21/05/2026
আজ যে নামাজটা ছেড়ে দিচ্ছেন, কাল সেটার জন্যই আফসোস করবেন!"
— এই চিরন্তন সত্যকে কেন্দ্র করে একটি শিক্ষণীয় গল্প নিচে তুলে ধরা হলো।
# # অবহেলা ও অনুতাপের গল্প: একটি হারানো সুযোগ
আরিফ একজন সফল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার আর বন্ধুদের আড্ডায় তার দিনগুলো কেটে যেত ঝড়ের গতিতে। আজান হলে সে ভাবত, "কাজটা শেষ করে নিই, নামাজ পরে পড়া যাবে।" এভাবেই তার জীবনের বহু ওয়াক্তের ফরজ নামাজ অলসতা আর অবহেলায় ছুটে যেত।
একদিন আরিফের এক ধার্মিক বন্ধু তাকে মসজিদে যাওয়ার অনুরোধ করলে সে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, "এখনও তো বয়স অনেক আছে, বুড়ো বয়সে তওবা করে নামাজ পড়া শুরু করব।" বন্ধুটি তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, "আরিফ, আজ যে নামাজটা অবহেলায় ছেড়ে দিচ্ছ, কাল হয়তো এই একটি সিজদার জন্যই তোমাকে চিরকাল আফসোস করতে হবে।" আরিফ হেসেই কথাটি উড়িয়ে দিল।
এর কিছুদিন পর, এক রাতে আকস্মিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় আরিফ প্রাণ হারায়।
মৃত্যুর পর যখন আরিফের চোখ খুলল, সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক বিশাল বিচারালয়ে। চারদিকের পরিবেশ ভীষণ থমথমে ও ভয়ংকর। তার সামনে তখন তার আমলনামা হাজির করা হলো। আরিফ দেখতে পেল, তার ক্যারিয়ারের সাফল্য, ব্যাংকের টাকা বা বিলাসবহুল গাড়ি—কোনো কিছুই আজ তাকে রক্ষা করতে পারছে না। তার আমলনামায় একের পর এক নামাজের ঘরগুলো শূন্য।
সেদিন ফেরেশতারা যখন তাকে অবাধ্যতার কারণে শাস্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আরিফ চিৎকার করে বলছিল, "আমাকে আর একটিমাত্র সুযোগ দেওয়া হোক! আমি পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে মাত্র একটা সিজদা করতে চাই!" কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার সেই আফসোস আর কান্নার কোনো মূল্যই রইল না।
# # মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের রেফারেন্স
পবিত্র কোরআনে কেয়ামতের দিন বেনামাজিদের এই চরম আফসোস এবং জাহান্নামীদের কথোপকথন স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
১. জাহান্নামে যাওয়ার মূল কারণ:
"তারা জাহান্নামীদের জিজ্ঞেস করবে, ‘কোন বিষয়টি তোমাদের সাকার (জাহান্নামে) প্রবেশ করালো?’ তারা বলবে, ‘আমরা নামাজ পড়তাম না।’"
— [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৪২-৪৩
১. সিজদা করতে না পারার আফসোস:
"স্মরণ করো সেই দিনের কথা, যেদিন (কেয়ামতের কঠিন পরিস্থিতিতে) পায়ের গোছা উন্মুক্ত করা হবে এবং মানুষকে সিজদা করার জন্য আহ্বান জানানো হবে, কিন্তু তারা (সিজদা করতে) পারবে না। তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে, হীনতা তাদেরকে গ্রাস করবে; অথচ যখন তারা সুস্থ ও নিরাপদ ছিল, তখনো তাদেরকে সিজদা করার আহ্বান জানানো হতো (কিন্তু তারা তা করেনি)।"
— [সূরা আল-কালাম, আয়াত: ৪২-৪৩](
# # সহীহ হাদিসের রেফারেন্স
নামাজ ত্যাগ করার ভয়াবহতা এবং পরকালে এর জবাবদিহিতা নিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
১. প্রথম হিসাব হবে নামাজের:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কেয়ামতের দিন বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রথমে নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। যদি নামাজ ঠিক হয়, তবে সে সফল ও সার্থক হলো। আর যদি নামাজ বিনষ্ট হয়, তবে সে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হলো।"
— [সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ৪১৩, সহীহ
১. কুফর ও ইসলামের ব্যবধান:
আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, "নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে ব্যবধান হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।"
— [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮২
১. আমল বরবাদ হওয়ার ভয়:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি (ইচ্ছাকৃতভাবে) আসরের নামাজ ছেড়ে দিল, তার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে গেল।"
— সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৫৫৩
শিক্ষা: সময় চলে গেলে আর আফসোস করে কোনো লাভ হবে না। তাই পরকালের চিরস্থায়ী জীবনের কঠিন আফসোস থেকে বাঁচতে আজই, এই মুহূর্ত থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করার দৃঢ় সংকল্প করা উচিত।
পরিশেষে, অলসতার স্বপ্নে ঘুমন্ত হে মুমিন,
ভোগ-বিলাস বাড়িয়ে কী উপকারে আসবে?
চোখ মেলো,
উঠো—প্রিয় রবকে স্মরণ করো।
চোখ মেলো,
শোন প্রিয় রবের যিকির।
চোখ মেলো,
চলো সত্য পথে।
এমন জীবন অতিবাহিত করে
কী উপকারে আসবে?
অলসতার স্বপ্নে ঘুমন্ত হে মুমিন,
যৌবনকালে ভুলে গিয়েছ তোমার রবকে!
ক্ষমতার বলে দেখিয়েছ দাপট!
যৌবন ঢলে পড়লে তখন আফসোস করবে—
সেই মুহূর্তে কেঁদে কী উপকারে আসবে?
চোখ মেলো,
উঠো—প্রিয় রবকে স্মরণ করো।
— আল্লামা ইকবাল (র.)