23/07/2022
ইমাম সাহেবের স্ত্রী রাশেদা বেগম হাতে মেহেদি লাগাচ্ছেন। তিনি সময় নিয়ে এতো চমৎকার মেহেদি ডিজাইন করেন, আশেপাশের অনেক মহিলা তার কাছে মেহেদি নিয়ে আসে। হাতে সময় থাকলে গল্প করতে করতে তাদের হাতে মেহেদি লাগিয়ে দেন।
গতো রোজার ঈদে সন্ধ্যা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত শুনে গুনে নয়জনের হাতে মেহেদি দিয়েছেন। একজন একজন করে এসে বলতো, "ভাবি, এবার কিন্তু না করতে পারবেন না।"
চাঁদ রাতে পিঠা বানাতে চেয়েছিলেন। সবার আবদার দেখে আর পিঠা বানাবেন কিভাবে? মেহেদি মাখাতে একসাথে কয়েকজন আসতো। তারা বললো, "আপনি আমাদেরকে মেহেদি মাখান, আমরা পিঠা বানিয়ে দিচ্ছি!"
বছরে একদিন এলাকার মেয়েদের অনুরোধ ফেলতে পারেননি।
মেয়েদের হাতে মেহেদি মাখাতে মাখাতে তিনি অনেক গল্প বলতেন। তার মাদ্রাসা জীবনের গল্প, যে গল্পের সাথে বেশিরভাগ মেয়ে পরিচিত না।
মাওলানা ইয়াসির আলী স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, "বাসায় কি মেহেদি আরো আছে, নাকি নিয়ে আসবো?"
রাশেদা বেগম হাসলেন। তার কসমেটিক্সের বক্সে এতোগুলা মেহেদি আছে, মাওলানা সাহেব দেখলে ভড়কে যাবেন। যতোবার কসমেটিক্স কিনতে যান, সাথে একটা মেহেদি কিনেন।
স্বামীকে বললেন, "না, মেহেদি লাগবে না। আসার সময় আপেল নিয়ে আসবেন।"
মাওলানা ইয়াসির আলী বাজারে চলে গেলেন। 'এই সময়' স্ত্রীর ভালো খাবার দরকার। মাসের অন্য সময় বাসায় ফল না আনলেও এই চার-পাঁচদিন বিভিন্ন রকম ফল নিয়ে আসেন।
মাওলানার মেহেদি পাগলী বউ এই সময় আসলেই হাতে মেহেদি মাখে। নামাজ পড়তে হয় না, ওজু করতে হয় না। হাতে মেহেদি মাখলে অনেকদিন রঙ থাকে।
বেশিরভাগ সময় রাশেদা বেগম হাতে মেহেদি মেখে এসে বলে, "কেমন হলো?"
স্ত্রীর হাতে মেহেদি দেখে তিনি বুঝে ফেলেন স্ত্রী 'আর কী' বুঝাতে চাচ্ছে।
একবার পনেরো দিনের মাথায় রাশেদা বেগম দুইবার মেহেদি মাখেন। স্ত্রীর হাতে দ্বিতীয়বার মেহেদি দেখে মাওলানা সাহেবের চক্ষু চড়কগাছ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "পনেরোদিনের মধ্যে দুইবার? মানে কী?"
রাশেদা বেগম হাসতে হাসতে বলেন, "আরে, এবার এমনিতেই মাখছি। আপনি কী ভাবছেন? শুধু ঐসময়ই মেহেদি মাখবো?"
রাশেদা বেগম মাদ্রাসায় থাকতে একটি হাদীস পড়েছিলেন। একবার এককজন মহিলা আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ঋতুবতী নারীরা কি মেহেদি মাখতে পারবে?"
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা জবাব দেন, তিনি এবং নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যান্য স্ত্রীগণ সেই সময় হাতে মেহেদি মাখতেন। কিন্তু, নবিজী তাঁদেরকে বারণ করতেন না।
রাশেদা বেগমের মাদ্রাসায় নারীদের ফিক্বহের ক্লাস নিতেন একজন উস্তাদা। উস্তাদা নারী হওয়ায় ক্লাসের মেয়েরা সাবলীলভাবে নারী সংক্রান্ত মাসআলা জেনে নিতো।
সেদিনের ক্লাসে ঋতুবতী নারীর মেহেদি মাখা নিয়ে আর কেউ প্রশ্ন করেনি। সবাইকে চুপ থাকতে দেখে রাশেদা বেগম প্রশ্ন করেন, "উস্তাদা, তাহলে কি আমরা ঐসময় মেহেদি মাখবো?"
ক্লাসের সবাইকে অবাক করে দিয়ে উস্তাদা ফাতিমা কাওছার হাত মোজা খুলে তার হাতের মেহেদি দেখিয়ে বলেন, "অনেক ফক্বীহের মতে মেয়েদের এই সময় মেহেদি মাখা শুধু জায়েজই নয়, বরং মুস্তাহাব। আলকামা, আতা ইবনে আবি রাবাহ, ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহু আজমাইন) -দের মতে এই সময়কালে মেয়েদের জন্য মেহেদি মাখা উত্তম।"
রাশেদা বেগম সেদিন থেকে এই আমল করে যাচ্ছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, মেহেদি মাখা এখন তার সাংকেতিক ভাষা হয়ে গেছে।
[মুসলিম সভ্যতায় জ্ঞানার্জনের ইতিহাস নিয়ে লেখা 'উত্তরসূরী' উপন্যাস থেকে। উপন্যাসের দুটো চরিত্র হলো মালিবাগ শাহী মসজিদের ইমাম মাওলানা ইয়াসির আলী ও তার স্ত্রী রাশেদা বেগম।]
লেখা
#আরিফুল ইসলাম