29/09/2021
খানা খাওয়ার সুন্নাত
—————————
আল্লাহ্ তাঁর বান্দার জন্য সৃষ্টির পরতে পরতে আসমান ও জমিনে, জলে ও স্থলে, দেশ ও আবহাওয়া ভেদে বিছিয়ে রেখেছেন অসংখ্য নিয়ামত। খাবার আল্লাহ তাআলার একটি অশেষ নিয়ামত।
মুসলমানের প্রতিটি ভালো কাজই ইবাদত এর সামিল। একজন মুসলমানের খাবার খাওয়ার বিশেষ কয়েকটি ও সুন্নত ও আদব রয়েছে। কীভাবে আহার করতে হবে এ ব্যাপারে রাসূল ﷺ সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন; সুন্নাত তরিকা অনুযায়ী আহার করলে খাওয়ার পাশাপাশি বহু ছাওয়াবের অধিকারী হতে পারি। অন্য দিকে স্বাস্থগত ভাবে সুফল পেতে পারি।
খানা খাওয়ার পূর্বের ও খানা খাওয়ার সময়ের সুন্নাতসমূহঃ
১। খাওয়ার পূর্বে দু’হাত কবজি পর্যন্ত ভালো ভাবে ধুয়ে কুলি করে খাবার শুরু করা। হাত না ধুয়ে না খাওয়া। -মুসনাদে আহমাদ
২। দস্তরখানা বিছিয়ে খানা খাওয়া।
৩। জমিনে বসে খাবার খাওয়া। দাড়িয়ে দাড়িয়ে বা হেঁটে হেঁটে না খাওয়া।
৪। খাওয়ার সময় বসার দুটি পদ্ধতি:
ক. দুই হাটু এবং দুই পায়ের পিঠের উপর নতজানু হয়ে বসা।
খ. ডান পা খাড়া করে বাম পায়ের উপর বসা।
৫। মাথায় টুপি পরে খাবার খাওয়া। মেয়েদের মাথায় কাপর দিয়ে খাওয়া।
৬। কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে না খাওয়া। -বুখারী শরীফঃ ৫১৯০, তিরমিজি শরীফঃ ১৯৮৬
৭। খাবারের পাত্র ধুয়ে পাত্রে খাবার নেয়া।
৮। খাবারের পাত্র থেকে খাবার নেয়ার সময় পাত্রের ডান দিক থেকে খাবার বেরে নেয়া।
৯। বোল বা বাটি থেকে খাবার বারার সময় ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিহি’ এ দোয়াটি পড়া।
১০। খাবার নিজ প্লেটে নেয়ার পর অন্যজনকে দিতে হলে প্রথমে ডান পাশের জনকে দেবেন। সেও তার ডান পাশের জনকে দেবে, এভাবেই চলবে। চা ও অন্যান্ন পানীয় এ নিয়মেই পান করতে হবে। নিজের বাম দিকের জনকে পরিবেশন না করা।
১১। খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ্ বলা।
খানা খাওয়া শুরু করার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া পড়তেন,
بسم الله وعلى بركةالله بعالى
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারকাতিল্লাহ্।
অর্থঃ আল্লাহ্ তায়ালার নামে খানা খাওয়া শুরু করছি এবং আল্লাহ তায়ালার বরকত প্রার্থনা করছি।
১২। যদি খাওয়ার শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে গেলে ‘’বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওআখিরাহ” বলা।
-আবু দাউদ, হাদিস নংঃ ৩৭৬৭, তিরমিজি, হাদিস নংঃ ১৮৫৮।
অর্থঃ আমি আল্লাহ তায়ালার নামে খানা খাওয়া শুরু করছি। প্রথমেও আল্লাহ তায়ালার নাম, পরিশষেও আল্লাহ তায়ালার নাম।
১৩। ডান হাত দ্বারা খাওয়া। বাম হাতে না খাওয়া। কারন ইবলিশ শয়তান বাম হাতে খায়।
-বুখারি শরীফঃ ৫১৬৭, তিরমিজি, শরীফঃ ১৯১৩
১৪। জুতা পায়ে বা শুয়ে শুয়ে খানা না খাওয়া এবং হাতে ভর দিয়ে না খাওয়া।
১৫। রুটি/ খাবার যদি দস্তরখানায় উপস্থিত হলে তরকারীর জন্য অপেক্ষা না করে খানা শুরু করা।
১৬। পাত্র থকে নিজের সামনের দিকে ডান দিক হতে খাওয়া শুরু করা।
-বুখারি শরীফঃ ৫১৬৭, তিরমিজি, শরীফঃ ১৯১৩
১৭। এক হাতে রুটি না ছিড়া। কেননা এটি অহংকারীদের পদ্ধতি। বাম হাতে রুটি ধরে ডান হাতে ছিড়া।
১৮। হাত থেকে লোকমা পড়ে গেলে অথবা খাদ্য দানা পরে গেলে উঠিয়ে পরিষ্কার করে খাওয়া। তিরমিজি শরীফঃ ১৯১৫; ইবনে মাজাহ শরীফঃ ৩৪০৩
১৯। তিন আঙ্গুল দ্বারা খাওয়া। উজর ছাড়া চার / পাঁচ আঙ্গুলে না খাওয়া। (মধ্যমা, বৃদ্ধা ও শাহাদাত)
২০। এক আঙ্গুলে ও দুই আঙ্গুল দিয়ে না খাওয়া। এক আঙ্গুলে খাওয়া শয়তানের কাজ, দুই আঙ্গুল দিয়ে খাওয়া অহংকারীদের স্বভাব।
২১। খাওয়ার মাঝখানে পানি পান না করা। খাওয়ার কিছুক্ষন পর পানি পান করা।
২২। খাবারে ফুঁ না দেয়া।
-ইবনে মাজাহ শরীফঃ ৩৪১৩
২৩। বেশী গরম খাবার না খাওয়া।
২৪। খানা খাওয়ার পর প্লেট বা খাবার পাত্র এবং আঙ্গুল চেটে খাওয়া। চেটে খাওয়ার আগে হাত না মোছা অথবা হাত না ধোঁয়া।
-বুখারী শরীফঃ ৫২৪৫
২৫। খাবারের দোষ না ধরা। পছন্দ হলে খাওয়া, না পছন্দ হলে না খাওয়া। তবুও দোষ না ধরা।
-বুখারী শরীফঃ ৫১৯৮; ইবনে মাজাহ শরীফঃ ৩৩৮২
২৬। একটি প্লেটে ২ বা ততোধিক ব্যাক্তি এক সাথে আহার করা।
২৭। এক প্লেটে কয়েক জন খাবার খেলে সঙ্গি সাথীগণকে নিজে দিক থেকে খানা দেয়া।
২৮। সম্পূর্ণ পেট ভরে না খাওয়া। পেটের ১ ভাগ খাবার, ১ ভাগ পানি ও ১ ভাগ খালি রেখে খাওয়া সম্পন্ন করা।
২৯। খাওয়ার সময় অযথা বেশি কথা বা আচরণ থেকে বিরত থাকা। ধৈর্য্য সহকারে খাওয়ার : অর্থাৎ সবুরে-শুকুরে খাওয়া। খাওয়ায় সময় অযথা তাড়াহুড়া না করা।
৩০। খাওয়ার সময় খানার ছোট ছোট লোকমা তোলা। এক লোকমা শেষ হলে অন্য লোকমা মুখে দেওয়া। বড় বড় এবং একের পর এক লোকমা না তোলা।
৩১। খাওয়ার পর উভয় হাত কব্জিসহ ধোয়া ও কুলি করা।
৩২। খাওয়ার পর কুলি করা।
-মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ শরীফ
৩৩। দুই বা ততোধিক লোক এক জায়গায় খেতে বসলে সবার খানা খাওয়া শেষে হাত ধোয়া। সবার খাওয়া শেষ হওয়ার আগে হাত না ধোয়া।
৩৪। খাওয়ার পর আল্লাহ তাআলার প্রশংসায় “আলহামদুলিল্লাহ” বলা ও দোয়া করা
খানা খাওয়ার পর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দোয়া পড়তে বলেছেন,
الحمد لله الذى اطعمنا وسقانا وكفانا واواناوارواناوجعلنا من المسلمين
উচ্চারণঃ আলহামদুলিল্লাহি আতআমানা, ওয়াসাকানা, ওয়াকাফানা, ওয়াআয়ানা, ওয়া আরওয়ানা, ওয়াজা আলানা মিনাল মুসলিমীন।
অর্থঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার যিনি আমাদেরকে খাইয়েছেন, পান করিয়েছেন, যথেষ্ট পরিমাণ খাবার দিয়েছেন, বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, সকল প্রকার নেয়ামত দিয়েছেন এবং আমাদের মুসলমানদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন।
৩৫। দাওয়াত খাওয়ার পরের দোয়া–
اَللّهُمَّ اَطْعِمْ مَنْ اَطْعَمَنِيْ وَ اَسْقِ مَنْ سَقَانِيْ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আতঈম মান আত‘আামনী ওয়া আস্কী মান সাকানী।
অর্থঃ ‘‘হে আল্লাহ্ যে আমাকে খাওয়াবে, তুমি তার খাদ্যে বরকত দান কর আর যে আমাকে পান করাবে, তুমি তাকেও পান করাও’’।
৩৬। খাবারের পর দাঁত খেলাল করা।
৩৭। দস্তরখানায় যা কিছু থাকে উহা মুরগী, বিড়াল, গরু, ছাগল ইত্যাদি কে খাওয়ানো যায়েজ। ডাসবিনে ময়লার স্তুপে বা রাস্তায় নিক্ষেপ না করা।
৩৮। খাওয়ার শেষে সাথে সাথে না শোয়া।
শুধু আহার নয়, বরংচ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহানবী ﷺ -এঁর নির্দেশিত পদ্ধতিকে অর্থাৎ প্রতিটি সুন্নাহ্ বাস্তব ও স্বাস্থ্যসম্মত বলে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন। রাসূল ﷺ -এঁর প্রতিটি কর্ম ও পদক্ষেপ মানবতার অনুসরণযোগ্য। দুনিয়াবি সফলতা ও আখিরাতে কামিয়াবির মাধ্যম। জীবন পথের পাথেয়। তার কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করলে মুমিনের জীবনে বয়ে যাবে প্রশান্তির ফল্গুধারা।
অন্তরে প্রথিত হবে নবী প্রেম।
আল্লাহর হুকুম মত, শরীয়ত সম্মত ও প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শে জীবন যাপন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
সম্পাদনায়ঃ
আলহাজ্ব শাহ্ সুফী মুহাম্মাদ আজহারুল ইসলাম আল কাদেরী মাঃ জিঃ আঃ
বর্তমান হযরত পীর সাহেব কিবলা, জহুরীয়া দরবার শরীফ।