25/05/2024
কোরবানি সম্পর্কে কোরআনের দিকনির্দেশনা
কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত দিনে পশু জবাই করা। এটি শুধুমাত্র আত্মত্যাগের প্রতীক নয় বরং আল্লাহর সাথে বান্দার গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশও বটে। কোরআনে কোরবানির ব্যাপারে একাধিক আয়াতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
"لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ"
"لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۗ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ"
"তাদের মাংস এবং রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।"
(সুরা হজ: আয়াত ৩৭)
প্রথম কোরবানির ইতিহাস
কোরবানির ইতিহাস বহু প্রাচীন। কোরআনে হাবিল ও কাবিলের ঘটনাই তার প্রমাণ। ইসলামে প্রথম কোরবানির দৃষ্টান্ত এই দুই ভাইয়ের মাধ্যমে পাওয়া যায়। হাবিল আল্লাহর জন্য প্রথমবারের মতো একটি ভেড়া কোরবানি করেন। অন্যদিকে, কাবিল তার ফসলের কিছু অংশ আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন।
"وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ ۖ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ ۖ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ"
"আর আপনি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের প্রকৃত ঘটনা বর্ণনা করুন; যখন তারা উভয়ে কোরবানি করল, তখন একজনের পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা হল এবং অন্যজনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হল না। সে বলল, 'আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব।' অপরজন বলল, 'আল্লাহ মুত্তাকিদের পক্ষ থেকে গ্রহণ করেন।'"
(সুরা মায়েদা: আয়াত ২৭)
ইবরাহিম আলাইহিস সাল্লামের কোরবানি
পরবর্তীতে, আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সাল্লামকে স্বপ্নে নির্দেশ দেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি আল্লাহর নামে কোরবানি করতে। হজরত ইবরাহিম প্রথমে ১০টি উট কোরবানি করেন, এরপর আবারও আদেশ প্রাপ্ত হয়ে ১০০টি উট কোরবানি করেন। পরিশেষে, তিনি তাঁর পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু আল্লাহর আদেশে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি প্রাণী কোরবানি হয় এবং ইসমাইলের কোনো ক্ষতি হয় না।
"فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَىٰ ۚ قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ"
"যখন সে তার পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়সে পৌঁছাল, তখন ইবরাহিম বললেন, 'হে আমার প্রিয় সন্তান, আমি স্বপ্নে দেখছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি; এখন তোমার মতামত কী?' সে বলল, 'হে পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।'"
(সুরা সাফফাত: আয়াত ১০২)
কোরবানির তাৎপর্য
কোরবানির মূল তাৎপর্য হলো আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্য প্রকাশ করা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য যে আত্মত্যাগ করা হয় তা কেবল মাংস বা রক্তের মাধ্যমে নয় বরং তাতে অন্তর্নিহিত থাকে আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস।
"لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ"
"তাদের মাংস এবং রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।"
(সুরা হজ: আয়াত ৩৭)
কোরবানির বিধান ও সময়কাল
ইসলামে হিজরি ক্যালেন্ডারের ১২তম চন্দ্রমাস জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করার সময় নির্ধারিত। এই সময়ে মুসলিমরা ঈদুল আজহা পালন করেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি দেন।
কোরবানি সমাজের দরিদ্র ও অভাবীদের মাঝে আনন্দ ও খাবারের ভাগাভাগি করারও একটি মাধ্যম। কোরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করা হয়: এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ দরিদ্র ও অভাবীদের জন্য।
উপসংহার
কোরবানি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য, ভালোবাসা এবং ভক্তির প্রকাশ। এটি আত্মত্যাগ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দানশীলতার এক মহান প্রতীক। মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর এই উৎসব পালন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে এবং সমাজে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করে।