11/11/2025
★ অমৃতকথা ★
***************
২৫-৯-১০, উদ্বোধন, ঠাকুরঘর। স্বামী অরূপানন্দ শ্রীশ্রীমা সম্পর্কে বলছেন;
সকালবেলা শ্রীশ্রীমায়ের সহিত কথা হইতেছে।
আমি বলিলাম; মা, যদি ঈশ্বর বলে কেউ থাকেন তবে জগতে এত দুঃখকষ্ট কেন? তিনি কি দেখছেন না? তাঁর কি এসব দূর করবার শক্তি নেই?
মা বলিলেন; "সৃষ্টিই সুখদুঃখময়। দুঃখ না থাকলে সুখ কি বোঝা যায়? আর সকলের সুখ হওয়া সম্ভব কি করে? সীতা বলেছিলেন রামকে, 'তুমি সকলের দুঃখকষ্ট দূর করে দাও না কেন? রাজ্যে যত প্রজা লোকজন আছে সকলকে সুখে রাখ। তুমি তো ইচ্ছা করলেই পার।' রাম বললেন, 'সকলের সুখ একসঙ্গে কি হয়?'
'না, তুমি ইচ্ছা করলেই হয়, যার যা অভাব হয় রাজভাণ্ডার হতে দিয়ে দাও।'
'আচ্ছা, তোমার কথামতই হবে।'
তখন লক্ষ্মণকে ডাকিয়া বলিলেন, 'যাও, রাজ্যমধ্যে সকলকে জানাও, যার যা অভাব থাকে চাইলেই রাজকোষ হতে পাবে।' সকলে সংবাদ পেয়ে এসে দুঃখ জানালে।
রাজকোষ অবারিত। বেশ সকলে সুখে দিন কাটাতে লাগল। রামের এমনি মায়া যে শীঘ্র যে দালানে রাম-সীতা থাকতেন তার ছাদ ফেটে জল পড়তে আরম্ভ হলো। মেরামতির চেষ্টায় লোকজন ডাকতে পাঠালেন। কোথায় লোকজন? কুলি-মজুর কি আর আছে? রাজ্যমধ্যে কুলি-মজুরের অভাবে প্রজাদের ঘরদরজা, কাজকর্ম সব নষ্ট হতে চলেছে-প্রজারা জানালে। তখন নিরুপায় হয়ে সীতা রামকে বললেন, 'আর ভিজে ভিজে কষ্ট সহ্য হয় না; যেমনটি ছিল তুমি তেমনটি করে দাও, তাহলে কুলি-মজুর সব মিলবে। সকলের একসঙ্গে সুখ হওয়া সম্ভব নয়।' রাম বললেন, 'তথাস্তু'। তখন দেখতে দেখতে সব পূর্বের মতো হলো। কুলি-মজুর মিস্ত্রী সব মিলল। সীতা বললেন, 'ঠাকুর, এ সৃষ্টি তোমারই অদ্ভুত খেলা!'
চিরদিন কেউ সুখী থাকবে না, সব জন্ম কারও দুঃখে যাবে না। যেমন কর্ম তেমন ফল, তেমন যোগাযোগ হয়।"
আমি বলিলাম; সবই কর্ম থেকে হয়?
মা বলিলেন; "কর্ম না তো কি? দেখছ না, এই যে মেথর বিষ্ঠার ভার বইছে।"
আমি বলিলাম; এ ভালমন্দ কর্মপ্রবৃত্তি প্রথম কোথা থেকে আসে? এ জন্মে বলবে তার পূর্বজন্ম থেকে, সে জন্মে আবার তার পূর্বজন্ম থেকে; আদি কোথা?
মা বলিলেন; "ঈশ্বরেচ্ছা ছাড়া কিছুই হবার সাধ্য নেই, তৃণটিও নড়ে না। যখন জীবের সুসময় আসে, তখন ধ্যানচিন্তা আসে; কুসময়ে কুপ্রবৃত্তি কুযোগাযোগ হয়। তাঁর যেমন ইচ্ছা তেমনি কালে সব আসে, তিনিই তার ভেতর দিয়ে কার্য করেন। নরেনের কি সাধ্য? তিনি তার ভেতর দিয়ে সব করলেন বলে তো নরেন সব করতে পেরেছিল?
ঠাকুর যেটি করবেন তাঁর তা ঠিক করা আছে। তবে ঠিক ঠিক যদি কেউ ওঁর উপর ভার দেয়, উনি তা ঠিক করে দেবেন।
সব সয়ে যেতে হয়। কারণ কর্মানুসারে সব যোগাযোগ হয়। আবার কর্মের দ্বারা কর্মের খণ্ডন হয়।"
আমি বলিলাম; কর্মের দ্বারা কর্মের খণ্ডন হয়?
মা বলিলেন; "তা হবে না? তুমি একটি সৎকার্য করলে, তাতে তোমার পাপটুকু কেটে গেল।
ধ্যান, জপ ঈশ্বরচিন্তায় পাপ কাটে।"
মির্জাপুর স্ট্রীটে একটি ছেলের উপর নাকি মৃতাত্মাদের আবেশ হয়। 'উদ্বোধনের' কেহ কেহ পূর্বদিন উহা দেখিতে গিয়াছিলেন। সেই কথা উঠিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আচ্ছা, প্রেতদেহে কতদিন থাকতে হয়?
মা বলিলেন; "উন্নত পুরুষ ছাড়া আর সকলকে একবছর প্রেতযোনিতে থাকতে হয়। তারপর গয়ায় পিণ্ডদান, মহোৎসব– তাদের উদ্দেশ্যে এ সব করলে প্রেতযোনি মুক্ত হয়ে ভগবানের কাছে যায়। অথবা অন্যান্য লোকে গিয়ে সুখটুকু ভোগ করে। আবার কালে বাসনা অনুসারে জন্ম হয়। কারও বা সেখান থেকেই মুক্তি হয়। তবে ইহজন্মের কিছু সুকৃতি থাকলে প্রেতদেহেও চৈতন্য একেবারে হারায় না।"
মা বৃন্দাবনের সেই বৈষ্ণব ভূতের (গোবিন্দজীর পূজারীর) কথা বলিলেন।
আমি বলিলাম; গয়ায় পিণ্ড দিলেই কি ভগবানের কাছে যায়?
মা বলিলেন; "হাঁ যায়।"
আমি বলিলাম; তবে আর ভজন-সাধনের কি দরকার?
মা বলিলেন; "তাঁর কাছ থেকে যে আবার বাসনা কর্মানুসারে পৃথিবীতে এসে জন্মায়। এখান থেকে কেউ বা মুক্তিলাভ করে, কেউ বা নীচ যোনি সব ভোগ করে। চক্রের মতো সৃষ্টি চলছে। যে জন্মে মন বাসনাশূন্য হয়, সেইটি শেষ জন্ম।
আমি বলিলাম; এই যে ভগবানের কাছে যায় বললে, কেউ কি এসে নিয়ে যায়, না আপনিই যায়?
মা বলিলেন; "আপনিই যায়, সূক্ষ্ম শরীর হাওয়ার শরীর কিনা?"
আমি বলিলাম; যাদের গয়ায় পিণ্ডাদি না হয়, তাদের কি গতি হয়?
মা বলিলেন; "যতদিন না বংশে কোন ভাগ্যবান জন্মে গয়ায় পিণ্ড দেয়, কি ঔর্ধ্বদেহিক ক্রিয়াদি করে, ততকাল প্রেতদেহে থাকতে হয়।
আমি বলিলাম; এই যে ভূত প্রেত, এসব কি শিবের চেলা ভূত? না যারা মরে গেছে তারা।
মা বলিলেন; "না, মৃত যারা তারা; শিবের চেলা ভূত, সে সব আছে আলাদা।
ভারী সাবধানে চলতে হয়। প্রত্যেক কর্মের ফল ফলে। কাউকে কষ্ট দেওয়া, কটু বলা ভাল নয়।"
আমি বলিলাম; মা, নিমগাছেও আম ফলে না, আর আম গাছেও নিম ফলে না। যার যেমনটি হবার, তার তেমনটি হয়।
মা বলিলেন; "ঠিক বলেছ, বাবা, কালে ঈশ্বর-টীশ্বর কিছু থাকে না। জ্ঞান হলে মানুষ দেখে ঠাকুর-ঠুকুর সবই মায়া—কালে আসছে, যাচ্ছে।"
**********************************
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন ও আনন্দে থাকুন ঠাকুর, মা ও স্বামীজীর কাছে আন্তরিক —এই প্রার্থনা করি।
জয় মা
জয় ঠাকুর।
হরি ওঁ রামকৃষ্ণ।
সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ
সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ।।
🙌🙌🙌
—স্বামী জয়ানন্দ মহারাজ।