14/04/2026
📌 নীল ষষ্ঠীর অজানা কাহিনী এবং ব্রতের নিয়ম 🙏
চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ। চারপাশ গরমে খাঁ খাঁ করছে, তবুও মায়ের মুখে এক ফোঁটা জল নেই। দিনভর উপোস করে সন্ধ্যার পর শিবের মাথায় জল ঢেলে তবেই তাঁরা অন্নজল গ্রহণ করেন। কিন্তু কেন? কিসের এত টান, কিসের এত বিশ্বাস?
আজ আপনাদের শোনাবো এমন এক গল্প, যা শুনলে আপনারও গায়ে কাঁটা দেবে। জানাবো নীল ষষ্ঠীর সেই অজানা কাহিনী, যা প্রতিটি মায়ের জানা উচিত।
গল্পটা অনেক অনেক দিন আগের। এক দেশে বাস করতেন এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী। তাঁরা ছিলেন চরম ঈশ্বরভক্ত। বারো মাসে তেরো পার্বণ, কোনো ব্রত বা পুজোই তাঁদের বাদ যেত না। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, তাঁদের একটি সন্তানও বাঁচত না। জন্ম নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই কোল খালি করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। শোকে, দুঃখে, আর ক্ষোভে একদিন ব্রাহ্মণী কেঁদে উঠলেন, "সবই মিথ্যে! এত পুজো, এত বার-ব্রত করে কী পেলাম? ঠাকুর-দেবতা বলে কেউ নেই!" দুঃখে অভিমানে তাঁরা ঠিক করলেন, সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে তাঁরা কাশী চলে যাবেন। মনের জ্বালায় একদিন নদীর তীরে এসে তাঁরা জীবন শেষ করে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিলেন।
ঘাটের ধারে বসে দু'জনে যখন হাউহাউ করে কাঁদছেন, তখন সেখানে এলেন এক বৃদ্ধা।
জিজ্ঞাসা করলেন, "কী হয়েছে বাছা? তোরা কাঁদছিস কেন?"
ব্রাহ্মণী তাঁর বুকফাটা কান্নার কথা, সব সন্তান হারানোর কথা খুলে বললেন। সব শুনে বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন, "তোরা সব ব্রত করিস ঠিকই, কিন্তু মনে যে বড় অহংকার! শুধু নিয়ম মানলেই কি হয়? ভগবানের ওপর বিশ্বাস থাকা চাই, মন পবিত্র থাকা চাই। তোরা কি নীল ষষ্ঠী করেছিস?" ব্রাহ্মণী অবাক! "সে আবার কী মা? কই, সে ব্রত তো আমরা জানি না! তখন সেই বৃদ্ধা—যিনি আসলে ছিলেন স্বয়ং মা ষষ্ঠী—তাঁদের এই ব্রতের নিয়ম শিখিয়ে দিলেন। বললেন, "সমগ্র চৈত্র মাস সন্ন্যাস করে শিবের পুজো করবি। তারপর সংক্রান্তির আগের দিন, সমস্ত দিন উপোস করে সন্ধ্যার সময় নীলাবতীর পুজো করে নীলকণ্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে দিয়ে, মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে তবে জল খাবি। যারা নীল ষষ্ঠী করে তাদের ছেলে-মেয়ে কখনও অল্প বয়সে মরে না।"
এই কথা বলেই বৃদ্ধা শূন্যে মিলিয়ে গেলেন!
বাড়ি ফিরে খুব নিষ্ঠা ভরে নীল ষষ্ঠীর ব্রত করলেন ব্রাহ্মণী। আর মা ষষ্ঠীর কৃপায় তাঁদের কোল আলো করে জন্ম নিল ফুটফুটে সব সন্তান। তারা দীর্ঘায়ু ও নীরোগ হলো। পাড়ার সকলে ব্রাহ্মণীর সুখ দেখে এই ব্রতের কথা জানতে পারল এবং সেই থেকেই ঘরে ঘরে সন্তানের মঙ্গলের জন্য শুরু হলো নীল ষষ্ঠীর ব্রত।
নীলপূজা বা নীল ষষ্ঠী হলো মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এক লোকোৎসব, যা মহাদেব শিব ও দেবী নীলাবতীর (শিব-দুর্গা) বিবাহ উৎসবের স্মারক। চৈত্র সংক্রান্তির চড়ক উৎসবের ঠিক আগের দিন এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই দিন নীলসন্ন্যাসীরা লাল কাপড় পরে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর হাতে ত্রিশূল নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরেন। গৃহস্থ মহিলারা উঠানে আলপনা দিয়ে নীলকে আহ্বান করে বসান। তখন ঢাক-ঢোল বাজিয়ে সন্ন্যাসীরা গেয়ে ওঠেন শিবের বিয়ের সেই বিখ্যাত গান।
🙏 কীভাবে পালন করবেন নীল ষষ্ঠীর ব্রত? (পূজাবিধি ও নিয়ম) 🙏
১. উপকরণ:
--------------
গঙ্গার মাটি বা শুদ্ধ মাটি, বেলপাতা, গঙ্গাজল, দুধ, দই, ঘি, মধু, কলা, বেল, ডাব, শশা, আতপচাল এবং মহাদেবের পছন্দের ফুল (আকন্দ, অপরাজিতা বা ধুতুরা)। তবে মহাদেব বেলপাতাতেই সবচেয়ে বেশি তুষ্ট হন।
২. ব্রত পালনের নিয়ম:
---------------------
নীল ষষ্ঠীর দিন সারা দিন উপোস করে থাকতে হয়। সন্ধ্যেবেলা শিবের মাথায় ডাবের জল বা গঙ্গাজল ঢালতে হয়।
৩. প্রার্থনা:
------------
এরপর শিবের মাথায় বেলপাতা, ফুল ও একটি ফল ছুঁইয়ে রেখে, সন্তানের নামে একটি মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতে হয়।
৪. ব্রতভঙ্গ:
-----------
ব্রত ভাঙার পর অন্ন বা সন্দক লবণ যুক্ত খাবার খেতে নেই। ফল, সাবু, বা ময়দার তৈরি খাবার খেয়েই ব্রত পালন করতে হয়।
মায়েদের কাছে সন্তানের চেয়ে বড় আর কিছুই নেই। আর সেই সন্তানের দীর্ঘায়ু, মঙ্গল ও সুস্থতার জন্যই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই পবিত্র নীল ষষ্ঠী। আপনার সন্তানের জন্য রইল অনেক অনেক আশীর্বাদ ও শুভকামনা।
জয় মা ষষ্ঠী! জয় বাবা ভোলানাথ!