13/07/2026
শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা তো এই চলেই এলো। এই আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। রথযাত্রা এলেই রথযাত্রা প্রসঙ্গে একটি বহুল প্রচলিত উক্তি প্রায়ই শোনা যায় - " রথে চ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।' অর্থাৎ রথে উপবিষ্ট বামন জগন্নাথকে দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। মূল শ্লোক হচ্ছে -
দোলায়াং দোল গোবিন্দং চাপে চ মধুসূদন
রথে চ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।
কিন্তু শ্রীমদভগবদগীতার ৩/৩০, ১৮/৫৮ সহ একাধিক শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই " যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ" " উত্তিষ্ঠোতিষ্ঠ ভারত " ইত্যাদি বলে অর্জুন কে স্বধর্ম তথা ক্ষত্রিয়োচিত যু্দ্ধকর্মে প্রবৃত্ত হতে উৎসাহ দিচ্ছেন। এছাড়াও ত্রিগুণের বশীভূত হয়ে কৃত সকাম কর্মের ফল যে ভোগ ভিন্ন ক্ষয় না হওয়া পর্যন্ত পুনঃ পুনঃ সংসার চক্রে যাতায়াত করতে হয় তা-ও বলছেন। যেমন শ্রীভগবান নিজেই ভগবদগীতার রাজবিদ্যা রাজগুহ্যযোগ নামক নবম অধ্যায়ের ২১ নং শ্লোকে বলছেন -
তে তং ভুক্ত্বা স্বর্গলোকং বিশালং
ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি।
এবং ত্রয়ীধর্মমনুপ্রপন্না
গতাগতং কামকামা লভন্তে।।২১।।
অর্থাৎ, ত্রিবেদোক্ত যাগযজ্ঞ কর্মপরায়ণ হয়ে যারা স্বর্গলাভ কামনা করে, তাঁরা দিব্য স্বর্গসুখ ভোগ করে থাকে বটে, কিন্তু তাঁদের প্রার্থিত বিপুল স্বর্গসুখ উপভোগ করে পুণ্যক্ষয় হলে তাঁরা পুনরায় মর্ত্যলোকে প্রবেশ করে। এই রূপ কামনা ভোগ পরবশ এই ব্যক্তিগণ যাগযজ্ঞাদি বেদোক্ত কর্ম করেও পুনঃ পুনঃ সংসারে যাতায়াত করতে থাকে।
তাহলে এই যে অখণ্ডনীয় কর্মফলের পাশ বন্ধন তা কি দারুময় বিগ্রহের দর্শনেই অপসৃত হয়ে যায়? আর স্বধর্মাচরণ ব্যতিরেকে শুধু রথারূঢ় জগন্নাথ দর্শনেই সকল কর্মফল ভোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়!?
দারুময় ভগবান সাক্ষাৎ ব্রহ্ম এবং তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর অহৈতুকী কৃপাবলোকনে নিখিল পাপরাশি মুহুর্তে ভস্মীভূত করতে পারেন, ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু জন্ম জন্মার্জিত লালিত সংস্কার এবং সঞ্চিত প্রারব্ধ ভোগ ব্যাতীত কোনো যাগযজ্ঞ বৈদিক কর্মানুষ্ঠানেই যে জন্মচক্র থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না সে কথা শ্রীগীতায় শ্রীভগবানের শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী থেকেই জানা গেল। তাহলে আবার রথারূঢ় বামন জগন্নাথের দর্শনে পুনর্জন্ম হয় না এই শাস্ত্রবাক্যের সহিত ভগবদগীতায় ভগবানের শ্রীবাক্যের মধ্যে এই আপাত পারস্পরিক বিরুদ্ধতার মীমাংসা কি?
গীতাসারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন কে বলছেনঃ
হৃদিস্থিতং পঙ্কজমষ্টপত্রং
সকর্ণিকাং কেশরমধ্যনালম্
অঙ্গুষ্ঠমাত্রং মুনয়ো বিদন্তি
ধ্যায়ন্তি বিষ্ণুং পুরুষং প্রধানং। ৩১।
- হৃদয়মধ্যে যে অষ্টপত্রবিশিষ্ট পঙ্কজ অবস্থিতি করে, উহার কেশরের মধ্যভাগ রক্তবর্ণ এবং উহা কর্ণিকায় বিশোভিত। উহার আকার অঙ্গুষ্ঠ-পরিমাণ; মুনিগণ উহাকেই প্রধান পুরুষ বিষ্ণু বলিয়া ধ্যান করিয়া থাকেন। ৩১ ॥
এই অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ আত্মা সম্পর্কে বেদাদি শাস্ত্রেও বলা হচ্ছে।
কঠোপনিষদে এই হৃদয় দহরাকাশে অবস্থিত অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ প্রধান পুরুষ আত্মার সম্পর্কে বলা হচ্ছে -
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষে। মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।
ঈশানে ভূতভবাস্য ন ততো বিজুগুপ্সতে। এতদ্বৈতৎ। ১২।।
- যে অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ পুরুষ আত্মার মধ্যে অবস্থিতি করিয়া সর্বশরীর ব্যাপিয়া হৃদয়াকাশে বিরাজিত আছেন, তিনিই ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান এই কালত্রয়ের নিয়ন্তা। যে ধীর ব্যক্তি উক্তরূপে আত্মাকে জানে তাহার নিকট আত্মা গুপ্ত থাকেন না। সে সর্ব্বদা সেই পরমাত্মাকে হৃদয়ক্ষেত্রে মূর্তিমান দেখিতে পায়। যে এক আত্মা সর্বত্র ব্যাপিয়া আছেন তাঁহার গোপনভাব হইতে পারে না।
পুনরায় বলা হচ্ছে -
অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো জ্যোতিরিবাধূমকঃ।
ঈশানো ভূতভব্যস্য স এবাদ্য স উ শ্বঃ। এতদ্বৈতৎ।১৩৷৷
- এই অঙ্গুষ্ঠ মাত্র পুরুষ নির্ধূম জ্যোতি পদার্থের ন্যায়। যোগী-গণ হৃদয় দেশে এই ব্রহ্ম পদার্থের উপলব্ধি করিয়া থাকেন। ইনি ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান, কালত্রয়ের ঈশ্বর। ইনি ইদানীং যেমন প্রাণী শরীরে বর্তমান আছেন, ভবিষ্যৎকালেও তেমন থাকিবেন। ইঁহাকেই প্রকৃত ব্রহ্ম পদার্থ জানিবে।
জীবের হৃদয়াকাশে অবস্থিত এই অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ প্রধান পুরুষই ( পুর তথা দেহের ঈশ বলেই পুরুষ ) রথে উপবিষ্ট বামন জগন্নাথ। এই প্রধান পুরুষ আত্মা অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ মাত্র তথা রথারূঢ় জগন্নাথও বামনাকৃতি।
[ শৈব পক্ষে এই হৃদয় গুহাধিষ্ঠিত অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ পুরুষই আত্মলিঙ্গ রূপ দেবাদিদেব মহেশ্বর। ]
এখন জ্ঞাতব্য হল এই অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ পুরুষ কোথায় অবস্থান করেন? এর উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতার মোক্ষযোগ নামক অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৬১ নং শ্লোকে অর্জুনকে বলছেন -
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঽর্জুন তিষ্ঠতি
ভ্রাময়ন্ সর্বভূতানি যন্ত্ররূঢ়ানি মায়য়া। ৬১।
অর্থাৎ, হে কৌন্তেয়, ঈশ্বর সর্বজীবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকিয়া মায়া দ্বারা যন্ত্রারূঢ় পুত্তলিকার ন্যায় তাহাদিগকে ভ্রমণ করাইতেছেন।
ঠিক যেন সাধক কবির বলা সেই কথা -
আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী, আমি ঘর তুমি ঘরণী
আমি রথ তুমি রথী, যেমন চালাও তেমনি চলি
হৃদয়ে অবস্থিত এই পরমাত্মার দর্শনের ফলেই যে ভোগাকাঙ্ক্ষা বিহীন নিষ্কামী সাধক পরমপদ লাভ করতে পারেন, যা ঠিক রথে বামন জগন্নাথ দর্শন করে পুনর্জন্ম না হওয়ারই সমতুল্য, সে বিষয়ে শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ের ২০ নং মন্ত্রে বলা হচ্ছে। যথাঃ
অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়া-
নাত্মা গুহায়াং নিহিতোঽস্য জন্তোঃ।
তমক্রতুং পশ্যতি বীতশোকো
ধাতুঃ প্রসাদান্মহিমানমীশম্ ॥ ২০ ॥
অর্থাৎ, অণু হইতেও অণুতর এবং মহান হইতেও মহত্তর আত্মা সকল প্রাণীর হৃদয়ে আত্মস্বরূপে অবস্থিত আছেন। হৃদয়ে নিহিত ও বিষয়-ভোগের আকাঙ্ক্ষাশূন্য সেই আত্মাকে যিনি ঈশ্বরানুগ্রহে ক্ষয়বৃদ্ধিহীন পরমেশ্বররূপে দর্শন করেন, তিনি ঐ দর্শনের ফলে সর্বদুঃখের অতীত হন।
পুনশ্চঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ প্রধান পুরুষের অবস্থান সম্পর্কে গীতাসারে অর্জুন কে বলছেনঃ
নিরালয়ং সমুদ্দিশ্য তত্র নাদো লয়ং গতঃ।
অনাহতস্থ্য শব্দশ্য তশ্য শব্দ যো ধ্বনিঃ ॥ ২৭ ॥
ধ্বনেরন্তর্গতং জ্যোতির্জ্যোতিরন্তর্গতং মনঃ।
তন্মনো বিলয়ং যাতি তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদম্ ॥ ২৮
তৎ পদং পরমং ধ্যানং তদ্ধ্যানং ব্রহ্ম উচ্যতে।
নাভিমূলে স্থিতং পদ্মং নালং তস্য দশাঙ্গুলম্.।। ২৯।।
কোমলং তস্য তন্নালং নিম্নপত্রমধোমুখং
কদলীপুষ্পসঙ্কাশং চন্দ্রকান্তি সুনির্মলম্।।৩০।।
- বায়ুর আলয় শূন্যস্থানের উদ্দেশে যে নাদ উখিত হয়, তাহাই লয়ে পৰ্য্যবসিত হয়, অনাহত শব্দের যে নাদ, তাহাই ধ্বনিপদবাচ্য।
ধ্বনির অভ্যন্তরে জ্যোতির অবস্থান, তদভ্যন্তরে মনের অধিষ্ঠান, সেই মনই বিষ্ণুর পদ কৈবল্য প্রাপ্ত হইয়া থাকে।
ঐ পদপ্রাপ্তির কার্য্যই পরম ধ্যান এবং উহাই ব্রহ্ম বলিয়া কীর্তিত হইয়া থাকে, জীবের নাভিমূলে দশাঙ্গুলি-পরিমিত পদ্মনাল বিরাজমান আছে। উহা কোমল, নিম্নপত্রবিশিষ্ট এবং অধোমুখে অবস্থিত, উহা দেখিতে কদলীপুষ্পের ন্যায়, উহা সুনির্মল ও চন্দ্রের ন্যায় রমণীয়।
এই যে দশাঙ্গুলি পরিমাণ পদ্মনাল অতিক্রম করে হৃদয় কমল মধ্যস্থ কর্ণিকার মধ্যে প্রধান পুরুষের অবস্থানের উল্লেখ তারই ইঙ্গিত ঋগ্বেদোক্ত পুরুষ সূক্তেও পাওয়া যায়। সেখানেও সর্বব্যাপী সর্বাত্মক পরমাত্মা সম্পর্কে বলা হচ্ছে -
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাত্যতিষ্ঠদ দশাঙ্গুলম্ ॥১॥
সেই সর্বব্যাপী পরমাত্মা পঞ্চ সূক্ষ্ম ভূতাত্মক এবং পঞ্চ স্থূল ভূতাত্মক হৃদয় আকাশ কে অতিক্রম করে অবস্থান করছেন। পূর্বে হৃদয়াকাশে পরিচ্ছিন্ন স্বরূপে অবস্থিত থেকে, পরে স্বানুষ্ঠিত ক্রতু সামর্থ্যে সেই পরিচ্ছিন্নাকারতা পরিত্যাগ পূর্বক সর্বাতিশায়ি-স্বরূপে অবস্থিত রয়েছেন।
এই যে বামন জগন্নাথ তথা অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ আত্মা ইনি কোন রথে আরোহণ করেন? সে প্রসঙ্গে কঠোপনিষদ বলছেঃ
আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।"।
কঠোপনিষদ ১/৩/৩
- এই দেহই রথ, আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী, বুদ্ধি হল সারথী, মন হল রথের লাগাম, মনকে নিয়ন্ত্রিত করে বুদ্ধি দ্বারাই এই শরীররূপ রথকে পরিচালনা করতে হয়।
অর্থাৎ, এই দেহই হল সেই ষোড়শ চক্র বিশিষ্ট ( পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় ও ষড়রিপুর প্রতীকায়িত ) নন্দীঘোষ নাম্না রথ, যার উপরে সেই হৃৎকমল মধ্যস্থ অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ পরমাত্মা তথা রথারূঢ় বামন জগন্নাথ উপবিষ্ট আছেন। দেহরূপ রথ মধ্যে অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ পরম জ্যোতিস্বরূপ সেই বামন জগন্নাথ কে দর্শন করলেই আর পুনর্জন্ম হয় না। সকল কর্মচক্র খণ্ডন হয়ে ভববন্ধনের জন্ম জন্মান্তরের যাতায়াতের অবসান ঘটে। এ প্রসঙ্গেও গীতাসারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলছেনঃ
সর্ব্বসংকল্প নির্মুক্তঃ পক্ষেদাত্মানমাত্মনি।
নিরালম্বে পদে শূন্যে যত্তেন উপজায়তে। ৫৯।
নিবর্তন্তে ক্রিয়াঃ সব্বা যস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে।
শিলামৃদ্দারুরচিতা দেবতা বুদ্ধিকল্পিতা। ৬১।
- যে ব্যক্তি সকল প্রকার বাসনা হইতে বিনির্ন্মুক্ত হইয়াছে, তাহার আলম্বনবিহীন শূন্যপদে যে তেজ প্রকাশিত হয়, তাহাতেই আত্মাতে আত্মবস্তুর দর্শন ঘটিয়া থাকে । ৫৯ ॥
- তখন পরাবর ব্রহ্মবস্তু দৃষ্ট হয়, সুতরাং জীবের সমস্ত ক্রিয়াকর্ম নিবর্তিত হইয়া থাকে, অধিক কি বলিব, এ সময়ে বুদ্ধিকল্পিত শিলা, মৃত্তিকা বা প্রস্তর-নির্মিত দেবতার আদর থাকে না ॥ ৬১ ॥
অতএব, বেদাদি শাস্ত্রের নিরিখে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, একমাত্র আত্মায় আত্মবস্তু তথা ব্রহ্মবস্তুর দর্শনেই জন্মার্জিত সকল কর্মফল পাশবদ্ধতা থেকে চিরমুক্তি ঘটে জন্মচক্র থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
দেহ রথে সেই অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ প্রধান পুরুষ বিষ্ণু কে দর্শন করাই প্রকৃতপক্ষে নন্দীঘোষ রথে বামন জগন্নাথ কে দর্শন করার প্রকৃত অর্থ। তবে কি, সাধারণ ভক্তের যে বিশ্বাস - কাষ্ঠ নির্মিত রথারূঢ় জগন্নাথ কে দর্শন করলেই জন্মচক্র থেকে মুক্তি ঘটে তা মিথ্যা?
না, কখনো মিথ্যা নয়। ভগবান ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু। তিনি কৃপা করলে, ইচ্ছা করলে যোগীর যে যোগসাধনগম্য অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ ব্রহ্মদর্শন জনিত ফললাভ , তা তিনি দারুমূর্তির দর্শনের মাধ্যমেই দান করতে পারেন। আর ভক্তের দৃষ্টিতে দারুব্রহ্মকে সাধারণ কাষ্ঠ জ্ঞান করা অপরাধ। ব্রহ্মদারু রূপেই ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু ভগবান ইচ্ছা করলে ভক্তের কোটি জন্মার্জিত কর্মফল লাঘব করতে পারেন। শ্রীভগবানের এই দারুময় বিগ্রহে আত্মপ্রকাশ করার কারণই হল পতিত উদ্ধারণ। তবে সেখানেও দারুমূর্তিতে ব্রহ্মপুরুষ জগন্নাথকে দেখার মত চোখ থাকা চাই। অভক্ত, অজ্ঞানীর চোখ নিয়ে শতবার রথারূঢ় বামন জগন্নাথকে দর্শন করলে ঐ শিবলিঙ্গে পাষাণ বুদ্ধির ন্যায় দারুব্রহ্মেও শুধুমাত্র কাষ্ঠখণ্ডই দর্শন হবে। কিন্তু ভক্তের দৃষ্টিতে, জ্ঞানীর দৃষ্টিতে নিজের অন্তরে দেখার মত চোখ নিয়ে তাকালে, নিজের দেহ রূপ রথেই পরমাত্মা রূপ বামন জগন্নাথ দর্শন হবে। সর্বোপরি দেহ রথে দহরাকাশে অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ পরমাত্মাই যে নন্দীঘোষ রথে আরূঢ় বামন জগন্নাথ তার প্রত্যক্ষ অনুভব হবে। তখনই এই বারবার যাতায়াতের যন্ত্রণা একেবারে ঘুচে যাবে।
ভক্ত কবি রামপ্রসাদের একটি উক্তিও এ বিষয়ে প্রণিধানযোগ্য। সাধকের ভাষায় -
" যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহ ভাণ্ডে। " গানের ভাষায় তিনি সহজ ভাবে বলেছেনঃ-
কালী বলো রসনারে...
ষটচক্র রথমধ্যে শ্যামা মা মোর বিরাজ করে
কালী বলো রসনারে।
পরিশেষে, ভগবৎপাদ জগদগুরু আদি শঙ্করাচার্যের ভাষায় এই নিবেদন -
পুনরপি জননং পুনরপি মরণং
পুনরপি জননী জঠরে শয়নম্
ইহ সংসারে খলু দুস্তারে
কৃপা পারাবারে পাহি মুরারে
ভজ গোবিন্দং ভজ গোবিন্দং
গোবিন্দং ভজ মূঢ়মতে।।
তথ্যসূত্রঃ
শ্রীগীতা - জগদীশ চন্দ্র ঘোষ
উপনিষদ গ্রন্থাবলি (কঠোপনিষদ)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ
গীতাসার
🛕 শুভ আসন্ন রথযাত্রা 🛕