26/03/2026
একবিংশ শতাব্দীতে ভিক্ষুসংঘ: আধুনিক মনন ও প্রাচীন বিনয়ের এক অপূর্ব সমন্বয়
লিখেছেন: ভিকখু বিপস্সি
সময় গতিশীল। সময়ের পরিক্রমায় ভৌগোলিক পটপরিবর্তন হয়। বস্তু পরিবর্তন ঘটে। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের পালাবদল হয়। একই সাথে মানুষের খাদ্যাভাস, জীবনযাত্রা ও চিন্তারও প্রতিফলন ঘটে। বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ মানব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের স্বরুপতা ও মননশীলতা কেমন হওয়া উচিত-তা নিয়ে বৌদ্ধ দর্শনের মৌলিক নীতিবিধানকে সমুন্নত রেখে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা যেতে পারে। আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে সময় বদলায় কিন্তু বিনয় বা নৈতিকতার ভিত্তি অপরিবর্তিত থেকে যায়। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এটিও মনে রাখতে হবে, আধুনিকতা মানে বুদ্ধের শিক্ষাকে বাদ দিয়ে নয় সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থায় অবদান রাখা: বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল একজন ভিক্ষু হিসেবে ত্রিপিটক মূখস্থ বা একমুখী শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বরং বুদ্ধি, বিবেচনা, যোগ্য ও দক্ষতার সাথে লব্দ জ্ঞানকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বুদ্ধের বাণীকে নিছক অলৌকিকভাবে উপস্থাপন না করে বরং তাত্ত্বিক, বিশ্লেষণধর্মী, যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্বপ্নবাজ তরুণ প্রজন্মের দৌড়গড়ায় পৌছে দেয়া। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, বিশ্ব ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্যক স্বচ্ছধারণা থাকা প্রয়োজন। ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করা। ধর্মপ্রচারের সুবিধার্থে মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা। যাতে করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বুদ্ধের অহিংস নীতি ও সাম্যর বাণী তুলে ধরতে সহজতর হয়। তথ্য প্রযুক্তি ও মিডিয়া লিটারেসির মাধ্যমে ইন্টারনেট জগতে ভূল তথ্য বা অপপ্রচার রোধে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে সচেতন ও দক্ষতা অর্জন করা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সদ্ধর্মের প্রচার ও প্রসারে সোশ্যাল মিডিয়াকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা। নেট দুনিয়ায় অনলাইন ধম্মক্লাস, কাউন্সেলিং করা। তুলনামূলক অন্যান্য ধর্মতত্ত্বে সম্যক ধারণা রাখা। অর্থাৎ, সদ্ধর্মের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা। এতে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। একবিংশ শতাব্দীতে ভিক্ষুসংঘকে সংকীর্ণ মানসিকতার উর্ধ্বে গিয়ে মৈত্রীর রসায়নে সকল ধর্ম ও বর্ণ মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেতন থাকা।
সক্রিয় সামাজিক ভূমিকা রাখা: ভিক্ষুসঙ্ঘ কেবল পূজনীয় অবস্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আত্মহিত ও পরহিতে কাজ চালিয়ে নেয়া। কেবলমাত্র অরণ্যচারী কিংবা বিহারবাসী হয়ে নয় বরং সমাজের সংকটে সক্রিয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে বৌদ্ধ বিহারসমূহকে নিছক উপাসনালয় নয় বরং জ্ঞানচর্চার আদর্শ পাঠাগার হিসেবে গড়ে তোলা। যেখানে তরুণ প্রজন্ম নৈতিক শিক্ষা ও সুস্থ চিন্তার খোরাক পাবে। বর্তমান ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ নানা মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। মানসিক বিষন্নতা, অবসাদগ্রস্থ মানুষকে পরিত্রাণে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর হিসেবে মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে মানুষের দুশ্চিতা দূর করতে সাহায্যে করতে পারে। একই সাথে সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার দূরীকরণে- যা কিছু অহিতকর, পরিহানীমূলক, কলহ-অশান্তি সৃষ্টি হয়, মাদক বাণিজ্য ও সূরাপানের কুফল এবং জাতিগত বৈষম্য নিরসনে ভূমিকা রাখা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল, পাঠাগার ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিচালনায় জনসচেতনতা তৈরি করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীতে সেবামূলক কাজে অংশ নিয়ে আর্তমানবতায় সেবায় নিবেদিত হওয়া।
পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি ও অবদান রাখা: গৌতমের জন্ম, সিদ্ধিলাভ, ধর্মপ্রচার, ভ্রমণ এবং নির্বাণ সবকিছু পরিবেশের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি প্রকৃতিকে পছন্দ করতেন। তাঁকে প্রকৃতিপ্রেমী বললেও অমূলক হবে না। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত বিধি এবং সকল প্রাণীর সাথে সহাবস্থানের আহ্বান করে গেছেন। বৈশ্বিক দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন এবং সংকট মোকাবেলায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচি, প্লাস্টিক পণ্য বর্জন এবং অরণ্য সংরক্ষণে ভিক্ষুগণ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।
চারিত্রিক নির্মলতা ও বিনয় রক্ষা: ভোগবাদী সমাজে ভিক্ষুদের সরল জীবনযাপন আত্মমুক্তির সহায়ক। লোভহীন, অর্থ ও সম্পদের মোহে না পড়ে ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল থাকা। ত্যাগ ও সরল জীবনযাপনে আদর্শ জীবনশৈলী গঠন করা। মধ্যমপন্থায় প্রজ্ঞানুশীলন করা। নিজেকে এমনভাবে তৈরি করা যাতে তাঁর উপস্থিতিতে অনুসারিদের মনে প্রশান্তি আসে। কেননা, ভিক্ষুদের গ্রহণযোগ্যতা মূলত তাদের সংযমতা ও বিনয়ে। একবিংশ শতাব্দীতে ভিক্ষুগণ হবে আধুনিক, বাস্তববাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক অন্যদিকে বিনয়ী ও তপোনিষ্ঠ। তাঁরা সমাজের আলোকবর্তিকা, প্রজ্ঞা ও করুণার মাধ্যমে অশান্ত পৃথিবীকে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিবেন।
ভবতু সব্বমঙ্গলম- জগকে সর্বদা মঙ্গল বিরাজ করুক।