09/04/2023
দ্বিতীয় হিজরি। পৃথিবী অবাক, বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে আছে। কী ঘটতে যাচ্ছে! এটাও কি সম্ভব! ইতিহাস হয়রান! কী লিখবে ভেবে পাচ্ছে না। এমন আশ্চর্য ঘটনা দ্বিতীয়টা দেখেনি যে...
দৃশ্যপট ১:
যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে গেছে। শত্রু বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে এগিয়ে আসছে। এখন যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকলে ক্ষতির সীমা থাকবে না। সামান্য অবহেলায় মদীনা পর্যন্ত হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তিনি এমন অনিবার্য যুদ্ধ নিয়ে চিন্তিত। উম্মত তাঁর সঙ্গ দিবে তো! নাকি বনী ইসরাঈলের মত অস্বীকার করে বসবে! তাছাড়া যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদিও নেই। তাহলে কী ঘটতে যাচ্ছে?!
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মানসিক এই দুশ্চিন্তার কথা মহান সহচরগণ বুঝতে পারেন। সর্বপ্রথম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়ান। চমৎকারভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গ দানের মত ব্যক্ত করেন। তারপর হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়ালেন। তিনি বললেন– "আল্লাহ আপনাকে সত্য নবী হিসাবে পাঠিয়েছেন। আমরা আপনাকে নবী হিসাবে মেনে নিয়েছি। এখন আপনি যা আদেশ করবেন, তাই আমরা পালন করবো। আমরা বনী ইসরাঈল নই। আমরা আপনার উম্মত।"
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের কথা শুনে খুব খুশি হলেন। অন্তর থেকে খুব দোয়া করলেন। নবীজি তবু পেরেশান। আনসারি সাহাবিগণ কিছু বলেনি এখনও। অথচ সাহাবীগণের মধ্যে অধিকাংশ আনসারি। তাছাড়া তাদের সাথে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী তারা মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য নয়। তারা সামরিক ব্যয়ভার বহন করবে, এতটুকুই। তারপরও নবীজি আশাবাদী। তিনি সবার দিকে লক্ষ্য করে পরামর্শ দানের আবেদন করেন। মূলত আনসারি সাহাবীদের লক্ষ্য করেই এই আবেদনটি করেছেন।
আনসারি সাহাবীদের অধিনায়ক ও পতাকাবাহক সা'দ ইবনে মু'আয রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যাপারটি অনুধাবন করলেন। তিনি দাঁড়ালেন। নবীজি এবং তাঁর আনিত ধর্মের প্রতি আনুগত্যের কথা স্বীকার করলেন এবং বললেন– "হে আল্লাহ রাসূল, যদিও আমরা এই যুদ্ধ করতে বাধ্য নই, তবু আমরা আপনার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবো। আমরা আপনাকে একা ছেড়ে কোথাও যাবো না। আমরা বনী ইসরাঈলের মতো আচরণ করবো না। আমরা আপনার ডানে বামে, সামনে পিছনে, চতুর্দিকে বেষ্টন দিয়ে যুদ্ধ করবো। আপনি বললে আগুণেও ঝাঁপ দিবো। আপনার আদেশের বিন্দুমাত্র খেলাফ করবো না।"
সা'দ বিন মু'আয রাদিয়াল্লাহু আনহু'র এই কথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব আনন্দিত হলেন। চেহারা মোবারক খুশির দ্যুতিতে বহুগুণ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। তিনি সাহাবিদেরকে সামনে বাড়তে আদেশ দিলেন। কাফেলা সামনে বাড়তে থাকলো।
দৃশ্যপট ২:
বদর প্রান্তর। একপাশে সহায়সম্বলহীন মুসলিম বাহিনী, অপর পাশে পূর্ণ সামরিক সজ্জায় সজ্জিত কাফের বাহিনী। উভয় দল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আচানক কাফের বাহিনী থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে উতবাহ, শায়বা এবং ওয়ালিদ বেরিয়ে আসে। চিৎকার করে ডাক দেয়, আর বলে– "কে আসবি আয়, আমাদের তরবারির খেলা দেখে যা।" তাদের ডাক শুনে তিনজন আনসারি সাহাবি খোলা তরবারি নিয়ে এগিয়ে যায়। আউয, মুআব্বিজ এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুম। কুরাইশগণ তাদের সাথে মোকাবেলা করতে অস্বীকার জানায়। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে কুরাইশী মুহাজির চায়।
নবীজি হামযা, উবায়দা ইবনে হারিস এবং আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম-কে মোকাবেলার জন্য এগিয়ে যেতে বললেন। তাঁরা এগিয়ে গেলো। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। ওয়ালিদের বিপরীতে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু, শায়বার বিপরীতে হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উতবার বিপরীতে উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুহূর্তের মধ্যেই ওয়ালিদ এবং শায়বার মস্তক ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়লো। উতবার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু আহত হয়ে পড়েছিলেন। ইতোমধ্যে আলী ও হামযা আপন আপন প্রতিদ্বন্দ্বীকে খতম করে ফেলেছিলেন। ফলে এবার এদিকে মনোনিবেশ করেন। এবং উতবার জীবনও সাঙ্গ করে দেন। উবায়দা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে নিরাপদে যুদ্ধের ময়দান থেকে সরিয়ে আনেন।
যুদ্ধের সূচনা কাফেরদের জন্য বড় মন্দের বার্তা নিয়ে এলো। তারা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলো। ফলে মূল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে যুদ্ধে বিন্যাস্ত করে দিয়ে মহান রবের কদমতলে সেজদায় নত হয়ে পড়েন। কেঁদে কেঁদে স্বীয় রবের কাছে বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন– "হে আল্লাহ! তুমি আমাদের বিজয় দান করো। আজ যদি আমরা হেরে যাই, তাহলে দুনিয়াতে তোমাকে ডাকার মতো আর কেউ থাকবে না। তোমার গুণকীর্তন কেউ করবে না। হে মহান মালিক! আপনিই বিজয় দানকারী। আপনিই সকল ক্ষমতার অধিকারী। আপনি আমাদের বিজয়ী করুন।"
নবীজি আত্মভোলা হয়ে যান। কেঁদে কেঁদে দোয়া করতে থাকেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির অস্থিরতা দেখে ছুটে আসেন। নবীজিকে জড়িয়ে ধরেন। সান্ত্বনা দেন। আর বলেন– আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে নিরাশ করবেন না। আপনি শান্ত হোন।
দৃশ্যপট ৩:
যুদ্ধ শেষ। মুসলমানদের বিজয় হয়েছে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ সামনে প্রতিফলিত হয়ে আছে। ময়দানে ৭০ জন কাফেরের কর্তিত মস্তক পড়ে আছে। বাঘা বাঘা নেতাদের মস্তকও দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের মূল প্ররোচক আবু জাহেল নিকৃষ্টভাবে মারা পড়েছে। কাফেররা ভয়ে পালায়ন করেছে। বন্দি হয়েছে অনেকেই। অস্ত্রহীন, বাহন-বিহীন, সহায়সম্বলহীন সাহাবীগণের হাতে প্রচুর গনিমতের মাল জমা হয়েছে।
এই যুদ্ধে ১৪ জন মহান সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন। আল্লাহ তাঁদের উপর খুব সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাঁদেরকে বদর প্রান্তেই দাফন করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি করে। যুদ্ধ জয়ের ফলে বিশ্বনেতা হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্তৃত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। মদিনার নতুন রাষ্ট্রকে অন্য আরব গোত্রগুলি নতুন শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। মদিনার শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেকেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। মুসলিম উম্মাহর কাছে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ অনেক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হন।
হ্যাঁ হ্যাঁ, এতক্ষণ যাবৎ ১৭ই রমযানের কয়েকটি দৃশ্যপট এঁকে দেখালাম। মনে আছে তো, আজকেও কিন্তু ১৭ই রমযান। আসুন না– ১৭ই রমযানে ঘটিত বদরের প্রান্তে কতক্ষণ ঘুরে আসি। চেতনা গ্রহণ করি। ভবিষ্যৎ চলার পাথেয় এখান থেকে নেই। বদর যে আমাদের প্রেরণা। বদর আমাদের চিন্তার খোরাক। বদর আমাদের পথপ্রদর্শক। বদর আমাদের শিক্ষক। বদর আমাদের ভালোবাসা। বদর আমাদের সব।