18/11/2022
আপনি কি জানেন! আপনার একমুঠো চাউল বিশাল চৈত্য গড়ে উঠবে! অতএব, আপনি অকৃপণ চিত্তে দান করতে পারেন, আপনার পরিবারের জন্য সকাল-সন্ধ্যা রন্ধনশালায় নিয়ে যাওয়া ভাগ হতে ‘একমুঠো চাউল’। -সংঘরাজ ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের
একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েও যিনি শুধুমাত্র ধর্মীয় ধ্যান-সাধনার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তৎকালীন সমতল, পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দীন-হীন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা দেখে ধর্মীয় সাধনার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে তাঁর আগমন ছিল পাহাড়ি বৌদ্ধদের শিক্ষা বিস্তারে নব দিগন্তের উন্মোচন। অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা, পুরোদিন অতিবাহিত হয়ে যায় দু’বেলা অন্ন জোগানে, নেই শিক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা! তিনি উপলব্ধি করলেন সহজ, সরল মনের অধিকারী এ পাহাড়ি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠিদের প্রকৃত জীবনবোধ-সচেতনতা শেখাতে প্রয়োজন বৌদ্ধিক ধর্মীয় অনুশাসন ও সাধারণ শিক্ষা। সে দূরদর্শী-মহানুভব চিন্তা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পালি টোল, পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম প্রভৃতি। আশ্রমে আশ্রিত হল অনাথ, অসহায়, ছিন্নমূল, হতদরিদ্র পাহাড়ি বৌদ্ধ শিশু। তাদের ভরণ পোষণে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করলেন ‘মুষ্টি চাউল’ দানের। পরবর্তীতে এ ‘মুষ্টি চাউল’ প্রথা সমগ্র দেশব্যাপি বৌদ্ধদের উন্নয়নের অন্যতম উৎস হিসেবে প্রবর্তিত হয়। তিনিই প্রথম বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গরীব, অনাথ, অসহায় শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা করেন।
তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন বাংলাদেশের সমগ্র বৌদ্ধগণকে উপকৃত করে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ত্রিপিটক প্রচার বোর্ড, চন্দ্রঘোনা জ্ঞানশ্রী শিশু সদন, কদলপুল অনাথ আশ্রম ও ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার, সংঘরাজ ভিক্ষু মহামণ্ডল ধর্মীয় শিক্ষা পরিষদ, ত্রৈমাসিকা পত্রিকা ‘ধর্মায়তন’, জোবরা গুণালংকার বৌদ্ধ অনাথালয়, পশ্চিম বিনাজুরী ধর্মকথিক অনাথ আশ্রম, পশ্চিম বিনাজুরী উচ্চ বিদ্যালয়, উচাই সূর্যপুর জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ বিহার, নূরপুর জ্ঞানশ্রী বৌদ্ধ বিহার, বাংলাদেশ বুদ্ধ শাসন কল্যাণ ট্রাস্ট প্রভৃতি জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠান। সে সাথে তিনি বহু গুণী শিষ্য-প্রশিষ্য গড়ে তোলে বৌদ্ধ সমাজকে আলোকোজ্জ্বল করে তোলেন।
অনবদ্য কর্মযজ্ঞের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি থাইল্যান্ড হতে ‘শাসনশোভন জ্ঞানভাণক’, বার্মা সরকার কর্তৃক ‘মহাসদ্ধম্মজ্যোতিকাধ্বজ’, থাইল্যান্ড’র মহাচুলালংকার বিশ্ববিদ্যালয় হতে ‘ডক্টরেট ডিগ্রি’র মত দূর্লভ সম্মাননা লাভ করেন। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারী, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় পদক ”একুশে পদক” প্রদান পূর্বক সম্মানিত করা হয়।
তিনি আমাদের জ্ঞান বাতিঘর, সদ্ধর্মের অনন্য এক পুরোধা, ক্ষণজন্মা সংঘমনীষী, অনাথপিতা, সদ্ধর্মাদিত্য, বিনয়াচার্য, বাংলাদেশের বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয়গুরু মহামান্য ত্রয়োদশ সংঘরাজ শাসনশোভন জ্ঞানভাণক ড. জ্ঞানশ্রী মহাথের। জন্ম তাঁর ১৯২৫ সনের ১৮ নভেম্বর, চট্টগ্রামের রাউজানস্থ উত্তর গুজরা (ডোমখালী) গ্রামে। গৃহীনাম লোকনাথ বড়ুয়া, পিতা প্রেমলাল বড়ুয়া, মাতা মেনকা বালা বড়ুয়া। পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ব্রতী হন বৈরাগ্য জীবনচর্চায়, ১৯৪৪ সনে প্রব্রজ্যা গ্রহণ; উপসম্পদা ১৯৪৯ সনে, উপ-সংঘরাজ ভদন্ত গুণালংকার মহাথের’র উপাধ্যায়ত্বে।
‘জ্ঞানশ্রী’ নামের সার্থক মহাজীবন; অমিয় সুন্দর জ্ঞান, মহানুভব এ সংঘ-পুদ্গল বর্তমানে জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছালেও বিনয় আদর্শে নিজেকে সমুন্নত রাখার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া, দু:স্থ, অনাথ ও অসহায়দের জীবনমান উন্নয়নে অধ্যাবধি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি সমতল-পার্বত্য বৌদ্ধ এলাকার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বিহার এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে বৌদ্ধদের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁর গৌরবময় ত্যাগদীপ্ত জীবন আমাদের অনুপম আশীষ।
শুভ জন্মদিন হে গুরুবর!!