04/06/2026
১৯৭৪ সালের ৫ জুন। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে হয়তো এটি একটি সাধারণ দিন কিন্তু ইলম আদর্শ ও সংগ্রামের ইতিহাসে এটি এক অনন্য সূচনার দিন।কায়েদে উলামা খলিফায়ে মাদানি হযরত মাওলানা আব্দুল করীম শাইখে কৌড়িয়া রহ 'র নির্দেশনায় মুজাহিদে মিল্লাত প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবিবুর রহমান রাহিমাহুল্লাহ যে চারা রোপণ করেছিলেন আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে..
জামেয়ার ইতিহাস মূলত এর প্রতিষ্ঠাতার ইতিহাসেরই একটি বিস্তৃত রূপ। প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবিবুর রহমান রাহিমাহুল্লাহ। একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন। ছিলেন দূরদর্শী মুরব্বি, চিন্তানায়ক, লেখক, বক্তা এবং দীনি আন্দোলনের বলিষ্ঠ সিপাহসালার। তার অক্লান্ত শ্রম, অশ্রুসিক্ত দোয়া, নিরবচ্ছিন্ন ফিকির এবং কলম-যবানের তেজস্বী সংগ্রামের এক শৈল্পিক প্রতিচ্ছবি হলো জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজির বাজার।
যে মানুষটি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উম্মাহর কল্যাণ দ্বীনের হেফাজত এবং ইলমের প্রসারের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন সে হাতেই গড়ে উঠেছিল এই প্রতিষ্ঠান। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী, সাহস ছিল আপসহীন, আর ঈমানি দৃঢ়তা ছিল পাহাড়সম অটল। তাই জামেয়ার প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ যেন আজও প্রতিষ্ঠাতার সেই জ্বলন্ত প্রেরণার সাক্ষ্য বহন করে।
জামেয়া কেবল শিক্ষাদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান নয়। এটি আদর্শ নির্মাণের কারখানা, নেতৃত্ব তৈরির পাঠশালা এবং দীনি চেতনা জাগ্রত রাখার এক শক্তিশালী দুর্গ। দেশের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে আকাবির ও আসলাফের আদর্শ রক্ষা, বাতিল মতবাদের মোকাবিলা এবং ঈমান-আকিদা সংরক্ষণের সংগ্রামে জামেয়ার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমরণ।
বিশেষত নাস্তিক্যবাদ, ধর্মবিদ্বেষ ও মুরতাদ প্রবণতার বিরুদ্ধে যে গণসচেতনতা ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। তার অন্যতম অগ্রসৈনিক ছিলেন প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবিবুর রহমান রাহিমাহুল্লাহ। তার সেই সংগ্রামী চেতনা আজও জামেয়ার শিরা উপশিরায় প্রবাহিত। জামেয়া কেবল তার প্রতিষ্ঠিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় তার চিন্তা, দর্শন, মেহনত এবং সংগ্রামী মানসিকতার জীবন্ত উত্তরাধিকার।
গত ৫২ বছরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য আলেম, খতিব, শিক্ষক, মুফতি, দায়ী ও সমাজসেবক তৈরি হয়েছেন। দেশের আনাচে-কানাচে, এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়েও তাদের দীনি খেদমতের ছাপ দৃশ্যমান। জামেয়ার শ্রেণিকক্ষ, মসজিদ, লাইব্রেরি এবং উস্তাযদের সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা প্রজন্ম আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইসলামের শিক্ষা ও নৈতিকতার বার্তা পৌছে দিচ্ছে।
একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার বিল্ডিং আর ইমারত নয় তার নৈতিকতার সবক গ্রহনকারী মানুষের মধ্যে। এই দীর্ঘ যাত্রায় যারা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, শিক্ষা দান করেছেন, আর্থিক ও নৈতিক সহযোগিতা করেছেন কিংবা নীরবে কোনো দায়িত্ব পালন করেছেন সকলেই এই ইতিহাসের অংশ। তাদের ত্যাগ, শ্রম ও আন্তরিকতা ছাড়া এই অগ্রযাত্রা সম্ভব হতো না।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় প্রতিষ্ঠাতা, প্রবীণ উস্তাযগণ এবং সেইসব নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের যারা আজ আমাদের মাঝে নেই। আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকে মাগফিরাত দান করুন, কবরকে প্রশস্ত ও আলোকময় করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম নসীব করুন।
আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনি দুর্গকে কিয়ামত পর্যন্ত অটুট রাখুন। জামেয়ার ফয়েজ ও বরকতকে আরও বিস্তৃত করুন এবং জামেয়াকে উম্মাহর জন্য হেদায়াত ইলম ও সত্যের পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কবুল করুন। আমীন।