16/08/2026
গণেশ চতুর্থী - উৎপত্তি, ইতিবৃত্ত ও মাহাত্ম্য :
“ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ”
গণেশ চতুর্থী হল ভগবান বিঘ্নবিনাশক, বুদ্ধিদাতা, সিদ্ধিদাতা গণেশের জন্মোৎসব। ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনটিকে “বিনায়ক চতুর্থী” অথবা “বিঘ্নেশ চতুর্থী” নামেও ডাকা হয়।
বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে গণেশ-সংক্রান্ত একাধিক পৌরাণিক উপাখ্যান পাওয়া যায়। এই উপাখ্যানগুলি থেকে গণেশের জন্মবৃত্তান্ত, লীলাকথা ও তার স্বতন্ত্র মূর্তিতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
যদিও পণ্ডিতেরা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে তার জন্ম সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেন, গণেশ গুপ্ত যুগে খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং বৈদিক ও প্রাক-বৈদিক পূর্বসূরিদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে বৈশিষ্ট পেয়েছিলেন। হিন্দু গ্রন্থে তাকে পার্বতী ও শিবের পুত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হিন্দুধর্মের গাণপত্য ঐতিহ্যে গণেশ হলেন পরম সত্তা।
গণেশ-সংক্রান্ত প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলি হল গণেশপুরাণ, মুদ্গলপুরাণ ও গণপতি অথর্বশীর্ষ।
বৃহৎধর্মপুরাণ অনুযায়ী – পার্বতী পুত্রলাভে ইচ্ছুক হলে শিব অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। অগত্যা পার্বতীর পীড়াপীড়িতে শিব পার্বতীর বস্ত্র টেনে সেটিকেই পুত্রজ্ঞানে চুম্বন করতে বলেন। পার্বতী সেই বস্ত্রকে পুত্রের আকার দিয়ে কোলে নিতেই সেটি জীবিত হয়ে ওঠে। তখন শিব পুত্রকে কোলে নিয়ে বলেন, এই পুত্র স্বল্পায়ু। উত্তরদিকে মাথা করে শায়িত এই শিশুর মস্তকও তৎক্ষণাৎ ছিন্ন হয়ে যায়।
পার্বতী শোকাতুর হন। এমন সময় দৈববাণী হয় যে উত্তরদিকে মাথা করে শুয়ে আছে এমন কারোর মাথা এনে জুড়ে দিলে তবেই এই পুত্র বাঁচবে। পার্বতী তখন নন্দীকে মস্তকের সন্ধানে পাঠান। নন্দী ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতের মাথা কেটে আনেন। দেবতারা বাধা দিয়েও ব্যর্থ হন। এই মাথাটি জুড়ে শিব পুত্রকে জীবিত করেন। শিবের বরে, ইন্দ্র ঐরাবতকে সমুদ্রে ফেলে দিলে সে আবার মস্তক ফিরে পায়।
শিবপুরাণ ও স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী –
পার্বতী দেবী স্নানের সময়ে তাঁর দেহের ময়লা দিয়ে এক বালকের মূর্তি গড়ে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি হলেন গণেশ। পরে শিব তাঁর মাথা ছেদন করলে আবার হাতির মস্তক স্থাপন করা হয়। এই জন্মলীলার স্মরণে গণেশ চতুর্থী পালিত হয়।
‘গণপতি’র প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীনতম হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে। দুটি ঋক মন্ত্রে ‘গণানাম গণপতিম হবামহে...’ ও ‘বিষু সীদা গণপতে...’ বাক্যবন্ধগুলি বৈদিক গণপতির একটি ধারণা দেয়। যদিও এই গণপতি ও বর্তমান কালে পূজ্য পৌরাণিক গণপতি এক নয়। তবে একথা অনেকেই স্বীকার করেন বেদোত্তর যুগে ঋগ্বেদের ‘গণপতি-ব্রহ্মণস্পতি’ থেকেই পৌরাণিক ‘গজবদন-গণেশ-বিঘ্নেশ্বর’-এর ধারণাটি বিবর্তিত হয়েছে।
ঋগ্বৈদিক গণপতির অপর নাম ছিল ‘বৃহস্পতি’ বা ‘বাচস্পতি’। তিনি জ্যোতির্ময় দেবতা। তার গাত্রবর্ণ রক্তিমাভ-স্বর্ণালি। অঙ্কুশ বা কুঠার তার অস্ত্র। তার আশিষ ভিন্ন কোনও ধর্মীয় সিদ্ধি সম্ভব নয় বলে মনে করা হত। তিনি সর্বদা ‘গণ’ নামে একটি নৃত্যগীতকারী দলের সঙ্গে বিরাজমান ও দেবতাদের রক্ষকরূপে কল্পিত হতেন।
অন্যমতে, ভারতের আদিম অধিবাসীদের পূজিত হস্তিদেবতা ও লম্বোদর যক্ষের মিশ্রণে গণেশ কল্পনার উদ্ভব। অথবা এমনও হতে পারে গণেশ সম্পূর্ণ অনার্য দেবতা, পরে যাঁর আর্যীকরণ ঘটে। গণেশের বাহন ইঁদুর এই আদিম কোনও সংস্কারের প্রতীক। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে ষষ্ঠ শতকের মধ্যবর্তী কোনও সময়ের লেখা বৌধায়ণ ধর্মসূত্রে গণেশের উল্লেখ নেই।
খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে কালিদাস, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে ভারবি, খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে পঞ্চতন্ত্র বা ভরত নাট্যশাস্ত্রও গণেশের সাক্ষ্য দেয় না। গুপ্ত যুগের শেষভাগে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক থেকেই এঁর একক পূজা প্রচলিত হয়।
‘মানবগৃহ্যসূত্র’ ও ‘যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি’-তে শাল, কটঙ্কট, উষ্মিত, কুষ্মাণ্ড রাজপুত্র ও দেবযজন ইত্যাদিকেও বিনায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাভারতে এঁরাই বিনায়ক। এঁদের কাজ বিঘ্ন উৎপাদন করা। এই সব বিনায়ক মিলে পরে বিঘ্নরাজ গণপতির রূপ নেয়।
যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি অনুসারে একজন বিনায়ক অম্বিকার পুত্র। এখানেই গণেশকে প্রথমবার দুর্গার সন্তান বলে উল্লেখ করা হয়। বহু পুরাণে তাকে স্বয়ম্ভূ বলা হয়েছে। আবার স্কন্দের গণ বা পার্ষদদের অনেকে পশুপাখির মুখবিশিষ্ট। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের ‘ভূমারা’তে এই ধরনের বহু গণের উল্লেখ পাওয়া যায়।
গণেশ অর্থাৎ গণ-ঈশের হস্তিমুখের এও এক কারণ হতে পারে। আবার কোনও কোনও মতে যক্ষ ও নাগদেবতা মিলে গণেশ। হাতির মাথাযুক্ত যক্ষ পুরাণে বর্ণিত। এছাড়া যক্ষরাও লম্বোদর।
‘যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা’-য় বিনায়ক ও গণপতির পূজার বিবরণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে রচিত ললিত মাধব-এও গণেশের উল্লেখ পাওয়া যায়।
মহাভারতের সঙ্গে সংযোগ –
মহাভারত – মহাভারত মতে, কৌরব ও পাণ্ডবদের মৃত্যু হলে ব্যাস ধ্যানে বসেন। মহাভারতের সমস্ত ঘটনা তার মনের মধ্যে ফুটে ওঠে। তখন এই সুবিশাল গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করার জন্য উপযুক্ত লিপিকারের খোঁজে তিনি ব্রহ্মার নিকট যান। ব্রহ্মা তাকে গণেশের কাছে যেতে বলেন।
গণেশ মহাভারত লিখতে সম্মত হন বটে, কিন্তু শর্তারোপ করেন, লিখতে লিখতে তার কলম থামতে দেওয়া চলবে না। ব্যাসও পাল্টা শর্তারোপ করেন, কোনও শ্লোকের অর্থ না বুঝে তিনি লিখতে পারবেন না। এইজন্য ব্যাস মহাভারতে ৮৮০০ কূটশ্লোক অন্তর্ভুক্ত করেন, যেন এই শ্লোকগুলির অর্থ অনুধাবন করতে গণেশের বেশকিছুটা সময় লাগে ও সেই অবসরে তিনি আরও কতকগুলি শ্লোক রচনা করে ফেলেন। এই মহাগ্রন্থ রচনার সূচনাও ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষ চতুর্থীতে হয়েছিল বলে বিশ্বাস।
শাস্ত্রে বলা আছে, ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষের চতুর্থীতে ভগবান গণেশকে পূজা করলে ভক্তের জীবনের সব বাধা দূর হয়, নতুন কর্মে সফলতা আসে।
প্রাচীনকালে এটি ছিল গৃহোৎসবের আকারে। ঘরে মূর্তি স্থাপন করে পূজা করা হত।
মারাঠা শাসক ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ গণেশ পূজাকে রাষ্ট্রীয় উৎসব হিসেবে উৎসাহিত করেন।
পরে ইংরেজ শাসনকালে (উনিশ শতকে) লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এই উৎসবকে গণআন্দোলনের রূপ দেন। তিনি মণ্ডপে গণেশ প্রতিষ্ঠা করে সর্বজনীন পূজার সূচনা করেন, যাতে ব্রিটিশ বিরোধী ঐক্য গড়ে ওঠে।
তারপর থেকে গণেশ চতুর্থী হয়ে ওঠে ভারতের অন্যতম বৃহৎ সর্বজনীন উৎসব।
গণেশ মূর্তির প্রতীকতত্ত্ব ও ব্যাখ্যা :
ভগবান গণেশ কেবল এক দেবমূর্তি নন, তিনি জীবনদর্শনের এক প্রতীক। তাঁর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, রূপ ও বাহন গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। নিচে তাঁর মূর্তির প্রতীকতত্ত্ব দেওয়া হল —
হাতির মাথা (গজানন রূপ)– গণেশের হাতির মাথা জ্ঞানের প্রতীক। হাতি হল ধৈর্য, শক্তি ও সুদূরপ্রসারী স্মৃতির প্রতীক। হাতি যেমন ঘন জঙ্গলের পথ খুলে দেয়, তেমনি গণেশ ভক্তের জীবনের সমস্ত বিঘ্ন দূর করে পথ পরিষ্কার করেন।
বড় কান (শ্রবণশক্তি)– গণেশের কান বড়, যা প্রতীক দেয় ধৈর্য সহকারে শোনার ক্ষমতা। মানুষের উচিত বেশি শোনা, কম বলা।
ছোট চোখ – একাগ্রতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। চোখ ছোট হলেও তা গভীরভাবে সব কিছু লক্ষ্য করতে সক্ষম।
দীর্ঘ শুঁড় – শুঁড় শক্তিশালী আবার নমনীয়। জ্ঞানী মানুষকে বড় সমস্যাও জয় করতে হয়, আবার ক্ষুদ্র বিষয়েও মনোযোগ দিতে হয়।
আধ্যাত্মিক প্রতীক ভক্তি (ভৌতিক জগৎ) ও জ্ঞান (অধিদেব জগৎ) – উভয়কে ধারণ করা।
বৃহৎ উদর (পেট)– গণেশের বড় পেট সমস্ত কিছু ধারণ করার প্রতীক। জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ – সবকিছুকে ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। মহাবিশ্বের সমস্ত রহস্য তাঁর অন্তরে ধারণ করা আছে।
একদন্ত (একটি দাঁত)– এক দাঁত ভাঙা, অন্যটি অটুট। ভালো গ্রহণ করা, খারাপ ত্যাগ করা।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, গণেশ মহাভারত লিখতে গিয়ে নিজের দাঁত ভেঙে কলম করেছিলেন।
চার হাত – গণেশ সাধারণত চার হাতে প্রতিমূর্ত। এক হাতে অঙ্কুশ (গজদন্ত/অঙ্কুশ) যা অজ্ঞতা ও দোষ দমন করার প্রতীক।
এক হাতে পাশ (ফাঁস) যা আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রতীক।
এক হাতে মোদক যা জ্ঞানের মাধুর্য, সাধনার ফল।
এক হাতে অভয় মুদ্রা যা ভক্তকে ভয়ের থেকে মুক্তি দেওয়ার আশ্বাস।
ইঁদুর বাহন (মূষক)– ইঁদুর গণেশের বাহন। ইঁদুর যেমন ক্ষুদ্র হলেও সব জায়গায় প্রবেশ করতে পারে, তেমনি মনের ইচ্ছা সর্বত্র প্রবেশ করে। গণেশ মূষকের উপর আরোহন করে বোঝান, যে মন নিয়ন্ত্রিত হলে ভক্ত সব জয় করতে পারে।
লাল রঙের পোশাক ও শৃঙ্গার — লাল বর্ণ শক্তি ও কর্মের প্রতীক। অলংকার প্রতীক দেয় সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্য।
গণেশের প্রতিমা জীবনের শিক্ষাগ্রন্থ :
শ্রবণ (বড় কান) – বেশি শুনতে শেখো।
একাগ্রতা (ছোট চোখ) – মনোযোগ দাও।
ধৈর্য (বড় পেট) – সব কিছু সহ্য করো।
বিচারশক্তি (এক দন্ত) – ভালো নাও, মন্দ ত্যাগ করো।
বাহন নিয়ন্ত্রণ (ইঁদুর) – মনকে জয় করো।
অভয় মুদ্রা – ঈশ্বর সর্বদা রক্ষা করছেন।
ভারতে ও ভারতের বাইরে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বিভিন্ন শাস্ত্রে গণেশের এই সাধারণ রূপের বহু রূপভেদও দৃষ্ট হয়। এই সকল রূপভেদের মূর্তি অনুসারে ধ্যান ও পূজাবিধি ভিন্ন ভিন্ন।
যেমন, গুপ্তযুগে প্রাপ্ত কয়েকটি গণেশমূর্তি অষ্টভূজ থেকে দশভূজ। আবার তন্ত্রগ্রন্থ তন্ত্রসার, কাশ্মীরে, নেপালে ও আফগানিস্তানে কোনও কোনও ক্ষেত্রে গণেশের বাহন সিংহ। এদিকে প্রসন্ন গণেশ সাধারণ রূপেই বিরাজমান। কিন্তু প্রাণতোষিনী তন্ত্র-এ উল্লিখিত চৌরগণেশ সাধনার ফল চুরি করেন। বিঘ্নগণেশ বিঘ্ন ঘটান। লক্ষ্মীগণেশ লক্ষ্মীকে আলিঙ্গন করে থাকেন।
গণেশ মূর্তি জীবনের প্রতিটি ধাপে শৃঙ্খলা, বুদ্ধি, ধৈর্য, আত্মসংযম ও ভক্তির বার্তা দেয়।
গণেশকে বলা হয় “বিঘ্নহর্তা” অর্থাৎ সকল প্রতিবন্ধকতার বিনাশক। তাঁকে “বুদ্ধির দেবতা” ও “বিদ্যাদাতা” বলা হয়, ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ পূজিত দেবতা। যে কোনো শুভকর্মে সর্বপ্রথম গণেশ পূজার নিয়ম আছে — “আদ্য গণেশ পূজা”। এই উৎসব মানুষকে ঐক্য, সমবেত আনন্দ, সৃষ্টিশীলতা ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়।
আজকের দিনে গণেশ চতুর্থী শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। গণেশ মণ্ডপে নাটক, গান, নৃত্য, সমাজসেবা, দানকার্য, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
॥ শ্রী গণেশের ধ্যান মন্ত্র ॥
ওঁ খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্রবদনং লম্বোদরং সুন্দরং প্রস্যন্দম্মদগন্ধলুব্ধ মধুপব্যালোলগণ্ডস্থলম্।
দন্তাঘাত বিদারিতারিরুধিরৈঃ সিন্দুরশোভাকরং, বন্দে শৈলসুতাসুতং গণপতিং সিদ্ধিপ্রদং কর্ম্মসু॥
অর্থ —
আমি বন্দনা করি শৈলসুতা পার্বতীর পুত্র গণপতিকে। যিনি আকারে বেঁটে, দেহে স্থূল, মুখে হাতিরাজের মতো, বড়ো পেটের অধিকারী এবং অপরূপ সুন্দর। যাঁর গালের পাশে হাতির মতো মদের গন্ধে আকৃষ্ট মৌমাছির ভনভনানি সর্বদা বেজে চলে। যিনি দন্তাঘাত দ্বারা শত্রুকে বিদীর্ণ করেছেন, আর সেই রক্তে তাঁর অঙ্গ সিন্দুরের মতো রঞ্জিত হয়ে শোভা পাচ্ছে। সেই গণপতি সকল কর্মে সিদ্ধি দান করেন।
এই মন্ত্রটি গণেশের রূপ বর্ণনা করে, যেমন তাঁর স্থূল দেহ, হাতির মুখ, লম্বোদর (বড় পেট) এবং সুন্দর মুখ। এটি সিদ্ধিদাতা এবং ইষ্টফলদাতা গণপতিকে বন্দনা করে।
ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং গণপতিং বিদ্যুদ্বর্ণং গজাননং।
শ্বেতাম্বরং সিতাব্জস্থং স্বর্ণমুকুট শোভিতম্॥
শ্বেতমূষিক পৃষ্ঠন্যস্তবামচরণং সিদ্ধিদং।
বামজান্বারোপিতদক্ষিণপদং চতুর্ভুজম্॥
অর্থ —
আমি সর্বদা ধ্যান করি সেই গণপতির —যাঁর দেহ বিদ্যুৎসম জ্যোতির্ময়, যাঁর মুখ গজের ন্যায়, যিনি শুভ্রবসন পরিহিত এবং শুভ্র পদ্মে আসীন। যিনি স্বর্ণমুকুটে শোভিত, যাঁর বাম পা শুভ্র মূষিকের পৃষ্ঠে স্থাপিত। যিনি সকল সিদ্ধিদাতা, যিনি বাম হাঁটুর উপর দক্ষিণ পদ স্থাপন করে চতুর্ভুজ রূপে বিরাজমান।
॥ অথর্বশীর্ষীয় ধ্যান মন্ত্র ॥
একদন্তং চতুর্হস্তং পাশঅঙ্কুশধারিণম্।
বরদং চ হস্তৈর্বিভ্রাণং মূষকধ্বজম্॥
রক্তং লম্বোদরং শূর্পকর্ণকং রক্তবাসসম্।
রক্তগন্ধানুলিপ্তাঙ্গং রক্তপুষ্পৈঃ সুপূজিতাম॥
অর্থ —
আমি সেই একদন্ত, চতুর্ভুজ গণপতিকে ধ্যান করি, যিনি হাতে পাশ ও অঙ্কুশ ধারণ করেন, বরদান দেন, যাঁর বাহন মূষক। যিনি রক্তবর্ণ, লম্বোদর, শূর্পকর্ণ, রক্তবসনধারী; যাঁর অঙ্গ রক্তচন্দনে সুগন্ধিত, যিনি রক্তপুষ্পে পূজিত।
॥ বিশ্ববীজ ধ্যান মন্ত্র ॥
একদন্তং মহাকায়ং তপ্তকাঞ্চনসন্নিভম্।
লম্বোদরং বিশ্ববীজং মঙ্গলায় মহাগণপতিম্॥
অর্থ —
আমি ধ্যান করি সেই মহাগণপতিকে, যিনি একদন্ত, মহাকায়, তপ্ত স্বর্ণসম দীপ্তিময়, যাঁর বৃহৎ উদর সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করে, এবং যিনি সকল মঙ্গলের মূল।
॥গণপতি কার্যসিদ্ধি বা বিঘ্ননাশক মন্ত্র॥
বক্রতুণ্ড মহাকায় সূর্যকোটিসমপ্রভ।
নির্বিঘ্নং কুরু মে দেব সর্বকার্যেষু সর্বদা॥
অর্থ —
হে বক্রতুণ্ড, মহাকায়, কোটি সূর্যের ন্যায় প্রভাময় গণেশ! আমার সকল কর্ম সর্বদা বিঘ্নহীনভাবে সম্পন্ন হোক — এই বর দাও।
এখানে গণেশের তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ধ্যানে আনা হয়—
বক্রতুণ্ড — বাঁকা দন্ত, যা শত্রুবিনাশ ও কর্মসিদ্ধির প্রতীক।
মহাকায় — তাঁর বিশাল দেহ বিশ্বকে ধারণ করার প্রতীক।
সূর্যকোটিসমপ্রভ — অসীম জ্যোতি, যা অন্ধকার (অজ্ঞতা ও বিঘ্ন) দূর করে।
সাধক প্রার্থনা করেন যেন তাঁর জীবনের সব কাজ নির্বিঘ্নে ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
॥ গণপতি প্রণাম মন্ত্র ॥
ওঁ একদন্তং মহাকায় লম্বোদর গজাননম্।
বিঘ্ননাশকরং দেবং হেরম্বং প্রণামাম্যহম্॥
অর্থ —
যিনি একদন্ত(একটি দাঁতযুক্ত), মহাকায়(বিশাল শরীরযুক্ত), লম্বোদর(পেট বড়), গজানন(হাতির মুখযুক্ত) এবং সকল বিঘ্ননাশকারী, সেই হেরম্বদেবকে আমি প্রণাম করি।
॥ সিদ্ধিদাতা গণেশের প্রণাম মন্ত্র ॥
সর্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্ব মঙ্গল হেতবে।
পার্বতী প্রিয় পুত্রায় গণেশায় নম নমঃ।
অর্থ —
যিনি সকল প্রকার বাধা-বিঘ্ন দূর করেন, যিনি সর্বপ্রকার মঙ্গলের হেতু, যিনি পার্বতী দেবীর অতি প্রিয় পুত্র, সেই শ্রীগণেশকে আমি বারবার প্রণাম জানাই।
এই মন্ত্রটি সাধারণত গণেশ-পূজার প্রারম্ভে উচ্চারণ করা হয়, যাতে জীবনের সব বাধা দূর হয় এবং সকল কাজে শুভফল আসে।
॥ গণপতি গায়ত্রী মন্ত্র ॥
ওঁ একদন্তয় বিদ্মহে, বক্রতুন্ডায় ধীমহি,
তন্নো দন্তি প্রচোদয়াৎ॥
অর্থ —
আমরা এক দাঁতযুক্ত হাতির দাঁতের অধিকারী ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যিনি সর্বব্যাপী। আমরা বাঁকা, হাতির আকৃতির শুঁড়যুক্ত ঈশ্বরের ধ্যান করি এবং আরও বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রার্থনা করি। আমরা এক দাঁতযুক্ত হাতির দাঁতের অধিকারী ঈশ্বরের সামনে মাথা নত করি, যাতে তিনি আমাদের মনকে জ্ঞানে আলোকিত করতে পারেন।
॥ শোক-বিনাশক বন্দনা ॥
গজাননং ভূত গণাধি সেবিতং।
কপিত্থ জম্বু ফলসার ভক্ষিতম্॥
উমা সুতং শোক বিনাশ কারণং।
নমামি বিঘ্নেশ্বর পদপঙ্কজম্॥
অর্থ —
আমি প্রণাম করি সেই গজমুখ গণপতিকে,
যাঁকে ভূতগণ সেবা করে, যিনি কপিত্থ ও জাম্বু ফল ভক্ষণ করেন, যিনি উমার সন্তান এবং শোকবিনাশী।
॥ তান্ত্রিক গণেশ-উপাসনা মন্ত্র ॥
ওঁ নমো সিদ্ধি বিনায়কায় সর্ব কার্য্য কর্ত্রে সর্ব বিঘ্ন প্রশমনায় সর্বজয়া বশ্যকর্ণয় সর্বজন সর্বস্ত্রী পুরুষ আকার্শনায় শ্রীং ওঁ স্বাহা।
অর্থ —
আমি প্রণাম করি সেই সিদ্ধিদাতা বিনায়ক গণেশকে, যিনি সকল কার্য সিদ্ধ করেন, সকল বাধা দূর করেন, সকলকে জয় করার এবং মন বশীভূত করার ক্ষমতা দান করেন, যিনি সকল নারী-পুরুষের হৃদয় আকর্ষণ করেন। সেই শ্রীবিনায়কের উদ্দেশে এই মন্ত্র সমর্পণ করছি— শ্রীং ওঁ স্বাহা।
এই মন্ত্রটি মূলত তান্ত্রিক গণেশ-উপাসনায় ব্যবহৃত হয়।
সাধক মনে করেন, গণপতি শুধু বাধা দূর করেন না, তিনি আকর্ষণশক্তি, বশীকরণশক্তি এবং সর্বজয়শক্তি দান করেন।
“শ্রীং” বীজমন্ত্রটি ধন, ঐশ্বর্য ও সৌভাগ্যের প্রতীক।
তাই এই মন্ত্র পাঠের উদ্দেশ্য — কর্মসিদ্ধি, বাধানাশ, জয়লাভ এবং লোকহৃদয় আকর্ষণ।
হে বিঘ্নেশ্বর গণপতি, তোমার পদপদ্মে আমি প্রণাম করি। তুমি আমার জীবনের সকল শোক ও বিঘ্ন দূর করো, আমার সমস্ত কর্ম সিদ্ধ ও মঙ্গলময় করো।
ওঁ শ্রী গণেশায় নমঃ 🙏
✍️ বিশ্বরূপ চক্রবর্তী অন্তু