07/07/2024
একটা শব্দ কমও না, বেশীও না। ঠিক যতটুকু না বললেই না, স্বল্প কথায় ঠিক ততটুকু শব্দচয়নে মনের ভাব প্রকাশ করার বাগ্মীতাকেই আরবি বালাগাতের পরিভাষায় الإعجاز (Brevity) বা সংক্ষিপ্তকরণ বলা হয়।
পৃথিবীর সব ভাষার সাহিত্যেই brevity বা সংক্ষিপ্ত বাক্যালংকারের ব্যবহার আছে; বিশেষ করে কবিতায়।
কিন্তু মহিমান্বিত কুরআনের الإعجاز এতটাই অসাধারণ যে, প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে তা অবিশ্বাসীদের জন্য একটা অসাধ্য অনতিক্রম্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। যা আজ পর্যন্ত কেউই মোকাবেলা করতে পারেনি। এ এক অশ্রুতপূর্ব মিরাকল, অনন্যসাধারণ আয়াত বা নিদর্শন।
কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো শুধু শব্দ না। প্রতিটি শব্দই একেকটি ইতিহাস। একই সাথে ছন্দময়, আবার মানবজাতির পথপ্রদর্শকও বটে।
পড়তে পড়তে একসময় মনে হবে, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি হ'রফ, প্রতিটি হরকত যেন গুনে গুনে হিসেব করে চয়ন করা হয়েছে।
আবু লাহাবের স্ত্রী, উম্মে জামিল, পুরো নাম আরওয়া বিনতে হারব বিন উমাইয়্যাহ। অর্থ বিত্ত, শান-শওকত আর সামাজিক অবস্থান বিবেচনায়, উম্মাইয়্যাহ বংশের রাজকন্যা বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। একদিকে ক্বুরাঈশ নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারব বিন উম্মাইয়ার বোন। অন্যদিকে বনু হাশীম গোত্রের আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আবু লাহাবের স্ত্রী।
সমাজে তার আরও একটা পরিচিতি ছিল। তিনি ছিলেন নিন্দুক স্বভাবের স্বভাবজাত বাগ্মী কবি। তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের নামে কুৎসা রটিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক স্যাটায়ার কবিতা রচনা করে ফেলতে পারতেন তিনি।
"মুহাম্মদ" মানে "অধিক প্রশংসিত"। অথচ কটাক্ষ করে উম্মে জামিল তার কবিতায় আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদকে ﷺ সম্বোধন করতেন "মুযাম্মাম" নামে, অর্থাৎ "অধিক নিন্দনীয়" বলে। না'উজুবিল্লাহ মিন জালিক। আমাদের যামানাতেও এমন কিছু কিছু উম্মে জামিলের দেখা পাই আমরা। দু'আ করি, উম্মে জামিলের মত তাদেরও ঠাঁই হোক জাহান্নামের গহীন অতলে।
সমাজে যার এমন খ্যাতি, এমন প্রভাব প্রতিপত্তি, উম্মাইয়্যা বংশের সেই রাজকন্যাকে কেমন করে আসমান থেকে যমীনে নামিয়ে আনা যায়? কেমন করে "এক কথায়" তার আকাশছোঁয়া সামাজিক অবস্থানকে ধূলিস্যাৎ করে দেওয়া যায়?
আল্লাহ সুবহা'নাহু ওয়াতাআ'লা শুধুমাত্র দুটো শব্দ ব্যবহার করলেন, "حَمَّالَةَ ٱلْحَطَبِ - হাম্মালাতাল হাত্বব" - ইন্ধনকাঠ বহনকারী।
ব্যাস, এই দুটো শব্দেই আল্লাহ রব্বুল আ'লামীন সবকিছু তছনছ করে দিলেন। দুটো শব্দেই জানিয়ে দিলেন, কেমন ছিলেন আবু লাহাবের স্ত্রী, আর কি ছিল তার পরিণতি।
আরবি ভাষায় "حاملة - হা'-মিলাহ" মানে গর্ভবতী নারী, যা উদ্ভুত হয়েছে ক্রিয়াপদ "حمل - হামালা" থেকে, যার অর্থ বহন করা। "حَمَّالَة - হাম্মালাহ" তারই অতিরঞ্জিত (Hyperbole) বা আধিক্যবাচক রূপ।
যখন কেউ কোন কাজ বারবার করে, অধিক পরিমানে করে, এবং সেটা তার পেশায় পরিণত হয়, তখন আরবি ভাষায় "فعّال - ফাঃআল" প্যাটার্নের এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন, রস্সাম (অঙ্কন শিল্পী), নাজ্জার (ছুতারমিস্ত্রী), খব্বাজ (রুটিওয়ালা), ইত্যাদি। আর শেষে গোল তা (ة) যোগ করলে, সেটা স্ত্রী বাচক বুঝায়।
তো "حمّال - হাম্মাল" হচ্ছে অধিক বহনকারী পুরুষ, আর "حمّالة - হাম্মালাহ" হচ্ছে অধিক বহনকারী নারী। সেই হিসাবে "حَمَّالَةَ ٱلْحَطَبِ - হাম্মালাতাল হাত্বব" হচ্ছে জ্বালানি কাঠ বহনকারী।
কিন্তু উমাইয়্যাহ বংশের রাজকন্যা কেন জ্বালানি কাঠ বহন করতে যাবেন? সেই সমাজে কারা জ্বালানি কাঠ বহন করতো? দাসদাসীরা।
ব্যাস, ঐ এক কথাতেই আল্লাহ রব্বুল আ'লামীন উম্মে জামিল অর্থাৎ আবু লাহাবের স্ত্রীর সকল সামাজিক মর্যাদা ধূলিস্যাৎ করে দাসদাসীদের কাতারে নিয়ে আসলেন। সুবহা'নাল্লাহ!
কিন্তু কাহিনি এখানেই শেষ নয়। মনে আছে, "হামিলাহ" মানে গর্ভবতী নারী। আর আবু লাহাবের স্ত্রীর চরিত্র যেন কেমন ছিল? তিনি ছিলেন চুগলখোর নারী। এর কুৎসা ওর কাছে, ওর কুৎসা এর কাছে রটনা করাই ছিল তার স্বভাব। আর নিন্দা মানুষের অন্তরে আগুন জ্বেলে দেয়। সেই অর্থেও, "حَمَّالَةَ ٱلْحَطَبِ - হাম্মালাতাল হাত্বব" - যথোপযুক্ত অর্থ প্রদান করে। দৃশ্যপটটা এমন, যেন তিনি তার গর্বে আগুন (অন্যের কুৎসা) বহন করে বেড়াচ্ছেন, আর লোকেদের অন্তরে সেই আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
একইসাথে "حَمَّالَةَ ٱلْحَطَبِ - হাম্মালাতাল হাত্বব" তার চুড়ান্ত পরিনতির অগ্রীম বার্তাও বহন করেছে। তাকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, তিনি নিজেই হবেন জাহান্নামের প্রজ্জলিত আগুনের ইন্ধনকাঠ। কীভাবে?
{سَيَصْلَىٰ نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ
وَٱمْرَأَتُهُۥ حَمَّالَةَ ٱلْحَطَبِ}
এখানে سَيَصْلَىٰ শব্দটি سيدخل (সাইয়াদখুলু) - "অতিশীঘ্রই সে প্রবেশ করবে" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
অর্থাৎ "অতি শীঘ্রই সে (আবু লাহাব) প্রজ্জ্বলিত লেলিহান শিখার আগুনে প্রবেশ করবে। আর তার স্ত্রীও, জ্বালানি কাঠ বহনকারী।"
মজার ব্যবহার হলো, سَيَصْلَىٰ শব্দটির আরেকটি অর্থ হলো "উত্তপ্ত করা"। সেই অর্থে আয়াত দুটোর অর্থ অনেক এমন, "অতি শীঘ্রই সে (আবু লাহাব) জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিশিখাকে উত্তপ্ত করবে। আর তার স্ত্রীও, (যে নিজেই) জ্বালানি কাঠ বহনকারী।"
অর্থাৎ তারা যে জ্বালানী কাঠ বহন করছে, তাদের মন্দ কর্ম, এই জ্বালানী কাঠ একদিন তাদেরকেই জাহান্নামের ইন্ধনে পরিনত করবে। তারাই হবে জাহান্নামের জ্বালানী কাঠ, তাদের ঠাঁই হবে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে।
সুবহা'নাল্লাহ! এবার বলেন brevity কাকে বলে?
পারলে অবিশ্বাসীদের কেউ এক শব্দে এত কাহিনী বর্ণনা করে দেখাক! এক কথায় কারও সামাজিক মর্যাদা ধূলিস্যাৎ করে দেখাক। তার চরিত্র বর্ননা করে একই সাথে তার শাস্তি আর শেষ পরিনতি বর্ণনা করে দেখাক!
জানতে চান আবু লাহাবের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
সীরাত ইবনে হিশামে বর্ণিত আছে, এই সুরাহ নাযিল হবার পরে আবু লাহাবের স্ত্রী রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে আমাদের প্রিয় রসূলকে পাথর মারার উদ্দেশ্য তাকে খুঁজতে বের হন।
সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বকর রদিয়াল্লহু আ'নহু তাকে ছুটে আসতে দেখে ঝামেলা এড়ানোর প্রিয় রসুলকে বলেন, "আল্লাহর রসূল, কেননা আপনি এখান থেকে সরে যান, যাতে সে আপনার ক্ষতি করতে না পারে।" আল্লাহর রসূল প্রিয় বন্ধুকে আশ্বস্ত করে বললেন, "আমার আর তার মাঝে একটা পর্দা থাকবে" - অর্থাৎ ভয় পেও না, সে আমাকে দেখতে পাবে না।
আবু লাহাবের স্ত্রী এসে আবু বকরকে বললেন, "আবু বকর, তোমার সাথী নাকি আমাদেরকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করেছে?" জবাবে আবু বকর বলেন, "এই ঘরের (ক্বাবার) রব্বের ক্বসম, তিনি (আল্লাহর রসূল) কাব্য করেননি, তিনি কবিতা আবৃত্তি করেন না।" শুনে আবু লাহাবের স্ত্রী বললেন, "তুমিতো সত্যই বলেছো"।
সীরাত ইবনে হিসামে আছে, অতঃপ্র রেগেমেগে আবু লাহাবের স্ত্রী ব্যঙ্গ করে আবৃত্তি করেন,
مُذَمَّمًا أَبَيْنَا وَدِينَهُ ... ... قَلَيْنَا وَأَمْرَهُ عَصَيْنَا
আমরা মুযাম্মামকে (অধিক নিন্দিতকে) অমান্য করছি
তার ধর্ম প্রত্যাখ্যান করছি, তার আদেশের তীব্র বিরোধিতা করছি।
[হাহ হাহ হাহ! 😀 কিরে নোমান জ্বলে? জ্বলে নাকি?]
এই বলে গটগট করে আবু লাহাবের স্ত্রী সেখান থেকে চলে গেলে আবু বকর আল্লাহর রসূলকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তিনি আপনাকে দেখতে পাননি?" জবাবে আল্লাহর রসূল বললেন, "না, সে চলে যাওয়া পর্যন্ত একজন ফেরেস্তা আমাকে আড়াল করে রেখেছিল।" [সুত্র: মুসনাদ আল-বাযযার]
যত পড়ি ততই বিস্মিত হই। কী এক অসাধারণ গ্রন্থ, কী অসাধারণ তার শব্দের গাঁথুনি। কোন রকম অসংগতি নাই। এক বিন্দুও না।
অথচ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে? সুবহা'নাল্লাহ!
#তবুও_কি_ফিকির_করবেন_না