10/09/2025
ধর্মের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধা
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
ধর্ম ধারণ ও দর্শন করার জন্য শ্রদ্ধা জাগাতে হবে। শুদ্ধ ধর্মের জ্ঞান আহরণের জন্যও শ্রদ্ধা জাগাতে হবে। সৎকর্ম ও আত্ম নিরীক্ষণ করার জন্যও শ্রদ্ধা জাগাতে হবে। ধর্ম দর্শনের উৎসাহের জন্যও শ্রদ্ধা জাগাতে হবে। কিন্তু যে শ্রদ্ধা জাগ্রত করবেন, তা যেন অন্ধশ্রদ্ধা না হয় সে দিকেও কড়া নজর বা খেয়াল রাখতে হবে। সত্যিকার ধর্মের প্রতি, ধর্ম দর্শনের প্রতি এবং ধর্ম ধারণের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা যখন জাগ্রত হয় তখনই বলা হয়-‘ ধম্মং সরণং গচ্ছামি।’
আপনি কোন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা উৎপন্ন করবেন? কোন ধর্মকে দর্শন করবেন? এবং কোন ধর্মকে ধারণ করবেন? যে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা উৎপন্ন করবেন, যে ধর্মকে আপনি দর্শন করবেন এবং যে ধর্মকে ধারণ করবেন, সে ধর্ম বৌদ্ধধর্ম নয়, হিন্দু ধর্মও নয়, ইসলাম ধর্মও নয়, জৈন ধর্মও নয়, খৃষ্টান ধর্মও নয়, পার্সী ধর্মও নয় এবং শিখ ধর্মও নয়। সে ধর্ম হল অনন্ত, অপ্রমাণ। ‘অপ্পমাণো ধম্মো’ অর্থাৎ অপরিমিত বা অপ্রমাণ ধম্ম। যা সতত আপনার মধ্যে উৎপন্ন হচ্ছে এবং বিলয় হচ্ছে। অপ্রমাণ ধর্ম হলেই তখন হবে ধর্ম। সকলের জন্য যা হয় তাই হল ধর্ম। বৌদ্ধধর্ম তো কেবল বৌদ্ধদের জন্য। হিন্দু ধর্ম তো কেবল হিন্দুদের জন্য। ইসলাম ধর্ম তো কেবল মুসলিমদের জন্য। জৈন ধর্মও তো কেবল জৈনদের জন্য। অনুরূপভাবে খৃষ্টান ধর্মও তো কেবল খৃষ্টানদের জন্য। পার্সী ধর্মও তো কেবল পার্সীদের জন্য এবং শিখ ধর্মও তো কেবল শিখদের জন্য। উপরোক্ত ধর্মগুলি হল বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়, গোষ্ঠী বা সমূহের জন্য। সেগুলির কোনটাই সার্বজনীন বা সকলের ধর্ম নয়।
ধর্ম হতে হবে সকলের জন্য। সকলের জন্য অর্থাৎ সার্বজনীন যে ধর্ম সে ধর্মেরই শরণ নেওয়া বা আশ্রয় নেওয়া উচিত। সার্বজনীন হল সে ধর্ম, যা আপনার/ আমার ভিতরে রয়েছে, যা উদয়-বিলয় হচ্ছে। যে ধর্মকে আমরা ধারণ করে রয়েছি তাকেই দর্শন করতে হবে। অর্থাৎ আপনি যদি ক্রোধ, হিংসা, লোভ, অজ্ঞানতা ইত্যাদি ধর্ম সমূহ ধারণ করেন, তাহলে আপনি দুঃখী, অস্থির ও অশান্ত হবেন। তা হল সার্বজনীন দুঃখদায়ক ধর্ম। সে ধর্ম সমূহ ধারণ করলে আপনি নিজেও কখনও সুখী হতে পারবেন না, অপরকেও কখনও সুখ দিতে পারবেননা। এগুলি হল সার্বজনীন অহিতকারী ধর্ম। সে সমস্ত ধর্মে ‘গচ্ছামি’ বা গমণ করলে কেবল দুঃখই দুঃখ।
তেমনি আপনি যদি মৈত্রী, করুণা, ভালবাসা, সদাচার, অলোভ, অদ্বেষ ও অমোহ ইত্যাদি ধর্মকে ধারণ করেন, তাহলে আপনি হবেন শান্ত, সংযত ও সুখী। আপনি নিজেও আনন্দ ও সুখময় জীবন-যাপন করতে পারবেন এবং অপরকেও সুখের ভাগীদার করতে পারবেন। এগুলিই হল সার্বজনীন সুখকর ধর্ম। এ সমস্ত ধর্মে ‘গচ্ছামি’ বা গমণ করলে জীবনে সুখ, শান্তি ও আনন্দ লাভ করবেন। সুতরাং কোন ধর্মকে ধারণ করছেন, তা আপনাকে দর্শন করতে হবে। আপনি সঠিক ধর্মের অনুসরণ করলেই তখন ধর্মও আপনাকে শরণ বা আশ্রয় দেবে। বুদ্ধ বলেছেন- ধম্মো হবে রক্খতি ধম্মচারিং।’ ধর্মই ধার্মিককে রক্ষা করে বা শরণ দেয়। সঠিক ধর্মের অনুসরণ করলেই সত্যিকার ধর্মের শরণে যাচ্ছেন এবং সে ধর্ম অনুসরণের দ্বারা আপনি সুরক্ষা পাবেন।আপনি সঠিক ধর্মকে ধারণ না করে কেবল মুখে বুদ্ধ নাম নিচ্ছেন, মুখে ‘ধম্মং সরণং গচ্ছামি’ উচ্চারণ করছেন, অথচ ধারণ করছেন ক্রোধ, হিংসা, লোভ, শঠতা, প্রতারণা ও লোক ঠকানো মূলক অধর্ম, তাতে কি সত্যিকার ধর্মের শরণে আপনি আছেন? আপনার মধ্যে বাক্য সংযম নাই, কায় সংযম নেই এবং মন সংযম নেই। আপনার সমস্ত ইন্দ্রিয়ই অসংযত। যে ধর্ম আপনি ধারণ করে আছেন, সে ধর্ম কি আপনাকে রক্ষা করবে? কখনও না। সর্বদা আপনি দুঃখ-অশান্তিই তো ভোগ করবেন। ইহাই হল সার্বজনীন, সার্বকালীক ও সার্বদেশিক দুঃখদায়ক ধর্ম।
আর আপনি যদি মৈত্রী, করুণা, দয়া, অহিংসা, অলোভ, অদ্বেষ ও অমোহ ইত্যাদি ধর্মকে ধারণ করেন, কায়, বাক্য ও মনকে সংযত করেন এবং ইন্দ্রিয় সমূহকেও সংযত করেন, তাহাই হবে প্রকৃত ধর্ম ধারণ। সে ধর্মই আপনাকে শরণ বা আশ্রয় দেবে। সে ধর্মের দ্বারাই আপনি যথার্থ সুখ, শান্তি ও আনন্দ পাবেন। ইহাই হল সার্বজনীন, সার্বদেশিক ও সার্বকালিক সুখদায়ক ধর্ম।
আপনি বৌদ্ধ, বিহারে গিয়ে প্রতিদিন বুদ্ধের বন্দনা করছেন, ধর্মের শরণ নিচ্ছেন, ধর্মের প্রচুর বই-পুস্তক পড়ছেন, ধর্মীয় সভা-সমাবেশে যোগ দিচ্ছেন, ধর্মকথাও বলছেন, শীলও গ্রহণ করছেন, মুসলমান আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-কালামও পড়ছেন, রোজাও রাখছেন, দাঁড়ি রাখছেন, টুপিও পড়ছেন, আপনি হিন্দু ব্রত-উপবাসও রাখছেন, বিভিন্ন পূজা-পার্বণও উদযাপন করছেন, ভজন-কীর্তনও করছেন, দেব-দেবীর কাছে মাথা ঠেকাচ্ছেন, কপালে টিকা বা তিলকের লাগাচ্ছেন, লোক আপনাকে মনে করছে আপনি অনেক ধার্মিক। কারণ আপনার বাহ্যিক আবরণে তাই দেখাচ্ছে। এত কিছু করেও দেখা যাচ্ছে, আপনার ক্রোধ কমছেনা, আপনার হিংসা-বিদ্বেষ কমছেনা, আপনার লোভ-লালসা কমছে না, আপনার বাক্য সংযম নাই, কায় সংযম নাই, আপনার মন সংযম নাই এবং আপনার ইন্দ্রিয় সংযম নাই, আপনার কায়, বাক্য ও মন অসংযত। তাহলে বুঝতে হবে, যে ধর্মকে আপনি ধারণ করেছেন, তা সঠিক ধর্ম নয়। এখানেই ধর্ম ধারণের মাপকাঠি বা মানদণ্ড দেখা যায়। আপনি সঠিক ধর্মের শরণে নাই। আপনি কেবল হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম, খৃষ্টান, জৈন, শিখ ও পার্সী ইত্যাদি তথাকথিত ধর্মকে ধারণ করে আছেন। আপনি নিজের মধ্যে ধারণকৃত ধর্মকেও আপনি দর্শন করছেননা। বাহ্যিক ধর্মকেই কেবল আশ্রয় দিয়েছেন। নিজের মধ্যে ধারণকৃত ধর্মকে দর্শন করাই হল সত্যিকার ধর্ম দর্শন। যে ধর্ম ধারণ করলে আপনি প্রকৃত সুখ, শান্তি ও আনন্দ পাবেন, যে ধর্মকে ধারণ করলে আপনার কায়, বাক্য ও মন ইত্যাদি ইন্দ্রিয় সমূহ সংযত হবে, শান্ত হবে, সে ধর্ম হতে আপনি যোজন দূরে অবস্থান করছেন। মুখে ‘ধম্মং সরণং গচ্ছামি’ বললেও সত্যিকার ধর্মের শরণে আপনি নাই।
আপনি যে ধর্মকে ধারণ করেছেন, সে ধর্ম আপনাকে মৃত্যুর পর পরলোকে শান্তি দেবে, সুখ দেবে, পুরস্কার দেবে, স্বর্গ দেবে, বেহেস্ত দেবে, হেভেন দেবে, সেখানে অপার শান্তি, অপার ঐশ্বর্য ভোগ করবেন, অপার কাম বাসনার চরিতার্থ করবেন এ বিশ্বাসেই কেবল সাম্প্রদায়িক ধর্ম সমূহ বা লেবেল লাগানো ধর্ম সমূহ অনুসরণ করে চলেছেন। সেজন্য অনুসৃত ধর্ম সমূহের দ্বারা ইহ জীবনে আপনি অশান্তি, দুঃখ-কষ্ট ভোগ করলেও মৃত্যুর পর স্বর্গে অপার সুখ লাভের কল্পনা বা বিশ্বাস আপনার মধ্যে রয়েছে।
আমাদের দেখতে হবে যে, ধর্মের গুণ তো ‘অকালিকো’ অর্থাৎ অকালিক বা কখন ফল দেবে তার কোন কালাকাল নাই। যে ধর্ম অনুসরণে বর্তমানে যদি আপনি সুখ, শান্তি ও আনন্দ না পান, যে ধর্ম ধারণে আমরা প্রতি মুহূর্তে যদি ফল না পাই, সবকিছু যদি কেবল মৃত্যুর পর হয়, তাহলে সে ধর্ম ধারণে আমার লাভ কি? মৃত্যুর পর যে লাভ করব তারও নিশ্চয়তা কি? যে ব্যক্তি ইহ জীবনে অশান্ত, অসংযত, ক্রোধী, হিংসুক, লোভী, বিদ্বেষী হয়ে নিজেও দুঃখ ভোগ করছেন প্রতি পদে পদে এবং অপরকেও দুঃখ দিচ্ছেন বা দুঃখের কারণ হচ্ছেন, তিনি কিভাবে আশা করতে পারেন যে, মৃত্যুর পর স্বর্গে তার জন্য অপার সুখ অপেক্ষা করছে।
যে রকম ধর্ম আমরা ধারণ করব, সে রকম ধর্মের ফল আমরা প্রতি পদে পদে ভোগ করে থাকি। তারজন্য পরকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়না। ধর্মের ফল রয়েছে তৎকাল বা ‘সন্দিট্ঠিকো’ অর্থাৎ সন্দিষ্টিক। এখন ধারণ করলে এখন ফল পাবেন। এখন ধারণ করছেন, তার ফল এখন পাচ্ছেন, কি পাচ্ছেন না, তা পরীক্ষা করে দেখুন। যদি এখন ধারণ করছেন, আর ফল পাবেন মৃত্যুর পর, তাহলে বুঝতে হবে সে ধর্মের মধ্যে কোথাও গোঁজামিল বা গড়বড় রয়েছে। মৃত্যুর পর পরিণাম যাই আসুক না কেন, তা অন্য কথা। কিন্তু এখন অর্থাৎ বর্তমানে আমার কি হচ্ছে, কি পরিণাম আসছে, তা কি দেখতে নেই?
যদি ধর্ম ধারণে আমার এখন কোন পরিবর্তন না আসে, আমার লোভ, ক্রোধ, কামনা, বাসনা ও ঠক-প্রতারণা মূলক বিকার সমূহ হতে সামান্যও মুক্তি না আসে এবং মৃত্যুর পর কেহ আমাকে মুক্ত করে দেবে, কারও কৃপা দ্বারা আমি মুক্ত হয়ে যাব, তখন বুঝতে হবে যে, এরকম প্রবচন দাতারা ধোঁকাই দিচ্ছেন আপনাকে। ভাই! আপনি ধর্মের নামে মহা ধোঁকার মধ্যে রয়েছেন। এর থেকে বড় ধোঁকা ও প্রতারণা পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারেনা। ধর্মের নিয়ম তো আপনাকে এখানেই সংশোধন করবে। বর্তমানে সংশোধন করবে। বর্তমান শুদ্ধ হলে ভবিষ্যত তখন আপনাতেই শুদ্ধ হয়ে যাবে। ইহলোকের জীবন শুদ্ধ ও পবিত্র হলে পরলোক তো আপনাতেই শুদ্ধ হবে। বর্তমান সংশোধনই হল সত্যিকার ধর্ম। ইহলোক সংশোধন করাই হল ধর্ম। পরলোকের চিন্তা আমার দরকার নাই। ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে শুদ্ধ ধর্মের আশ্রয়ে সংশোধন করুন। পরক্ষণ তো বর্তমান ক্ষণেরই জন্ম দেওয়া সন্তান। বর্তমানকে সংশোধন করুন, ভবিষ্যত তো বর্তমানেরই সন্তান। তা আপনাতেই সংশোধন হবে। কেননা ধর্মের গুণ অকালিকো। ধর্মের গুণ সন্দিষ্টিক অর্থাৎ ক্ষণে ক্ষণে তৎকাল ফল প্রদানকারী। জীবনকে এভাবে পরিচালনা করলেই আপনি সত্যিকার অর্থে ধর্মের আশ্রয়ে আছেন বা ধম্মং সরণং গচ্ছামি অর্থাৎ ধর্মের শরণে গমণ করছেন। অন্যথায় নয়।