংস নিবেদন করা হয়। সাথে থাকে পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি বা টক। এছাড়া ক্ষীর, পায়েস ও মিষ্টি ও মা কে নিবেদন করা হয়।

🕉 মলুটি গ্রামে অবস্থিত জাগ্রত দেবী মা মৌলাক্ষী (বা মা মৌলীক্ষা)-কে প্রধানত তন্ত্র মতে পুজো করা হয়। মা তারার বড় বোন হিসেবে পূজিতা এই দেবীকে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ভোগ নিবেদন করা হয়—

নিত্য ভোগ ও শীতল ভোগ: সকালে মঙ্গলারতির পর সাধারণত লুচি, সুজি, এবং বিভিন্ন ফলমূল দিয়ে শীতল ভোগ নিবেদন করা হয়।

অন্ন বা মহাভোগ: দুপুরে বা বিশেষ পুজো ও উৎসবের দিনে দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। এই মহাভোগে সাধারণত খিচুড়ি বা পোলাও, সাথে পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি এবং পায়েস থাকে।

তান্ত্রিক উপাচার: তন্ত্রপীঠ হওয়ায় মায়ের নিত্য পুজোর নানা বিশেষ উপাচার রয়েছে।

🕉 পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামে অবস্থিত বহুলা সতীপীঠে (যেখানে দেবী সতীর বাম বাহু পতিত হয়েছিল) মাকে সাধারণত ঐতিহ্যবাহী ও ভক্তিপূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। মন্দিরে দেবীকে প্রতিদিন নিয়ম করে অন্ন, ডাল, ভাজা ও তরকারিসহ ষোড়শ উপাচারে অন্নভোেগ দেওয়া হয়। অন্নভোগের পাশাপাশি দেবীকে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। এর মধ্যে খাঁটি দুধের তৈরি রাবড়ি, ক্ষীর এবং কেতুগ্রাম ও কাটোয়া অঞ্চলের বিখ্যাত মিষ্টি দই মায়ের অত্যন্ত পছন্দের।

বিশেষ দিনের মিষ্টি: বিশেষ পূজা, নবরাত্রি বা দীপাবলিতে ভোগে বড় আকারের রসগোল্লা, পান্তুয়া এবং মিঠাই দেওয়া হয়।

সাধারণ ভোগের উপকরণ:

অন্ন ও ব্যঞ্জন: ঘি-ভাত বা অন্ন, খিচুড়ি, লুচি এবং পোলাও।

তরকারি: ছোলার ডাল, আলুর দম এবং মরসুমি সবজির মিশ্র তরকারি।

মিষ্টি ও ক্ষীর: ক্ষীর বা পায়েস এবং বিভিন্ন রকমের মিষ্টি (যেমন- সন্দেশ, রসগোল্লা)।

ফলমূল: মরসুমি টাটকা ফল ও ডাবের জল।
অন্যান্য: মিছরি, ছোলা, মুড়কি এবং জল।

তন্ত্রমতে পূজিতা এই দেবীকে বিশেষ তিথি বা উৎসবে (যেমন- নবরাত্রি বা দীপাবলি) পূজার প্রথা অনুযায়ী নৈবেদ্য বা শীতল ভোগও দেওয়া হয়। এখানে দেবী বহুলা তাঁর স্বামী ভৈরব (বীরুক) ও পুত্রকে (অষ্টভূজ গণেশ ও কার্তিক) নিয়ে একসঙ্গে বিরাজ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই এখানে পারিবারিক তৃপ্তিদায়ক খাবারের মতোই ভোগ প্রস্তুত করা হয়।

🕉 পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কোগ্রামের (পুরাতন নাম উজানি) সতীপীঠে মা মঙ্গলচণ্ডী (দেবী দুর্গার দশভুজা রূপ) রূপে পূজিতা হন। এই পীঠের প্রধান বিশেষত্ব হলো, বছরের ৩৬৪ দিনই দেবীর অন্নভোগে মাছ বাধ্যতামূলক। উজানি সতীপীঠে মাতা সতীর ডান কনুই পড়েছিল। এখানে দেবী মঙ্গলচণ্ডী নামে পূজিতা হন। সারাবছর দেবীর নিত্যভোগে অন্ন, ডাল, ভাজা ও মাছের পদ এবং পছন্দের মিষ্টান্ন হিসেবে ক্ষীর ও পায়েস বিশেষভাবে নিবেদন করা হয়।

নিত্য ও বিশেষ ভোগ:
সারাবছর: প্রতিদিনের অন্নভোগে ভাত, ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি এবং অবশ্যই মাছ নিবেদন করা হয়।

ভোগে মাছের প্রচলন: এই পীঠের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মাকে মাছের ভোগ দেওয়া। সাধারণত শোল ও বোয়াল মাছ ভাজা মায়ের ভোগের অপরিহার্য অংশ।

দুর্গাপূজা: কেবলমাত্র দুর্গাষ্টমীর দিন মাকে নিরামিষ ভোগ (লুচি, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি) দেওয়া হয়। বাকি দিনগুলোতে (যেমন সপ্তমী ও নবমী) মাছের ভোগই চলে! দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন দেবীকে কোনো মাছ বা আমিষ ভোগ দেওয়া হয় না। ওই দিন সম্পূর্ণ নিরামিষ অন্নভোগ, হরেক রকম ভাজা এবং মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়।

সারাবছর দেবীকে প্রতিদিন অন্ন, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি, ডাল, মাছ এবং মিষ্টান্ন হিসেবে ঘন ক্ষীর ও পায়েস নিবেদন করা হয়।

🕉 বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত যশোরেশ্বরী সতীপীঠে মা কালীর নিত্যপূজা ও ভোগ নিবেদনের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে নিরামিষ এবং স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। যশোরেশ্বরী সতীপীঠে দেবীকে প্রতিদিন ঐতিহ্যবাহী অন্নভোেগ এবং বিশেষ মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। মায়ের পছন্দের মিষ্টান্নের মধ্যে ক্ষীর, ক্ষীরমোহন, সন্দেশ, ছানার তৈরি বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও পাকা কলা প্রধান।

এছাড়া ভক্তরা মানত হিসেবে মায়ের উদ্দেশ্যে বাতাসা ও ফলমূল নিবেদন করেন। মাকে মূলত যে ভোগ ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

অন্ন ভোগ: গোবিন্দভোগ চালের সাদা ভাত ও ঘি-ভাত।

মিষ্টান্ন: ক্ষীর, পায়েস, মিষ্টি, দই, চিঁড়ে এবং বিভিন্ন প্রকার ফলমূল। ভোগে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্ষীর ও সুস্বাদু ছানার মিষ্টান্ন রাখা বাধ্যতামূলক।

মানতের প্রসাদ: ভক্তদের দেওয়া ভোগ বা বাতাসা পূজার পর সাধারণ দর্শনার্থীদের মাঝে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।

অন্যান্য: লুচি, ডাল, সবজি বা তরকারি।

এছাড়া পূজা ও ভোগ নিবেদনের পর পান-সুপারি দেওয়া হয়। বিভিন্ন বিশেষ তিথি ও উৎসবে এই ভোগ নিবেদনে মিষ্টান্ন ও নানা পদের সমারোহ ঘটে।

🕉 পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জে (তিস্তা নদীর তীরে) অবস্থিত ত্রিস্রোতা সতীপীঠে (মা ভ্রামরী দেবী) মা সতীকে প্রধানত তন্ত্র ও বৈষ্ণব উভয় রীতিতেই ভোগ নিবেদন করা হয়।

ত্রিস্রোতা সতীপীঠে মাকে যে যে ভোগ নিবেদন করা হয় তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

নিরামিষ (বৈষ্ণব রীতি): ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, লুচি, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, মিষ্টি, এবং ক্ষীর বা পরমান্ন।

পছন্দের মিষ্টান্ন: দেবীর ভোগের প্রধান ও পছন্দের মিষ্টান্নগুলোর মধ্যে রয়েছে খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের মিহিদানা, সন্দেশ (ক্ষীর ও ছানার) এবং রসগোল্লা।

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দেবী ভ্রামরী মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গদের দেবী, তাই ভোগে চিনির তৈরি মিষ্টির পাশাপাশি অনেক সময় বাতাসা ও মিষ্টি ফলমূলও রাখা হয়।

আমিষ (তান্ত্রিক রীতি): তন্ত্রপীঠ হওয়ার কারণে নিয়ম অনুযায়ী দেবীকে পাঁঠার মাংস এবং পোড়া মাছ (যেমন- শোল মাছ) নিবেদন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও দেবী যেহেতু কীট পতঙ্গের সাথে সম্পর্কিত, তাই নৈবেদ্য হিসাবে প্রচুর পরিমাণে চিনি, গুড় বা বাতাসাও দেওয়া হয়ে থাকে।

অন্যান্য উপাচার: এছাড়া নিত্য পূজায় মিষ্টি, ফলমূল, ডাবের জল, নতুন লাল বস্ত্র বা চেলি এবং জবা ফুলের মালা দেওয়া হয়।

🔱 কালী পুজোয় বিশেষ কিছু মিষ্টি বা ভোগ নিবেদন করা হয়ে থাকে। অঞ্চলভেদে মায়ের পছন্দের এবং পূজায় ব্যবহৃত এই বিখ্যাত মিষ্টিগুলো হলো:

🌺 কালীঘাট (কলকাতা): মা কালীর জন্য বিখ্যাত ১৬০ বছরের পুরনো 'চ্যাপ্টা রসগোল্লা' বা ক্ষীরমোহন। হারান মাঝি মিষ্টির দোকানে তৈরি এই বিশেষ মিষ্টিটি মা কালীর ভোগে দেওয়া হয় এবং রাতের শয়নের আগে এটি মাকে নিবেদন করা হয়।

🌺 তারাপীঠ (বীরভূম): এই মহাশ্মশানে দেবী তারাকে ভোগ হিসেবে সাধারণত আমিষ (খাসির মাংস ও শোল মাছ) দেওয়া হলেও, মিষ্টির মধ্যে ক্ষীরের তৈরি নানা পদ ও রাবড়ি মায়ের অত্যন্ত প্রিয়।

🌺 দক্ষিণেশ্বর (কলকাতা): ভবতারিণী মায়ের পুজোয় সন্দেশ, রসগোল্লা ও ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর-ছানার বিভিন্ন মিষ্টির নৈবেদ্য সাজানো হয়।

🌺 কঙ্কালীতলা (বোলপুর): এখানকার মা কালীর কাছে ক্ষীর, ছানাবড়া ও গুড়ের তৈরি সন্দেশ খুবই জনপ্রিয়।

🌺 বক্রেশ্বর (বীরভূম): এখানকার মা মহিষমর্দিনী ও কালী মন্দিরে খাঁটি ছানার মিষ্টি ও রাবড়ি নিবেদন করা হয়।

🌺 নলহাটি (বীরভূম): মা নলাটেশ্বরীর শক্তিপীঠে ভক্তরা সাধারণত পেঁড়া, ক্ষীরকদম এবং রসগোল্লা নিবেদন করে থাকেন।

🙏🏼🙏🏼রক্ত-জবার মালা আর খড়গের রুদ্র রূপের অন্তরালে মা যে আসলে সন্তানের জন্য অন্নপূর্ণা—বাংলার এই বিভিন্ন সতীপীঠের বৈচিত্র্যময় ভোগ-তালিকাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মায়ের চরণে ভক্তি আর জিভের স্বাদে এই শাক্ত ইতিহাসই বাঙালির ভক্তিকে বাকি দুনিয়ার থেকে আলাদা করে রেখেছে।🙏🏼🙏🏼

বৈদিক জ্যোতিষের অন্তরালে: যোগ, যোগিনী ও করণ​মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রের বিন্যাস আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে প্র...
28/05/2026

বৈদিক জ্যোতিষের অন্তরালে: যোগ, যোগিনী ও করণ
​মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রের বিন্যাস আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। আমরা সাধারণত রাশি বা লগ্ন নিয়ে চর্চা করলেও, বৈদিক পঞ্চাঙ্গের আরও তিনটি অত্যন্ত শক্তিশালী স্তম্ভ হলো যোগ, যোগিনী এবং করণ। জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কর্মের শুভ-অশুভ ফল বুঝতে এই তিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

​যোগ (Yoga): সূর্য ও চন্দ্রের দূরত্বের মেলবন্ধন থেকে তৈরি হয় ২৭টি নিত্য যোগ। এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং আমাদের চারপাশের পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নির্ধারণ করে।

​যোগিনী দশা (Yogini Dasha): ৩৬ বছরের একটি চক্রে আবর্তিত এই দশা পদ্ধতি আমাদের জীবনের নির্দিষ্ট সময়ের শুভ বা অশুভ প্রভাবকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করে। ৮ জন দৈব যোগিনী এই চক্রের নিয়ন্ত্রক।

​করণ (Karana): প্রতিটি তিথির অর্ধাংশ হলো এক একটি করণ। শাস্ত্রে বলা হয়, 'করণং কর্ম সিদ্ধি'—অর্থাৎ আমাদের দৈনন্দিন কর্মে সাফল্য পাওয়ার চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে এই করণের সঠিক ব্যবহারের ওপর।
​নিচে এই তিনটি রহস্যময় বিষয়ের বিস্তারিত তালিকা ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো, যা আপনাকে নিজের জীবন সম্পর্কে আরও গভীরে জানতে সাহায্য করবে।


জ্যোতিষ শাস্ত্রে যোগিনী দশা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দশা পদ্ধতি, যা মূলত ৩৬ বছরের একটি চক্রে আবর্তিত হয়। এই দশাটি নক্ষত্রের ওপর ভিত্তি করে গণনা করা হয় এবং মোট ৮ জন যোগিনী এই দশাগুলি নিয়ন্ত্রণ করেন।

​নিচে ৮ জন যোগিনী, তাঁদের দশা কাল এবং প্রভাব ব্যাখ্যা করা হলো:

​১. মঙ্গলা (Mangala)

​সময়কাল: ১ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: চন্দ্র।

​প্রভাব: এটি অত্যন্ত শুভ দশা। এই সময়ে মানসিক শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি এবং শুভ কাজের সূচনা হয়। এটি সাধারণত জ্ঞান বৃদ্ধি এবং সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়।

​২. পিঙ্গলা (Pingala)

​সময়কাল: ২ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: সূর্য।

​প্রভাব: এই দশাটি কিছুটা মিশ্র বা কষ্টকর হতে পারে। শারীরিক অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। তবে ধৈর্য ধরলে এটি আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে।

​৩. ধন্যা (Dhanya)

​সময়কাল: ৩ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: মঙ্গল।

​প্রভাব: নাম অনুযায়ী এটি 'ধন্য' বা সৌভাগ্যের দশা। আর্থিক উন্নতি, কর্মক্ষেত্রে সাফল্য এবং মান-সম্মান বৃদ্ধির যোগ তৈরি হয়। শত্রুরা এই সময়ে পরাস্ত হয়।

​৪. ভ্রামরী (Bhramari)

​সময়কাল: ৪ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: বুধ।

​প্রভাব: 'ভ্রামরী' শব্দের অর্থ ভ্রমণকারী। এই দশায় অহেতুক ঘোরাঘুরি, স্থান পরিবর্তন বা কাজের চাপে অস্থিরতা বাড়তে পারে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কিছুটা ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

​৫. ভদ্রিকা (Bhadrika)

​সময়কাল: ৫ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: বৃহস্পতি।

​প্রভাব: এটি অত্যন্ত কল্যাণকর দশা। পারিবারিক সুখ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এই সময়টি সেরা। বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়দের থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যায়।

​৬. উল্কা (Ulka)

​সময়কাল: ৬ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: শনি।

​প্রভাব: এই সময়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কাজে বাধা, আইনি জটিলতা বা আকস্মিক শোকের সম্ভাবনা থাকে। কঠোর পরিশ্রম এবং সাবধানে পা ফেলা এই সময়ের প্রধান উপায়।

​৭. সিদ্ধা (Siddha)

​সময়কাল: ৭ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: শুক্র।

​প্রভাব: এটি সাফল্যের দশা। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত কাজ এই সময়ে সম্পন্ন হয়। বিবাহ, প্রেম বা নতুন কোনো সৃজনশীল কাজের জন্য এই ৭ বছর অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

​৮. সংকটা (Sankata)

​সময়কাল: ৮ বছর।

​নিয়ন্ত্রক গ্রহ: রাহু।

​প্রভাব: এটি যোগিনী দশা চক্রের দীর্ঘতম এবং কঠিনতম দশা। নামের মতোই এই সময়ে নানা 'সংকট' বা প্রতিকূলতা আসতে পারে। তবে এই দশা মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে এবং জীবনের কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

​বিশেষ দ্রষ্টব্য:

এই দশা নির্ণয় করা হয় জন্ম নক্ষত্রের সংখ্যায় ৩ যোগ করে তাকে ৮ দিয়ে ভাগ করে। অবশিষ্ট সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় কোনো ব্যক্তি কোন যোগিনী দশায় জন্মগ্রহণ করেছেন।

​উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক কোনো ব্যক্তির জন্ম 03/10/1991, অতএব উক্ত তারিখ অনুযায়ী চন্দ্রের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জাতকের জন্ম নক্ষত্র সম্ভবত অশ্লেষা (Ashlesha)।

​যোগিনী দশা গণনার সূত্রটি হলো:

(নক্ষত্র সংখ্যা+ 3) ÷ 8

যে সংখ্যাটি অবশিষ্ট (Remainder) থাকবে, সেটিই নির্দেশ করবে জাতকের জন্মের সময় কোন দশা চলছিল।

​উদাহরণ ও গণনা:

​১. নক্ষত্র নির্ধারণ: অশ্বিনী থেকে গণনা করলে অশ্লেষা হলো ৯ম নক্ষত্র।

২. সূত্রে প্রয়োগ: (9 + 3) = 12

৩. ভাগফল: ১২ কে ৮ দিয়ে ভাগ করলে (12 ÷ 8) অবশিষ্ট থাকে ৪ (4)

​ফলাফল:
উপরে দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ৪ নম্বর যোগিনী হলো ভ্রামরী। অর্থাৎ, জাতকের জন্মের সময় ভ্রামরী দশা চলছিল।

​দশা চক্রের ক্রম অনুযায়ী জীবনধারা:

​যেহেতু জাতকের জন্ম 'ভ্রামরী' দশায়, তাই জীবনের দশা চক্র নিচের ক্রমে অগ্রসর হয়েছে:

​ভ্রামরী (৪ বছর): ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত।
​ভদ্রিকা (৫ বছর): ১৯৯৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত।
​উল্কা (৬ বছর): ২০০০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত।
​সিদ্ধা (৭ বছর): ২০০৬ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত।
​সংকটা (৮ বছর): ২০১৩ থেকে ২০২১ পর্যন্ত।
​মঙ্গলা (১ বছর): ২০২১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত।
​পিঙ্গলা (২ বছর): ২০২২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত।
​ধন্যা (৩ বছর): ২০২৪ থেকে শুরু হয়েছে এবং এটি ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলবে।

​বর্তমান প্রভাব (ধন্যা দশা):

​বর্তমানে উক্ত জাতক ধন্যা দশার অধীনে আছেন (যা ২০২৪-এর শেষভাগ থেকে ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর)। ধন্যা দশার অধিপতি মঙ্গল। এই সময়টি সাধারণত:
​আর্থিক উন্নতির জন্য সহায়ক।
​পুরানো প্রচেষ্টার শুভ ফল পাওয়া যায়।
​পরিবারে সুখ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।

জ্যোতিষ শাস্ত্রে করণ হলো পঞ্চাঙ্গের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের একটি (তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ এবং করণ)। একটি 'তিথি'র অর্ধেক অংশকে বলা হয় করণ। অর্থাৎ, একটি তিথিতে দুটি করণ থাকে।

​মোট করণের সংখ্যা ১১টি। এদের দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: স্থির করণ এবং চর (গতিশীল) করণ।

​১. চর করণ (Variable Karana)
​এই ৭টি করণ চক্রাকারে আবর্তিত হয়। কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ তিথির দ্বিতীয় অংশ থেকে শুক্লপক্ষের চতুর্দশী তিথির প্রথম অংশ পর্যন্ত এগুলি বারবার ফিরে আসে।

​বব (Bava): এটি অত্যন্ত শুভ। এই করণে জন্ম হলে ব্যক্তি সাহসী, কর্মঠ এবং আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন হন।

​বালব (Balava): এর অধিপতি ব্রহ্মা। এই করণের জাতকরা সাধারণত শান্ত, ধৈর্যশীল এবং সুশিক্ষিত হন। ধর্মীয় কাজে এদের আগ্রহ থাকে।

​কৌলব (Kaulava): এর অধিপতি মিত্র (সূর্য)। এরা বন্ধুসুলভ এবং সামাজিক হন। মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে এরা দক্ষ।

​তৈতিল (Taitila): এর অধিপতি বিশ্বকর্মা। এই করণে জন্ম হলে ব্যক্তি ভাগ্যবান হন এবং স্থাপত্য বা সৃষ্টিশীল কাজে সফল হন।

​গর (Gara): এর অধিপতি ভূমি। এরা কঠোর পরিশ্রমী এবং কৃষিকাজ বা ভূ-সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজে উন্নতি করেন।

​বণিজ (Vanija): এর অধিপতি লক্ষ্মী। নামের মতোই এরা ব্যবসা-বাণিজ্যে অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সফল হন।

​বিষ্টি বা ভদ্রা (Vishti/Bhadra): এটি অশুভ বলে গণ্য হয়। এই করণে নতুন কোনো শুভ কাজ শুরু করা নিষেধ। তবে শত্রুকে দমন বা গবেষণামূলক কাজের জন্য এটি উপযুক্ত।

​২. স্থির করণ (Fixed Karana)
​এই ৪টি করণ মাসে কেবল একবারই আসে। এগুলি সাধারণত অশুভ বা কঠিন বলে বিবেচিত।

​শকুনি (Shakuni): এটি কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দ্বিতীয় অর্ধে আসে। এর জাতকরা সাধারণত বুদ্ধিমান কিন্তু কিছুটা ধূর্ত প্রকৃতির হতে পারেন। ঔষধ বা মন্ত্রশাস্ত্রে এদের আগ্রহ থাকে।

​চতুষ্পদ (Chatushpada): এটি অমাবস্যার প্রথম অর্ধে আসে। এর জাতকরা পশুপালন বা ব্যবসায় সফল হন। এরা সাধারণত স্বাধীনচেতা এবং একগুঁয়ে হন।

​নাগ (Naga): এটি অমাবস্যার দ্বিতীয় অর্ধে আসে। এর জাতকরা জ্ঞানপিপাসু হন কিন্তু জীবনে অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে পারেন।

​কিস্তুঘ্ন (Kinstughna): এটি শুক্লপক্ষের প্রতিপদের প্রথম অর্ধে আসে। এটি স্থির করণের মধ্যে তুলনামূলক শুভ। এরা পরোপকারী এবং ভাগ্যবান হন।

​করণের গুরুত্ব:

​জ্যোতিষ শাস্ত্রে বলা হয়, "করণং কর্ম সিদ্ধি"—অর্থাৎ কর্মে সাফল্য আসবে কি না, তা করণের ওপর নির্ভর করে।
​স্থাবর কাজ (যেমন বাড়ি কেনা) বা অস্থাবর কাজ (যেমন ব্যবসা শুরু) করার সময় শুভ করণ দেখা জরুরি।

​বিশেষ করে 'ভদ্রা' বা 'বিষ্টি' করণ চলাকালীন কোনো শুভ যাত্রা বা মাঙ্গলিক কাজ এড়িয়ে চলাই প্রচলিত নিয়ম।


জ্যোতিষ শাস্ত্রে 'যোগ' হলো পঞ্চাঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সূর্য এবং চন্দ্রের দূরত্বের যোগফলের ওপর ভিত্তি করে এই ২৭টি নিত্য যোগ নির্ণয় করা হয়। প্রতিটি যোগের নিজস্ব স্বভাব এবং অধিপতি দেবতা রয়েছেন, যা একজন ব্যক্তির চরিত্র ও কর্মজীবনের ওপর প্রভাব ফেলে।

​নিচে ২৭টি নিত্য যোগের নাম ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

​১. বিষ্কুম্ভ (Vishkumbha)
​এই যোগে জন্ম হলে ব্যক্তি সাধারণত জয়ী বা বিজয়ী হন। তবে জীবনের শুরুতে কিছুটা বাধা আসতে পারে। এরা সুন্দর চেহারার অধিকারী এবং সম্পদশালী হন।

​২. প্রীতি (Priti)
​অধিপতি দেবতা বিষ্ণু। এই যোগ অত্যন্ত শুভ। এরা দয়ালু, সবার প্রিয় এবং আনন্দপ্রিয় মানুষ হন। দাম্পত্য জীবন সাধারণত সুখের হয়।

​৩. আয়ুষ্মান (Ayushman)
​নাম থেকেই স্পষ্ট যে এরা দীর্ঘায়ু হন। সুস্বাস্থ্য এবং উচ্চশিক্ষার যোগ থাকে। এরা সাধারণত জীবনে স্থায়িত্ব এবং প্রতিষ্ঠা পছন্দ করেন।

​৪. সৌভাগ্য (Saubhagya)
​এটি অত্যন্ত মঙ্গলময় যোগ। সৌভাগ্যের জাতকরা জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করেন এবং সব কাজে ভাগ্যের সহায়তা পান।

​৫. শোভন (Shobhana)
​এরা দেখতে আকর্ষণীয় হন এবং চারিত্রিক শুদ্ধতা বজায় রাখেন। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি এদের গভীর অনুরাগ থাকে।

​৬. অতিগণ্ড (Atiganda)
​এটি কিছুটা প্রতিকূল যোগ। পারিবারিক বা শারীরিক ক্ষেত্রে নানা বাধা আসতে পারে। তবে এরা মানসিকভাবে দৃঢ় ও সাহসী হন।

​৭. সুকর্মা (Sukarma)
​এরা কর্মঠ এবং নীতিবান হন। সমাজে বড় কোনো সংস্কারমূলক কাজ বা সৎ কর্মে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করেন।

​৮. ধৃতি (Dhriti)
​ধৃতি মানে ধৈর্য। এই যোগের জাতকরা শান্ত প্রকৃতির এবং ধৈর্যশীল হন। বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে এরা তাড়াহুড়ো করেন না।

​৯. শূল (Shula)
​এই যোগের জাতকরা তর্করত এবং সাহসী হন। তবে ক্রোধের কারণে মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে পারেন। আধ্যাত্মিক দিকে এদের ঝোঁক থাকে।

​১০. গণ্ড (Ganda)
​জীবনের মোড়ে মোড়ে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তবে জেদ এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে এরা বড় বাধা অতিক্রম করতে পারেন।

​১১. বৃদ্ধি (Vriddhi)
​এরা জীবনে ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে পৌঁছান। ব্যবসা বা চাকরিতে পদোন্নতির সম্ভাবনা এদের খুব বেশি থাকে।

​১২. ধ্রুব (Dhruva)
​ধ্রুব মানে অটল। এদের একাগ্রতা অসামান্য। লক্ষ্য স্থির করলে এরা তা পূরণ না করে ছাড়েন না। এরা অত্যন্ত বিশ্বস্ত বন্ধু হন।

​১৩. ব্যাঘাত (Vyaghata)
​এরা কিছুটা চঞ্চল এবং খামখেয়ালি হতে পারেন। তবে বিপদের সময় এদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধি চমৎকার কাজ করে।

​১৪. হর্ষণ (Harshana)
​হর্ষণ মানে আনন্দ। এরা সবসময় হাসিখুশি থাকতে ভালোবাসেন এবং আশেপাশের পরিবেশকে আনন্দিত রাখেন।

​১৫. বজ্র (Vajra)
​এরা অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং কথার বরখেলাপ করেন না। আর্থিক দিক থেকে এরা বেশ সচ্ছল হন।

​১৬. সিদ্ধি (Siddhi)
​প্রতিটি কাজে এদের সাফল্য আসার সম্ভাবনা থাকে। এরা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন।
​১৭. ব্যতিপাত (Vyatipata)
​এটি একটু জটিল যোগ। জীবনের শুরুর দিকে অস্থিরতা থাকলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে এরা জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

​১৮. বরীয়ান (Variyana)
​এরা আরামপ্রিয় এবং শৌখিন হন। তবে নিজ যোগ্যতায় সমাজে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেন।

​১৯. পরিঘ (Parigha)
​শত্রু দমন করতে এরা পারদর্শী। এরা পরিশ্রমী এবং নিজের নীতিতে অটল থাকেন।

​২০. শিব (Shiva)
​অত্যন্ত শুভ যোগ। এরা ধার্মিক, শান্ত এবং পরোপকারী হন। মান-সম্মান এদের সহজাত প্রাপ্তি।

​২১. সিদ্ধ (Siddha)
​এরা সাধনা বা কোনো বিশেষ বিদ্যায় পারদর্শী হন। মানুষের সেবা করতে এরা আনন্দ পান।

​২২. সাধ্য (Sadhya)
​সাধ্য মানে যা সাধন করা যায়। এরা ধীরস্থির এবং লক্ষ্যমুখী। কূটনীতিতে এরা বেশ দক্ষ হন।

​২৩. শুভ (Shubha)
​এরা সত্যবাদী এবং সুন্দর মনের মানুষ হন। এদের জীবন সাধারণত সুশৃঙ্খল এবং বিতর্কমুক্ত হয়।

​২৪. শুক্ল (Shukla)
​এরা শুদ্ধ চরিত্রের অধিকারী এবং ধার্মিক হন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি এদের তীব্র নেশা থাকে।

​২৫. ব্রহ্ম (Brahma)
​এরা অত্যন্ত মেধাবী এবং সৃষ্টিশীল হন। গোপন বিদ্যায় এদের আগ্রহ থাকে এবং এরা বেশ মিতব্যয়ী হন।

​২৬. ঐন্দ্র (Indra)
​এরা নেতৃত্ব দিতে ভালোবাসেন। সমাজে এদের আধিপত্য বজায় থাকে এবং প্রশাসনিক কাজে সফল হন।

​২৭. বৈধৃতি (Vaidhriti)
​এটি শেষ যোগ। এই যোগের জাতকরা স্বাধীনচেতা এবং কিছুটা খামখেয়ালি হন। তবে এরা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ভাণ্ডার।

​জেনে রাখা ভালো:
এই ২৭টি যোগের মধ্যে প্রীতি, আয়ুষ্মান, সৌভাগ্য, শোভন, সুকর্মা, ধৃতি, বৃদ্ধি, ধ্রুব, হর্ষণ, সিদ্ধি, শিব, সিদ্ধ, সাধ্য, শুভ, শুক্ল, ব্রহ্ম এবং ঐন্দ্র—এই ১৭টি যোগকে সাধারণত শুভ ধরা হয়। বাকি ১০টি যোগের ক্ষেত্রে জাতককে কিছুটা বাড়তি সাবধানতা বা বিশেষ প্রতিকার অবলম্বন করতে বলা হয়।

তথ্যসূত্র: এই তথ্যগুলো মূলত 'বৃহৎ পরাশর হোরাশাস্ত্র' বা প্রথাগত 'পঞ্চাঙ্গ'-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

Address

চুঁচুড়া, হুগলী
Chinsurah
712103

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when দশমহাবিদ্যা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category