11/03/2024
রমাদান নিয়ে কয়েকটি কথা
————————————-
রমাদান মাসের মূল উদ্দেশ্য সারাদিন না খেয়ে থাকা নয়। রমাদানে রোজা রাখাটা একটা অবশ্য পালনীয় শর্ত। তবে মূল উদ্দেশ্য নয়। প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে রোজা আমরা কেনো রাখি? এর মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন। রমাদানের রোজা রাখার কথা এজন্যই আল্লাহ প্রেসক্রাইব করেছেন যাতে আমাদের মধ্যে God Consciousness তৈরী হয়। ব্যাপারটা একটু সহজ ভাষায় যদি বুঝিয়ে বলি। ধরুন আমাদের যখন ডায়াবেটিক পরীক্ষা করতে হয় রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা জানার জন্য যা জানা ব্যাক্তির সঠিক চিকিৎসা বা সুস্থতার জন্য খুবই জুরুরি। তাহলে মূল উদ্দেশ্যটা যদি হয় সুস্থতা তার জন্য প্রয়োজন সঠিক অবস্থাটা জানা, রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা, আর এজন্য একটি অবশ্য করণীয় কাজ হচ্ছে না খেয়ে রক্তের পরীক্ষা করা। রমাদানের রোজা রাখার বিষয়টা অনেকটা এরকম।
মূল উদ্দেশ্য God Consciousness তৈরী করা। আর এজন্য অবশ্যকরণীয় কাজ হচ্ছে রোজা বা সিয়াম পালন করা। আল্লাহ বলছেন সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াত, হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। এখানে রোজা আল্লাহ এজন্য ফরজ করেছেন যাতে আমরা তাকওয়া বা আল্লাহভীতি (God Consciousness) অর্জন করতে পারি। এটা মূলত একটা প্রশিক্ষনের মাস। নিজেকে ভালো কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যে বিধি বিধানগুলো দিয়েছেন তা নিজের মধ্যে ধারণ করা।
এখন ধরুন, আমি রোজা আছি কিন্তু মানুষের ক্ষতি করেই যাচ্ছি, দেশের ক্ষতি করছি, সমাজের ক্ষতি করছি, রাষ্ট্রের ক্ষতি করেই যাচ্ছি। আমি রোজা আছি কিন্তু আমি মানুষের অধিকার নষ্ট করছি। মানুষকে তার প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিচ্ছি না, আমি রোজা আছি কিন্তু অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করছি, আমি রোজা আছি, আয় করছি সৎ উপায়ে কিন্তু ব্যায়ের ক্ষেত্রে গিয়ে অসৎ উদ্দেশ্য অর্থ ব্যায় করছি। যেমন, আমার ব্যাক্তিগত স্বার্থে কাউকে বিশাল অংকের টাকা দিয়ে সেই স্বার্থটা উদ্ধার করলাম। আবার আমি রোজা রেখেছি, অথচ মন্দ কথা বলা, মন্দ চিন্তা করা থেকে বিরত থাকিনি, মানুষের নামে সারাক্ষণ সমালোচনা করা, একজনকে আরেকজনের শত্রু বানিয়ে ফেলা, কথায় কথায় গালি দেয়া, মানুষকে অসম্মান করা, মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ানো, কাউকে হেনস্তা করা, কারো হক নষ্ট করা, চোখের সামনে অন্যায় ঘটছে তা মেনে নেয়া, সারাক্ষণ আজে বাজে কথা বলা, ফেইসবুকে বসে বসে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় ফান পোস্ট শেয়ার করা, আজে বাজে অপ্রয়োজনীয় অশ্লীল কৌতুক শেয়ার বা পোস্ট করা, পরিবারের প্রতি অবহেলা, সমাজের দরিদ্র মানুষের প্রতি সামর্থ্য থাকা সত্তেও অবহেলা করা, রোজা রাখলাম কিন্তু ইচ্ছামত পার্টি করলাম, মাস্তি করলাম, টেবিল ভরা খাবার সাজিয়ে ফেইসবুকে ছবি দিলাম, লৌকিকতা করলাম, ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু যা আল্লাহ করতে বলেছে করিনি বা যা আল্লাহ নিষেধ করেছে তা থেকে বিরত থাকিনি তবে বুঝতে হবে আমার মধ্যে আল্লাহ ভীতি নেই। মানে আমি রোজা রাখলাম কিন্তু আল্লাহকে তোয়াক্কা করলাম না। এ রোজার রাখার কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই। এই রোজা রাখা আমার কোনো উপকারে আসবে না। যেমন, এটা হবে এই রকম যে, আমি না খেয়ে থাকলাম কিন্তু ডায়াবেটিকস পরীক্ষা করলাম না। অতএব, আমি আমার নিজেকে বিপদের সম্মুখীন করলাম।
আশা করছি আমরা এই একটা মাস নিজেকে প্রশিক্ষিত করবো নিজের এবং অন্যের কল্যানের চিন্তা করে। My Life My Choice এই নীতি থেকে আমরা সরে আসবো। কারণ যে জীবনটা নিয়ে আমাদের এত বাড়াবাড়ি, সেটার মালিক আমি আপনি নই। এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো ততই উত্তম। কারো বাসা ভাড়া নিয়ে যখন আমরা থাকি, তখন সে বাসার কোনো ক্ষতি হলে, আমরা চিন্তায় থাকি, বাসার মালিক না জানি কী বলে। কী কৈফিয়ত দিবো? অথচ অন্যের দেয়া জীবন যার ভাড়াও দিতে হয় না, সেটা নিয়ে আমাদের কোনো কৈফিয়তের বা জবাবদিহিতার ভয় নেই !!! কী অদ্ভুত। সেদিন বেইলি রোডে যখন অর্ধশত মানুষ পুড়ে মরেছে, কেউকি এটা বলার সুযোগ পেয়েছে যে, My life my choice? আমার চয়েস এখন এটাই যে, আমি এখন মরতে চাইনা, এই ভেবে কেউ কি কেউ বাঁচতে পেরেছে। অতএব যিনি মৃত্যু ও জীবনের মালিক তার প্রতি আমরা আমাদের জবাবদিহীতার ভয় তৈরী করবো। আমার প্রত্যেকটা কথা ও কাজের জবাবদিহি আল্লাহর কাছে করতে হবে এই চিন্তাটা আমাদের প্রতিটি কাজ করবার আগে করবো। এ পুরো মাসে আমাদের প্রতিটি কাজে আল্লাহ ভীতি অর্জন করবো এবং আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের পথে এগিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুক। আমীন।
সবাইকে রমাদান মুবারাক ❤️