25/07/2026
শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা
শুভ আষাঢ়ী পূণিমা বৌদ্ধদের কাছে অতি তাৎপর্যময় পুণ্যতিথি। এ পূর্ণিমা তিথিতে তথাগত বুদ্ধের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে রাজকুমার সিদ্ধার্থের মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, গৃহত্যাগ (মহাভিনিষ্কমণ), সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষুদের নিকট ভগবান বুদ্ধের প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তনসূত্র দেশনা, শ্রাবস্তীর গণ্ডম্ব বৃক্ষমূলে যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন, মাতৃদেবীকে ধর্মদেশনার জন্য
তুষিত স্বর্গে গমন এবং ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষা বাসব্রত আরম্ভ।
তথাগত বুদ্ধের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে। তাই বৌদ্ধদের কাছে পূর্ণিমা আসে জীবনে পূর্ণতা সাধনের জন্য। তথাগত বুদ্ধ যেমন নিজ প্রচেষ্টায় জীবনে পূর্ণতা সাধন করে মহাবোধি বা আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, জগজ্জ্যোতি বুদ্ধত্ব প্রাপ্ত হন, ঠিক তেমনিভাবে পূর্ণচন্দ্রের মতো নিজের জীবনকে ঋদ্ধ-সমৃদ্ধ লাভ করাই প্রতিটি বৌদ্ধের আত্মপ্রচেষ্টা। তেমনি আষাঢ়ী পূর্ণিমাও বৌদ্ধদের জীবনে বিচিত্র রূপ পরিগ্রহ করে বৌদ্ধদের কাছে অতিস্মরণীয় হয়ে আছে।
আজ হতে আড়াই হাজার বছরেরও অধিক আগের ঘটনা। কপিলাবস্তু নগরে আষাঢ়ী পূর্ণিমা সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো। রাজন্তপুরেও পালিত হতো এ পুণ্যোৎসব। রাজা শুদ্ধোধনের মহিষী রানী মহামায়া আষাঢ়ী পূর্ণিমার উপোস ব্রত অধিষ্ঠান করলেন। সে রাতে রানী মহামায়া স্বপ্নমগ্ন হয়ে দেখলেন চার দিকপাল দেবগণ এসে পালঙ্কসহ মায়াদেবীকে নিয়ে গেলেন হিমালয়ের পর্বতে সুবিস্তৃত এক সমতল ভূমির ওপর। তখন তারা মহামায়াকে সুউচ্চ মহাশাল বৃক্ষতলে রেখে সশ্রদ্ধ ভঙ্গিমায় এক প্রান্তে দাঁড়ালেন। তারপর মায়াদেবীকে তাদের মহিষীগণ এসে হিমালয়ের অনবতপ্ত হ্রদে (মানস-সরোবর) স্নান করিয়ে দিব্য (স্বর্গীয়) বসন-ভূষণ ও মাল্য গন্ধে সমলঙ্কৃত করলেন। অনতিদূরে শোভা পাচ্ছিল এক রজতপর্বত। সেই পবর্তে ছিল এক সুবর্ণ প্রাসাদ। চারদিক পাল দেবগণ মহারাজা পালঙ্কসহ দেবীকে সেই প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দিব্য শয্যায় শয়ন করালেন। তখন অদূরবর্তী সুবর্ণ পর্বত থেকে নেমে এসে উত্তর দিক থেকে অগ্রসর হয়ে রজত পর্বতে আরোহণ করল। রজত একটি শে^ত পদ্মধারণ করে অবলীলাক্রমে কবিবর মহাক্রোষ্ণনাদে সুবর্ণ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। তৎপর ধীরে ধীরে তিনবার মাতৃশয্যা প্রদক্ষিণ করে তার দক্ষিণ পাশর্^ভেদ করে মাতৃজঠরে প্রবেশ করল। কিন্তু তা স্বপ্ন নয়। অলৌকিক বাস্তব ঘটনা; যা ঘটে গেল স্বপ্নাকারে। তখন চারদিকে দিব্য আভায় উদ্ভাসিত হলো। এ রূপে উত্তরাষাঢ়ী নক্ষত্র যোগে মাতৃ কুক্ষিতে প্রতিসিদ্ধ গ্রহণ করলেন ভাবী বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব। সেই আষাঢ়ী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতেই এ অলৌকিক স্বপ্ন দর্শনে ভীত হলেন না রানী মায়াদেবী। যেন দিব্য এক পুলকে অভিভূত তিনি। পরদিন প্রত্যুষে দেবী রাজাকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত জানালেন। রাজা কাল বিলম্ব না করে চৌষট্টিজন জ্যোতির্বিদ এনে স্বপ্নের ফল জানতে চাইলেন। বিপ্রগণ বললেন, মহারাজ চিন্তা করবেন না, আপনার মহিষী সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। লাভ করবেন তিনি এক দেব দুর্লভ পুত্ররত্ন। তখন বসুন্ধরা হবে ধন্য। তিনিই সে মহামানব সিদ্ধার্থ রূপে জন্ম নিলেন রাজ পরিবারে।
সিদ্ধার্থ গৌতমের বয়স তখন ২৯, তখন তার যৌবন পরিপূর্ণ। ভরা যৌবনের মাদকতা তার কাছে নেই। সর্বদা বৈরাগ্য চিন্তায় মনকে উদাসীন করে তোলে। এ অবস্থা দেখে রাজা শুদ্ধোধন কুমার সিদ্ধার্থ গৌতমকে সুন্দরী যশোধরার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেন। ফিরে এলো সেই আষাঢ়ী পূর্ণিমা। এ তিথিতেই সিদ্ধার্থ পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, ভোগ-বিলাস, রাজ্য, ধন, সবকিছুকে তুচ্ছ মনে করে মহাভিনিক্রমণ অর্থাৎ সংসার ত্যাগ করলেন। সমস্ত তৃষ্ণার বন্ধনকে ছিন্ন করে জগতের মুক্তির জন্য এ তার আত্মত্যাগ।
জগতের ইতিহাসে এরূপ আর কোনো মহাপুরুষের জীবনে দৃষ্টান্ত নেই। ভোগের পৃথিবীতে এরূপ ত্যাগের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তা জীব-জগতের দুঃখ মোচনের জন্য। অতঃপর রাজকুমার গয়ার বোধিদ্রুম মূলে ৬ বছর কঠোর সাধনার পর চরম ও পরম জ্ঞান ‘মহাবোধি’ লাভ করলেন। সম্যক সম্বুদ্ধ হিসেবে দেব মানবকে প্রজ্ঞার আলো বিতরণে তার আবিভূাব। বুদ্ধত্ব লাভের পর তথাগত (সম্যক সম্বুদ্ধ) চিন্তা করতে লাগলেন তার নবলব্ধ ধর্ম সর্বপ্রথম কার কাছে প্রকাশ করবেন। সিদ্ধার্থ গৌতম গৃহ ত্যাগের পর প্রথম সাক্ষাৎ পান ঋষি আড়ার কালামের। সেই ঋষি আড়ার কালামের কথা চিন্তা করতেই দিব্যজ্ঞানে দেখেন তিনি পরলোকগমন করেছেন। দ্বিতীয় সাক্ষাৎপ্রার্থী রামপুত্র রুদ্রকের কথা স্মরণ করে জানতে পারেন তিনি পরপারের যাত্রী হয়েছেন। কাকে তার প্রথম নবলব্ধ ধর্ম প্রকাশ করবেন সেই চিন্তা করতে গিয়ে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যের কথা মনে পড়ল। তখন তিনি সারানাথে ঈষি-পত্তন মৃগদাবে গমন করলেন। এই পঞ্চবর্গীয় শিষ্য তার ধ্যানের সঙ্গী ছিলেন। সিদ্ধার্থ কৃচ্ছ্র সাধনা ত্যাগ করে মধ্যম পথ গ্রহণ করলে তারা তাকে ত্যাগ করে চলে যান। তথাগত বুদ্ধ সেই আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিনে ঈষি-পত্তন মৃগদাবে সেই পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে সর্বপ্রথম ধর্ম দেশনা ধর্মচক্র প্রবর্তনসূত্র দেশনা করলেন। তার নবলব্ধ সদ্ধর্মকে প্রকাশ করলেন। তিনি সেই ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রে বললেনÑ ‘হে ভিক্ষুগণ, দুটি রচরমে প্রব্রজিত ভিক্ষু শ্রামণদের যাওয়া উচিত নহে। সেই দুটি কী কী? প্রথমত হীন গ্রাম্য ও সাধারণ জনসেবিত অনার্য ও অনর্থ কর কাম্য বস্তুতে অনুরক্ত হওয়া আর দ্বিতীয়ত অনার্য ও অনর্থযুক্ত আত্মক্লেশজনিত দুঃখবরণ। এই দুই অন্ত ত্যাগ করে তথাগত মধ্যমপথ অধিগত হয়েছে, যা চক্ষু উৎপাদনকারী এবং যা মানুষকে নির্বাণের দিকে সংবর্তিত করে।’
ভগবান বুদ্ধের এ মধ্যম পথের শিক্ষা হলোÑ আর্যসত্যসমূহের দর্শন লাভ। সংসার দুঃখকে অতিক্রম হেতু যে মার্গ দর্শন। মার্গজ্ঞান ক্ষণেই চার আর্য সত্য প্রত্যক্ষ করেন। তা সংসার দুঃখ বিনাশের হেতু। সংযুক্ত নিকায়েরসচ্চ সংযুক্ত তৃতীয়বর্গে বলা হয়েছেÑ ‘যারা দুঃখ, দুঃখোৎপত্তি, দুঃখ নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধের মার্গ চিত্তবিমুক্তি ও প্রজ্ঞা বিমুক্তি জানেন না, তারা জন্ম, জরাদির অধীন এবং তারা দুঃখের অন্ত সাধন করতে সক্ষম। যারা উক্ত আর্যসত্য জানেন, জন্ম, জরাদিও অধীন না হয়ে সর্বদুঃখের অন্তসাধন করতে সক্ষম।’
ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষুদের উদ্দেশে বলেছেনÑ ‘ভিক্ষুগণ! চার আর্যসত্যের অনুরোধ ও পটিবোধের অভাবে আমাকে ও তোমাদিগকে দীর্ঘকাল জন্ম হতে জন্মান্তরে এবং ভব হতে ভবান্তরে সন্ধাবন ও সংসরণ করতে হয়েছে। ভিক্ষুগণ! সে চার আর্যসত্য বর্তমানে অনুবুদ্ধ ও পটিবিদ্ধ হয়েছে। এখন ভব তৃষ্ণা উচ্ছিন্ন হয়েছে, ভবরজ্জু ক্ষীণ হয়েছে। আর পুনর্জন্ম নেই।’সিদ্ধার্থ গৌতমের বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির সপ্তম বছর পর আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিবসে শ্রাবস্তীর নগর দ্বারে গণ্ডম্ব বৃক্ষমূলে যমক প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন করে। অতঃপর ঋদ্ধি প্রদর্শন করে ক্রমে ত্রিপদ বিক্ষেপেতাবতিংশ দেবলোকে উপস্থিত হয়েছিলেন। তথায় তিনি অভিধর্ম দেশ না করার মানসে পারিজাত বৃক্ষ মূলে পাণ্ডুকম্বল শিলাসনে উপবেশন করলেন। দশ সহস্র চক্রবালের দেব-ব্রহ্ম তখনবুদ্ধ সন্নিধানে সম্মিলিত হলেন। বুদ্ধের অনুপমষড়শ্মি দেবব্রহ্মের দিব্য জ্যোতিকেও অভিহিত করল। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা পুণ্য তিথিতেই তথাগত বুদ্ধ তাবতিংশ স্বর্গে বর্ষাবাস গ্রহণ করেছিলেন। এ বর্ষাবাসের কারণ তার মাতৃদেবীকে র্নিবাণ লাভের হেতু উৎপন্ন করা।
তাই এ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ পূর্ণিমার মাহাত্ম্য বর্ণনাব্যাপক। অনেক পুণ্যময় ও তাৎপর্যময় স্মৃতিবিজড়িত এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বাংলাদেশেও অনুরূপভাবে এ আষাঢ়ী পূর্ণিমা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে প্রতিপালিত হয়ে আসছে। আজ থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস আরম্ভ।
বর্তমান এমন সময়ে শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা সমাগত পুরো পৃথিবীর মানুষ মারণঘাতী করোনাভাইরাসের মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন। পৃথিবীতে মানুষের জন্য এটা বৈশি^ক মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ চায় গোটা পৃথিবীর মানবজাতি। এ করোনাভাইরাস আমাদের সবাইকে মানবিক হতে শিক্ষা দিচ্ছে। ভগবান বুদ্ধের মতো আত্মত্যাগী হয়ে এ কঠিন পরিস্থিতি থেকে মানবজাতিকে রক্ষায় যত্নবান হই। বিশ^মানবতা সভ্যতার অনন্য পুণ্যময় তিথিকে স্মরণ করে আত্মসংযমী হয়ে সবাই নির্বাণ লাভের হেতু উৎপন্ন হোকÑ এই প্রত্যাশা।