18/08/2026
বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি উদ্বোধন
১৭.৮.২০২৬
একটি পুরাতনী বাংলা গান শুনেছিলাম, ‘হল মাটিতে চাঁদের উদয় কে দেখবি আয়’, আর সাম্প্রতিক একটা গান শুনতে পেতাম লাউড স্পিকারে, ‘মেরে অঙ্গনা মে দেখো আজ খিলে হ্যায় চাঁদ’ – সব কটা গানের ভাব আজ আমাদের রামকৃষ্ণ সারদা মিশন বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজের সন্ন্যাসিনী, ব্রহ্মচারিণী আর ছাত্রীদের আবেগের সাথে মিলেমিশে গেছে। আজ আমাদের কলেজ-প্রাঙ্গনেও চন্দ্রোদয় হয়েছিল।
কাল ছাত্রীদের বলছিলাম, ‘আমরা জানি এবং মানি যে রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের অধ্যক্ষ, যিনি সংঘগুরু, তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সচল বিগ্রহ। অগণিত মানুষ যাঁকে একটিবার চোখে দেখার আশায় ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, তিনি আগামীকাল স্বয়ং আসবেন তোমাদের কাছে।’ তাঁদের কচিমনে কোন ভাবনা নিশ্চয়ই কাজ করেছিল, তাই আজ অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে তাঁরা মহারাজকে বরণ করতে ব্যান্ড বাজায়, গান করে – ওদের উৎসাহ এবং উদ্দীপনা ছিল দেখার মতন।
আজ আমাদের কলেজে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি উদ্বোধন করতে এসেছিলেন সংঘাধ্যক্ষ পরম পূজ্যপাদ স্বামী গৌতমানন্দ মহারাজ।
মহারাজকে একবারটি কলেজে নিয়ে আসার পরিকল্পনা আমাদের প্রায় দুবছরের। মহারাজের সেক্রেটারি জগন্নাথ মহারাজের কাছে শুনতে থাকি সবময়,’ সময় নেই সময় নে’ই – মহারাজের যাত্রাক্রম বহুদিন আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। অবশেষে সম্মতি মিললো, কিন্তু একটি শর্তসাপেক্ষে। কিছু উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করলে, সেই উপলক্ষ্যে মহারাজকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে।
আমার বোকাবুদ্ধি – জগন্নাথ মহারাজকে বললাম, আমাদের কলেজে একটা Indoor Sports Hall হচ্ছে,পূজনীয় মহারাজ কি সেটা উদ্বোধন করবেন? সেক্রেটারি মহারাজের তাতে কোন আপত্তি ছিল না, কিন্তু সব কথা শুনে, পূজনীয়া প্রদীপ্তপ্রাণামাতাজী ধমক লাগালেন, ‘তুমি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সঙ্ঘাধ্যক্ষকে নিয়ে এসে তোমার ছোট একটা Sports Hall উদ্বোধন করাবে? ওটা কি তাঁকে মানায়।‘ মাতাজীর অনেকদিনের পরিকল্পনা ছিল বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনে স্বামী বিবেকানন্দের একটি বড় মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হলে বেশ হয়। পূজনীয় মহারাজের আগমনকে মাথায় রেখে এবারে স্বপ্নকে সাকার করার উদ্যোগ গতি পেল। কুমোরটুলিতে মূর্তি বায়না দেওয়া হয়। স্বামীজীর দশ ফুটের মূর্তি এল কলেজে আগস্টের প্রথমে।
আজ সেই মূর্তিতে, তাঁর আদরের নরেণের পূর্ণাবয়ব বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে এলেন স্বয়ং ‘শ্রীরামকৃষ্ণদেব’ এর সাম্প্রতিক প্রতিমা পূজ্যপাদ স্বামী গৌতমানন্দ মহারাজ।
কয়েকদিন ধরেই সাজো সাজো রব ছিল বিদ্যাভবনে। প্রার্থনা ছিল প্রকৃতির দেবীর কাছে, বর্ষার বর্ষণকে সামলে রেখো মা। না, মা সেকথা শোনেন নি। মহারাজ যখন আসছেন, তার কিছু আগে থেকেই শুরু হয়েছিল মুষলধারে বৃষ্টি – কিন্তু ছাতা মাথায় ছাত্রীরা দাঁড়িয়ে পড়েছিল মহারাজকে স্বাগত জানাতে রাস্তার দুপাশে। ব্যান্ডে বাজবে, ‘ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত, আমরা আনিব রাঙা প্রভাত, আমরা টুটাব তিমির রাত, বাধার বিন্ধ্যাচল’। বাস্তবিকই একজনের কাঁধে ড্রাম, অন্যজনের হাতে ছাতা – দুজনেই ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু ক্যাসাবিয়াঙ্কারা এক পাও নড়ছে না নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থেকে। বাধার বিন্ধ্যাচল তারা পার করবেই।
অবিরাম বর্ষণের মধ্যেই লাল নীল বাতি দপদপ করতে করতে প্রথমে ঢুকলো Howrah City Police এর গাড়ি তারপর একে একে আরো তিনটি গাড়ি। ছাত্রীরা ততক্ষণে বাজনা বাজাতে শুরু করে দিয়েছে। দুপাশে হাতজোড় দাঁড়িয়ে আছে বাকি কন্যারা। তারই মধ্যে দিয়ে মহারাজের গাড়িটিকে নিয়ে যাওয়া হল মন্দিরের কাছে।
এরপর শুরু হল ৯৮ বছরের যুবার দিব্য চমক। বিরাট নাটমন্দির দিয়ে হেঁটে চললেন তিনি, তিনটি ধাপের সিঁড়ি পেরিয়ে উঠলেন গর্ভমন্দিরে। একে একে তিনজনকে অর্ঘ্য দিলেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম অর্ঘ্য ঠাকুরের জন্য তাঁর হাতে দিতে গেলে, মহারাজ মায়ের অর্ঘ্য চাইলেন প্রথমে। রাজরাজেশ্বরী মন্দির আলো করে বসে আছেন মধ্যমনি হয়ে। চিরাচরিত রীতির বদলে সারদামঠের অধীশ্বরীকে মহারাজ প্রথম অর্ঘ্য দিলেন।
এরপর মহারাজ ধূপ এবং কর্পূরের আরতি করেন। একে একে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন তিনজনকে। তারপর নীচে নেমে এসে নাটমন্দিরে বসলেন সাধু ব্রহ্মচারিণীদের প্রণাম নেওয়ার জন্য। প্রণাম চলবে অনেকের, আমি বেরিয়ে এলাম। মূর্তি উদ্বোধনের জায়গায় কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।
মহারাজের গাড়ি দেখতে পেয়েই মেয়েরা আবার ব্যান্ড বাজাতে শুরু করলো। গাড়ি থেকে নামার পর সকলে শুরু করলো ‘মূর্ত মহেশ্বর’।
মহারাজ নিশ্চয়ই বোতাম টিপে অনেক মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেছেন। বেশ অভ্যস্ত ভঙ্গীতে রিমোট টিপলেন, বিরাট পর্দা নিজে নিজে সর সর করে খুলে গেল পূবে, উত্তরে, দক্ষিণে। আবার আরতি, আবার অর্ঘ্য। স্বামীজীর চারপাশে প্রদক্ষিণের জন্য বেশ প্রশস্ত বাঁধানো জায়গা আছে। মহারাজ সেবকদের নিয়ে প্রদক্ষিণ করলেন স্বামীজীকে। প্রদীপ্তপ্রাণাজীও মহারাজকে সঙ্গ দিলেন। মূর্তির নীচে বাঁধানো পাদপীঠে লেখা –
স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি
শুভ উদ্বোধন
পরম পূজনীয়
স্বামী গৌতমানন্দজী
অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন
১৭/৮/২০২৬
লেখাটা ঢাকা ছিল। মহারাজ সেই গেরুয়া ঢাকাটি সরালেন। সেবক জোরে জোরে লেখা পড়লেন। সেটা শুনে মহারাজ শিশুর মত হাততালি দিচ্ছেন। সবাই মহারাজের হাততালি দেখে হাসছে – এক দিব্য বালক যেন! অপূর্ব দৃশ্য!
আশ্চর্যের ব্যাপার, মহারাজের আরতি ও প্রদক্ষিণের সময় বৃষ্টি থেমে গেল। আসলে মা তো আমাদের ভক্তির পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। আবেগে, আনন্দে আমাদের শরীর বোধ ছিল না, বৃষ্টির পরোয়া ছিল না। কিন্তু আদরের দুলালটির শরীর স্বাস্থ্য না রক্ষা করলে চলে? তাই তাঁর গায়ে আঁচ লাগতে দিলেন না মা।
সেখান থেকে সভাগৃহ। মেয়েদের সমবেত বেদমন্ত্র পাঠে সভা শুরু হল। প্রদীপ্তপ্রাণা মাতাজীর স্বাগত ভাষণ, এবং মহারাজকে বরণ করে নেওয়ার পরে মহারাজ প্রায় আধঘন্টা সকলের উদ্দেশ্যে বললেন। সে যে কি যুগোপযোগী বক্তব্য! পরে রেকর্ডিং এলে সব পাঠাবো। ধৈর্য ধরে সকলের প্রণাম নিয়ে, হাসিমুখে হাত তুলে সকলকে আশীর্বাদ করলেন। তারপর শিশুর হাসিতে উদ্ভাসিত মুখে আমাদের সকলের কথার সহাস্য জবাব দিতে দিতে গাড়িতে উঠলেন। বললেন, ‘এই তো বাধা ভেঙে গেল, এখন আবার আসা হবে।‘
আমরা এখন প্রতীক্ষায় থাকবো, কবে আবার এরকম আনন্দঘন মুহূর্ত ঈশ্বর আমাদের উপহার দেন।
✍️ প্রব্রাজিকা বেদরূপপ্রাণা মাতাজি 🌼🙏
জয় ঠাকুর জয় মা জয় স্বামীজি
🙏🪷🌷🌼🙏