20/01/2026
মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে প্রথম গুপ্ত হত্যা
বর্তমান সময়ে মুসলমানদের মধ্যে কোনো আইকনিক নেতার আবির্ভাব হলে, কিংবা কাউকে আইকনিক মনে করা হলেই—অনেক সময় নেতা হওয়ার আগেই তাকে অ্যাসাসিনেট করা হয়। কিন্তু আমরা কি জানি, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোন নেতার ওপর গুপ্ত হামলা চালানো হয়েছিল?
তিনি ছিলেন হজরত উমর ফারুক রা.। আরও অবাক করার বিষয় হলো—আজ ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুরোপুরি অমীমাংসিতই রয়ে গেছে আর হয়তো রয়েও যাবে। চলুন, ঘটনাটি পুরোটা বিশ্লেষণ করে বোঝার ট্রাই করি।
২৩ হিজরি সাল। মুসলিম বিশ্বের যে কেউ যেন তার কাছে নিজেদের অভিযোগ জানাতে পারেন—এই উদ্দেশ্যে তিনি পুরো মুসলিম বিশ্ব সফর করেন। এ সময় প্রত্যেক প্রদেশের বড় বড় শহরে তিনি প্রায় দুই মাস করে অবস্থান করেন।
এই ২৩ হিজরিতেই তিনি হজ পালনের জন্য মক্কায় যান। ফেরার পথে ‘আবতাহ’ নামক স্থানে অবস্থান করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন—যেন তিনি মদিনায় শহীদ হতে পারেন। তৎকালীন সময়ে মদিনায় শহীদ হওয়ার দোয়া ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার সেই দোয়া কবুল করেন।
মদিনায় ফিরে এসে তিনি আবার রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সে সময় শেষ পারস্য সম্রাট ইয়াজদাগির্দের নিকটাত্মীয় হরমুজ ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় বসবাস করছিল। কিন্তু আজও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না—সে সত্যিই অন্তর থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, নাকি তার মনে কুটিলতা লুকিয়ে ছিল। বাহ্যিক আচরণ অবশ্য তার কুটিলতার দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে অন্তরের খবর একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন।
উমর ফারুক রা. সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক অমুসলিম কাউকে মদিনায় বসবাসের অনুমতি দিতেন না। কিন্তু নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে বন্দি হওয়া আবু লুলু ফিরোজ নামে মুগিরা ইবনে শোবা রা. এর এক গোলামকে তিনি ব্যতিক্রম হিসেবে অনুমতি দেন।
কারণ মুগিরা ইবনে শোবা রা. তার শৈল্পিক দক্ষতার কথা সামনে রাখেন এবং বলেন—তার মাধ্যমে মদিনাবাসী উপকৃত হবে। ফিরোজ ছিল চিত্রকর, কাঠমিস্ত্রি ও কামার—এই তিন ক্ষেত্রেই অত্যন্ত দক্ষ।
তখন নিয়ম ছিল—যোগ্যতাসম্পন্ন গোলামরা মালিকের ব্যক্তিগত সেবা না করে নিজেদের পেশায় আত্মনিয়োগ করত, এবং উপার্জনের একটি অংশ মালিককে কর হিসেবে দিত। সে অনুযায়ী ফিরোজকে প্রতিদিন দুই দিরহাম দিতে হতো। যেহেতু সে অত্যন্ত দক্ষ ছিল, তার ইনকামও ছিল বেশি।
তবে এই অর্থ দেওয়াটর পরিমাণ তার কাছে বেশি মনে হওয়ায় সে উমর রা. এর কাছে কর কমানোর অভিযোগ নিয়ে যায়। উমর রা. তার পেশার কথা শুনে বলেন, “তোমার আয়ের তুলনায় তো খুব বেশি নেওয়া হচ্ছে না।”
ফিরোজ চলে যাওয়ার সময় রাগত স্বরে বলে যায়—
“তার ইনসাফের পাল্লা আমি ছাড়া সবার জন্যই অবধারিত।”
এই কথায় তার ক্ষোভের আভাস পাওয়া গেলেও দ্য গ্রেট উমর ফারুক রা. একজন বিচারপ্রার্থীকে নিরাশ করতে চাননি। তাই তিনি মুগিরা রা.কে কর কমানোর ব্যাপারে সুপারিশ করবেন বলে মনস্থির করেন।
এরপর একদিন ফিরোজকে কোথাও যেতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“শুনেছি তুমি নাকি খুব ভালো চাক্কি বানাতে পারো। আমার জন্য একটা বানিয়ে দেবে?”
ফিরোজ তখন আশ্চর্য ভঙ্গিতে, কিছুটা হুমকির সুরে বলল—
“আমি এমন একটি চাক্কি বানাবো, যা পূর্ব–পশ্চিমে বসবাসকারী সবাই দেখতে পাবে।”
বিচক্ষণ উমর রা. তার কথার ধরনেই হুমকির ইঙ্গিত বুঝে ফেলেছিলেন। তিনি সাথীদেরও বলেছিলেন যে, লোকটি তাকে হুমকি দিয়েছে। কিন্তু ইনসাফের খাতিরে তাকে গ্রেফতার করেননি। কারণ অপরাধ প্রমাণ ছাড়া কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না। যেহেতু তার কোনো অপরাধ তখনো প্রমাণিত হয়নি, তাই তাকে যেতে দিয়েছিলেন।
২৭ জিলহজ, বুধবার। আমিরুল মুমিনিন উমর ফারুক রা. ফজরের নামাজ পড়ানোর জন্য মেহরাবে দাঁড়ান। তাকবিরে তাহরিমা দেওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ লুকিয়ে থাকা আবু লুলু ফিরোজ বেরিয়ে এসে তার বুকে পরপর ছয়টি খঞ্জরের আঘাত করে।
আক্রমণটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে, পেছনে থাকা মুক্তাদিরা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেননি। কয়েকজন আবু লুলুকে ধরতে গেলে সে খঞ্জর চালিয়ে তেরোজনকে আহত করে, যাদের মধ্যে নয়জন শহীদ হন। একপর্যায়ে একজন চাদর দিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলে, সে নিজের খঞ্জর দিয়েই আত্মহত্যা করে।
যদিও অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই হত্যাকাণ্ডকে রাগের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছেন—কারণ উমর রা. তার অভিযোগে সাড়া দেননি। কিন্তু পুরো ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। কারণ কয়েক দিরহামের জন্য কেউ কখনো নিজের জীবন বাজি রেখে এত নিখুঁত পরিকল্পনায় হত্যা করে না। আবার তার হুমকি দেওয়ার ধরনটা স্পষ্ট করে দেয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল।
এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে যাকে সন্দেহ করা হয়, উমর রা. এর শাহাদাতের পর তার ছেলে হজরত উবায়দুল্লাহ রাগের মাথায় তাকে হত্যা করে ফেলে। এর ফলেই আজ পর্যন্ত এই ষড়যন্ত্রের রহস্য অমীমাংসিত থেকে গেছে।
হজরত উবায়দুল্লাহ রা. তার বন্ধু আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা.–এর কাছ থেকে জানতে পারেন—হরমুজই সেই খঞ্জরটি ফিরোজকে দিয়েছিল, যেটি দিয়ে উমর রা.–কে হত্যা করা হয়। তবে উবায়দুল্লাহ রা.-এর এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি মারাত্মক ভুল। যার প্রভাব অর্ধশত বছর পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল। এমনকি আজও তার পরোক্ষ প্রভাব বিদ্যমান।
সূত্র : মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস - মাওলানা ইসমাইল রেহান