24/04/2023
🌙 শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত:
কিন্তু যে অনন্য মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকে পবিত্র মাহে রমজান, অতুলনীয় যে ফজিলতকে তা ধারণ করে রাখে, পরের মাস শাওয়ালের চাঁদ ওঠার সাথে সাথেই কি তা একেবারে শেষ হয়ে যাবে? মহামহিম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনুগত বান্দাদের জন্যে ব্যবস্থা ঠিক এরকম নয়। শাওয়ালের প্রথম তারিখ ঈদুল ফিতরের দিন রোজাকে নিষিদ্ধ করে রমজানের অনন্যতাকে একদিকে অধিক স্পষ্ট করা হয়েছে, অপরদিকে ঈদের পরদিন থেকেই পুরো মাসজুড়ে ঐচ্ছিকভাবে আরেকটি ফজিলতের ঘোষণা দেওয়া
হয়েছে।
সহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِنًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ 'যে রমজান মাসের রোজা রাখল, এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পুরো বছরই রোজা রাখল।' [হাদীস নং ১১৬৪]
যে কোনো ভালো কাজ করলে দশগুণ নেকি পাওয়া যায়- এটি কুরআনের ঘোষণা। সুরা আনআমে আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ-
যে একটি নেক আমল করবে তার দশগুণ সমান
'যে কেউ কোনো ভালো কাজ করবে, সে এর দশগুণ নেকি লাভ করবে।' [আয়াত: ১৬০]
রমজানের ত্রিশটি রোজা রাখার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখলে মোট রোজার সংখ্যা দাঁড়ায় ছত্রিশটি। আর ছত্রিশটি রোজার দশগুণ হচ্ছে তিনশ ষাটটি রোজা। এ অর্থেই শাওয়ালের ছয় রোজার মাধ্যমে পুরো বছরের রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। হাদীসের ভাষ্য থেকে এটাও স্পষ্ট, শাওয়ালের ছয় রোজা দিয়ে পুরো বছরের রোজার নেকি হাসিল করতে হলে অবশ্যই রমজানের পুরো মাস রোজা রাখতে হবে। রমজানের রোজা না রেখে, কিংবা কিছু রেখে কিছু না রেখে শাওয়ালের রোজা রাখলে এ ফজিলত পাওয়া যাবে না। রমজান মাস যদি উনত্রিশ দিনে শেষ হয়ে যায়, তবু এ সওয়াব প্রাপ্তির জন্যে শাওয়ালের ছয়টি রোজাই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে এমনটি মনে করার অবকাশ নেই, রমজান মাস উনত্রিশ দিনে শেষ হলে হয়তো শাওয়াল মাসে সাতটি রোজা রাখতে হবে। কারণ হাদীসে স্পষ্টভাবেই রমজান মাসের রোজা রাখার পর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। রমজান মাস ত্রিশ দিনে শেষ হলো, না উনত্রিশ দিনে -তা এক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়।
⏩ শাওয়ালের ৬ রোজা রাখার নিয়ম:
এ ছয়টি রোজা কীভাবে রাখতে হবে-বিরতিহীনভাবে, না বিরতি দিয়ে দিয়ে? ঈদুল ফিতরের পর পর, না মাসের শেষ দিকে? না মাসের মাঝের দিনগুলোতে? এসব বিষয়ে হাদীস বিশারদ মনীষীগণের পক্ষ থেকে সবরকম যতই বর্ণিত হয়েছে। কেউ বলেছেন, মাসের শুরুর দিকে বিরতিহীনভাবে এ ছয় রোজা রাখা উত্তম। কারণ এতে একটি কল্যাণকর কাজ দ্রুত সম্পাদিত হবে। আবার কেউ বলেছেন, শেষ দিকে কিংবা বিরতি দিয়ে দিয়ে রোজাগুলো রাখা উত্তম হবে। কেননা এতে রমজানের ফরজ রোজার সাথে এ নফল রোজার একটি পার্থক্য স্পষ্টরূপে ফুটে উঠবে। মোটকথা, এ রোজাগুলো যেভাবেই রাখা হোক, মাসের যে সময়েই রাখা হোক, হাদীসে বর্ণিত এ সওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। অনেকে অবশ্য বিরতিহীনভাবে এ ছয় রোজা রাখাকে জরুরি মনে করে থাকে, এ ধারণাটি ঠিক নয়।
আরও কয়েকটি নফল রোজা ঈদুল ফিতরের মধ্য দিয়ে মাসব্যাপী সিয়ামসাধনার সমাপ্তি ঘটে- এ কথা ঠিক। কিন্তু এর চেতনা ও শিক্ষা একজন মুমিন বাকি এগারটি মাস মনেপ্রাণে ধারণ করে। শুধু তাই নয়, হাদীস শরীফে এমন আরও কিছু রোজার কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো সওয়াব ও পুরস্কারপ্রাপ্তির দিক দিয়ে সারা বছরের রোজা রাখার সমতুল্য। কিছু রোজা আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বছর জুড়ে নির্দিষ্ট সময়ে রাখতেন। এখানে আমরা এমনি দুটি বিষয় উল্লেখ করছি।
🟢 প্রতি মাসে তিনটি রোজা
রমজানের পর থেকে আবার রমজান আসা পর্যন্ত প্রতি আরবি মাসে তিনটি রোজা রাখা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত এ রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এ বিষয়ে উৎসাহিত করতেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. বলেছেন, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি বিষয় কখনো ছাড়তেন না-১. আশুরার রোজা, ২. জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, ৩. প্রতি মাসে তিন রোজা আর ৪. ফজরের দুই রাকাত সুন্নত নামাজ। [সুনানে নাসাঈ, হাদীস : ২৪১৬] সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা.। আমলের প্রতি অত্যধিক উৎসাহী ছিলেন তিনি। বছর জুড়ে
রোজা রাখতেন আর রাতভর তাহাজ্জুদ নামাজে কুরআন
শরীফ পড়ে পড়ে কাটিয়ে দিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তখন
তাকে এ থেকে বারণ করলেন আর বললেন,
لا صَامَ مَنْ صَامَ الدَّهْرَ صَوْمُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ صَوْمُ الدَّهْرِ كُلِّهِ যে সারা বছর রোজা রাখে, তার রোজাই হয় না। (প্রতি মাসে) তিনটি রোজাই পুরো বছরের রোজার সমতুল্য। [সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৯৭৯]
শাওয়ালের ছয় রোজার মতো এখানেও দশগুণ নেকির বিষয়টিই বিবেচ্য। তিন দিন রোজা রাখলে এর দশগুণ হিসেবে ত্রিশটি অর্থাৎ পুরো মাস রোজা রাখার সওয়াব মিলে। আর এভাবে যে বছরের প্রতিটি মাসে রোজা রাখবে, সে যেন পুরো বছরই রোজা রাখল। এই অর্থেই উপরোক্ত হাদীসে প্রতি মাসে তিনটি রোজাকে সারা বছরের রোজার সমতুল্য বলা হয়েছে।
এ তিনটি রোজা মাসের কোন তারিখে রাখতে হবে-এ নিয়ে অবশ্য কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। মাসের শুরুতে যাঝে শেষে যে কোনো সময়ই তা রাখা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো তারিখ নির্দিষ্ট করে এ রোজা রাখতেন না। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রা. এমনটিই বলেছেন—'রোজাগুলো মাসের কোন তারিখে হচ্ছে এ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো ভাবনা ছিল না।' [সহীহ মুসলিম] তবে হাদীস শরীফে এও পাওয়া যায়, তিনি কোনো কোনো সাহাবীকে কখনো প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখার জন্যে উৎসাহিত
করেছেন।
সহীহ বুখারীর বর্ণনা, হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেছেন, আমার বন্ধু হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতে আদেশ করেছেন। [হাদীস : ১৯৮১] ইমাম বুখারী রহ.এর ব্যাখ্যা অনুসারে, এ তিন দিন হলো প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। এ তিন দিন রোজা রাখাও সুন্নত। পরিভাষায় এ তিন দিনকে 'আইয়্যামে বিয' বলা হয়। তাই যদি কেউ প্রতি মাসের এ তিন দিন রোজা রাখে, তাহলে আইয়্যামে বিযের রোজার সুন্নতও আদায় হবে, আবার মাসে তিন দিন রোজা রাখার সুন্নতও পালিত হবে। আর এর মধ্য দিয়ে খুব সহজেই অর্জিত হতে পারে পুরো বছরের নফল রোজার সওয়াব।
🟢 প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়মিত আমল ছিল-তিনি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। সাহাবী হযরত উসামা ইবনে যায়দ রা. তাঁকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি যখন রোজা রাখতে শুরু করেন তখন এমন হয় যেন আপনি আর রোজা ছাড়বেন না। আবার যখন রোজা না রাখতে শুরু করেন,তখন মনে হয় যেন আপনি আর রোজা রাখবেন না। কিন্তু দুইটি দিনের কথা ভিন্ন। সে দুইটি দিন অবশ্য আপনি নিয়মিতই রোজা রাখেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কোন দুই দিন? সাহাবী বললেন, সোম ও বৃহস্পতিবার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
এই দুটি দিন এমন যেগুলিতে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে কাজগুলি দেখানো হয়, তাই আমি পছন্দ করি যে আমি রোজা রেখে আমার আমলগুলি প্রদর্শিত হয়।
'এই দুই দিন (মানুষের) আমল বিশ্বজগতের প্রভুর সামনে উপস্থিত করা হয়। আমার ইচ্ছা, আমার আমলগুলো যখন তাঁর নিকট পেশ করা হয় তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।' [সুনানে নাসাঈ, হাদীস: ২৩৫৮]
সপ্তাহের এ দুই দিন এবং আইয়্যামে বিযের তিন দিনেও শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন কেবল একটু সচেতনতা। এতে একটি আমলের মধ্য দিয়েই তিনটি আমল পালিত হতে পারে খুব সহজেই। আল্লাহর ভান্ডারে যে সবকিছুই অসীম! করুণাময় সেই সত্তার নিকট আমরা সবকিছুর প্রতিদানই আশা করতে পারি।