10/01/2024
বন্দে পুরুষোত্তমম্ জয় গুরু🙏
সুপ্রভাত 🙏🙏🙏
দিব্য কাহিনী নাম-মাহাত্মা
ইষ্টপদে টান না হলে জপ করিস বা কী,
জনম-ভোর করলেও জপ লাভ হবে ফাঁকি।
------- শ্রীশ্রীঠাকুর
ইষ্টপদে টান বাড়াতে হলে তাঁর জন্য কর্ম করা দরকার। এভাবে যজন, যাজন, ইষ্টভৃতি,ইত্যাদি কর্ম নিত্য পালন করে ক্রমেই তাঁর স্বারূপ্য লাভ করা যায়।
১৯৬৭ ইংরেজী। তখন আমি সেনাবিভাগে চাকুরী করতাম এবং পরমপিতার দেওয়া দীক্ষা- দানের কার্য্যও করতাম। দুমাসের ছুটিতে বাড়ীতে গিয়াছি। বাড়ী আমার আসামে।
একদিন সান্ধ্য প্রার্থনান্তে এক দীক্ষার আমন্ত্রণ পেলাম। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় মাইল খানেক দূরে এক বিবাহ-বাটীতে দীক্ষা হবে। দীক্ষা নেবে সদা বিবাহিত বরকন্যা। আজ দীক্ষা হবে এবং কাল হবে কন্যা-বিদায়। যথাসময়ে গিয়ে দীক্ষার আসনে বসলাম। বরকন্যাকেও আনা হলো এবং তারাও আসনে বসল। বরের সঙ্গেই প্রথম আলাপ জমালাম, কারণ বেচারা মনমরা হয়ে বসে আছে।
"কি ভাই ? কি ভাবছেন ? তোমার নাম কি? বউ-এর নাম কি ? কি কর ? কোথায় থাক ? বয়স কত ?" ইত্যাদি জিজ্ঞাসা যা জানলাম তা এরূপঃ নামগুলি ঠিক মনে পড়ছে না। ছেলের বয়স চব্বিশ এবং মেয়ের বয়স সতের।
দীক্ষা কর্ম শুরু করলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য্য । মেয়ে তো একটা কথাও বলছে না। কেবল আমার মুখের দিকে হাবার মত তাকিয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞাস করলে উত্তর দিচ্ছে না। প্রথমতঃ ভাবলাম, নতুন বউ সেজেছে। আমার সঙ্গে কথা বলতে বুঝি লজ্জা হচ্ছে। কিন্তু তাই বা কি করে মানি ? তাহলে আমার মুখের দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে কেমন করে?
বললাম, "মা! দীক্ষার মন্ত্রগুলি মুখে উচ্চারণ করতে হয়।
কিন্তু তথাপি চুপ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বরের মুখের দিকে তাকালাম। বর বলে চললো "দাদা! ওরা আমাকে ধোকা দিয়েছে। ওরা আমার কাছে একথা গোপন করেছে যে মেয়েটি জন্ম থেকেই বোবা।
বিয়ের ব্যাপারে স্বাভাবিক আমার অনেক জল্পনা- কল্পনা আছে। যেমন প্রথমতঃ কন্যা ইষ্টপ্রাণ হওয়া চাই। সুন্দরী স্ত্রী পাবার আমার উদ্দেশ্য নয়। তাই বলে একবারে কুরূপা তো কেউ চায় না। অঙ্গহীনা স্ত্রী তো কেউ চায় না। তখন ব্যাপারটা নিজের উপর ফেলেই বিচার করলাম। আমায় যদি এইভাবে কেউ ধোকা দিত, তাহলে বোধ হয় সহ্য করতে পারতাম না। আবার মেয়েটিও তো আশা ভরসা নিয়েই জন্মেছে। তারও তো বিয়ে হওয়া দরকার। কোন বাবা-মা চায় কি যে,তার মেয়েটির বিয়ে না হোক? কাকেই বা দোষ দিই। সব তো অদৃষ্টের খেলা।
তাই অতি সাবধানে মন বুঝে বললাম, "ভাই! সব ভাগ্য। ভাগ্য আমাদের ভগবানের হাতে। তা আবার কর্ম কে অনুসরণ করে। যেমন কর্ম ভাগ্যও পরমপিতা তেমনি দান করেন। কোন জন্মে কোথায় কি কর্ম করে এসেছি, তা তো জানা নেই। সব কিন্তু তারই প্রতিক্রিয়া। বর্তমানের কর্ম ভবিষ্যতকেই আমন্ত্রণ করে। ভগবান কে ডাকা ছাড়া আর অন্য উপায় কি আছে ? এখন বরং ভাব যে,তিনি সর্ব্ব শক্তিমান। এযাবৎ তাঁকে যতটুকু লাভ করেছি, ততটুকুই আমি শক্তিমান এবং ভাগ্যবান। এযাবৎ স্ত্রী ভাগ্য যতটুকু উপার্জন করেছ, তার সার্থকতা তো পেলেই, তা তুমি যতটুকু পাও। দণ্ড নিতে হয় হাসিমুখে এবং তাতেই কর্মদোষ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। বিধাতার বিধান অনুযায়ী দণ্ডকে আর্শিবাদ মনে করে গ্রহণ করতে হয় এবং তাতেই মুক্তি। তুমি স্ত্রীকে তদ্রূপই গ্রহণ করো,ভালবাস, স্বামী হিসাবে তোমার যা' কর্ত্তব্য, তা' তুমি যথাযথ ভাবে করে যাও। এতদিন দীক্ষা পাওনি। এদিক-সেদিক দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরেছ। ফলে হয়তো পেয়ছো অশান্তি। আমি বলবো যে, আজ এই মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলেই তোমারও সদগুরুর চরণাশ্রয় প্রাপ্তি ঘটেছে। সে হিসাবে তুমিও তার কাছে কম ঋণী নও। সুতরাং দীক্ষা নাও, যজন,যাজননাদি নিয়ে চল,অহরহ তাঁর কথা ভাব এবং নাম কর।পরিণামে কেবল মঙ্গলই হবে। আর শোন, বিশ্বাস কর। তাঁর আরেক নাম পরশমণি। পরশমণির ছোঁয়ায় নাকি লোহাও সোনা হয়ে যায় । সুতরাং যা' বলছি করে যাও। যা' হবার, ভালই হবে। তাঁর দয়ায় অসম্ভব সম্ভব হয়।
মনে হল বর প্রসন্ন হলো। বরের দীক্ষা হলো। কন্যা তো কিছুই বলে না। অন্য একটি দীক্ষিত মেয়ে কন্যাকে ধরে দীক্ষার মন্ত্রোচ্চারণ করল এবং কন্যারও দীক্ষা হলো।
দীক্ষান্তে কন্যার বাবাকেও শ্রীশ্রীঠাকুরের বহু কথা বললাম।
ছুটি শেষ হয়ে গেল। আবার রণবেশে সজ্জিত হয়ে চাকুরিতে মন দিলাম। কত দীক্ষা হয়। সবার কথা কি সব সময় মনে থাকে? এই মেয়েটির কথাও ভুলে গেলাম ক্রমে। ১৯৬৯ ইংরাজীতে আবার ছুটিতে এলাম বাড়িতে। এক বাড়িতে সৎসঙ্গ হবে। গৃহকর্তা অন্দর মহলে একখানা চেয়ারে বসালেন। ওখানে ছিল মায়েদের ভিড়। অনেকেই প্রণাম করে গেলেন। একটি বউ প্রণাম করে সামনে দাঁড়িয়ে রইল। জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বলবে মা।" মেয়েটি বলল, "আমায় চিনতে পারেননি?"
সত্যিই আমি কিন্তু তাকে চিনতে পারলাম না। তাই জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকালাম তার দিকে। সে বলল" মনে নেই আপনার ? আমায় ডীক্ষা ডিয়েছিলেন। আমি কঠা বলটে পারটাম না।" তখন চিনতে পেরে বললাম, " চিকিৎসা হয়েছে বুঝি ?" মেয়েটি বলল, "নাটো। আপনি যে নাম বলেছিলেন, সেটি জপে-জপে আমার মুখে কঠা ফোটে গেছে।"
আশ্চর্য হলাম। প্রথমতঃ ওর সঙ্গে নাকি কেউ কথা বলতো না। কথা বুঝতে হত ইশারা দিয়ে। কি ভাবে যে সে নামটা শুনল ,জপ করল এবং মুখে কথা ফুটবল,কিছুই বুঝতে পারলাম না। জীবনের সতেরটা বৎসর যে কথা বলতে পারেনি, দীক্ষার পর দুবৎসরের মধ্যে সে কিভাবে কথা বলছে, সেটি আশ্চর্য্যের ব্যাপারই বটে। খবর নিয়ে জানলাম স্বামীর স্ত্রী মিলে তারা সুখের সংসার করে আছে। স্বামী নাকি ওকে খুব আদর করে। ঘরে সকাল- সন্ধ্যা বিনতি প্রর্থনা হয় ইত্যাদি।
আমি অবাক বিস্ময়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের কথা ভাবতে- ভাবতে বাড়ী চলে এলাম।
(sg) নাম- মহাত্ম্য
শ্রীবকুলজ্যোতি চক্রর্ত্তী
আলোচনা- আষাঢ়- ১৩৮৫