18/02/2026
পৃথিবীতে একদিনে ঈদ কেন পালিত হয় না?
জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও শরিয়াভিত্তিক বিশ্লেষণ
১. ভূমিকা
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো : পৃথিবীর সব দেশে একই দিনে ঈদ ও রোজা পালিত হয় না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ইসলামের চন্দ্রপঞ্জিকার মূলনীতি, পৃথিবীর ভূগোল এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের মধ্যে।
২. হাদিসের নির্দেশনা: চাঁদ দেখার ভিত্তি
বিষয়টি বোঝার আগে মূল হাদিসটি স্মরণ করা দরকার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখেই রোজা পূর্ণ করো। যদি চাঁদ না দেখো, তবে আরবি মাস ৩০ দিন পূর্ণ করো।
এই হাদিসটিই ইসলামি চন্দ্রপঞ্জিকার ভিত্তিপ্রস্তর এবং এখান থেকেই দুটি ভিন্ন পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে।
৩. চাঁদ দেখার দুটি পদ্ধতি
চাঁদ দেখার পদ্ধতিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় — "ইমকানিয়াত" এবং "রুইয়াত"।
"ইমকানিয়াত" বলতে বোঝায় চাঁদের জন্ম বা কনজাংশনের উপর ভিত্তি করে মাস গণনা শুরু করা। সহজ কথায়, পৃথিবীতে চাঁদের জন্ম হলেই আরবি মাসের সূচনা ধরা হয় চাঁদ চোখে না দেখলেও। অর্থাৎ, "চাঁদ জন্ম নিয়েছে, অতএব মাস শুরু হয়েছে এটিই ইমকানিয়াতের মূল কথা।
অন্যদিকে "রুইয়াত" বলতে বোঝায় নিজ দেশের দিগন্তে সরাসরি খালি চোখে বা টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ চাক্ষুষভাবে দেখা। এই পদ্ধতিতে চাঁদ না দেখা গেলে নতুন মাস শুরু হয় না এবং বিদ্যমান মাসকে ৩০ দিনে পূর্ণ করতে হয়।
৪. জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: কেন একসাথে চাঁদ দেখা যায় না?
পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে আবর্তিত হয়। লন্ডন থেকে পূর্বে ও পশ্চিমে প্রতি ১১১ কিলোমিটারে একটি করে দ্রাঘিমারেখা এবং মোট ৩৬০টি দ্রাঘিমারেখা মিলিয়ে পৃথিবী একটি সম্পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে। পৃথিবী প্রতিটি দ্রাঘিমারেখা অতিক্রম করতে সময় নেয় ৪ মিনিট তাই প্রতি দ্রাঘিমায় সময়ের পার্থক্য ৪ মিনিট।
চাঁদও পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে, তবে তার গতি ভিন্ন। চাঁদ প্রতিটি দ্রাঘিমারেখা পেরোতে সময় নেয় ৪ মিনিট ৪ সেকেন্ড, কারণ চাঁদ নিজেও পৃথিবীর পিছনে পিছনে সরতে থাকে। চাঁদের গতি প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ০.৫ ডিগ্রি। কোনো দেশের দিগন্তে চাঁদকে দৃশ্যমান হতে হলে তাকে সূর্যের তুলনায় অন্তত ৫ থেকে ৬ ডিগ্রি পিছিয়ে থাকতে হবে। এই দূরত্ব অর্জন করতে জন্মের পর ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ফলে পৃথিবীর সব প্রান্তে একই মুহূর্তে চাঁদ দেখা যাওয়া জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবেই অসম্ভব।
৫. ২০২৬ সালের রমাদান: অঞ্চলভেদে বিস্তারিত হিসাব
আমরা জানি, আরবি মাস বা দিনের হিসাব শুরু হয় সূর্যাস্তের পর চাঁদের উপর ভিত্তি করে। ২০২৬ সালের রমাদানের চাঁদের জন্ম হয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি UTC+0 তে, অর্থাৎ লন্ডনের সময়ে দুপুর ১২টায়। এই সময়কে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইমকানিয়াত ও রুইয়াতের সম্ভাবনা এখন ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করা যাক।
(ক) প্রথম অঞ্চল UTC+6 থেকে UTC+12/13 (বাংলাদেশ থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত)
লন্ডনে যখন দুপুর ১২টা, তখন বাংলাদেশে বিকাল ৬টা ১ মিনিট অর্থাৎ চাঁদের জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের সন্ধ্যার পরে। বাংলাদেশে সন্ধ্যা হয় ৫:৫৪ মিনিটে, কিন্তু চাঁদের জন্ম হয়েছে ৬:০১ মিনিটে। যেহেতু আরবি দিনের হিসাব শুরু হয় সন্ধ্যা থেকে এবং সন্ধ্যার পরে চাঁদের জন্ম হয়েছে, তাই সেই সন্ধ্যায় আগের চাঁদের হিসাব চলবে। এর মানে হলো বাংলাদেশে শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করতে হবে। নিউজিল্যান্ড ও আমেরিকার সামোয়া অঞ্চল পর্যন্ত (UTC+12/13) একই অবস্থা কোনো কোনো অঞ্চলে চাঁদের জন্ম হয়েছে একদম মধ্যরাতে। এই পুরো টাইমজোনে নতুন চাঁদের হিসাব শুরু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তাই তাদের পূরনো চাদের হিসেবে ৩০ তম দিন পূর্ণ করতে হবে।
(খ) দ্বিতীয় অঞ্চল UTC+5 থেকে UTC+1 (ভারত-পাকিস্তান থেকে মরক্কো পর্যন্ত):
এই বিশাল অঞ্চলে চাঁদের জন্ম হয়েছে সন্ধ্যার আগে, কোনো কোনো অঞ্চলে একদম সকালেই। তাহলে কি এখানে রোজা শুরু হবে? এখানেই ইমকানিয়াত ও রুইয়াতের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রুইয়াতের বিচারে এই পুরো অঞ্চলে চাঁদ সরাসরি দেখার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কারণ চাঁদের গতি প্রতি ঘণ্টায় ০.৫ ডিগ্রি, তাই জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে সূর্য থেকে মাত্র ১-২ ডিগ্রি দূরে থাকে, যেখানে দৃশ্যমান হতে দরকার ন্যূনতম ৫-৬ ডিগ্রি। পাকিস্তান থেকে মরক্কো পর্যন্ত - সবখানেই খালি চোখে চাঁদ দেখার সম্ভাবনা শূন্য।
কিন্তু ইমকানিয়াতের বিচারে চাঁদের জন্ম হয়েছে এটাই অনেক দেশের ফতোয়া বোর্ডের জন্য যথেষ্ট। এই যুক্তিতে UTC+3-এ থাকা সৌদি আরব, কাতার ও দুবাই রোজার ঘোষণা দিয়েছে। পক্ষান্তরে কুয়েত, ওমান, সিরিয়া, UTC+2-এর মিশর ও তুরস্ক এবং UTC+1-এর মরক্কো এই দেশগুলো রোজার ঘোষণা দেয়নি। কারণ তাদের ফতোয়া বোর্ডের নীতি হলো রুইয়াত, অর্থাৎ সরাসরি চাঁদ দেখা। চাঁদ না দেখা গেলে মাস শুরু হয় না।
(গ) তৃতীয় অঞ্চল — UTC-3 থেকে UTC-11 (আমেরিকা মহাদেশ):
এখানে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। চাঁদ জন্মের পর ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ায় সে সূর্য থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে। ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, চিলি ও আলাস্কার দিগন্তে চাঁদ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তাই এই দেশগুলো সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে নয়, বরং নিজেদের দিগন্তে সরাসরি চাঁদ দেখার কারণেই রোজা পালন শুরু করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সৌদির অনুসরণ আর নিজের চাঁদ দেখা এক বিষয় নয়।
৬. ইসলামি শরিয়ায় ইমকানিয়াত না রুইয়াত কোনটি গ্রহণযোগ্য?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো উভয়ই গ্রহণযোগ্য, তবে পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমতঃ : UCT+6 থেকে UCT+13 পর্যন্ত ইমকানিয়াত বা রুইয়তের প্রশ্নই উঠে না।
UTC+5 থেকে UTC-2 পর্যন্ত যে দেশগুলো চাঁদের জন্মের উপর ভিত্তি করে ইমকানিয়াত পদ্ধতিতে রোজা পালন করে, তাতে শরিয়াগত কোনো অসুবিধা নেই যেমনটি সৌদি আরব, কাতার ও দুবাই করেছে। আবার যারা সরাসরি নিজ দেশের দিগন্তে চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা ঘোষণা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে, তারাও সঠিক পথেই আছে যেমনটি আরব ও আফ্রিকার বাকি দেশগুলো করেছে।
তবে উত্তম ও আদর্শ আমল হলো সরাসরি চাঁদ দেখে রোজা ও ঈদ পালন করা। হাদিসের ভাষা সুস্পষ্ট "চাঁদ দেখে রোজা রাখো।" এই নির্দেশনার আক্ষরিক অনুসরণই অধিকাংশ দেশের ফতোয়া বোর্ড করে থাকে এবং এটিই শরিয়ার আদর্শিক অবস্থান।
৭. সর্বশেষ
পৃথিবীতে একই দিনে ঈদ পালিত না হওয়া কোনো বিভ্রান্তি বা বিভেদের বিষয় নয়। এটি পৃথিবীর ভূগোল, চাঁদের গতিবিধি এবং ইসলামি ফিকহের স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল। যে দেশে সন্ধ্যার আগে চাঁদ জন্ম নিয়েছে, সে দেশে ইমকানিয়াত প্রযোজ্য হতে পারে। যে দেশে চাঁদ জন্মই নেয়নি সন্ধ্যার আগে, সে দেশে আগের মাস ৩০ দিনে পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক। আর যে দেশে চাঁদ সময়ের ব্যবধানে দৃশ্যমান হয়েছে, সে দেশে রুইয়াতের মাধ্যমে রোজা শুরু হওয়াটাই স্বাভাবিক।
প্রতিটি মুসলিম তার অবস্থান, টাইমজোন ও মাযহাব অনুযায়ী ইসলামের নির্দেশনা মেনেই আমল করছেন এটিই শরিয়ার প্রশস্ততা ও সৌন্দর্য।
তবে অধিকতর সুন্নাহভিত্তিক আমল হলো, সরাসরি চাঁদ দেখে রোজা বা ঈদ পালন করা।