02/07/2026
কংসাবতী-কুমারী উপত্যকার পুরাকীর্তি ও পরিবেশ-বান্ধব পর্যটন সম্ভাবনা: একটি বিস্তৃত সমীক্ষা
রাঢ়বঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে কংসাবতী ও কুমারী নদীর অববাহিকা—বিশেষত মুকুটমণিপুর, অম্বিকানগর এবং পরেশনাথ অঞ্চল—প্রাগৈতিহাসিক প্রত্ন-আয়ুধের প্রাপ্তিযোগ এবং আদি-মধ্যযুগীয় জৈন ও হিন্দু সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয়ক্ষেত্র। ১৯৫৯ সালে মুকুটমণিপুরের কংসাবতী ও কুমারী নদীর সংযোগস্থলে বাঁধ নির্মাণের সময় সারেঙ্গগড় ও পরেশনাথসহ অন্তত ৪০টি প্রাচীন জনপদ, সনাতন হিন্দু স্থাপত্য ও জৈন বসতি জলের তলায় চলে যায়। তা সত্ত্বেও, পরেশনাথের প্রায় ছয় ফুটের তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের প্রতিমা, ক্লোরাইট পাথরের বীরস্তম্ভ এবং অম্বিকানগরের জৈন শাসনদেবী অম্বিকা (যিনি বর্তমানে হিন্দু মাতৃকারূপে সিঁদুর ও উজ্জ্বল নকল চোখে পূজিত) এই অঞ্চলের প্রাচীন ধর্মীয় বিবর্তনের অকাট্য ঐতিহাসিক দলিল। ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, সেন রাজাদের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ‘সেনেরগড়’ এবং রাজস্থানের ক্ষত্রিয় রাজা জগন্নাথ ও তাঁর পৌত্র অনন্ত ধবলদেবের রাজধানী হিসেবে অম্বিকানগর একদা এক সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল।
বর্তমানে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্যটনকেন্দ্র মুকুটমণিপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিশাল জলাধার, বোটিং এবং হরিণ উদ্যানের (Deer Park) আকর্ষণে শীতের মরসুমে বিপুল পর্যটকের সমাগম ঘটে। তবে আধুনিক পর্যটনতত্ত্বে (Tourism Studies) কেবল এই প্রাকৃতিক প্রমোদ-ভ্রমণই যথেষ্ট নয়; এর সমান্তরালে অম্বিকানগরের ভৈরব শিবের ভগ্ন দেউলসহ কংসাবতী উপত্যকার প্রাচীন প্রত্নস্থলগুলির বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ ও একটি সুসংহত ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম সার্কিট’ গঠন একান্ত জরুরি। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) বা রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সক্রিয় উদ্যোগে এই অবহেলিত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির সংস্কার করা সম্ভব হলে, তা একদিকে যেমন গবেষক ও ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসু পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াবে, অন্যদিকে তেমনই দায়িত্বশীল পরিবেশ-বান্ধব পর্যটনের (Eco-Tourism) মাধ্যমে স্থানীয় হস্তশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে আঞ্চলিক অর্থনীতির স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী বিকাশ ঘটাবে।
তথ্যসূত্র
• দাশগুপ্ত, পরেশচন্দ্র। সুবর্ণরেখার প্রাঙ্গণে অরণ্যকন্যা কংসাবতী। কলকাতা।
• বরাট, বিপ্লব। (২০২৪). প্রত্নকল্পতরু দ্বারকেশ্বর: ক্ষেত্রসমীক্ষায় নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান। বাঁকুড়া: নিদর্শন সাহিত্য প্রকাশনী।
• বন্দ্যোপাধ্যায়, রাখালদাস। (১৯২৫). অম্বিকানগর ও সারেঙ্গগড় প্রত্ন-পরিমণ্ডল প্রতিবেদন।
• Archaeological Survey of India (ASI). Annual Report on Eastern Indian Antiquities & Jain Vestiges in Bankura District.