31/05/2026
🔱 মহাতীর্থের মহাকোষ: বাংলার বিভিন্ন জাগ্রত শক্তিধামে মায়ের পছন্দের রাজকীয় 'ভোগ সমূহ' 🔱
"যা দেবী সর্বভূতেষু ক্ষুধা-রূপেণ সংস্থিতা..."
বাঙালির তন্ত্রসাধনা আর শাক্ত ঐতিহ্যের অন্তরে মা যেমন রুদ্রাণী, তেমনই তিনি অন্নদাত্রী। কোথাও তিনি শ্মশান-কালী রূপে কড়া তান্ত্রিক আমিষ ভোগে সন্তুষ্ট, আবার কোথাও তিনি ভবতারিণী বা আদ্যা মা রূপে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও নিরামিষ ব্যঞ্জনে পরম তৃপ্ত। সতীর দেহাংশ যেখানে যেখানে পড়েছে, সেখানে কেবল আধ্যাত্মিক শক্তিপীঠ গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে এক একটি অনন্য এবং আদি 'ভোগ-পরম্পরা'।
আজকের এই শাক্ত আড্ডায় আসুন জেনে নিই পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জাগ্রত শক্তিধামে মায়ের সেই সুপ্রাচীন, রহস্যময় ও রাজকীয় ভোগের অন্তর্কথা—যা কেবল ধর্ম নয়, জড়িয়ে আছে শত শত বছরের লোক-ইতিহাসের সাথে! পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শক্তিপীঠে মায়ের পছন্দের ভোগ স্থানভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। কোথাও নিরামিষ অন্নভোগ, আবার কোথাও আমিষ পদ-যেমন মাছ, এমনকি বলি দেওয়া পাঁঠার মাংসও দেবীকে পরম তৃপ্তিতে নিবেদন করা হয়। নিচে বাংলার কয়েকটি প্রধান শক্তিপীঠের ভোগের বিবরণ দেওয়া হলো:
🕉 তারা মায়ের ভোগ (তারাপীঠ, বীরভূম):
বীরভূমের এই মহাশ্মশানে মা তারা কেবল বিশ্বজননী নন, তিনি বামাখ্যাপার পরম আরাধ্যা 'বড় মা'। এখানে দেবীর নিত্য পুজোয় মিষ্টি, মিছরি ও লুচি-সুজির শীতল ভোগ দেওয়া হলেও, মধ্যাহ্ন ও রাতের প্রধান আকর্ষণে থাকে এক্কেবারে কড়া শাক্ত মেজাজ। মন্দির চত্বরে উৎসর্গীকৃত ছাগ-বলির কষা মাংস এবং মহাশ্মশানের ঐতিহ্যবাহী পোড়া শোল মাছ ও কারণ-বারি (মদ) ছাড়া মা তারার প্রধান অন্নভোগ সম্পূর্ণ হয় না! এখানে দেবীর নিত্যপুজোয় দিনের বিভিন্ন সময়ে মিষ্টি, মিছরি, লুচি ও সুজির শীতল ভোগ দেওয়া হয়। তবে দুপুর ও রাতে প্রধান ভোগে থাকে অন্ন, ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি। বিশেষত, মা তারার সবথেকে পছন্দের ভোগ হলো মন্দির চত্বরে বলি দেওয়া পাঁঠার মাংস এবং পোড়া শোল মাছ ও পোলাও বা খিচুড়ি। সাথে থাকে মা তারার প্রিয় ল্যাংচা, ক্ষীর ও ছানার মিষ্টি, ক্ষীরের তৈরি নানা পদ, রাবড়ি, মিষ্টি, মিছরি, লুচি ও সুজির শীতল ভোগ। মহাশ্মশানের আদি তান্ত্রিক মতে এখানে কড়া আমিষ ভোগ বাধ্যতামূলক।
🕉 মা কালীর ভোগ (কালীঘাট, কলকাতা):
৫১ সতীপীঠের অন্যতম প্রধান এই ক্ষেত্রে দেবীর আদি ও অকৃত্রিম রূপে আমিষ ভোগের দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। সুগন্ধ সুবাসিত ঘিয়ে ভাজা চালের 'কালা ভাত', পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া পাঁঠার বলির নিরামিষ মাংস এবং কাতলা বা চিংড়ির মালাইকারির রাজকীয় ভোগ মাকে নিবেদন করা হয়। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মিষ্টি রহস্য হলো—রাতের শয়নের আগে মাকে নিবেদন করা হয় বিখ্যাত হারান মাঝির মিষ্টির দোকানের ১৬০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী 'চ্যাপ্টা রসগোল্লা' বা ক্ষীরমোহন! আমি ব্যক্তিগত ভাবে ভালোবাসে ওটাকে রসচ্যাপ্টা বলে ডাকি। কালীঘাটে মূলত আমিষ ভোগ নিবেদনের দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। মায়ের প্রধান ভোগ হিসেবে অন্ন বা খিচুড়ির সঙ্গে মাছের পদ (বিশেষ করে কাতলা মাছ বা চিংড়ি মাছের মালাইকারি) এবং পাঁঠার মাংসের ভোগ অত্যন্ত পছন্দের। এছাড়াও মায়ের প্রধান মধ্যাহ্ন ভোগে থাকে বোয়াল বা আর মাছের ঝোল সাথে মা দক্ষিণাকালীর প্রিয় খাঁটি ক্ষীরের সন্দেশ, পান এবং বড় বড় ছানার মিষ্টি। এই রাজকীয় ভোগ পাওয়ার জন্য আগে থেকে বুকিং করা বাধ্যতামূলক।
🕉 কঙ্কালীতলা মন্দিরের ভোগ (বীরভূম):
শান্তিনিকেতনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা কোপাই নদীর তীরে এই সিদ্ধপীঠে দেবীর কোনো মূর্তি নেই। এক অলৌকিক কুণ্ডে সতীর দেহাংশ পূজিত হয়। এখানকার পরিবেশের মতোই মায়ের ভোগও অত্যন্ত শান্ত ও সাত্ত্বিক। মায়ের ছবিতে প্রতিদিন নিবেদন করা হয় সাদা অন্ন বা নিরামিষ খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, লাবড়া, মিষ্টি দই এবং গুড়ের তৈরি সুস্বাদু সন্দেশ। এখানে দেবীর কোনো মূর্তি নেই, একটি কুণ্ডে সতীর দেহাংশ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। কোপাই নদীর তীরের এই সিদ্ধপীঠে ভক্তরা সাধারণত দুধ, ফল, মিষ্টি এবং সাধারণ নিরামিষ অন্নভোগ মায়ের ছবিতে নিবেদন করেন। সম্পূর্ণ শান্ত ও সাত্ত্বিক নিরামিষ অন্নভোগ, খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, লাবড়া এবং পায়েস মায়ের ছবিতে নিবেদিত হয়। সাথে থাকে ক্ষীর, ছানাবড়া, গুড়ের সন্দেশ এবং মিষ্টি দই। কুণ্ডের জল ও মায়ের ছবিতে দুধ, ফল ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়। এক্কেবারে শান্ত পল্লী-প্রকৃতির এখানে মায়ের স্বাত্তিক ভোগ পাবার আশায় উপচে পড়ে ভক্ত দের ভিড়। মায়ের অত্যন্ত প্রিয় খাঁটি মিষ্টি দই এবং ছানার গোল সন্দেশ।
🕉 মায়ের ভোগ (বক্রেশ্বর, বীরভূম):
অষ্টাবক্র মুনির এই তপোভূমিতে মা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে আসীন। এই আদি ক্ষেত্রে তান্ত্রিক মতে অন্নভোগ, পাঁচ তরকারি ও ভাজার সাথে বলির মাংস ও মাছ নিবেদন করার সুপ্রাচীন প্রথা আজও কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। মায়ের মিষ্টির থালায় থাকে খাঁটি ছানার মিষ্টি ও রাবড়ি। উষ্ণ প্রস্রবণের জন্য বিখ্যাত বক্রেশ্বরে মায়ের মহিষমর্দিনী রূপ পূজিত হয়। এখানে মা কালীর মতোই অন্নভোগ, পাঁচ তরকারি, ভাজা এবং তান্ত্রিক মতে আমিষ ভোগ বা বলির মাংস ও মাছ নিবেদন করার প্রথা রয়েছে। মায়ের প্রিয় খাঁটি ছানার মিষ্টি, পেঁড়া এবং রাবড়ি ও বক্রেশ্বরের বিখ্যাত ক্ষীর।। উষ্ণ প্রস্রবণের এই সিদ্ধপীঠে তান্ত্রিক ও শাক্ত মূর্তির সহাবস্থান। এখানে মায়ের মহিষাসুরমর্দিনী রূপ কে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, মাছের ঝোল এবং বিশেষ তিথিতে বলির মাংস।
🕉 শ্রী রামকৃষ্ণের নিজের হাতে সেবা করা মা ভবতারিণীর ভোগ এক্কেবারে রাজকীয়! এখানে বলি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তাই কোনো মাংসের পদ থাকে না। কিন্তু নিরামিষ পদের পাশাপাশি মাছের ভোগ এখানে বাধ্যতামূলক! ঘি-ভাত, পোলাও, শুক্তো, পুঁইশাক আর ছানার ডালনার সাথে মাকে নিবেদন করা হয় পাঁচ রকমের মাছের পদ (রুই, কাতলা, কই, পার্শে এবং গলদা চিংড়ি)। শেষে থাকে চাটনি, রাবড়ি ও ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর-ছানার বিভিন্ন মিষ্টি। দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীকে প্রতিদিন রাজকীয় অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। এই ভোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিরামিষ পদের পাশাপাশি মাছের ভোগও দেওয়া হয়। মা ভবতারিণীর রাজকীয় অন্নভোগ: ঘি-ভাত, পোলাও এর পাশাপাশি সাদা ভাত, পুঁইশাক, শুক্তো, ছানার তরকারি এবং পাঁচ রকমের মাছ (রুই, কাতলা, কই, পার্শে, ভেটকি বা গলদা চিংড়ি অথবা ইলিশ) ও নিবেদন করা হয়। মায়ের খাস নৈবেদ্য হলো সন্দেশ, রসগোল্লা, রাবড়ি এবং ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর-ছানার বিভিন্ন মিষ্টি। এখানে বলি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ! তাই মাছেদের রাজকীয় পদ থাকলেও কোনো মাংসের পদ দেওয়া হয় না। শ্রী রামকৃষ্ণের নিজের হাতে সেবা করা ভবতারিণী মায়ের ভোগে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি, মায়ের খাস পছন্দের রাজভোগ, ছানার সন্দেশ এবং রাবড়ি।
মা ভবতারিণীর ভোগে সাধারণত যেসকল পদ
থাকে:
প্রধান অন্ন: ঘি-ভাত, পোলাও ও সাদা ভাত।
ভাজা ও শাক: পাঁচ রকমের ভাজা এবং পুঁইশাক।
তরকারি ও ডাল: শুক্তো, ছানার তরকারি এবং ডাল।
মাছ: পাঁচ রকমের মাছের পদ (রুই, কাতলা, কই, পার্শে এবং ভেটকি বা গলদা চিংড়ি)।
মিষ্টি ও অন্যান্য: চাটনি, পায়েস, ক্ষীর, দই এবং নানা রকমের মিষ্টি।
🕉 আদ্যাপীঠ (কলকাতা): জগৎ-কল্যাণের অলৌকিক সাত্ত্বিক অন্নক্ষেত্র
ব্রহ্মচারী অন্নদা ঠাকুরের এই মহাসাধনাক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরামিষ ও সাত্ত্বিক অন্নকূটের ছোঁয়া পাওয়া যায়। মায়ের মহাতৃপ্তির ভোগ তালিকায় থাকে খিচুড়ি, বাসন্তী পোলাও, আলুর দম, পাঁচমিশালি তরকারি ও ছ্যাঁচড়া। আর মিষ্টির পাতে মায়ের সবচেয়ে পছন্দের পদ হলো সুস্বাদু মালপোয়া ও মিছরির জল। আদ্যাপীঠে দেবী আদ্যার ভোগ প্রসাদ অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি বিভিন্ন সুস্বাদু পদের সমাহারে প্রস্তুত করা হয়। আদ্যাপীঠে ব্রহ্মচারী অন্নদা ঠাকুরের ধামে সম্পূর্ণ নিরামিষ সমৃদ্ধ ভোগ: খিচুড়ি, বাসন্তী পোলাও, ভাত, আলুর দম, মিক্সড ভেজ, ছ্যাঁচড়া ও চাটনি নিবেদন করা হয়। মায়ের বিশেষ পছন্দ মালপোয়া, পায়েশ, নানা রকম মিষ্টি এবং মিছরির জল। ব্রহ্মচারী অন্নদা ঠাকুরের এই ধামে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়।
মায়ের বিশেষ পছন্দ মালপোয়া এবং মিছরির জল। মায়ের পছন্দের ভোগগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদগুলি হলো:
খিচুড়ি
বাসন্তী পোলাও
ভাত
আলুর দম | আলুর তরকারি
মিক্সড ভেজ (কুমড়ী বা সবজির তরকারি)
পাঁচমিশালি তরকারি
ছ্যাঁচড়া
চাটনি
পায়েশ
মিষ্টি
🕉 নলহাটী (বীরভূম): নলাটেশ্বরীর পছন্দ সুগন্ধি বোঁদে ও পেঁড়া।
সতীর কণ্ঠনালী বা নলা যেখানে পতিত হয়েছিল, সেই নলহাটী দুর্গে মা নলাটেশ্বরীর নিত্য পুজোয় গোবিন্দভোগ চালের সুগন্ধি খিচুড়ি ও পোলাও দেওয়া হয়। তবে মিষ্টির দিক থেকে এখানকার বিশেষ আকর্ষণ হলো মায়ের প্রিয় পেঁড়া, ক্ষীরকদম, রসগোল্লা এবং ক্ষীরের কাঁচাগোল্লা।। নলাটেশ্বরী মায়ের নিত্য ভোগে সুগন্ধি গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি, পোলাও এর সাথে থাকে নিরামিষ তরকারি। ভক্তদের প্রধান নৈবেদ্য পেঁড়া, ক্ষীরকদম এবং রসগোল্লা ও সুগন্ধি বোঁদে।
🕉 নৈহাটির বিখ্যাত বড় মাকে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিভিন্ন ধরনের ভোগ নিবেদন করা হয়। এই ভোগের থালায় প্রধানত থাকে সাদা অন্ন, পোলাও, খিচুড়ি, লুচি এবং সুজি। এর সঙ্গে আমিষ ও নিরামিষ নানা পদ যেমন- এঁচোড়ের তরকারি, ছানার তরকারি, পনিরের তরকারি, অরহর ডাল, পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি ও পায়েস দেওয়া হয়। অন্নকূট উৎসবের সময় এই আয়োজনে আলুর দমও যোগ হয়। আমাদের জাগ্রত বড় মায়ের রাজকীয় ভোগে থাকে স্তূপাকার করা সাদা অন্ন, পোলাও, খিচুড়ি, লুচি এবং সুজি। এর সঙ্গে এঁচোড়ের তরকারি, পনির ও ছানার ডালনা তো থাকেই, কিন্তু অন্নকূট উৎসবের সময় মায়ের ভোগের প্রধান ইউএসপি হয়ে ওঠে জাঁদরেল আলুর দম। আর মিষ্টির থালায় সাজানো থাকে হাজার হাজার কেজি কালো জাম ও ল্যাংচা! এবং দীপাবলিতে কয়েকশো কেজি ফল ও মিষ্টি মা কালীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়।
🕉 শান্তিপুর আগমেশ্বরী (নদীয়া): ৩৬ রকমের নিরামিষ ব্যঞ্জনের মহাসমাহার
সর্বানন্দী তন্ত্রের আদি দেবী আগমেশ্বরী মায়ের পুজোয় কোনো পশুবলি হয় না। সম্পূর্ণ নিরামিষ মেজাজে মাকে ৩৬ রকমের ব্যঞ্জনে ভোগ দেওয়া হয়! বিউলি ও মুগ ডাল, ৩ রকমের শাক (লাল, কচু, পালং), চালকুমড়ো, এঁচোড় ও ছানার ডালনার সাথে শেষ পাতে থাকে চালতার চাটনি এবং শান্তিপুরের বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী নিখুঁতি মিষ্টি। নদীয়ার শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী মা আগমেশ্বরীর পুজোয় মাকে সম্পূর্ণ নিরামিষ ৩৬ রকমের ব্যঞ্জনে ভোগ নিবেদন করা হয়। এই প্রাচীন পুজোয় কোনো পশুবলি হয় না। এখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ ৩৬ রকমের ব্যঞ্জনে মহাতৃপ্তির যে ভোগ গুলি থাকে তার মধ্যে পোলাও, বিউলি ও মুগ ডাল, শুক্তো, ৩ রকমের শাক (লাল, কচু, পালং), চালকুমড়ো, কচুর দম, এঁচোড় ও ছানার ডালনা। শান্তিপুরের বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী নিখুঁতি, হরেক রকমের মিষ্টান্ন এবং পায়েস এবং ক্ষীরের ছাঁচ সন্দেশ।
মা আগমেশ্বরীর পছন্দের ভোগ তালিকায় মূলত যে পদগুলি থাকে, তা হলো:
মূল পদ:
পোলাও
ডাল: বিউলি ও মুগ ডাল
শুক্তো
ভাজা ও শাক:
তিন রকমের শাক (লাল শাক, কচু শাক, পালং শাক)
বিভিন্ন ধরনের ভাজা
তরকারি ও নিরামিষ পদ:
চালকুমড়ো ও মিষ্টি কুমড়োর তরকারি
কচুর দম ও বাঁধাকপির তরকারি
এঁচড়ের তরকারি এবং ছানার
ডালনা
চাটনি ও মিষ্টি:
চালতা ও টমেটোর চাটনি
হরেক রকমের মিষ্টান্ন এবং পায়েস
এছাড়া সেই ঋতুতে লভ্য প্রায় সব ধরনের ফলই মাকে অর্পণ করা হয়।
🕉 পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রামের জাগ্রত সতীপীঠ ও শক্তিপীঠ মা যোগাদ্যার (ভদ্রকালী) ভোগে সাধারণত আমিষ পদ নিবেদন করা হয়। মঙ্গলকোটের এই জাগ্রত শক্তিপীঠে মা যোগাদ্যা (ভদ্রকালী) রূপে পূজিত হন। মায়ের প্রিয় ভোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আমিষ ও মিষ্টান্নের এক অদ্ভুত যুগলবন্দী। দীপাবলি ও নিত্য পুজোয় ছাগ-বলির মাংস এবং গঙ্গার খাঁটি মাছের আমিষ অন্নভোগ যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনই নামের স্বার্থকতা বজায় রেখে মায়ের পাতে দেওয়া হয় ঘন ক্ষীর, পায়েস এবং সুস্বাদু লুচি। এই আদি সতীপীঠের ভোগে আমিষ ও মিষ্টির এক অদ্ভুত তান্ত্রিক ভারসাম্য রয়েছে ।
🕉 পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম মা বর্গভীমার প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী ভোগ হল
শোল মাছের টক। ৫১ সতীপীঠের অন্যতম প্রাচীন এই ভীমরূপা সতীপীঠের ভোগ পরমাশ্চর্য! যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথা অনুযায়ী, দেবীর প্রতিদিনের নিত্য ভোগে পাকা তেঁতুল দিয়ে রান্না করা শোল মাছের টক (অম্বল) নিবেদন করা অবধারিত! বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে মায়ের এই মাছের টকের সাথে রাজভোগ ও চন্দ্রপুলি মিষ্টি সাজিয়ে দেওয়া হয়। রাজভোগ: বিশেষ উৎসব বা পূজার দিনগুলোতে (যেমন কালীপূজা) দেবীকে রাজবেশে সাজিয়ে মাছের পাশাপাশি অন্ন ও অন্যান্য ভোগও দেওয়া হয়।
🕉 কীরীটকোণা অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের শ্রী কিরীটেশ্বরী শক্তিপীঠ মন্দিরে দেবীকে অন্নভোগ, নানা রকমের মিষ্টি ও পায়েস নিবেদন করা হয়। এছাড়াও, বিশেষ পূজা ও উৎসবে (যেমন দুর্গাপূজার অষ্টমীতে) আমিষ ভোগ হিসেবে বিভিন্ন মাছের পদ, বিশেষ করে ইলিশ ও শোল মাছের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
নিত্যদিনের নিবেদন:-
অন্নভোগ: ভাত, ডাল ও নিরামিষ তরকারি।
মিষ্টি ও পায়েস: ক্ষীর, সুস্বাদু পায়েস এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি।
ফলমূল: মরসুমি ফল।
বিশেষ উৎসবের ভোগ (যেমন অষ্টমীর ভোগ)
মাছ: রুই, কাতলা ও বিশেষ করে ইলিশ মাছ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ভক্তদের জন্য এই রাজরাজেশ্বরী অন্ন প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থাও থাকে।
🕉 অট্টহাস সতীপীঠ মায়ের ভোগ ও পছন্দের মিষ্টান্ন।
পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের কাছে অবস্থিত অট্টহাস সতীপীঠে (যেখানে সতীর অধরোষ্ঠ বা নিচের ঠোঁট পড়েছিল) দেবী চামুণ্ডা বা অধরেশ্বরী রূপে পূজিতা হন। তান্ত্রিক ও শাক্ত মতে দেবীর নিত্যপূজা ও ভোগের আয়োজন করা হয়।
নিত্যভোগ নিবেদনের উপকরণ:
অন্ন ভোগ: দেবীকে প্রতিদিন দুপুরে মূল ভোগ হিসেবে অন্ন, ডাল এবং ভাজা নিবেদন করা হয়।
তরকারি ও ব্যঞ্জন: বিভিন্ন মরসুমি শাকসবজির তরকারি ও পাঁচমিশালি তরকারি দেওয়া হয়।
মিষ্টি ও ফল: দুধ, ক্ষীর বা পায়েস, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি এবং নানান ধরণের ফল প্রসাদ হিসেবে নিবেদন করা হয়।
এছাড়াও বিশেষ তিথি ও অমাবস্যায় দেবীর ভোগের আয়োজনে বিশেষ বৈচিত্র্য আসে। দর্শনার্থীদের জন্য মন্দির চত্বরে স্বল্প মূল্যে অন্নভোগ প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থাও রয়েছে
🕉পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সাঁইথিয়ায় অবস্থিত নন্দীকেশ্বরী সতীপীঠে দেবীকে প্রধানত বৈষ্ণব ও তান্ত্রিক মতে সম্পূর্ণ নিরামিষ ‘অন্নভোগ’ নিবেদন করা হয়। মা'কে সাধারণত অন্ন, পাঁচ রকম ভাজা, ডাল, চাটনি, তরকারি, মাছ এবং পায়েস ও মিষ্টি এবং বিভিন্ন মরসুমি সব্জির তরকারি নিবেদন করা হয়।
নিত্যদিনের ভোগের উপকরণ:
প্রধান অন্ন: সুগন্ধি চালের ভাত বা পোলাও
ব্যঞ্জন: ঘি-ভাত, ডাল, নানা রকমের ভাজা, শুক্তো এবং একাধিক তরকারি
মিষ্টান্ন ও ক্ষীর: ক্ষীর, পায়েস এবং বিভিন্ন ধরনের খাঁটি ছানার মিষ্টি এবং রসগোল্লা থাকে।
এছাড়া বিশেষ পূজা বা তিথিতে (যেমন বৈশাখী পূর্ণিমা বা শিবরাত্রিতে) ভক্তদের পক্ষ থেকে মা নন্দীকেশ্বরীকে ফলমূল এবং মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়।
পোলাও: শনি ও মঙ্গলবার মা-কে বিশেষ করে অন্নভোগের বদলে সুগন্ধী চালের পোলাও নিবেদন করা হয়।
শীতকালীন ভোগ: বিশেষ উৎসবের দিনগুলিতে স্থানীয় মিষ্টি ও ক্ষীর নিবেদনের প্রচলন রয়েছে।
অনেক ভক্ত মায়ের উদ্দেশ্যে মাছও ভোগ হিসেবে নিবেদন করে থাকেন।
🕉বীরাচারীদের ভূমি বীরভূম। পঞ্চসতীপীঠের অন্যতম লাভপুরের ফুল্লরা দেবী। ‘অট্টহাসে ওষ্ঠ পাতো দেবী সা ফুল্লরা স্মৃতা।বিশ্বেশো ভৈরব স্তত্র সর্বাভীষ্ট প্রদায়ক।
বীরভূমের লাভপুরে অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম ফুল্লরা সতীপীঠে মা জয়দুর্গাকে নিত্যদিন অন্নভোগ বা ভাত এবং বিশেষ দিনে আমিষ ও নিরামিষ দুই ধরনের ভোগই নিবেদন করা হয়। দুপুরে দেবীকে অন্ন, ডাল, ভাজা ও বিভিন্ন তরকারির সাথে আমিষ ভোগ (মাছের পদ) নিবেদন করা হয়। মা ফুল্লরার পরম পছন্দের মিষ্টি হলো ক্ষীর ও ক্ষীরভোগ, রসগোল্লা, মিহিদানা, এবং সন্দেশ।এছাড়া স্থানীয় নানা মিষ্টির দোকানে তৈরি খাঁটি ছানার মিষ্টান্নও মাকে দেওয়া হয়।
নিত্যদিনের ভোগ: অন্ন, ডাল ও বিভিন্ন ধরনের তরকারি
আমিষ ও অন্যান্য বিশেষ ভোগ: বিশেষ করে মায়ের ভোগে টক মাছ এবং মাংস নিবেদন করা হয়। সাথে থাকে পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি বা টক। এছাড়া ক্ষীর, পায়েস ও মিষ্টি ও মা কে নিবেদন করা হয়।
🕉 মলুটি গ্রামে অবস্থিত জাগ্রত দেবী মা মৌলাক্ষী (বা মা মৌলীক্ষা)-কে প্রধানত তন্ত্র মতে পুজো করা হয়। মা তারার বড় বোন হিসেবে পূজিতা এই দেবীকে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ভোগ নিবেদন করা হয়—
নিত্য ভোগ ও শীতল ভোগ: সকালে মঙ্গলারতির পর সাধারণত লুচি, সুজি, এবং বিভিন্ন ফলমূল দিয়ে শীতল ভোগ নিবেদন করা হয়।
অন্ন বা মহাভোগ: দুপুরে বা বিশেষ পুজো ও উৎসবের দিনে দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। এই মহাভোগে সাধারণত খিচুড়ি বা পোলাও, সাথে পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি এবং পায়েস থাকে।
তান্ত্রিক উপাচার: তন্ত্রপীঠ হওয়ায় মায়ের নিত্য পুজোর নানা বিশেষ উপাচার রয়েছে।
🕉 পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামে অবস্থিত বহুলা সতীপীঠে (যেখানে দেবী সতীর বাম বাহু পতিত হয়েছিল) মাকে সাধারণত ঐতিহ্যবাহী ও ভক্তিপূর্ণ নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। মন্দিরে দেবীকে প্রতিদিন নিয়ম করে অন্ন, ডাল, ভাজা ও তরকারিসহ ষোড়শ উপাচারে অন্নভোেগ দেওয়া হয়। অন্নভোগের পাশাপাশি দেবীকে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। এর মধ্যে খাঁটি দুধের তৈরি রাবড়ি, ক্ষীর এবং কেতুগ্রাম ও কাটোয়া অঞ্চলের বিখ্যাত মিষ্টি দই মায়ের অত্যন্ত পছন্দের।
বিশেষ দিনের মিষ্টি: বিশেষ পূজা, নবরাত্রি বা দীপাবলিতে ভোগে বড় আকারের রসগোল্লা, পান্তুয়া এবং মিঠাই দেওয়া হয়।
সাধারণ ভোগের উপকরণ:
অন্ন ও ব্যঞ্জন: ঘি-ভাত বা অন্ন, খিচুড়ি, লুচি এবং পোলাও।
তরকারি: ছোলার ডাল, আলুর দম এবং মরসুমি সবজির মিশ্র তরকারি।
মিষ্টি ও ক্ষীর: ক্ষীর বা পায়েস এবং বিভিন্ন রকমের মিষ্টি (যেমন- সন্দেশ, রসগোল্লা)।
ফলমূল: মরসুমি টাটকা ফল ও ডাবের জল।
অন্যান্য: মিছরি, ছোলা, মুড়কি এবং জল।
তন্ত্রমতে পূজিতা এই দেবীকে বিশেষ তিথি বা উৎসবে (যেমন- নবরাত্রি বা দীপাবলি) পূজার প্রথা অনুযায়ী নৈবেদ্য বা শীতল ভোগও দেওয়া হয়। এখানে দেবী বহুলা তাঁর স্বামী ভৈরব (বীরুক) ও পুত্রকে (অষ্টভূজ গণেশ ও কার্তিক) নিয়ে একসঙ্গে বিরাজ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাই এখানে পারিবারিক তৃপ্তিদায়ক খাবারের মতোই ভোগ প্রস্তুত করা হয়।
🕉 পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার কোগ্রামের (পুরাতন নাম উজানি) সতীপীঠে মা মঙ্গলচণ্ডী (দেবী দুর্গার দশভুজা রূপ) রূপে পূজিতা হন। এই পীঠের প্রধান বিশেষত্ব হলো, বছরের ৩৬৪ দিনই দেবীর অন্নভোগে মাছ বাধ্যতামূলক। উজানি সতীপীঠে মাতা সতীর ডান কনুই পড়েছিল। এখানে দেবী মঙ্গলচণ্ডী নামে পূজিতা হন। সারাবছর দেবীর নিত্যভোগে অন্ন, ডাল, ভাজা ও মাছের পদ এবং পছন্দের মিষ্টান্ন হিসেবে ক্ষীর ও পায়েস বিশেষভাবে নিবেদন করা হয়।
নিত্য ও বিশেষ ভোগ:
সারাবছর: প্রতিদিনের অন্নভোগে ভাত, ডাল, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি এবং অবশ্যই মাছ নিবেদন করা হয়।
ভোগে মাছের প্রচলন: এই পীঠের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মাকে মাছের ভোগ দেওয়া। সাধারণত শোল ও বোয়াল মাছ ভাজা মায়ের ভোগের অপরিহার্য অংশ।
দুর্গাপূজা: কেবলমাত্র দুর্গাষ্টমীর দিন মাকে নিরামিষ ভোগ (লুচি, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি) দেওয়া হয়। বাকি দিনগুলোতে (যেমন সপ্তমী ও নবমী) মাছের ভোগই চলে! দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন দেবীকে কোনো মাছ বা আমিষ ভোগ দেওয়া হয় না। ওই দিন সম্পূর্ণ নিরামিষ অন্নভোগ, হরেক রকম ভাজা এবং মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়।
সারাবছর দেবীকে প্রতিদিন অন্ন, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি, ডাল, মাছ এবং মিষ্টান্ন হিসেবে ঘন ক্ষীর ও পায়েস নিবেদন করা হয়।
🕉 বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার ঈশ্বরীপুরে অবস্থিত যশোরেশ্বরী সতীপীঠে মা কালীর নিত্যপূজা ও ভোগ নিবেদনের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে নিরামিষ এবং স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। যশোরেশ্বরী সতীপীঠে দেবীকে প্রতিদিন ঐতিহ্যবাহী অন্নভোেগ এবং বিশেষ মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। মায়ের পছন্দের মিষ্টান্নের মধ্যে ক্ষীর, ক্ষীরমোহন, সন্দেশ, ছানার তৈরি বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও পাকা কলা প্রধান।
এছাড়া ভক্তরা মানত হিসেবে মায়ের উদ্দেশ্যে বাতাসা ও ফলমূল নিবেদন করেন। মাকে মূলত যে ভোগ ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
অন্ন ভোগ: গোবিন্দভোগ চালের সাদা ভাত ও ঘি-ভাত।
মিষ্টান্ন: ক্ষীর, পায়েস, মিষ্টি, দই, চিঁড়ে এবং বিভিন্ন প্রকার ফলমূল। ভোগে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্ষীর ও সুস্বাদু ছানার মিষ্টান্ন রাখা বাধ্যতামূলক।
মানতের প্রসাদ: ভক্তদের দেওয়া ভোগ বা বাতাসা পূজার পর সাধারণ দর্শনার্থীদের মাঝে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।
অন্যান্য: লুচি, ডাল, সবজি বা তরকারি।
এছাড়া পূজা ও ভোগ নিবেদনের পর পান-সুপারি দেওয়া হয়। বিভিন্ন বিশেষ তিথি ও উৎসবে এই ভোগ নিবেদনে মিষ্টান্ন ও নানা পদের সমারোহ ঘটে।
🕉 পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জে (তিস্তা নদীর তীরে) অবস্থিত ত্রিস্রোতা সতীপীঠে (মা ভ্রামরী দেবী) মা সতীকে প্রধানত তন্ত্র ও বৈষ্ণব উভয় রীতিতেই ভোগ নিবেদন করা হয়।
ত্রিস্রোতা সতীপীঠে মাকে যে যে ভোগ নিবেদন করা হয় তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
নিরামিষ (বৈষ্ণব রীতি): ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, লুচি, নানা রকমের ভাজা, তরকারি, মিষ্টি, এবং ক্ষীর বা পরমান্ন।
পছন্দের মিষ্টান্ন: দেবীর ভোগের প্রধান ও পছন্দের মিষ্টান্নগুলোর মধ্যে রয়েছে খাঁটি গাওয়া ঘিয়ের মিহিদানা, সন্দেশ (ক্ষীর ও ছানার) এবং রসগোল্লা।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দেবী ভ্রামরী মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গদের দেবী, তাই ভোগে চিনির তৈরি মিষ্টির পাশাপাশি অনেক সময় বাতাসা ও মিষ্টি ফলমূলও রাখা হয়।
আমিষ (তান্ত্রিক রীতি): তন্ত্রপীঠ হওয়ার কারণে নিয়ম অনুযায়ী দেবীকে পাঁঠার মাংস এবং পোড়া মাছ (যেমন- শোল মাছ) নিবেদন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও দেবী যেহেতু কীট পতঙ্গের সাথে সম্পর্কিত, তাই নৈবেদ্য হিসাবে প্রচুর পরিমাণে চিনি, গুড় বা বাতাসাও দেওয়া হয়ে থাকে।
অন্যান্য উপাচার: এছাড়া নিত্য পূজায় মিষ্টি, ফলমূল, ডাবের জল, নতুন লাল বস্ত্র বা চেলি এবং জবা ফুলের মালা দেওয়া হয়।
🔱 কালী পুজোয় বিশেষ কিছু মিষ্টি বা ভোগ নিবেদন করা হয়ে থাকে। অঞ্চলভেদে মায়ের পছন্দের এবং পূজায় ব্যবহৃত এই বিখ্যাত মিষ্টিগুলো হলো:
🌺 কালীঘাট (কলকাতা): মা কালীর জন্য বিখ্যাত ১৬০ বছরের পুরনো 'চ্যাপ্টা রসগোল্লা' বা ক্ষীরমোহন। হারান মাঝি মিষ্টির দোকানে তৈরি এই বিশেষ মিষ্টিটি মা কালীর ভোগে দেওয়া হয় এবং রাতের শয়নের আগে এটি মাকে নিবেদন করা হয়।
🌺 তারাপীঠ (বীরভূম): এই মহাশ্মশানে দেবী তারাকে ভোগ হিসেবে সাধারণত আমিষ (খাসির মাংস ও শোল মাছ) দেওয়া হলেও, মিষ্টির মধ্যে ক্ষীরের তৈরি নানা পদ ও রাবড়ি মায়ের অত্যন্ত প্রিয়।
🌺 দক্ষিণেশ্বর (কলকাতা): ভবতারিণী মায়ের পুজোয় সন্দেশ, রসগোল্লা ও ঐতিহ্যবাহী ক্ষীর-ছানার বিভিন্ন মিষ্টির নৈবেদ্য সাজানো হয়।
🌺 কঙ্কালীতলা (বোলপুর): এখানকার মা কালীর কাছে ক্ষীর, ছানাবড়া ও গুড়ের তৈরি সন্দেশ খুবই জনপ্রিয়।
🌺 বক্রেশ্বর (বীরভূম): এখানকার মা মহিষমর্দিনী ও কালী মন্দিরে খাঁটি ছানার মিষ্টি ও রাবড়ি নিবেদন করা হয়।
🌺 নলহাটি (বীরভূম): মা নলাটেশ্বরীর শক্তিপীঠে ভক্তরা সাধারণত পেঁড়া, ক্ষীরকদম এবং রসগোল্লা নিবেদন করে থাকেন।
🙏🏼🙏🏼রক্ত-জবার মালা আর খড়গের রুদ্র রূপের অন্তরালে মা যে আসলে সন্তানের জন্য অন্নপূর্ণা—বাংলার এই বিভিন্ন সতীপীঠের বৈচিত্র্যময় ভোগ-তালিকাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মায়ের চরণে ভক্তি আর জিভের স্বাদে এই শাক্ত ইতিহাসই বাঙালির ভক্তিকে বাকি দুনিয়ার থেকে আলাদা করে রেখেছে।🙏🏼🙏🏼