03/09/2017
আঁটপুর, বাংলার এক অন্য মন্দির নগরীর ইতিকথা
মাটি পুড়িয়ে হল সোনা, আর তাই দিয়ে গাঁথা অতীত বঙ্গের সোনার ইতিহাস, আর এই ইতিহাসের একটুকরো আজকের আঁটপুরেও আছে। শ্রীরামপুর মহকুমার অন্তর্গত জাঙ্গিপাড়া থানা ও ব্লকের এলাকাধীন একটি গ্রাম আঁটপুর। প্রাচীনকালে এই স্থান ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তাঁতের কাপড়ের জন্য খুবই খ্যাতি ছিল। আঁটপুর গ্রামটি আটটি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত, আটটি গ্রাম তড়া, বোমনগর, কোমরবাজার, ধরমপুর, আনারবাটি, রানিরবাজার, বিলাড়া, লোহাগাছি৷ জনশ্রুতি এই অঞ্চলে ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজার আট সেনাপতি বাস করতেন বলে গ্রামটির আঁটপুর নামকরণ হয়। অন্য মতে, মুসলিম রাজত্বকালে এই স্থানে আনোর খাঁ ও আঁটোর খাঁ নামে দুই জমিদার বাস করতেন। তাঁদের নামানুসারে আনোরবাটি (বর্তমানে আনারবাটি) ও আঁটপুর নামকরণ হয়েছে।
আদিশূরের সময় কান্যকুব্জ থেকে যে পাঁচজন ব্রাহ্মণ ও পাঁচজন কুলীন কায়স্থ গৌড়দেশে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে কালীদাস মিত্র এই মিত্র বংশের প্রতিষ্ঠাতা। এ পরিবারের তিনটি অংশ বিভিন্ন সময়ে ২৪ পরগণা জেলার বড়িশা, হুগলি জেলার কোন্নগর ও আঁটপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। আঁটপুরের মিত্রবাড়ির আদি পুরুষ হলেন শ্রী কন্দর্প মিত্র। পরবর্তীকালে শ্রী কন্দর্প মিত্রের পৌত্র কৃষ্ণরাম মিত্র বর্ধমানের মহারাজা তিলকচন্দ্র বাহাদুরের দেওয়ান হিসাবে প্রচুর ভূসম্পত্তি অর্জন করেন। তিনিই আঁটপুরে অনেকগুলি দেবালয় নির্মাণ ও জলাশয় খনন করান। এই দেবালয়গুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দের মন্দির। শোনা যায় যে তিনি বৈদ্যবাটি থেকে গঙ্গাজল ও গঙ্গামাটি আনিয়ে সেই গঙ্গামাটিতে ইঁট পুড়িয়ে রাধাগোবিন্দের মন্দির নির্মাণ করান।
তবে আঁটপুর শুধু মাত্র মন্দিরের জন্য প্রসিদ্ধ নয়, আঁটপুরের অন্য গৌরবময় অতীত আজ বিদ্যমান, ১৮৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, নরেন্দ্রনাথের (স্বামীজি তখনও বিবেকানন্দ নাম গ্রহন করেন নি) গুরুভ্রাতা বাবুরামের মা নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের আঁটপুর গ্রামে আমন্ত্রণ জানান। তাঁরা সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করে আঁটপুরে যান এবং কিছুদিন সেখানে থাকেন। আঁটপুরেই বড়দিনের পূর্বসন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথ ও আটজন শিষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন আর নরেন্দ্রনাথ "স্বামী বিবেকানন্দ" নাম গ্রহণ করেন। এই বাবুরাম ঘোষ এ পরে স্বামী প্রেমানন্দ নামে অধিক পরিচিত হন। আজও ওখানকার রামকৃষ্ণ মঠের দুর্গা পূজা খুবই বিখ্যাত।
যাই হোক ফিরে আসি শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দের মন্দিরের কথায়, এই আটচালা শৈলীর মন্দিরটি উচ্চ ভিত্তিবেদির নির্মিত, পূর্বমুখী ও সামনে ত্রিখিলান প্রবেশ পথ। গর্ভগৃহের সামনে সন্নিবদ্ধ রয়েছে দোচালা বা একবাংলা মণ্ডপ। এটি জগমোহন বা পরিদর্শন কক্ষ রূপে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের দোচালা জগমোহন'যুক্ত আটচালা স্থাপত্য এই পশ্চিমবাংলায় বিরল, হ্যাঁ কালনায় দুটি দেবালয়ে এরকম অতিরিক্ত একবাংলা মণ্ডপের সমাবেশ হয়েছে বটে কিন্তু সেগুলি ২৫-চূড়া রত্ন মন্দির। এই মন্দিরের টেরাকোটার কাজও প্রশংসার দাবি রাখে, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলক অনুযায়ী মন্দিরটি ১৭০৮ শকাব্দে (১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠিত। সামনে ত্রিখিলান প্রবেশপথের উপরের তিনটি প্রস্থে কার্নিশের নিচে এবং দেওয়ালের দু'পাশে বামে ও ডাইনে ছোট ছোট খোপে অজস্র টেরাকোটা মূর্তি স্থাপিত। এছাড়া মন্দিরের উত্তর ও দক্ষিণদিকের দেওয়ালেও বহু টেরাকোটা মূর্তি আছে, এইসব টেরাকোটা ফলকগুলির মাধ্যমে কৃষ্ণলীলা, ভীষ্মের শরশয্যা, রাসলীলা, রামরাবণের যুদ্ধ, পুতনাবধ, বহুবাহু কালীমূর্তি, ফিরিঙ্গি বণিক, মুসলমান ফকির ইত্যাদি গ্রাম বাংলার সামগ্রিক চিত্র দেখা যায়। বলা যেতে পারে সর্বধৰ্ম সমন্বয়ের এক দৃষ্টান্ত এই মন্দির।
এই মন্দিরের দোচালা জগমোহনের ভেতরের ছাদে পঙ্খের ফুল-লতাপাতার নকশাচিত্র উৎকৃষ্ট দেওয়াল চিত্রের পরিচায়ক। এই দোচালার ভিতরের দেওয়ালে ফুল-লতাপাতার টেরাকোটা ফলকগুলিও সুন্দর। গর্ভগৃহে সিংহাসনে রাধাকান্ত ও রাধার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ও নিত্য পূজিত।
এই রাধাগোবিন্দের মন্দির ছাড়াও এই মন্দির চত্বরে আরও কয়েকটি শিব মন্দির আছে, যথা - গঙ্গাধর, ফুলেশ্বর, জলেশ্বর, বাণেশ্বর ও রামেশ্বর৷ এছাড়া আছে একটি রাধাগোবিন্দের দোলমঞ্চ, এই দোলমঞ্চটি পঞ্চরত্ন শৈলীর, দোলমঞ্চটি উঁচু ভিত্তিবেদির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মূল চূড়াটি উঁচু, প্রতিটি শিখরের উপরিভাগ রেখদেউল ধরণের আড়াআড়িভাবে খাঁজকাটা, চারটি স্তম্ভের উপর দোলমঞ্চটি দণ্ডায়মান, স্তম্ভগুলি পরস্পর ধনুরাকৃতি খিলানের দ্বারা সংযুক্ত।
এছাড়া আঁটপুরের মিত্রবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হল চণ্ডীমণ্ডপ। শোনা যায় এটি কাঁঠাল কাঠের তৈরি, দোচালা খড়ের চাল। এর প্রতিটি স্তম্ভের গায়ে, কড়িকাঠে ও ফ্রেমের উপর অজানা শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত রূপ পেয়েছে - বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, পৌরাণিক ঘটনা, সামাজিক চিত্র, নকশা ইত্যাদি। ঐতিহাসিকদের মতে এটি শ্রী কন্দর্প মিত্র ১৬৮৩ খ্রীষ্টাব্দে নির্মাণ করেন।
এর অদূরেই ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও শ্রীমা সারদাদেবীর যোগ্য শিষ্য, রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রেমানন্দ অর্থাৎ বাবুরাম ঘোষের দূর্গা বাড়ি৷ আগেই বলেছি এই বাড়িতেই স্বামী বিবেকানন্দ সহ নয়জন গুরুভাই সন্ন্যাস গ্রহণের সংকল্প নেন৷ আজও ওই দিনটিতে স্মরণ করে প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠান হয়, আর রামকৃষ্ণ মঠের দুর্গাপুজাও খুব বিখ্যাত, যা দেখতে আজও অনেক দূর দুরান্ত থেকে লোক আসে৷
আজ এইটুকুই, আবার আসবো ফিরে অতীত বাংলার অন্য কোনও জায়গার, মন্দিরের গল্প নিয়ে। ভাল থাকুন সবাই, ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুন।
যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন
১) 97055872@N03/albums" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/
৩) https://www.facebook.com/TOB16/