19/06/2023
আপনার সদ্য আঠারো পেরুনো মেয়েটি একদিন এসে বলল, ‘মা, আমি বিয়ে করতে চাই’।
মেয়ে আপনার হিজাবি, পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে। কম বয়সে বিয়ে করে ফিতনা থেকে বাঁচতে চাইছে জেনে খুশি হলেন, আবার নিজ মুখে বিয়ের কথা বলায় একটু অবাকও হলেন। তারপরও মনে মনে ঠিক করলেন, ধার্মিক একটা ছেলে দেখে বিয়ে দেবেন। কিন্তু আপনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যখন মেয়ে বলল, ‘মা, আমি একজনকে ভালোবাসি।’
অন্য ছেলেমেয়েদের রিলেশনশিপের কথা কানে এলে আর দশটা বাবা-মায়ের মতো আপনিও বলেছেন, ‘আমার মেয়ে তো অমন না’, কিন্তু আজ? তবুও যে বিয়ে করবে তার পছন্দ-অপছন্দের একটা দাম আছে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে কী করে? ছবি আছে তোর কাছে? দেখি কেমন।’ আগেরকার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল, মেয়ের ভালোবাসার মানুষটির ছবি দেখে আপনার মনে হলো, ‘মাটি দু’ ফাঁক হয়ে যাক, আমি ভিতরে ঢুকে পড়ি’! ছবিতে দেখা যাচ্ছে, চেহারা মেয়েদের মতো তবে চুল ছোট করে কাটা, গোলাপি রঙ করা, পোশাক ছেলেদের মতো তবে এক কানে দুল, আবার কাজল দিয়েছে গাঢ় করে! আপনার মুখে তখন একটাই প্রশ্ন–এ ছেলে নাকি মেয়ে!
মনের প্রশ্ন মুখ ফুটে বেরুতেই আপনার মেয়ে উত্তর দিল, ‘ও বায়োলজিকালি মেয়ে কিন্তু নিজেকে নন-বাইনারি হিসেবে পরিচয় দেয়। তার কাছে নারী-পুরুষ পরিচয়ের চেয়ে মানুষ পরিচয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
আগামাথা না বুঝে থ মেরে রইলেন আপনি।
মেয়ে বলল, ‘তুমি LGBTQ বোঝ না?’
--
এই চিত্রটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কল্পিত হলেও অনেক পশ্চিমা দেখে মুসলিম পরিবারগুলোতে এরকম ঘটনা ঘটছে। LGBTQ শব্দটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যাপাক সমাদৃত একটি শব্দ হয়ে উঠছে দিন দিন। আমাদের দেশে এই শব্দটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত, কেউ বা নতুন নতুন শুনছেন। দিন দিন এর ব্যাপকতা চোখে পড়ছে আমাদের।
এক সময় মনে হতো যারা জানে না তাদেরকে এই বিষয়ে জানানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু এখন এমন এক পর্যায়ে এসে গেছি যখন অ্যাপল, অ্যামাজন, ফেইসবুক, ইউনিলিভার, জুম, মাইক্রোসফটসহ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিজেদের লোগোতে রংধনু ব্যবহার করার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো ভাবে LGBTQ’য়ের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছে। সিনেমা-নাটকের মাধ্যমে তো বটেই, বাচ্চাদের স্কুলের পাঠ্যবই ব্যবহার করেও এসব নষ্টামি গেলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাই এখন ‘Ignorance is bliss’ বলার সুযোগ নেই। বরং জানতে হবে।
বিশেষ করে চলমান জুন মাস এসব নিয়ে কথা বলার জন্য, জানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। জুন মাসকে LGBTQ প্রচারকারীরা ‘প্রাইড মান্থ’ ঘোষণা করে, যত প্রকার মাধ্যম সম্ভব–সব মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব প্রচার করে বেড়ায়। তাদের প্রচারণায় অনেককিছুই থাকে ফাঁকাবুলি এবং অসত্য কথাবার্তা। বেশিভাগ সময়ই তারা ব্যক্তিস্বাধীনতা, অন্যের ক্ষতি না করে নিজে সুখে থাকা, যে যেভাবে সুখে থাকে তাকে সেভাবে থাকতে দেওয়ার মতো ক্লিশে কথাবার্তা ব্যবহার করে। তাদের হাতসাফাই অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়। ধোঁকায় পড়ে অনেকের মনে তাদের প্রতি সহানুভূতি জন্মে। তাই আমাদের প্রথমে LGBTQ শব্দটি সম্পর্কে জানা দরকার।
LGBTQ শব্দটি তৈরি হয়েছে Le***an, Gay, Bisexual, Transgender, Q***r, শব্দগুলোর প্রথম অক্ষর নিয়ে। এখন এই শব্দগুলোর মানে জেনে নেওয়া যাক।
লেসবিয়ান (Le***an) : যে নারী যৌন-শারীরিক সম্পর্ক বা রোমান্টিক রিলেশনশিপের ক্ষেত্রে বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি বা কোনো পুরুষের প্রতি আকর্ষিত না হয়ে নারীর প্রতি আকর্ষিত হয়। অর্থাৎ নারী সমকামী।
গে (Gay) : পুরুষ সমকামী। অর্থাৎ যে পুরুষ যৌনতার ক্ষেত্রে বা রোমান্টিক রিলেশনশিপের ক্ষেত্রে পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।
বাইসেক্সুয়াল (Bisexual) বা উভকামী: যে ব্যক্তি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে যৌন আকর্ষণ বোধ করে।
ট্র্যান্সজেন্ডার (Transgender) বা রূপান্তরকামী : শারীরিকভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক কোনও ব্যক্তি যখন মনে করে সে “ভুল” লিঙ্গের কারও দেহে আটকা পড়ে আছে! জ্বি, ঠিকই পড়েছেন। শারীরিকভাবে সুস্থ, ছেলে হিসেবে জন্মানো কোনো ছেলের যদি মনে হয় সে আসলে একটা মেয়ে তাহলে তাকে বলা হয় ট্র্যান্সগার্ল/ট্র্যান্সওম্যান। আর আগাগোড়া নারী হিসেবে জন্মানো কোনো মেয়ে যদি মনে করে সে আসলে একজন ছেলে তাহলে তাকে বলা হয় ট্রান্সবয়/ ট্র্যান্সম্যান।
কুইয়ার (Q***r) : কুইয়ার বলতে এমন ব্যক্তিদের বুঝায় যারা হেটারোসেক্সুয়াল (heterosexual) না, অথবা যারা নিজেকে শুধু নারী বা শুধু পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিতে আগ্রহী নয়, তারা যেকোনও কিছু হতে পারে!
এবং এই চার-পাঁচটি ধরণ ছাড়াও তারা আরও অনেকগুলো টার্ম এবং সেসবের প্রথম অক্ষর ব্যবহার করে যেমন INTERSEX, Asexual, QUESTIONING, NONBINARY ইত্যাদি ইত্যাদি; তখন হয় LGBTQIAQN। একেক সংস্থা নিজেদের মতো নতুন নতুন টার্ম জোড়া লাগায়, কারণ তাদের কাছে লিঙ্গ (Gender) কেবল নারী-পুরুষ–এই দুই প্রকার না, বরং তাদের কারও কারও মতে জেন্ডার ৩৪ প্রকার! কারও মতে ৮১ প্রকার! কারও কারও মতে সংখ্যাটা আরও বেশি! সেজন্য সাধারণত LGBT’র পরে বাকিগুলো না বলে LGBT+ বা LGBTQ+ বলা হয়ে থাকে।
যা হোক, LGBTQ’য়ের মধ্যে থাকা সংজ্ঞাগুলো থেকে আপনি কী বুঝলেন?
একজন মুসলিম এসবকে কোন চোখে দেখবে? অবশ্যই স্পষ্ট ফাহিশা হিসেবে দেখবে। ইসলামি শরীয়াহতে মানুষের জেন্ডার দুই প্রকার–পুরুষ ও নারী। যৌনতার সম্পর্ক হবে বিষমকামী বা হেটারোসেক্সুয়াল অর্থাৎ নারী ও পুরুষ বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষিত হবে, সমলিঙ্গের কারও প্রতি নয়। তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে বিয়ের ওপর ভিত্তি করে, বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা যিনা, সমকামিতা এসব ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কিন্তু এই LGBT+ সমর্থক ব্যক্তিরা চায় এসব লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ইত্যাদি বিকৃত মানসিকতার লোকগুলোকে সমাজের আর দশটা স্বাভাবিক রূচিসম্পন্ন মানুষকে মতো সম্মান করা হোক। শুধু সম্মানই না, তাদের সাথে এমন আচরণ করা হোক যেন তারা গৌরবের কিছু করে ফেলেছে! অথচ তাদের কাজকর্ম কিন্তু পুরোই অভিশপ্ত এবং মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। স্বাভাবিক পারিবারিক এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য LGBT’র নোংরামি ক্যান্সারের মতো ভয়ংকর। তাদের অনেকে বিয়ের কথা বলে। তাদের বিয়েকে নাকি স্বীকৃতি দিতে হবে! অথচ বিয়ে কেবল দু’জন মানুষের পরিবার হিসেবে থাকার চুক্তি নয়, ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী বিয়ে জায়েজ হওয়ার জন্য বিভিন্ন শর্ত প্রযোজ্য, যেগুলো LGBT লোকজন পূরণ করতে সক্ষম নয়।
অশ্লীলতার ব্যাপক প্রসার পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনে। বিশেষ করে বিবাহবহির্ভূত এবং অবাধ যৌনতা বিভিন্ন মহামারী ও রোগের বৃদ্ধি ঘটায়। আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন :
‘হে মুহাজিরগণ, এমন পাঁচটি জিনিস আছে, যখন তোমরা (মুসলিমরা) সেগুলোতে লিপ্ত হবে তখন এই শাস্তিগুলো তোমাদের উপর আপতিত হবে। এবং আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই যাতে তোমাদের (সাহাবাদের) জীবদ্দশায় তোমরা সেগুলো না দেখ।’
এই পাঁচটি জিনিসের একটি সম্পর্কে হাদিসে এসেছে :
‘যখন কোনো জাতির মধ্যে এই পরিমাণে চরিত্রহীনতা (যিনা, পায়ুকাম, ইত্যাদি) দেখা দেয় যে তারা প্রকাশ্যে সেগুলো ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়, তখন এমন সব মহামারী এবং রোগ-ব্যাধি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে যেগুলো তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না।’ [ ইবনে মাজাহ, ৪০১৯]
আজকে এইডস, মাংকিপক্স, সিফিলিসের মতো যৌন বাহিত রোগগুলির এত প্রকোপ যেন হাদিসের সত্যতা জানান দিচ্ছে। মানকিপক্স ছড়ানোর এবং আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় বেশি থাকে সমকামীরা। কুখ্যাত মরণব্যাধি এইডস ছড়ানোর পিছনেও সমকামীরা দায়ী। হ্যাঁ, অন্য ব্যাভিচারীদের মাঝেও এসব রোগ কম নয়। তবে যিনা সম্পর্কে তো আমরা মোটামুটি সবাই জানি, তাই এখন কেবল সমকামিতা এবং অন্যান্য বিকৃত যৌনতার কথা বলছি।
পৃথিবীতে সমকামিতার মতো ঘৃণিত আচরণের সূচনা ঘটে নবি লূত আলাইহিস সালামের জাতির মাধ্যমে। নবি লূত (আলাইহিস সালাম) সেই পাপিষ্ঠ জাতিকে সতর্ক করলেও তারা তাদের নবির কথা অগ্রাহ্য করেছে। এমনকি নবি লূত আলাইহিস সালামের বাসায় পুরুষ আকৃতি নিয়ে যেসব ফেরেশতা মেহমান হিসেবে এসেছিলেন, তাঁদের দিকেও সেই বিকৃত মানসিকতার লোকেরা নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য হাত বাড়াতে চেয়েছিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সেই নিকৃষ্ট লোকগুলোকে সমূলে ধ্বংস করে দেন। কুরআনে এসেছে :
‘এবং স্মরণ করো লূতের কথা, যখন সে তার জাতিকে বলল, “তোমরা কি এমন পাপাচারে লিপ্ত হও যা তোমাদের পূর্বে অন্য কোনো জাতি করেনি? নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের কামনাকে নারীদের পরিবর্তে পুরুষদের দিকে পরিচালিত কর – তোমরা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” কিন্তু তার জাতির একটি কথাই বলেছিল, “এই এলাকা থেকে এদের (লূতের পরিবারকে) তাড়িয়ে দাও, কারণ এরা বেশি পবিত্র থাকতে চায়।” সুতরাং আমি তাকে এবং তার পরিবারকে রক্ষা করলাম, তার স্ত্রীকে ব্যতিত – সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের একজন ছিল। এবং আমি তাদের উপর (পাথরের) বৃষ্টি প্রেরণ করলাম। অতএব, দেখ অপরাধীদের কী পরিণতি হয়েছিল।’ [আল-আরাফ ৭: ৮০-৮৪]
সমকামিতা সেই সমস্ত কবিরাহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো আল্লাহর আভিশাপ ডেকে আনে। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, আল্লাহর নবি ﷺ বলেছেন:
‘অভিশপ্ত সে যে তার পিতাকে অভিশাপ দেয়। অভিশপ্ত সে যে তার মাকে অভিশাপ দেয়। অভিশপ্ত সে যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কুরবানি করে। অভিশপ্ত সে যে অন্যায়ভাবে জমি দখল করার জন্য জমির চিহ্ন বদলে দেয়। অভিশপ্ত সে যে একজন অন্ধ লোককে ভুল দিকে নিয়ে যায়। অভিশপ্ত সে যে কোন পশুর সাথে সহবাস করে, অভিশপ্ত সে যে লূত আলাইহি সালামের জাতির মতো কাজ করে।’ [আহমাদ ১৮৭৮]
ইসলামি আইনের অধীনে, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, নবিজী ﷺ বলেছেন:
‘যে লুত আলাইহিস সালাম এর জাতির মতো কাজ করে তাকে হত্য| কর এবং যার সাথে এটা করা হয় তাকেও।’ [ আবু দাউদ ৪৪৬২, আত-তিরমিযি ১৪৫৬]
সূরা আরাফের ৮০-৮৪ আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা লূত আলাইহিস সালামের পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন কিন্তু তাঁর স্ত্রীকে রক্ষা করেননি। কেন?
কারণ সেই মহিলা নিজে সমকামী ছিল না বটে, সে সমকামীদের সমর্থন করত। সুতরাং মুসলিমদের মধ্যে সমকামীদের জন্য কোনো সহানুভূতি থাকার প্রশ্নই আসে না। বরং আমাদের হতে হবে নবি লূত (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর অনুসারী সেইসব লোকেদের মতো, যাঁরা তখন সংখ্যালঘিষ্ঠ হয়েও চরিত্রহীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, নিজেদের পবিত্র রেখেছিলেন। নয়তো আল্লাহর আজাব থেকে আমরাও রেহাই পাব না।
_________________
|| নিষিদ্ধ ভালোবাসা ||
রৌদ্রময়ী টিম
#রৌদ্রময়ী