15/05/2022
হরে কৃষ্ণ
#নৃসিংহ চতুর্দশী ব্রত
***ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব ও ভগবানের সঙ্গে হিরণ্যকশিপুর মহাযুদ্ধ!
**ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব ভক্ত প্রহ্লাদকে বলেছেন-
"বর্ষে বর্ষে তু কর্তব্যং মমসন্তুষ্টি কারণম।
মহাগুহ্যম ইদম্ শ্রেষ্ঠং মানবৈর্ভবভীরুভি।।
অর্থাৎ আমার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে চতুর্দশী ব্রত কর্তব্য।জন্ম-মৃত্যুময় সংসার ভয়-ভীত মানুষ এই পরম গোপনীয় ও শ্রেষ্ঠ ব্রত পালন করবে
****দৈত্য-বালকেরা সবাই প্রহ্লাদের উপদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। তারা তাদের শিক্ষক ষণ্ড ও অমর্কের বৈষয়িক উপদেশ গ্রহণ করল না। অসুর বালকেরা কৃষ্ণভক্তিতে নিষ্ঠাপরায়ণ হয়ে যাচ্ছে দেখে ষণ্ড ও অমর্ক ভয়ভীত হয়ে রাজা হিরণ্যকশিপুর কাছে সমস্ত পরিস্থিতি জানালাে। অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে বলল, হে মন্দবুদ্ধি, তুই আমার শাসন লংঘন করেছিস, তুই একটা জেদী মূর্খ। আজই তােকে যমালয় পাঠাবাে। তুই জানিস, আমি ক্রুদ্ধ হলে সমগ্র ত্রিভুবন কাঁপে, আর তুই কার বলে ভয়শূন্য হয়ে আমার নির্দেশ অতিক্রম করছিস।
** প্রহ্লাদ বললেন, হে পিতৃদেব, দয়া করে আপনি আপনার আসুরিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করুন। আপনি বলের কথা জিজ্ঞেস করছেন, পরমেশ্বর শ্রীহরিই সমস্ত বলের উৎস। আপনার বলও তার কাছ থেকে আসছে। ইন্দ্রিয়ের বল, মনের বল, দেহের বল সব তিনিই। আপনার বিপথগামী মন ছাড়া আপনার এই জগতে কোনও শত্রু নেই। আপনি আমাকে অনর্থক শত্রু মনে করছেন। আপনার শরীরের ছয় রিপুর আপনি দাসত্ব করছেন, অথচ আপনি গর্বভরে মনে করছেন যে- আপনি ত্রিভুবনের সমস্ত শত্রুকে জয় করেছেন। এসব আপনার নিদারুণ অজ্ঞতা।
** হিরণ্যকশিপু বলল, ওরে হতভাগা মূর্খ প্রহ্লাদ, তুই নিজেকে অতি বুদ্ধিমান বলে মনে করছিস, এর মানে হল আমার হাতে তাের মরবার ইচ্ছা হয়েছে। এক্ষুনি তাের মস্তক বিচ্ছিন্ন করব, তাের পরম আরাধ্য ভগবান এসে তােকে রক্ষা করুক। আমি দেখতে চাই। নেশাগ্রস্ত উন্মত্তের মতাে হয়ে ক্রোধান্ধ হিরণ্যকশিপু খড়গ তুলে তিরস্কার করছিল।
**হিরণ্যকশিপু বলল, তুই যে সবসময় বলি যে তাের কোনও জগদীশ্বর আছে, সে নাকি সবার ঊর্ধ্বে। সে নাকি সবার নিয়ন্তা এবং সর্বব্যাপ্ত। তবে বল, সে জগদীশ্বর কোথায়, সে যদি সর্বত্রই থাকে, তাহলে আমার সামনের এই স্তম্ভটাতে কি সে আছে? ধুপধাপ শব্দে পদচারণ করে হিরণ্যকশিপু চিৎকার করে রাজ সিংহাসনের সম্মুখভাগে একটি স্তম্ভে সজোরে মুষ্ট্যাঘাত করতে লাগল।
**সেই সময় স্তম্ভ থেকে এক ভয়ংকর ধ্বনি উত্থিত হল। সেই ধ্বনিতে যেন ব্রহ্মাণ্ড কম্পিত হয়েছিল। বহু দেবতা মনে করেছিলেন, হায় এই আমাদের গ্রহলোকটি বুঝি নষ্ট হয়ে গেল! সেই অদ্ভুত প্রচণ্ড ধ্বনি কেউ কখনও পূর্বে শুনেনি। অসুরেরা ভয়ে ভীত হয়েছিল। দেখা গেল, স্তম্ভ ভেঙ্গে তার ভেতর থেকে এক অদ্ভুত রূপ আবির্ভূত হলেন। সেই রূপটি না মানুষের, না সিংহের। ভক্ত প্রহ্লাদ মনে করেছিলেন, ভগবানকে আমি দর্শন করলেও পিতা হিরণ্যকশিপু না দর্শন করতে পারেন, আবার স্বতন্ত্র ভগবানও স্তম্ভ থেকে আবির্ভূত হতে পারেন কিংবা না হতেও পারেন। পিতা আমাকে যদি বধ করে, করতেও পারে, সেটিই ভগবানের ইচ্ছা হতেও পারে কিংবা না হতেও পারে। কিন্তু আমি স্থিরভাবেই জানি একমাত্র রক্ষাকর্তা পরম নিয়ন্তা হছেন শ্রীহরি। তাঁর ইচ্ছা বিনা কোনও অবস্থাতেই কেউ আমার শরীর নষ্ট করতে পারবে না।
** ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই পরিস্থিতিতে ভক্তের বাক্যের সত্যতা প্রমাণ করবার জন্য স্তম্ভ থেকে প্রকাশিত হলেন। শ্রীহরি আশ্বাস দিলেন প্রহ্লাদকে “ভয় করাে না, আমি উপস্থিত আছি।”
অসুর হিরণ্যকশিপু তাকে দেখে বিস্ময়ান্বিত হয়ে চিন্তা করল, এ আবার কোন্ ধরনের জীব! রূপটি বিশাল ভয়ংকর ক্রোধান্বিত রূপ। দুটি চোখ তার স্বর্ণের মতাে উজ্জ্বল। উজ্জ্বল কেশররাশি তার ভয়ংকর মুখমণ্ডলকে বিস্তার করেছে। বড় বড় ভয়ানক দন্তসারি। জিহ্বাটি ক্ষুরধার খড়গের মতাে
চঞ্চল। উন্নত দুই কর্ণ নিশ্চল। মুখ এবং নাসিকা বিবর পর্বতের গুহার মতাে। চোয়াল ভয়ংকরভাবে বিস্তীর্ণ। তার শরীর আকাশকে স্পর্শ করছে। তার গ্রীবা হ্রস্ব ও স্থূল। বক্ষোদেশ বিশাল। উদর কৃশ। শরীরের লোম চন্দ্র কিরণের মতাে শুভ্র। তার অসংখ্য বাহু। সেই বাহুসমূহ যেন সেনাবাহিনীর মতো চতুর্দিকে বিস্তৃত। বাহুসমূহে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম এবং অন্যান্য অস্ত্রাদি ধারণ করে রয়েছেন। তিনি এভাবে দৈত্য দানব এবং নাস্তিকদের বিনাশ করবার জন্য উদ্যত হয়েছেন। আর তিনি ভীষণ গর্জন করছিলেন।
**এইরকম রূপ দেখে হিরণ্যকশিপু মনে মনে ভাবল মহা মায়াবী বিষ্ণু আমাকে হত্যা করার এই পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু তার এই চেষ্টায় আমার আর কি হতে পারে? আমার সঙ্গে কে যুদ্ধ করতে পারবে? আমাকেও আবার ওই বিষ্ণু ভয় দেখায় ? এই বলে হাতীর মতাে বিশাল-শরীর হিরণ্যকশিপু একটি গদা ধারণ করে ভগবানকে আক্রমণ করল। ক্রোধান্বিত হয়ে দ্রুতবেগে গিয়ে নৃসিংহদেবকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। কিন্তু নৃসিংহদেবের জ্যোতিতে হিরণ্যকশিপুর প্রভাব অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। যত বড় ভয়ংকর সাপ হােক না কেন পক্ষীরাজ গরুড় তাকে যেভাবে গ্রাস করে, হিরণ্যকশিপুকে নৃসিংহদেব সেভাবে গ্রহণ করলেন।
গরুড় যেমন খেলাছলে কখনও কখনও সাপকে মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযােগ দেয়, তেমনি নৃসিংহদেব তার কবল থেকে অসুর হিরণ্যকশিপুকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযােগ দিলেন। মেঘের আড়াল থেকে সেই ঘটনা দেবতারা দর্শন করছিলেন। কিন্তু তারা অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিলেন, নৃসিংহদেবের হাত থেকে বুঝি সে নিষ্কৃতি পেয়ে গেল। এদিকে হিরণ্যকশিপু মনে করল যে, এই মায়াবী বিষ্ণু আমার শক্তিতে ভীত হয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তখন সে ঢাল ও খড়গ নিয়ে পুনরায় মহাবেগে ভগবানকে আক্রমণ করল। ভগবান তখন অট্টহাস্য করে বাজপাখীর মতাে তীব্রগতিতে হিরণ্যকশিপুকে গ্রহণ করেছিলেন। সেই যুদ্ধটি মাটিতে বা পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ থাকল না, আকাশমার্গেও চলতে লাগল। নৃসিংহদেবের সুতীব্র অট্টহাসির ফলে ভয়ে হিরণ্যকশিপুর চোখ মুদিত হয়েছিল। যে দুর্ধর্ষ হিরণ্যকশিপু ইন্দ্রের মহা বজ্রের আঘাতেও অক্ষত থাকে, সেই দুর্ধর্ষ অসুরকে ভগবান এমনভাবে ধরেছিলেন যে সে কেবল হাত পা সঞ্চালন করছিল, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারল না।
গ্রন্থসূত্র- ভক্তবৎসল শ্রীনৃসিংহদেব