Ancient Temples of Bengal

Ancient Temples of Bengal অতীত বাংলার ঐতিহ্যের হাতছানি

আঁটপুর, বাংলার এক অন্য মন্দির নগরীর ইতিকথা মাটি পুড়িয়ে হল সোনা, আর তাই দিয়ে গাঁথা অতীত বঙ্গের সোনার ইতিহাস, আর এই ইতিহাস...
03/09/2017

আঁটপুর, বাংলার এক অন্য মন্দির নগরীর ইতিকথা

মাটি পুড়িয়ে হল সোনা, আর তাই দিয়ে গাঁথা অতীত বঙ্গের সোনার ইতিহাস, আর এই ইতিহাসের একটুকরো আজকের আঁটপুরেও আছে। শ্রীরামপুর মহকুমার অন্তর্গত জাঙ্গিপাড়া থানা ও ব্লকের এলাকাধীন একটি গ্রাম আঁটপুর। প্রাচীনকালে এই স্থান ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তাঁতের কাপড়ের জন্য খুবই খ্যাতি ছিল। আঁটপুর গ্রামটি আটটি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত, আটটি গ্রাম তড়া, বোমনগর, কোমরবাজার, ধরমপুর, আনারবাটি, রানিরবাজার, বিলাড়া, লোহাগাছি৷ জনশ্রুতি এই অঞ্চলে ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজার আট সেনাপতি বাস করতেন বলে গ্রামটির আঁটপুর নামকরণ হয়। অন্য মতে, মুসলিম রাজত্বকালে এই স্থানে আনোর খাঁ ও আঁটোর খাঁ নামে দুই জমিদার বাস করতেন। তাঁদের নামানুসারে আনোরবাটি (বর্তমানে আনারবাটি) ও আঁটপুর নামকরণ হয়েছে।

আদিশূরের সময় কান্যকুব্জ থেকে যে পাঁচজন ব্রাহ্মণ ও পাঁচজন কুলীন কায়স্থ গৌড়দেশে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে কালীদাস মিত্র এই মিত্র বংশের প্রতিষ্ঠাতা। এ পরিবারের তিনটি অংশ বিভিন্ন সময়ে ২৪ পরগণা জেলার বড়িশা, হুগলি জেলার কোন্নগর ও আঁটপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। আঁটপুরের মিত্রবাড়ির আদি পুরুষ হলেন শ্রী কন্দর্প মিত্র। পরবর্তীকালে শ্রী কন্দর্প মিত্রের পৌত্র কৃষ্ণরাম মিত্র বর্ধমানের মহারাজা তিলকচন্দ্র বাহাদুরের দেওয়ান হিসাবে প্রচুর ভূসম্পত্তি অর্জন করেন। তিনিই আঁটপুরে অনেকগুলি দেবালয় নির্মাণ ও জলাশয় খনন করান। এই দেবালয়গুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দের মন্দির। শোনা যায় যে তিনি বৈদ্যবাটি থেকে গঙ্গাজল ও গঙ্গামাটি আনিয়ে সেই গঙ্গামাটিতে ইঁট পুড়িয়ে রাধাগোবিন্দের মন্দির নির্মাণ করান।

তবে আঁটপুর শুধু মাত্র মন্দিরের জন্য প্রসিদ্ধ নয়, আঁটপুরের অন্য গৌরবময় অতীত আজ বিদ্যমান, ১৮৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, নরেন্দ্রনাথের (স্বামীজি তখনও বিবেকানন্দ নাম গ্রহন করেন নি) গুরুভ্রাতা বাবুরামের মা নরেন্দ্রনাথ ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের আঁটপুর গ্রামে আমন্ত্রণ জানান। তাঁরা সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করে আঁটপুরে যান এবং কিছুদিন সেখানে থাকেন। আঁটপুরেই বড়দিনের পূর্বসন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথ ও আটজন শিষ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন আর নরেন্দ্রনাথ "স্বামী বিবেকানন্দ" নাম গ্রহণ করেন। এই বাবুরাম ঘোষ এ পরে স্বামী প্রেমানন্দ নামে অধিক পরিচিত হন। আজও ওখানকার রামকৃষ্ণ মঠের দুর্গা পূজা খুবই বিখ্যাত।

যাই হোক ফিরে আসি শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দের মন্দিরের কথায়, এই আটচালা শৈলীর মন্দিরটি উচ্চ ভিত্তিবেদির নির্মিত, পূর্বমুখী ও সামনে ত্রিখিলান প্রবেশ পথ। গর্ভগৃহের সামনে সন্নিবদ্ধ রয়েছে দোচালা বা একবাংলা মণ্ডপ। এটি জগমোহন বা পরিদর্শন কক্ষ রূপে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের দোচালা জগমোহন'যুক্ত আটচালা স্থাপত্য এই পশ্চিমবাংলায় বিরল, হ্যাঁ কালনায় দুটি দেবালয়ে এরকম অতিরিক্ত একবাংলা মণ্ডপের সমাবেশ হয়েছে বটে কিন্তু সেগুলি ২৫-চূড়া রত্ন মন্দির। এই মন্দিরের টেরাকোটার কাজও প্রশংসার দাবি রাখে, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলক অনুযায়ী মন্দিরটি ১৭০৮ শকাব্দে (১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠিত। সামনে ত্রিখিলান প্রবেশপথের উপরের তিনটি প্রস্থে কার্নিশের নিচে এবং দেওয়ালের দু'পাশে বামে ও ডাইনে ছোট ছোট খোপে অজস্র টেরাকোটা মূর্তি স্থাপিত। এছাড়া মন্দিরের উত্তর ও দক্ষিণদিকের দেওয়ালেও বহু টেরাকোটা মূর্তি আছে, এইসব টেরাকোটা ফলকগুলির মাধ্যমে কৃষ্ণলীলা, ভীষ্মের শরশয্যা, রাসলীলা, রামরাবণের যুদ্ধ, পুতনাবধ, বহুবাহু কালীমূর্তি, ফিরিঙ্গি বণিক, মুসলমান ফকির ইত্যাদি গ্রাম বাংলার সামগ্রিক চিত্র দেখা যায়। বলা যেতে পারে সর্বধৰ্ম সমন্বয়ের এক দৃষ্টান্ত এই মন্দির।

এই মন্দিরের দোচালা জগমোহনের ভেতরের ছাদে পঙ্খের ফুল-লতাপাতার নকশাচিত্র উৎকৃষ্ট দেওয়াল চিত্রের পরিচায়ক। এই দোচালার ভিতরের দেওয়ালে ফুল-লতাপাতার টেরাকোটা ফলকগুলিও সুন্দর। গর্ভগৃহে সিংহাসনে রাধাকান্ত ও রাধার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ও নিত্য পূজিত।

এই রাধাগোবিন্দের মন্দির ছাড়াও এই মন্দির চত্বরে আরও কয়েকটি শিব মন্দির আছে, যথা - গঙ্গাধর, ফুলেশ্বর, জলেশ্বর, বাণেশ্বর ও রামেশ্বর৷ এছাড়া আছে একটি রাধাগোবিন্দের দোলমঞ্চ, এই দোলমঞ্চটি পঞ্চরত্ন শৈলীর, দোলমঞ্চটি উঁচু ভিত্তিবেদির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মূল চূড়াটি উঁচু, প্রতিটি শিখরের উপরিভাগ রেখদেউল ধরণের আড়াআড়িভাবে খাঁজকাটা, চারটি স্তম্ভের উপর দোলমঞ্চটি দণ্ডায়মান, স্তম্ভগুলি পরস্পর ধনুরাকৃতি খিলানের দ্বারা সংযুক্ত।
এছাড়া আঁটপুরের মিত্রবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ হল চণ্ডীমণ্ডপ। শোনা যায় এটি কাঁঠাল কাঠের তৈরি, দোচালা খড়ের চাল। এর প্রতিটি স্তম্ভের গায়ে, কড়িকাঠে ও ফ্রেমের উপর অজানা শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত রূপ পেয়েছে - বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, পৌরাণিক ঘটনা, সামাজিক চিত্র, নকশা ইত্যাদি। ঐতিহাসিকদের মতে এটি শ্রী কন্দর্প মিত্র ১৬৮৩ খ্রীষ্টাব্দে নির্মাণ করেন।

এর অদূরেই ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও শ্রীমা সারদাদেবীর যোগ্য শিষ্য, রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রেমানন্দ অর্থাৎ বাবুরাম ঘোষের দূর্গা বাড়ি৷ আগেই বলেছি এই বাড়িতেই স্বামী বিবেকানন্দ সহ নয়জন গুরুভাই সন্ন্যাস গ্রহণের সংকল্প নেন৷ আজও ওই দিনটিতে স্মরণ করে প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠান হয়, আর রামকৃষ্ণ মঠের দুর্গাপুজাও খুব বিখ্যাত, যা দেখতে আজও অনেক দূর দুরান্ত থেকে লোক আসে৷

আজ এইটুকুই, আবার আসবো ফিরে অতীত বাংলার অন্য কোনও জায়গার, মন্দিরের গল্প নিয়ে। ভাল থাকুন সবাই, ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুন।

যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন
১) 97055872@N03/albums" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/
৩) https://www.facebook.com/TOB16/

গুপ্তিপাড়া – টেরাকোটা মন্দির স্তাপত্তের অপরূপ নিদর্শন শুদু নয় বঙ্গ জীবনের ইতিহাসের আয়নাওঅ্যান্টনি ফিরিঙ্গী এই সিনেমাটি ব...
02/09/2017

গুপ্তিপাড়া – টেরাকোটা মন্দির স্তাপত্তের অপরূপ নিদর্শন শুদু নয় বঙ্গ জীবনের ইতিহাসের আয়নাও

অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী এই সিনেমাটি বাঙালি মাত্রেই দেখেছেন, মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত একটি জনপ্রিয় সিনেমা। তাতে যে কবিয়াল গানের উল্লেখ আছে –

‘আমি সে ভোলানাথ নইরে আমি সে ভোলানাথ নই,
আমি ময়রা ভোলা ভিঁয়াই খোলা
বাগবাজারে রই।’

কিংবা

“ময়মনসিংহের মুগ ভালো, খুলনার ভালো কই।
ঢাকার ভালো পাতাক্ষীর, বাঁকুড়ার ভালো দই।।
কৃষ্ণনগরের ময়রা ভালো, মালদহের ভালো আম।
উলোর ভালো বাঁদর পুরুষ, মুর্শিদাবাদের জাম।।
রংপুরের শ্বশুর ভালো, রাজশাহীর জামাই।
নোয়াখালির নৌকা ভালো, চট্টগ্রামের ধাই।।
দিনাজপুরের কায়েত ভালো, হাবড়ার ভালো শুঁড়ি।
পাবনা জেলার বৈষ্ণব ভালো, ফরিদপুরের মুড়ি।
বর্ধমানের চাষী ভালো, চব্বিশ পরগণার গোপ।
গুপ্তিপাড়ার মেয়ে ভালো, শীঘ্র-বংশলোপ।।
হুগলির ভালো কোটাল লেঠেল, বীরভূমের ভালো বোল।
ঢাকের বাদ্যি থামলেই ভালো, হরি হরি বোল।“

ঠিক ধরেছেন পাঠক, আমি ভোলা ময়রার কথা বলছি। আজকের আধুনিক জীবনে কবিগানের কথা হয়ত বর্তমান যুবসমাজ ভুলেই গেছে, কিন্তু স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভোলা ময়রার বিশেষ প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "বাংলাকে জাগাতে যেমন রামগোপাল ঘোষের মতো বাগ্মী, হুতোম প্যাঁচার মতো আমুদে লোকের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ভোলা ময়রার মতো লৌকিক গায়কদের।" ইন্টারনেট খুঁজে দেখেছি, ভোলা ময়রার আদি বাড়ী এই গুপ্তিপাড়াতেই ছিল, তাই খুব ইচ্ছে এই মহান কবিয়ালের জন্মভিটে দেখে আসব। শুদু কি ভোলা ময়রা গুপ্তিপাড়ার আনাছে কানাচে ছড়িয়ে আছে অতীত বঙ্গের গৌরবময় ইতিহাস।

বাংলাদেশের প্রথম ‘বারোয়ারি পূজা’র সুত্রপাত হয় এই গুপ্তিপাড়াতেই, এই বঙ্গে পারিবারিক দুর্গাপূজার মধ্যে গুপ্তিপাড়ার সেন বাড়ির দুর্গাপূজা মতান্তরে জগদ্ধাত্রী পুজা অন্যতম প্রাচীন। কথিত আছে কোন এক কারনে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি একবার সেন বাড়ীর দুর্গা মতান্তরে জগদ্ধাত্রী পুজায় অংশ গ্রহন করতে অস্বীকার করেন, আর এদের মধ্যেই ১২জন একত্রিত হয়ে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে একটি সংগঠন গড়ে বিন্ধ্যবাসিনী জগদ্ধাত্রী পুজার আয়োজন করেন। বার জন বন্ধুর বা ইয়ারের সংগঠন বলে সেই থেকে বারোয়ারি পুজা কথাটি প্রচলিত হয়।

এছাড়া এই গুপ্তিপাড়া বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার অন্যতম প্রধান সেনাপতি প্রখ্যাত ‘মোহনলালের’ জন্মস্থান, এছাড়া রাজা রামমোহন রায়ের সঙ্গীত শিক্ষাগুরু ‘কালী মির্জা’ গুপ্তিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

যদিও গুপ্তি পাড়ার নামকরন সম্পর্কে আমার বিশেষ জানা নেই, তবে ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন্য পত্র পত্রিকা ঘেঁটে যা পেয়েছি তা হল – গুপ্তি পাড়া ও তৎসংলগ্ন গ্রাম গুলিতে বহু দেবদেবীর মন্দির, থান বর্তমান, আর এই জন্নেই এই অঞ্চলকে ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ বলা হত। হয়ত ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ এই নাম থেকে ‘গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী’, ‘গুপ্তপল্লী’ ও পরিশেষে ‘গুপ্তিপাড়া’ নামকরণ হয়েছে এরকম ভাবা যেতেই পারে। তবে প্রাচীন কাল থেকেই গুপ্তি পাড়ার নাম প্রসিদ্ধ ছিল, সাহিত্যেও এর উল্লেখ আছে। যেমন ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্যে – চাঁদ সওদাগরের চম্পকনগরী থেকে তরী ভাসিয়ে নদীপথে যাওয়ার পথে কাটোয়া, গুপ্তিপাড়া, ত্রিবেণী এই সব নগরের উল্লেখ আছে। এছাড়া গুপ্তিপাড়ার রথ পুরী বা মাহেশের রথের মতই বিখ্যাত।

তবে আজ আমি গুপ্তি পাড়ার প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলি নিয়ে কিছু কথা শোনাবো, স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা দূরে তারকেশ্বরের মোহান্তের অধীন দশনামী শৈবসম্প্রদায়ের মঠবাড়ি এলাকায় গুপ্তিপাড়ার এই প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলি অবস্থিত। এই মঠবাড়ি এলাকায় মোট চারটি মন্দির বর্তমান। মন্দির শৈলীর দিক থেকে দেখতে গেলে - কৃষ্ণচন্দ্রের 'আটচালা', শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর 'জোড়বাংলা', বৃন্দাবনচন্দ্রের 'আটচালা' ও রামচন্দ্রের মন্দিরটি 'একরত্ন' শ্রেণীর। মন্দিরগুলি একসঙ্গে 'বৃন্দাবনচন্দ্রের মঠ' বা 'গুপ্তিপাড়ার মঠ' নামে অধিক পরিচিত। একটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা প্রাঙ্গণের উত্তরের অংশে চারটি মন্দির। প্রাঙ্গণের দক্ষিণ অংশে ভোগের ঘর, মঠের অধিবাসীদের থাকার ঘর ইত্যাদি অবস্থিত, যদিও সেগুলির দশা খুব একটা ভাল নয়। চারটি মন্দিরই উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত এবং এক মন্দির থেকে পরের মন্দিরে যাওয়ার জন্য ইঁটের তৈরী সাঁকো আছে (এই ধরনের সাঁকো আপনারা বাঁশবেড়িয়াতেও দেখতে পাবেন, এও প্রাচীন বাংলার মন্দির শৈলীর মধ্যে অন্যতম হিসাবে গন্য করা যায়)। মন্দির এলাকায় প্রবেশ করলে সামনেই তোরণ দেখতে পাওয়া যাবে, তোরণের বাঁদিকে কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির।

কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির : উঁচু ভিত্তি বেদির উপর স্থাপিত, ত্রিখিলানবিশিষ্ট, অলিন্দযুক্ত, পূর্বমুখী, এটি বাংলার আটচালা শ্রেণীর মন্দির। সামনের দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার, অলিন্দের সামনে একটি বড়, দুপাশে দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট। এছাড়া দক্ষিণ ও উত্তর দিকে একটি করে প্রবেশদ্বার আছে, মন্দিরটির টেরাকোটার কাজ অল্প হলেও যা আছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। টেরাকোটার কাজের বেশির ভাগই ফুল এর নক্সায় তৈরি। মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্রীশ্রী কৃষ্ণচন্দ্র ও শ্রী রাধিকা অধিষ্ঠিত। জনশ্রুতি নবাব আলিবর্দি খাঁর আমলে ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি নির্মাণ করেন দণ্ডি মধুসূদন স্বামী। প্রবাদ আছে যে, তিনি শান্তিপুরের মধ্যম গোস্বামী বাড়ির রঘুনন্দন সেবায়ত দণ্ডিস্বামীর নিকট বেদান্তাদি অধ্যায়ন করতেন। শিক্ষা শেষে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় দুটি বিগ্রহের মধ্যে একটি যাচনা করেন। গুরুদেব শিস্যকে চোখবাঁধা অবস্থায় যে কোনও একটি বিগ্রহ নিতে বলেন। শ্রী দণ্ডি মধুসূদন স্বামী সেই অবস্থায় যেটি নেন সেটি গুপ্তিপাড়া মঠের কৃষ্ণচন্দ্র বিগ্রহ।
মহাপ্রভু বা শ্রীচৈতন্যের মন্দির : কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দিরের সামনের রোয়াক ধরে উত্তর দিকে সামান্য গেলেই বাঁদিকে পড়বে এই মন্দিরটি। উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত মন্দিরটি বাংলার জোর বাংলা শিল্পরীতিতে তৈরি, সবচেয়ে পুরানো। কোনও প্রতিষ্ঠাফলক না থাকায় মন্দিরটি ঠিক কবে তৈরী তা জানা যায় না। তবে ইঁটের পাতলা গড়ন ও স্থাপত্য বৈশিষ্টগুলি অনুযায়ী ঐতিহাসিকরা মন্দিরটি সতের শতকের গোড়ার দিকে নির্মিত বলে অনুমান করেন। জনশ্রুতি আছে আকবরের আমলে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন রাজা বিশ্বেশ্বর রায়। মন্দিরে শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের কাঠের বিগ্রহ অধিষ্ঠিত। মন্দিরের খিলান সজ্জিত প্রবেশপথের ওপরে পোড়ামাটির কিছু কাজ এখনও বর্তমান আছে।

বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির : কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দিরের সামনের রোয়াক ধরে উত্তর দিকে সামান্য এগিয়ে ডান দিকে ঘুরলে চোখে পড়বে বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির। এটি উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, ত্রিখিলানবিশিষ্ট, অলিন্দযুক্ত, দক্ষিণমুখী, বাংলা আটচালা শ্রেণীর মন্দির। সামনের দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার, অলিন্দের সামনে একটি বড়, দুপাশে দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট। পশ্চিম দিকে আর একটি প্রবেশদ্বার আছে, পূর্ব দিকের প্রবেশ দ্বারটি ভরাট করা। মন্দিরটিতে টেরাকোটার কাজ খুব বেশি নেই। ইমারতি থামে কিছু পোড়ামাটির মূর্তি আজও দেখা যায়, এছাড়া বাঁকানো কার্নিসের নিচেও পোড়ামাটির কাজ আছে।

কিন্তু এই মন্দিরের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হল, এর ঢাকা বারান্দা আর গর্ভগৃহের দেওয়ালে রয়েছে নয়নাভিরাম ফ্রেসকো পেন্টিং, পেন্টিং এর বিষয়বস্তু পৌরাণিক কাহিনী, ফুল ইত্যাদি। মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্রীশ্রী বৃন্দাবনচন্দ্র, শ্রীরাধিকা, গরুড় এবং পিছনের উঁচু বেদিতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ নিত্য পূজিত হন। স্বামী সত্যদেব সরস্বতী শান্তিপুরের এক গৃহস্থের বাড়ি থেকে শ্রী বৃন্দাবনচন্দ্রকে এনে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন। রথযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ এক সুন্দর, উঁচু রথে বসিয়ে টানা হয়। এই জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা গুপ্তিপাড়ার অন্যতম আকর্ষণ, মাহেশ ছাড়া এত বড় রথ পশ্চিমবঙ্গের আর কোথাও নেই। এই রথযাত্রা উপলক্ষ্যে এখানে বড় মেলা বসে, এছাড়া এখান কার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল ‘ভাণ্ডারা লুঠ’। আসুন সেই গল্পই শোনাই আপনাদের - ‘ভাণ্ডারা লুঠ’-এর নেপথ্যে যে পৌরাণিক এক প্রেম কাহিনী রয়েছে তাঁর গল্প শোনাই এবার - একবার মা লক্ষ্মীর সঙ্গে মন কষাকষি হওয়ায় প্রভু জগন্নাথ লুকিয়ে মাসির বাড়িতে আশ্রয় নেন। মা লক্ষ্মী ভাবলেন, স্বামী বোধহয় পরকীয়ার টানে পালিয়েছেন (হাজার হোক বৌয়ের মন তো)। শ্রী বৃন্দাবনের কাছে জানতে পারলেন প্রভু জগন্নাথ রয়েছেন মাসির বাড়িতে। স্বামীর মতিস্থির করাতে লক্ষ্মী লুকিয়ে ওই বাড়িতে ‘সর্ষে পড়া’ ছিটিয়ে আসেন, পরে জানতে পারেন মাসির বাড়ীর উপাদেয় খাদ্য সমুহের জন্যেই প্রভু জগন্নাথ নাকি আসতে পারছেন না। তখন মা লক্ষ্মীর অনুরোধে শ্রী বৃন্দাবন লোকলস্কর নিয়ে যান মাসির বাড়ি, গিয়ে দেখেন, তিনটি দরজাই বন্ধ। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে তাঁরা সারি সারি মালসার খাবার লুঠ করে নেন, শেষে প্রভু জগন্নাথ মনের দুঃখে মা লক্ষ্মীর কাছে ফিরে আসেন। এই সম্পর্কে প্রফুল্লকুমার পান মহাশয় তাঁর ‘গুপ্তিপাড়ায় শ্রী শ্রী বৃন্দাবন জিউর আবির্ভাব ও রথযাত্রা’ বইতে এর পরিচয় দিয়েছেন এ ভাবে — “লন্ডভন্ড হয়ে যায় ভোগ উপাচার।/ তাতে জগন্নাথে হয় চেতনা সঞ্চার।”

উল্টোরথে বিকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ একসঙ্গে খোলে মাসির বাড়ির তিনটি দরজা। ভিতরে রাখা থাকে এই উপাদেয় মালসা ভোগ গুলো। কি ভাবছেন যাবেন নাকি একবার গুপ্তি পাড়ায়? যেতেই পারেন, যদি গায়ের জোরে আর ঠেলাঠেলি করে ভাগ বসাতে পারেন এই সব উপাদেয় খাবারে তো লাইফ জিঙ্গালিলা হতে বাধ্য, সে দিক থেকে রথযাত্রায় এই আকর্ষণ কিন্তু কম নয় কোনও অংশে।

শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির : গুপ্তিপাড়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দির হল এই শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির। অনেকটা বাঁশবেড়িয়ার অনন্ত বাসুদেব মন্দিরের মত এর গড়ন। এরূপ কারুকার্যখচিত মন্দির পশ্চিমবঙ্গে খুব একটা নেই। এর টেরাকোটার কাজ খুবই উচ্চ শ্রেণীর, উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, পশ্চিমমুখী, ইঁটের তৈরী মন্দিরটি বাংলার একরত্ন শ্রেণীর। মন্দিরের শিখর-রত্নটি আটকোণা, মন্দিরের সামনে তিনটি পত্রাকৃতি খিলান যুক্ত আবৃত অলিন্দ আছে। সামনের ত্রিখিলান প্রবেশপথের ওপরের তিনপ্রস্থে, থাম ও ভিত্তিবেদি সংলগ্ন দেওয়ালে এবং শিখরে প্রচুর উৎকৃষ্ট টেরাকোটার কাজ আছে। প্রবেশ পথের দুপাশে তিন সারিতে ও উপরে দুসারিতে নিবদ্ধ নকশা করা ফ্রেমের মধ্যে(কুলুঙ্গি) রাধা-কৃষ্ণ ও নরনারীর নানা ভঙ্গিমার চিত্র ফুটে উঠেছে। এরূপ সুক্ষ্ম ও ছন্দময় কারুকার্য হুগলি জেলার কোন মন্দিরে নেই। তবে এর বেশির ভাগ টেরাকোটার কাজ সময়ের প্রকোপে নষ্ট হয়ে গেছে। তবে এখানে তিনটি খিলান ছাড়া অন্যত্র টেরাকোটার কাজে ফুলের নক্সার আধিক্যই বেশি। শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির এর উৎকৃষ্ট পোড়ামাটির সজ্জার জন্য বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা মন্দির বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। মন্দিরের সামনের দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার, সোজাসুজি একটি বড়, দুপাশে দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট। মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্রীরামচন্দ্র, সীতা, লক্ষ্মণ ও হনুমানের কাঠের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিকদের মতে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেওড়াফুলির রাজা হরিশচন্দ্র রায়।

গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মণ্ডল দ্বারা সংরক্ষিত।

যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন

১) 97055872@N03/albums" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/
৩) https://www.facebook.com/TOB16/

১৬৫৭ সালে শ্রীযুক্ত মোহন মিত্র মহাশয় উলা-বীর নগরে এসে বসবাস শুরু করলেন। ১৭০৪ সালে তাঁর সুযোগ্য পুত্র শ্রী রামেশ্বর মিত্র...
28/08/2017

১৬৫৭ সালে শ্রীযুক্ত মোহন মিত্র মহাশয় উলা-বীর নগরে এসে বসবাস শুরু করলেন। ১৭০৪ সালে তাঁর সুযোগ্য পুত্র শ্রী রামেশ্বর মিত্র সম্রাট আউরঙ্গজেবের কাছ থেকে মুস্তাফি উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে রামেশ্বর মিত্রের বড় ছেলে শ্রী রুঘুনন্দন মিত্র শ্রীপুর- বলাগড় অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন, আর অন্য সন্তান শ্রী অনন্ত রাম ১৭১২ সালে সুখারিয়ায় বসবাস শুরু করেন। ১৮১৩ সালে অনন্তরামের তৃতীয় পুত্র শ্রী শম্ভুরাম মিত্র মুস্তাফির সুযোগ্য পুত্র শ্রী বীরেশ্বর মিত্র মুস্তাফি মহাশয় এই আনন্দময়ী কালী মন্দির তৈরি করান।

আনন্দময়ী কালী মন্দির, একটি বড় পুকুরের ধারে বিশাল পঞ্চবিংশতি চূড়া বিশিষ্ট ভব্য মন্দির। এই মন্দিরের প্রথম তলার চারদিকের চারটি কোণে ৩টি করে চূড়া রয়েছে, দ্বিতীয় তলার চারটি কোণে ২টি করে ও তৃতীয় তলায় একটি করে চূড়া রয়েছে, ঠিক মাঝখানে রয়েছে মন্দিরের মূল চূড়া| বিশেষজ্ঞদের মতে মন্দিরের স্থাপত্বশিল্পে এ ধরনের কাজ অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও সারা পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের ৫টি মন্দির রয়েছে। মন্দির গাত্রে টেরাকোটার সুন্দর কারুকার্য রয়েছে – দশভুজা মা দুর্গার মূর্তি, গনেশের মূর্তি, শিবলিঙ্গের রুপ ইত্যাদি। মন্দির সংস্কারের সময় অপটু হাতে পরে অথবা সময়ের আঘাতে অনেক টেরাকোটার কারুকার্য আজ অবলুপ্ত, তবু যা আছে তা আজও প্রশংসার দাবি রাখে। এছাড়া দুধারে ৬টি করে মন্দির রয়েছে যার মধ্যে ৫টি আটচালা ও একটি করে পঞ্চরত্ন মন্দির। প্রত্যেকটি পঞ্চরত্ন মন্দিরে গনেশ মূর্তি রয়েছে ও বাকি মন্দির গুলিতে ভোলানাথ শিব বিরাজমান।

যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন
১) 97055872@N03/albums/with/72157639681616926" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums/with/72157639681616926
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/

আগেই বলেছি বাংলার স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাস সুপ্রাচীন, আর একটু আন্তরিক ভাবে দেখলে আশেপাশে খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের জীবন্ত দ...
28/08/2017

আগেই বলেছি বাংলার স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাস সুপ্রাচীন, আর একটু আন্তরিক ভাবে দেখলে আশেপাশে খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের জীবন্ত দলিল পশ্চিমবঙ্গের এই স্থাপত্য শিল্পগুলি। আজ শোনাবো ইতিহাসের বংশবাটীর তথা আজকের বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দিরের কথা।

১৬৭৩ সালে পাটুলির জমিদার রামেশ্বর রায় তৎকালীন মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে গঙ্গার ধারে বংশবাটি এলাকায় ৪০০ একরের একটি গ্রাম যৌতুক এবং রাজা উপাধি পান। তিনি সেখানে বসতি স্থাপন করেন ও সপরিবারে বসবাস শুরু করেন।

রাজা রামেশ্বরের দ্বারা বংশবাটী রাজবংশের প্রভূত শ্রীবৃদ্ধি ঘটে, রাজা রামেশ্বরের ছিল তিন পুত্র। জ্যেষ্ঠ সন্তান রাজা রঘুদেব বংশবাটিতে থেকে যান, অপর দুই পুত্র জমিদারির অংশ নিয়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। রাজা রঘুদেব বর্গীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য রাজবাড়ির চারিদিকে একটি খাল বা পরিখা খনন করান। তাঁর একমাত্র পুত্র গোবিন্দদেবের পুত্র রাজা নৃসিংহদেব পিতার মৃত্যুর তিনমাস পর জন্মগ্রহণ করেন। রাজা গোবিন্দদেব নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেছেন এই অজুহাতে তাঁর সমস্ত স্তাবর অস্তাবর সম্পত্তি নবাব আলিবর্দী অন্য জমিদারদের বন্দোবস্ত করে দেন। রাজা নৃসিংহদেব এই কারণে শৈশবে খুবই আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েন। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলায় যখন কোম্পানির শাসন কায়েম হলে রাজা নৃসিংহদেব ওয়ারেন হেস্টিংসকে তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। হেস্টিংস নৃসিংহদেবকে তাঁর পিতার সম্পত্তির ২৪ পরগণা অংশ ফিরিয়ে দেন। তারপর ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিসের নিকট আবেদন করে আরও তিনটি পরগণা লাভ করেন ।

এরপর ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি কাশীতে যান এবং সেখানে সাধু-সন্ন্যাসীদের সাহচর্যে তন্ত্রশাস্ত্রে আর যোগশাস্ত্রে প্রভূত জ্ঞ্যান লাভ করেন। শোনা যায় সেই সময় ভূকৈলাসের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল কাশীতে বাস করছিলেন। রাজা নৃসিংহদেব কাশীখণ্ডের সংস্কৃত থেকে বাংলা অনুবাদ করতে রাজা জয়নারায়ণ ঘোষালকে সাহায্য করেছিলেন।

১৭৯৯ সালে তিনি কাশী থেকে ফিরে আসেন। লর্ড কর্ণওয়ালিস তাঁকে অন্যান্য সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য বিলেতে কোর্ট-অফ-ডাইরেক্টরগণের কাছে আবেদন করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু রাজা নৃসিংহদেব সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য বিলেতে বিপুল টাকা ব্যয় না করে সেই টাকায় একটি উৎকৃষ্ট ভব্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে মনস্থ করেন।

হংসেশ্বরী মন্দিরের ন্যায় অনুরূপ কোনও মন্দির এই বাংলায় আর নেই, এর স্থাপত্য শৈলী অনবদ্য। রাজা নৃসিংহদেব ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর অকালপ্রয়াণে মন্দির নির্মাণের কাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে তাঁর সুযোগ্য পত্নী রানী শঙ্করী পুনরায় মন্দির নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ শেষ করেন। শোনা যায়, মন্দিরে তৈরির পাথর আনা হয়েছিল চুনার থেকে, আর রাজস্থানের জয়পুর কারিগরদের আনা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় খরচ হয়েছিল ৫লক্ষ টাকা। হংসেশ্বরী মন্দির দক্ষিণমুখী, এই মন্দিরের চারিদিকে বারান্দা এবং মন্দিরের সামনে খোলা বাঁধানো প্রশস্ত চত্বর আছে।

মন্দিরের গায়ে লাগানো একটি ফলকে এই শ্লোকটি খোদাই করা আছে :

শাকাব্দে রস-বহ্নি-মৈত্রগণিতে শ্রীমন্দিরং মন্দিরং
মোক্ষদ্বার-চতুর্দশেশ্বর-সমং হংসেশ্বরী-রাজিতং
ভূপালেন নৃসিংহদেবকৃতিনারব্ধং তদাজ্ঞানুগা
তৎপত্নী গুরুপাদপদ্মনিরতা শ্রীশঙ্করী নির্মমে ।।

শকাব্দা ১৭৩৬।

মূল মন্দিরটি ২১ মিটার লম্বা এবং এতে ১৩টি মিনার আছে। প্রতিটি মিনারের মাথা এক একটি পদ্মকুঁড়ির আকারে তৈরি। মন্দিরটি পাঁচতলা। প্রতিটি তলা তন্ত্রমতের এক একটি মূল স্নায়ুকে রিপ্রেজেন্ট করে – ইড়া, পিঙ্গলা, বজ্রাক্ষ, সুষুম্না এবং চিত্রিনী। মূল মিনারের একদম ওপরে আছেন মহাযোগী মহাদেব। মা হংসেশ্বরী দেবীর মূর্তি আছে নীচে (গ্রাউন্ড ফ্লোর-এ), এখানে শায়িত মহাদেবের নাভি থেকে নির্গত মৃনাল দন্ডে প্রস্ফুটিত সহস্রদল পদ্মের ওপর ললিতাসনে বসে আছেন নীলবর্না চতুর্ভুজা দেবী। তাঁর বাম হাতে খড়গ, নীচে নরমুন্ড, আর দুই ডান হাতে অভয়মুদ্রা ও শঙ্খ, মায়ের মূর্তি তৈরি হয়েছে নিম কাঠ দিয়ে। তন্ত্রমতে, প্রাণায়ামের সময়ে শ্বাস ছাড়ার মুহূর্তে “হং …” বলে একটি নাদ নির্গত হয়। তেমনি শ্বাস নেবার সময়ে “স …” করে একটি আওয়াজ হয়। এই দুয়ের সংযুক্তিতেই হং-স। মহাদেব এবং দেবীমূর্তির সংযোজনে এই মুর্তির নাম হংসেশ্বরী, বলা যায় শিব এবং শক্তির দুয়েরই পুজা হচ্ছে এখানে। আর এই মূর্তির কোন বিসর্জন নেই, সেই রানী শঙ্করীর আমল থেকেই পুজা হয়ে আসছে।

হংসেশ্বরী মন্দির খোলা থাকে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০মি এবং বিকাল ৪টা থেকে ৬টা ৩০ মি. পর্যন্ত। মন্দিরে নিত্যপূজা ছাড়াও বিভিন্ন উৎসবে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে অন্নভোগ প্রসাদের জন্য সকাল ১০টার মধ্যে সামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে কুপন সংগ্রহ করতে হবে।

মন্দিরটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মণ্ডল দ্বারা সংরক্ষিত।

যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন
১) 97055872@N03/albums/with/72157639681616926" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums/with/72157639681616926
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/

মাটি পুড়িয়ে হল সোনা, আর তাই দিয়ে গাঁথা অতীত বঙ্গের সোনার ইতিহাস, আর এই ইতিহাসের একটুকরো বংশবাটী তথা আজকের বাঁশবেড়িয়াতেও ...
28/08/2017

মাটি পুড়িয়ে হল সোনা, আর তাই দিয়ে গাঁথা অতীত বঙ্গের সোনার ইতিহাস, আর এই ইতিহাসের একটুকরো বংশবাটী তথা আজকের বাঁশবেড়িয়াতেও আছে, হ্যাঁ আমি অনন্ত বাসুদেব মন্দিরের কথা বলছি।

আগেই বলেছি রাজা রামেশ্বর রায়ের হাত ধরেই বংশবাটী প্রভূত শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। তিনি নিজ উদ্যোগে বঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে বিবিধ কাজে পটু কায়স্থ, ব্রাহ্মণ, বৈদ্যদের এই স্থানে এনে বসবাসের ব্যাবস্থা করে দেন। এছাড়া সেই সময় বর্গী আক্রমন প্রতিহত করার জন্যে যুদ্ধে পারদর্শী হিন্দু ও পাঠান সৈন্যদেরও বসবাসের ব্যাবস্থা করে দেন। রাজা রামেশ্বর রায় বিদ্যানুরাগীয়ও ছিলেন তাই তিনি বারাণসী থেকে ন্যায়, সাংখ্য ও দর্শনশাস্ত্রে পারদর্শী বহু পণ্ডিতকে এনে তাঁদের সাহায্যে বংশবাটীতে প্রায় ৬০টি চতুষ্পাঠী স্থাপন করেন।

তৎকালীন বঙ্গে নানা কারণে বিশৃঙ্খলা ছিল, সেই অবস্থার সুযোগ নিয়ে বেশ কিছু স্থানীয় জমিদারগণ প্রাপ্য রাজস্ব যথা সময়ে মোগল রাজদরবারে জমা দিতেন না। রাজা রামেশ্বর রায় সুযোগ বুঝে সেইসব জমিদারদের বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে তাঁদের জমিদারী হস্তগত করেন এবং যথাসময়ে মোগল রাজদরবারে রাজস্ব প্রেরণ করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব হিন্দু বিদ্বেষী হলেও রাজা রামেশ্বরের এই কাজে খুবই প্রীত হন এবং পুরস্কার স্বরুপ ১৬৭৩ খৃষ্টাব্দে "পঞ্চপর্চা খিলাত সহ রাজা-মহাশয়" এই উপাধিতে তাঁকে পুরস্কৃত করেন এবং এই রাজ উপাধি পুরুষানুক্রমে ব্যবহার করার জন্য আর একখানি সনদ দ্বারা বংশবাটী গ্রামে ৪০১ বিঘা ভূমি নিষ্কর জায়গীর রুপে ও ১২টি পরগণা তিনি জমিদারী স্বরূপ তাঁকে দান করেন।

রাজা রামেশ্বর পরম বৈষ্ণব ছিলেন এবং ১৬০১ শকাব্দে (ইংরাজি ১৬৭৯ খৃষ্টাব্দে)বংশবাটীতে একটি বিষ্ণুমন্দির তৈরি করান। উঁচু ভিত্তিবেদির উপর প্রতিষ্ঠিত ইঁটের তৈরী মন্দিরটি একরত্ন শ্রেণীর। এই মন্দিরের পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তরদিকে তিনটি করে খিলান আছে। মন্দিরের শিখর রত্নটি আটকোণা, চারকোণা মন্দিরের গর্ভগৃহের তিনদিকে অলিন্দ। মন্দিরটির পূর্বদিকে প্রবেশদ্বার, দক্ষিণদিকে আর একটি প্রবেশদ্বার আছে, এছাড়া উত্তরদিকের প্রবেশদ্বারটি ভরাট করা। মন্দিরটির গঠনশৈলী ও বাইরের তিন দিকের (পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর) দেওয়ালে, বিশেষ করে পূর্বদিকের দেওয়ালে অজানা শিল্পীদের মূল্যবান টেরাকোটা-অলংকরণে-সমৃদ্ধ ভাস্কর্য আজও অগণিত দর্শনার্থীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে তোলে। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটায় দক্ষযজ্ঞ, যজ্ঞের অনুষ্ঠান, নৌযুদ্ধ, হরধনু ভঙ্গ, দশাবতার, নৃত্যরতা নর্তকীর নৃত্যের মুদ্রা, মৃদঙ্গ বাদকের বাদন-ভঙ্গিমা প্রভৃতি দৈনন্দিন জীবনযাপনের ছবি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। এই মন্দিরের সামনের দিকের ভিত্তিবেদির গায়ে একটি প্রস্তর-ফলকে খোদিত প্রতিষ্ঠা-লিপি দেখতে পাওয়া যায়।

"মহীব্যোমাঙ্গশীতাংশুগণিতেশকবৎসরে।
শ্রীরামেশ্বরদত্তেন নির্মমে বিষ্ণুমন্দিরং।। ১৬০১ ।"

মহী = ১, ব্যোম = ০, অঙ্গ = ৬, শীতাংশু= চন্দ্র = ১ ধরে অঙ্কের বামাগতি নিয়মানুসারে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৬০১ শকাব্দ (ইং ১৬৭৯ খ্রীষ্টাব্দ, বাংলা ১০৮৬ সন)।

এই মন্দিরের কারুকার্য এত উচ্চ শ্রেণীর, শোনা যায় ১৯০২ খৃষ্টাব্দে বঙ্গের ছোটলাট স্যার জন উডবার্ন মন্দিরের ইঁটগুলিতে নানারকম কারুকার্য দেখে বলেছিলেন – “ অঙ্কিত ইঁটগুলি এত সুন্দর যে প্রত্যেকটির চিত্র সংগ্রহ করে দেওয়ালে টাঙালে গৃহের শোভা নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পাবে”। এছাড়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্দেশে প্রখ্যাত শিল্পী শ্রী নন্দলাল বসু এখানে প্রায় একমাস বসবাস করে মন্দিরের প্রতিটি দৃশ্য এঁকে নেন। দুঃখের কথা এই যে মন্দিরের সাবেক কষ্টিপাথরের নয়নাভিরাম বাসুদেব মূর্তিটি অনেক দিন আগে চুরি হয়ে যায়, যার কোনও খোঁজ এখনও মেলে নাই।

মন্দিরটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মণ্ডল দ্বারা সংরক্ষিত।

যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন
১) 97055872@N03/albums/with/72157639681616926" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums/with/72157639681616926
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/

অম্বিকা  কালনার  রাজবাড়ি  মন্দির  চত্বরের  উত্তর-পশ্চিম  কোণে  অবস্থিত  লালজী  মন্দির।  মন্দিরটি  পাঁচিল  দিয়ে  ঘেরা। এই...
27/08/2017

অম্বিকা কালনার রাজবাড়ি মন্দির চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত লালজী মন্দির। মন্দিরটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এই মন্দির ও সিদ্ধেশ্বরীর 'জোড়বাংলা' একই বছরে প্রতিষ্ঠিত। বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্রের মাতা রাজকুমারী ব্রজকিশোরী ১৬৬১ শকাব্দে (১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে) এই বিশাল মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, ইঁটের তৈরি, দক্ষিণমুখী, চারতলাবিশিষ্ট, লালজীর বিশাল পঁচিশরত্ন মন্দির আয়তন ও গাম্ভীর্যের দিক থেকে অসাধারণ। পশ্চিমবঙ্গে এই শৈলীর মন্দিরের সংখ্যা মাত্র পাঁচ। তার মধ্যে দুটি হুগলি জেলার সুখাড়িয়ার আনন্দময়ী কালীমন্দির ও বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর শ্রীধর মন্দির এবং বাকি তিনটি অম্বিকা কালনার কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির, লালজী মন্দির ও গোপালজীর মন্দির। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের কিছু পূর্বে রচিত দীনবন্ধু মিত্র তাঁর সুরধুনী কাব্যে (১ ম খণ্ড) এই মন্দিরে লালজী প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।

মন্দিরটির প্রথম তলের ছাদের চার কোণে যে খাঁজের সৃষ্টি হয়েছে তাতে তিনটি করে, দুটি চূড়া সমমাপে এগোনো, মাঝেরটা একটু পিছানো, মোট ১২ টি চূড়া স্থাপিত। তারপর বেড় কমিয়ে খানিকটা উপরে অষ্টকোণাকৃতি ২য় তল সৃষ্টি করা হয়েছে। তার ছাদে আটকোণে মোট ৮ টি চূড়া। এরপর বেড়ের উচ্চতা কমিয়ে ২য় তলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতায় ৩য় তল সৃষ্টি করা হয়েছে। তার চার কোণে ৪ টি এবং মাঝে একটি বড় চূড়া। অর্থাৎ চূড়াগুলির সজ্জা হচ্ছে ১২+৮+৪+১ । মোট চূড়ার সংখ্যা পঁচিশ এবং উপরের তলের চূড়া ধরে মোট চারতলা। এই চূড়াগুলি চারকোণা এবং তাদের ছাদ উঁচু-নিচু কার্নিসের বিন্যাসে কিছুটা পীড়া শিখরের অনুরূপ।

মন্দিরের সামনে সন্নিবদ্ধ রয়েছে একটি 'একবাংলা ' মণ্ডপ। মণ্ডপটির মাথায় লম্বা একটি মটকা বাঁধা যা গ্রাম বাংলার খোড়ো চালের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি পরিদর্শন কক্ষ বা 'জগমোহন' রূপে ব্যবহৃত হয়। তবে সাধারণ দর্শনার্থীদের এখানে উঠতে দেওয়া হয় না। এর সংলগ্ন ভূমির সমতল বেদিতে আর একটি পৃথক সুবৃহৎ চারচালাবিশিষ্ট নাটমন্দির সৃষ্টি করা হয়েছে। এর চালাগুলি সুন্দর সুন্দর ইমারতি থামের ওপর স্থাপিত। সাধারণ দর্শনার্থীরা এখান থেকেই বিগ্রহ দর্শন করেন।

মন্দিরের সামনে ত্রিখিলান অলিন্দ। পূর্ব ও পশ্চিম দিকেও ত্রিখিলান অলিন্দ। পশ্চিম দিকে কোন প্রবেশ পথ নেই। পূর্ব দিকে রয়েছে একটি প্রবেশ দ্বার। পূর্ব দিকের দরজা দিয়ে গর্ভগৃহে ঢুকতেই ডান দিকে রয়েছে সিঁড়ি যা দিয়ে মন্দিরের উপরে ওঠা যায়। পিছনেও ত্রিখিলান। দুটি জানলা। এ দিকেই আছে শয়নকক্ষ। জানলার মাথায় প্রতীক শিব মন্দিরের সজ্জা ও ফুলকারি কাজ। মন্দির প্রাঙ্গণের মূল প্রবেশদ্বারের মাথার উপরে আছে একটা ছোট একবাংলা।

মন্দিরের খিলান স্তম্ভগুলিতে, চারি দেওয়ালে রয়েছে অসংখ্য টেরাকোটার কাজ ও ফুলকারি নকশা। তবে এর বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে 'কল্পলতা' বা 'মৃত্যুলতা'কে দেওয়ালের কোণে বা গায়ে খাড়াভাবে লাগানোই প্রচলিত রীতি। এখানেও কোণের দুপাশে তা সমতলভাবে নিবদ্ধ এবং তা একতলার কার্নিস পর্যন্ত উঠে গেছে। ( 'কল্পলতা' হল উপর থেকে নিচে লতার মত কোণাচ। হাতি, সিংহ, লতা-পাতা অরণ্যের প্রতীক। এইভাবে মন্দির হয় অভীষ্ট ফলপ্রদ 'কল্পতরু'। আবার সমস্ত মায়ার মৃত্যু ঘটায় বলে একে 'মৃত্যুলতা'-ও বলা
মন্দির-দালানে দণ্ডায়মান অবস্থ্যায় রয়েছেন রাধাকৃষ্ণ। উচ্চতা যথাক্রমে ২ ফুট ও ১ ফুট ৬ ইঞ্চি। লালজী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে একটি কাহিনী আছে - একদিন মহারাজা কীর্তিচাঁদের মাতা ব্রজকিশোরী দেবী গঙ্গাস্নান সেরে উঠে ঘাটে দেখলেন, একজন বৈষ্ণব সাধক তার ভিক্ষালব্ধ অল্প চালের ভোগ দিচ্ছে লালজি কে। তখন রাজমাতা ব্রজকুমারী দেবী বললেন, ‘সামান্য এই ভোগের অন্নে লালজির কি পেট ভরবে? এক কাজ করো। আমি রাজমাতা। তুমি বরং লালজিকে দাও আমায়। আমি তোমায় কথাদিচ্ছি, পুরুষোত্তমে প্রভু জগন্নাথ দেবের মতো আমিও প্রতিদিন বাহান্নভোগ নিবেদন করব লালজিকে’। একথা শুনে হেসে সেই বৈষ্ণব সাধক বললেন - ’মা, ভোগ প্রাচুর্যে কি কখনও ভগবান তুষ্ট হন? কখনও এক মুঠি ভোগান্নে তুষ্ট হন তিনি, কখনও ইচ্ছে না হলে কিছুই গ্রহন করেন না তিনি। তবে ভক্তের নিবেদিত অন্তরের একান্ত আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ আকুতিভোগই যে গ্রহণ করেন তিনি”। যাইহোক, পড়ে কোন কারনে ওই বৈষ্ণব সাধক শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন বিগ্রহটি অর্পণ করেন রাজমাতা কে, সেই থেকে আজ ওই বিগ্রহ নিত্যসেবা আর পুজা পেয়ে আসছে। পরে অবশ্য শ্রী রাধিকার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে। তবে কালের নিয়মে আজ আর সেই ভোগপ্রাচুর্য নেই।

লালজি মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি নাটমণ্ডপ এবং আর একটি পর্বতাকৃতি মন্দির যা গিরিগোবর্ধন নামে পরিচিত, এই মন্দিরটি আনুমানিক ১৬৮০ শকাব্দে (১৭৫১ খ্রীষ্টাব্দে) নির্মিত হয়। এটি এক নতুন স্থাপত্যশৈলী। প্রচলিত চালা রীতিতে নির্মিত না হলেও এর চালের মধ্যে চালার সাদৃশ্য আছে। চাল বড় বড় শিলার আকারে তৈরি। মাঝে মাঝে নানা মূর্তি। এর সামনে কোন ঢাকা বারান্দা নেই। শ্রীকৃষ্ণের গিরিগোবর্ধন ধারণের প্রতীক স্বরূপ এর চাল নির্মিত।

(যারা আরও ছবি ও লেখা দেখতে চান তাঁরা নীচের লিঙ্কে দেখতে পারেন)
১) 97055872@N03/albums/with/72157639681616926" rel="ugc" target="_blank">https://www.flickr.com/photos/97055872@N03/albums/with/72157639681616926
২) http://indyaunrevealed.blogspot.in/

অম্বিকা  কালনার  রাজবাড়ি  মন্দির  চত্বরে  কৃষ্ণচন্দ্র  মন্দিরের  পিছনে  অবস্থিত  বিজয়  বৈদ্যনাথ  শিবমন্দির।  এই  মন্দিরট...
27/08/2017

অম্বিকা কালনার রাজবাড়ি মন্দির চত্বরে কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের পিছনে অবস্থিত বিজয় বৈদ্যনাথ শিবমন্দির। এই মন্দিরটি আলাদা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হলেও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের প্রবেশ-দ্বার পেরিয়ে এই মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। এই মন্দির প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরপ্রাঙ্গণে যাওয়া যায়। মন্দিরটিতে শ্বেতপাথরের ফলকে লিখিত একটি প্রতিষ্ঠাফলক রয়েছে, যা হয়তো নষ্ট হওয়া মূল প্রতিষ্ঠাফলকের পরিবর্তে সংস্থাপিত। এটির পাঠ নিম্নরূপঃ-

কুমার শ্রীমিত্রসেন-ধর্ম্মপত্নী শ্রিয়ান্বিতা।
লক্ষ্মীদেবী বৈদ্যনাথং সমরাধ্য সুতার্থিনী।। ১।।
ত্রিলোকচন্দ্রংতনয়ং লব্ধা দেব প্রসাদতঃ।
নির্ম্মায় মন্দিরমিদং কারুকার্য্যসুশোভিতম্।।২।।
বিজয়াদি বৈদ্যনাথনাম্নাত্র শিবলিঙ্গকম্।
মহেশ্বরস্য প্রীত্যর্থৎ স্থাপয়ামাস ভক্তিতঃ।।৩।।

অর্থাৎ, কুমার শ্রীমিত্রসেনের ধৰ্মপত্নী শ্রীযুক্তা লক্ষ্মীদেবী পুত্রার্থী হয়ে বৈদ্যনাথ শিবকে আরাধনা করে দেবানুগ্রহে ত্রিলোকচন্দ্র নামক পুত্র লাভ করেন। এরপর তিনি কারুকার্যখচিত এই মন্দির নির্মাণ করে বিজয়বৈদ্যনাথ নামক শিবলিঙ্গ মহাদেবের প্রীতির জন্য ভক্তিপূর্বক স্থাপন করলেন। এই কুমার মিত্রসেন ছিলেন রাজা চিত্রসেন রায়ের পিতৃব্য। ত্রিলোকচন্দের জননী বৈদ্যনাথকে আরাধনা করে ত্রিলোকচন্দ্রকে লাভ করেন। সেই ত্রিলোকচন্দ্র যখন রাজা হন তখন মানত পূরণের জন্য এই মন্দির নির্মিত হয়। যতদূর মনে হয়, কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির নির্মাণের সময়ই এই মন্দির নির্মিত হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির নির্মাণের সময় ১৭৫১ - ৫৫ খ্রীষ্টাব্দ।

মন্দিরটি উঁচু ভিত্তিবেদির উপর স্থাপিত, পূর্বমুখী, আটচালা মন্দির। এর আয়তন ১৯ ফুট ( ৫.৮ মি. ) × ২০ ফুট (৬ মি. -বারান্দাসহ )। উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট ( ৯ মি. )। গর্ভগৃহের সামনে তিনটি পত্রাকৃতি খিলানযুক্ত আবৃত অলিন্দ আছে। খিলান তিনটির উপরের চারপাশে আছে প্রতীক শিবালয় ও তার মধ্যে শিবলিঙ্গ। তোরণগুলির তিনটি খিলান ধারণের জন্য দুটি পূর্ণ স্তম্ভ ও দুটি অর্ধ স্তম্ভ রয়েছে। গর্ভগৃহে একটি মাত্র দরজা। মন্দিরটির সামনের দেওয়ালের দুপাশে ও উপরে দুই সারি কুলুঙ্গির মধ্যে অজস্র টেরাকোটা মূর্তি আছে। কিন্তু ত্রিখিলান প্রবেশ পথের উপরের পৃথক চার সারি ও তাদের সংযুক্ত অংশে পোড়ামাটির ফুল ছাড়া কোন মূর্তি নেই। ভিত্তিবেদি সংলগ্ন দেওয়ালেও পোড়ামাটির মূর্তি ফলক আছে। পোড়ামাটির কাজগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বীণাবাদনরতা পক্ষী-মানবী, নর্তকী, যুদ্ধযাত্রা, জমিদারের অন্যত্র গমন ও ফুলকারি নকশা ইত্যাদি। দুটি পূর্ণস্তম্ভের নিচের ও অন্যত্র অনেক জায়গার পোড়ামাটির কাজ নষ্ট হয়ে গেছে। মন্দিরের বাকি তিনটি দেওয়াল পলেস্তারা আবৃত।

মন্দিরের গর্ভগৃহে বিজয়বৈদ্যনাথ নামক কাল পাথরের শিবলিঙ্গ নিত্য পূজিত। শিবলিঙ্গের উচ্চতা আনুমানিক ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। মন্দিরটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ, কলকাতা মণ্ডল দ্বারা সংরক্ষিত।

Address

West Bangla
712101

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Ancient Temples of Bengal posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to Ancient Temples of Bengal:

Share

Category