15/08/2026
— তুই কেমন আছিস? অনেকদিন তো কথা হয় না।
— আলহামদুলিল্লাহ… ভালো আছি। তবে সত্যি বলতে, আগের মতো নেই।
— মানে?
— জানিস, কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক ছিল—হাসতাম, কথা বলতাম, সবার সঙ্গে মিশতাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা শূন্যতা ছিল।
— কীসের শূন্যতা?
— আল্লাহর থেকে দূরে থাকার শূন্যতা। আগে নামাজ ছুটে গেলে মন খারাপ হতো। কুরআন না পড়লে মনে হতো দিনটা অসম্পূর্ণ। আর একটা সময় এসে… এসব কিছুই আর অনুভব করতাম না।
— তারপর?
— প্রথমে বুঝতেই পারিনি যে আমি কতটা দূরে চলে গেছি। ভাবতাম, পরে ঠিক হয়ে যাব। “আগামীকাল থেকে নামাজ পড়ব”, “আগামীকাল থেকে কুরআন পড়ব”—এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল।
— তাহলে পরিবর্তনটা কীভাবে এলো?
— একদিন রাতে খুব অস্থির লাগছিল। চারপাশে সব ছিল, তবুও মনে হচ্ছিল আমার কিছুই নেই। ফোনটা পাশে রেখে চুপচাপ বসে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো—আমি এত মানুষের কাছে ছুটে বেড়াই, অথচ যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কাছেই তো ফিরছি না!
— তারপর কী করলি?
— অনেকদিন পর অজু করলাম। সিজদায় গিয়ে কিছু বলতে পারছিলাম না। শুধু কাঁদছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি তো কতবার ভুল করেছি, কতবার অবহেলা করেছি… এখন কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন?
— আল্লাহ তো পরম ক্ষমাশীল।
— হ্যাঁ। সেদিনই যেন নতুন করে বুঝলাম, আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। বান্দা যত দূরেই চলে যাক, ফিরে আসার পথটা খোলা থাকে।
— তারপর থেকে সবকিছু সহজ হয়ে গেল?
— না। বরং বুঝলাম, দ্বীনে ফিরে আসা মানে এক রাতেই নিখুঁত হয়ে যাওয়া নয়। কখনো নামাজে মন বসে, কখনো বসে না। কখনো কুরআন পড়তে ভালো লাগে, কখনো অলসতা আসে। কিন্তু একটা জিনিস বদলে গিয়েছে এখন ভুল হলে আমি পালিয়ে যাই না। আবার ফিরে আসি।
— আগে আর এখনকার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কী?
— আগে আমি ভাবতাম, “আমি আল্লাহর কাছে যাওয়ার মতো ভালো নই।” এখন বুঝি, ভালো হয়ে যাওয়ার জন্যই তো আল্লাহর কাছে যেতে হয়।
— বাহ! সুন্দর কথা।
— আর জানিস? আগে আমি দ্বীনকে অনেক নিয়ম-কানুনের মতো দেখতাম। এখন বুঝি, দ্বীন আসলে রবের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ। নামাজ শুধু একটা দায়িত্ব নয়—এটা আমার রবের সঙ্গে দেখা করার সময়। কুরআন শুধু পড়ার বই নয়—এটা আমার পথনির্দেশ। আর তাওবা শুধু মুখের কয়েকটা শব্দ নয়—এটা আবার ফিরে আসার সাহস।
— তাহলে তুই এখন কী চাস?
— খুব বেশি কিছু না। শুধু চাই, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন আল্লাহর দিকে ফিরে থাকতে পারি। মাঝপথে যদি আবার দুর্বল হয়ে যাই, যেন তিনি আমাকে আবার উঠিয়ে দেন।
— আমাকেও একটু দোয়ায় রাখিস।
— অবশ্যই। তবে তুইও একটা কথা মনে রাখিস—
— কী?
— আল্লাহর কাছে ফিরে আসার জন্য “সঠিক সময়” বলে কিছু নেই। আজই সময়। এখনই সময়।
— যদি অনেক গুনাহ হয়ে থাকে?
— তবুও ফিরে আসবি।
— যদি বারবার ভুল হয়ে যায়?
— তবুও ফিরে আসবি।
— যদি মনে হয়, আমি আর আগের মতো ভালো হতে পারব না?
— তখনও ফিরে আসবি। কারণ আমাদের কাজ নিখুঁত হয়ে যাওয়া নয় বারবার পড়ে গিয়ে আবার রবের দিকে ফিরে আসা।
— আর যদি আল্লাহ আমাকে গ্রহণ না করেন?
— এই ভয়টা শয়তানের। তুই রবের রহমত থেকে নিরাশ হবি না। যে হৃদয় তাঁকে খুঁজে ফিরে, আল্লাহ তাকে পথ দেখানোর ক্ষমতা রাখেন।
— তাহলে আজ থেকেই শুরু করব।
— আজ থেকেই না… এই মুহূর্ত থেকেই।
— কী দিয়ে?
— একটা অজু দিয়ে। তারপর দুই রাকাত নামাজ। সিজদায় গিয়ে নিজের ভাষায় বলবি—
— কী বলব?
— “হে আমার রব, আমি ফিরে এসেছি। আমি দুর্বল। আমাকে আর দূরে যেতে দিয়ো না।”
— তারপর?
— তারপর ধীরে ধীরে কুরআনের কাছে যাবি, নামাজ আঁকড়ে ধরবি, গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা করবি, ভালো মানুষের সঙ্গ নেবি। আর যখনই পড়ে যাবি—মনে রাখবি, ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা।
— জানিস, আজ অনেকদিন পর আমার বুকটা হালকা লাগছে।
— কেন?
— মনে হচ্ছে… আমি হারিয়ে যাইনি। আমি শুধু পথ থেকে একটু দূরে সরে গিয়েছিলাম।
— ঠিক তাই। আর পথটা এখনো সেখানেই আছে।
— আলহামদুলিল্লাহ।
— আলহামদুলিল্লাহ। চল, এবার দুজনেই রবের দিকে ফিরি।