30/11/2025
নতুন যারা একাদশী পালন করবেন তাদের জন্য শুদ্ধভাবে একাদশী পালনের সঠিক নিয়মাবলি দেওয়া হলো:-
একাদশী ব্রত পালনের একমাত্র প্রকৃত উদ্দেশ্যে কেবল উপবাস করা নয়। নিরন্তর ভগবান এর নাম স্মরণ, মনন, ও শ্রবন কীর্তনের মাধ্যমে একাদশীর দিন অতিবাহিত করতে হয়। এই দিন যতোটুকু সম্ভব উচিত একাদশী পালনে পরনিন্দা, পরচর্চা, মিথ্য ভাষণ, ক্রোধ, দুরাচারী, স্ত্রী সহবাস, সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ। নিন্মোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে তা পালন করতে হবে।
১) সমর্থ পক্ষে দশমীতে একাহার, একাদশীতে নিরাহার, ও দ্বাদশীতে একাহার করতে হবে।
২) তা পালন করতে অসমর্থ হলে, শুধু মাত্র একাদশীতে অনাহার করতে হবে।
৩) যদি তাও পালনে অসমর্থ হলে, একাদশীতে অবশ্যই পঞ্চ রবিশস্য বর্জন করবে। ফলমূলাদি অনুকল্প গ্রহণের বিধান রয়েছে।
● একাদশী ব্রতের আগের দিন রাত ১২ টার আগেই অন্ন ভোজন শেষ করে নিতে হয়। ঘুমাতে যাওয়ার আগে অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করে নিতে হবে যাতে দাঁতে বা মুখে একটুকরো অন্ন লেগে না থাকে।
● ব্রম্ভমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করে (ভোর ৪-৪ঃ৩০) শুচিশুদ্ধ হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মঙ্গল আরতিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে প্রার্থনা করতে হয়, “হে শ্রীকৃষ্ণ, আজ যেন এই মঙ্গলময়ী পবিত্র একাদশী সুন্দরভাবে পালন করতে পারি, আপনি আমাকে কৃপা করুন।”
● একাদশীতে শরীর ও মাথাতে প্রসাধনীর ব্যবহার নিষিদ্ধ, যেমন – সুগন্ধী সাবান, তেল, শ্যাম্পু ইত্যাদি। এছাড়া একাদশীতে পরনিন্দা-পরচর্চা, মিথ্যাভাষণ, ক্রোধ, দিবানিদ্রা, সাংসারিক ঝামেলা বর্জনীয়। এই দিন গঙ্গা আদি তীর্থে স্নান করতে হয়। মন্দির মার্জন, শ্রীহরির পূজার্চনা, স্তবস্তুতি, গীতা-ভাগবত পাঠ আলোচনায় বেশি করে সময় অতিবাহিত করতে হয়।
● এই তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের লীলা স্মরণ এবং তাঁর দিব্য নাম শ্রবণ করাই হচ্ছে সর্বোত্তম। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের একাদশীতে ২৫ মালা বা যথেষ্ট সময় পেলে আরো বেশি জপ করার নির্দেশ দিয়েছেন, তবেই আপনি চিণ্ময় আনন্দ অনুভব করবেন।
(১ মালা = ১০৮ বার)।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে,
হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।
● একাদশীর দিন সকল প্রকার ক্ষৌরকর্ম যেমন – দাড়ি-গোঁফ কাটা (শেভিং), চুল, নখ ইত্যাদি কাটা নিষিদ্ধ।
● একাদশীর সময়কালে সব্জি কাটার থেকে সতর্ক থাকতে হবে। যেনো কোথাও কেটে না যায়। একাদশীতে র*ক্ত ক্ষরণ বর্জনীয়।
● একাদশী ব্রত পালনে ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ আদি বহু অনিত্য ফলের উল্লেখ শাস্ত্রে থাকলেও শ্রীহরিভক্তি বা কৃষ্ণপ্রেম লাভই এই ব্রত পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য। ভক্তগণ শ্রীহরির সন্তোষ বিধানের জন্যই এই ব্রত পালন করেন। পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, বরাহপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ও বৈষ্ণবস্মৃতিরাজ শ্রীহরিভক্তিবিলাস আদি গ্রন্থে এ সকল কথা বর্ণিত আছে।
● হরিবাসরে (একাদশীতে) রাত্রি জাগরণের বিধি আছে। মহান গোস্বামীগন ও আচার্যবৃন্দের অনুমোদিত তালিকা বা পঞ্জিকায় যে সমস্ত একাদশী নির্জলা (জল ব্যতীত) ব্রত পালনের নির্দেশ প্রদান করেছেন, সেগুলি সেই মতো পালন করলে সর্বোত্তম হয়।
● একাদশীর মাহাত্ম্য ভগবদ্ভক্তের শ্রীমুখ হতে শ্রবণ করতে হয় অথবা সম্ভব না হলে নিজেই ভক্তি সহকারে পাঠ করতে হয়। কৃষ্ণ ভজন, কৃষ্ণ কথা, শ্রীমদ্ভাগবতম, শ্রীমদ্ভাগবত কথা, চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাকথা, জগন্নাথদেবের লীলাকথা প্রভৃতি পাঠ করতে হবে। সম্ভব হলে শুদ্ধ ভক্তের শ্রীমুখ হতে শ্রবণ করতে হবে।
● নির্জলা ও নিরাহার থেকে একাদশী পালন করতে একান্ত অপারগ হলে জল সহ কিছু সবজি, ফলমূল গ্রহণ করতে পারবে। নির্জলা উপবাস শুষ্ক উপবাস নামে পরিচিত। যেমন, আলু, মিষ্টি আলু, কুমড়ো, চালকুমড়ো, পেঁপে, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি সবজি, ঘি, সূর্যমুখী তেল অথবা বাদাম তেলে রান্না করে ভগবানকে উৎসর্গ করে, আহার করতে পারবেন। কাঁচা হলুদ অথবা ঘরে বানানো গুঁড়ো হলুদ, মরিচ, সৈন্ধব লবণ (Rock salt) ব্যবহার করবেন।
● আবার অন্যান্য আহার্য যেমন, দুধ, দই, কলা, আপেল, আঙুর, আনারস, আঁখ, আমড়া, তরমুজ, বেল, নারিকেল, আলু, বাদাম, লেবুর শরবত ইত্যাদি ফলমূল খাওয়া যায়।
● একাদশীতে সাবু খাওয়া যায় তবে অনেকক্ষেত্রে সাবু দানার উপর ময়দার কোটিং দেওয়া হয় ভারি করার জন্য, নিশ্চিত না হলে সাবু না খাওয়াই ভালো।
● একাদশীতে পাঁচ প্রকার রবিশস্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে —
১) ধান জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন, চাল, মুড়ি, চিড়া, সুজি, পায়েস, খিচুড়ি ,চালের পিঠা, খৈ, ইত্যাদি।
২) গম জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন, আটা, ময়দা, সুজি, বেকারির বিস্কুট, বা সকল প্রকার বিস্কুট, বেকারির রুটি, হরলিক্স জাতীয় ইত্যাদি।
৩) যব বা ভূট্টা জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন, ছাতু, খই, রুটি ইত্যাদি।
৪) ডাল জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন, মুগ, মসুরী, মাসকলাই, খেসারী, ছোলা, অড়হর, বিউরি, মটরশুঁটি, বরবটি, সিম ইত্যাদি।
৫) সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, তিল তেল, ইত্যাদি।
● একাদশীতে রান্নার সময় পাঁচ ফোড়ন ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিত। কারন, পাঁচ ফোঁড়নে অনেক সময় সরিষার তেল ও তিল থাকে, যা বর্জনীয়।
● একাদশীতে খাদ্যশস্য গ্রহণ করলে যে পা*প হবে অন্যকে খাওয়ালেও সেই একই পা*প হয়।
● একাদশীতে চা, বিড়ি, সিগারেট, পান, কফি, মদ, আফিম, গাঁজা, বা অন্য কোনও জাতীয় নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করবেন না।
হরে কৃষ্ণ 🌺🌿