16/08/2026
কাশীপুর উদ্যানবাটীর দোতলার সেই ঘরটি তখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। ভেতরে ধীরে ধীরে নিভে আসতে থাকা এক মহাপ্রাণের পার্থিব প্রদীপ। ১৮৮৬ সালের আগস্টের সেই দিনগুলোতে শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে দুরারোগ্য ব্যাধির তীব্র যন্ত্রণা, অথচ চোখ দুটো দিয়ে যেন উপচে পড়ছে অপার করুণা আর অপার্থিব আলোকচ্ছটা।
তিরোধানের মাত্র তিন-চার দিন আগের এক দ্বিপ্রহর। ঘরে কেউ নেই, কেবল গুরু আর তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ।
শ্রীরামকৃষ্ণ নরেনকে কাছে ডাকলেন। একদৃষ্টে শিষ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ প্রবেশ করলেন গভীর সমাধিতে। এক অলৌকিক অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হলেন নরেন—মনে হলো যেন এক অদৃশ্য প্রবল বিদ্যুৎপ্রবাহ তাঁর সমগ্র চৈতন্যে প্রবেশ করছে। বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে নরেন নিজেও এক অতল স্তব্ধতায় নিমজ্জিত হলেন।
অনেকক্ষণ পর যখন নরেনের চেতনা ফিরল, দেখলেন— শ্রীরামকৃষ্ণ কাঁদছেন। শীর্ণ দুটি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুধারা।
বিস্মিত, অভিভূত নরেন জানতে চাইলেন, "আপনি কাঁদছেন কেন?"
অতি স্নেহে, ভাঙা গলায় ঠাকুর বললেন—
"ওরে নরেন, আজ তোকে সব দিয়ে আমি কাঙ্গাল—ফকির হলুম রে! এই শক্তিতে তুই জগতের অনেক কাজ করবি, তারপর স্বস্থানে ফিরে যাবি।"
কেন এই মহাদান?
পরমহংসদেব জানতেন, তাঁর লীলাসংবরণের সময় সমাগত। যে সর্বজনীন ধর্মের বার্তা, অদ্বৈত চেতনার আলো এবং আর্ত মানবতার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের বীজ তিনি এই মাটিতে বুনে গেছেন, তা বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো এক মহাশক্তিমান আধারের প্রয়োজন ছিল। নরেন শুধু একজন শিষ্য ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই ‘সহস্রদল পদ্ম’, যার মাধ্যমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটার কথা। তাই নিজের আজীবনের সাধনা ও অধ্যাত্মশক্তির চূড়ান্ত নির্ঘোষ তিনি অবলীলায় ঢেলে দিলেন নরেনের অন্তরে—একজন গুরু নিঃস্ব হয়ে গেলেন তাঁর শিষ্যের পূর্ণতার জন্য।
এর ঠিক দু’দিন পরেই এল সেই শেষ সংশয় মোচনের মুহূর্ত। নরেন মনে মনে ভাবছেন, "এই অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও যদি ইনি বলতে পারেন যে ইনি ভগবান, তবেই আমি বিশ্বাস করব।" ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঠাকুর স্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠলেন—
"যে রাম, যে কৃষ্ণ, সে-ই এবার এই শরীরে রামকৃষ্ণ—তবে তোর বেদান্তের মতে নয়!"
১৮৮৬ সালের ১৬ই আগস্ট, মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঠাকুর পাড়ি দিলেন মহাসমাধির অনন্তলোকে।
মহাপ্রয়াণের পরবর্তী অধ্যায় ও উত্তরণ:
ঠাকুরের তিরোধানের পর এক শূন্যতার হাহাকার নেমে এসেছিল কাশীপুরের আঙিনায়। কিন্তু সেই শোকই জন্ম দিল এক মহাশক্তির। ঠাকুরের দিয়ে যাওয়া সেই আধ্যাত্মিক শক্তির স্ফুরণ ঘটল নরেন্দ্রনাথের জীবনে। প্রতিষ্ঠা হলো বরাহনগর মঠ, জন্ম নিল 'স্বামী বিবেকানন্দ' নামের এক ঝড়, যা ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্মমহাসভায় বিশ্ববাসীকে প্রথম শোনাল সনাতন ভারতের অমৃতবাণী। 'যত মত, তত পথ' রূপ নিল এক বৈশ্বিক দর্শনে, আর 'জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর' হয়ে উঠল মানবের সেবায় আত্মনিবেদনের মূলমন্ত্র।
আজকের দিনে এর প্রাসঙ্গিকতা:
আজকের এই তীব্র অসহিষ্ণু, স্বার্থপর ও খণ্ডিত পৃথিবীতে কাশীপুর উদ্যানবাটীর সেই মুহূর্তটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এক গভীর আত্মোপলব্ধি। শ্রীরামকৃষ্ণ ও নরেন—এ কোনো সাধারণ ব্যক্তিসম্পর্ক নয়; এ হলো শুদ্ধ ভালোবাসার দ্বারা আত্মার রূপান্তর। একজন গুরু নিজের অহং ও অর্জন সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে শিষ্যকে গড়ে তুলছেন জগতের কল্যাণে, আর সেই শক্তি নিয়ে শিষ্য দাঁড়াচ্ছেন আর্ত, বঞ্চিত মানুষের পাশে।
আজ ১৬ই আগস্ট, শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধান দিবসে আসুন সেই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করি। ধর্ম মানে তো কোনো আচার বা দেখনদারি নয়—ধর্ম হলো আত্মশুদ্ধি, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং অপরের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক অনন্ত সাধনা।
প্রণাম তোমায়, যুগাবতার।