28/12/2025
আমি জাপানে অনেক বছর ছিলাম। কিন্তু এই বছর বাংলাদেশে চলে এসেছি, পার্মানেন্টলি!
জাপানে সময় কেটেছে ট্রেনের নির্ভুল সময়সূচিতে, ঝকঝকে রাস্তা, নীরব শহর আর শৃঙ্খলার মধ্যে।
সবকিছু এতটাই ঠিকঠাক যে, কখনো কখনো মনে হতো—জীবন বুঝি এভাবেই হওয়া উচিত।
এই বছর দেশে ফিরে এসেছি। বাংলাদেশে।
এখানে নামার পর প্রথম যেটা টের পেয়েছি—হাওয়ার ওজন আলাদা।
চারপাশে কোলাহল, বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা। লাইফ এখানে সহজ নয়। প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন—সবই বাস্তব।
হ্যাঁ, বাংলাদেশে জীবন রিস্কি।
এ কথা অস্বীকার করলে নিজের সাথেই প্রতারণা করা হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি সত্যও আছে—
এই দেশে ঈমান একেবারে একা নয়। ভোরে আজানের ধ্বনি বাতাসে ভেসে আসে। মসজিদের মাইকে “আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাওম”— এই বাক্যটা শুধু ডাক না, এটা মনে করিয়ে দেয়— এই দুনিয়ার বাইরে আরেকটা হিসাব আছে।
এখানে নামাজ পড়তে আলাদা করে সাহস জোগাড় করতে হয় না। ইসলাম লুকিয়ে রাখতে হয় না।
সন্তানকে শেখাতে হয় না—“এটা বাইরে বলা যাবে না।” চাইলেই ঈমান নিয়ে চলা যায়—যদি ইচ্ছেটা থাকে।
অন্যদিকে, অমুসলিম উন্নত দেশগুলো— জাপান, ইউরোপ, আমেরিকা— সেখানে জীবন আশ্চর্য রকম নিরাপদ।
মানুষ কথা রাখে। আইন কাজ করে। রাস্তায় বের হলে মনে হয় না—আজ কিছু একটা হয়ে যাবে। সেই নিরাপত্তা যারা দেখেনি, তারা কখনো বুঝবে না।
সেই জীবন সত্যিই আরামদায়ক। কিন্তু সেই আরামের ভেতরেই ধীরে ধীরে একটা শূন্যতা জন্ম নেয়।
আজান নেই। মসজিদ দূরে, অনেক দূরে। হারাম আর হালাল—দুটো একই তাকের উপর সাজানো। গুনাহ সেখানে অপরাধ না, বরং “ব্যক্তিগত পছন্দ”। সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটা আসে সন্তানদের ক্ষেত্রে।
ওরা বড় হয় এমন এক সমাজে, যেখানে ইসলাম “স্বাভাবিক” না, বরং “ব্যতিক্রম”।
যেখানে বিশ্বাসটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
যেখানে প্রশ্ন আসে—
“তুমি আলাদা কেন?”
এভাবে একদিন টের পাওয়া যায়—
জীবনের নিরাপত্তা প্রায় শতভাগ। কিন্তু ঈমানের নিরাপত্তা ধীরে ধীরে শূন্যের দিকে যাচ্ছে।
এটা কোনো নাটকীয় কথা না। এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা।
অনেকে বলেন—
“বাংলাদেশের মানুষ অসৎ, উশৃঙ্খল। অমুসলিমরা হাজার গুণ ভালো।”
হ্যাঁ, তারা অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মানে। পরিচ্ছন্ন, দায়িত্বশীল, সভ্য।
কিন্তু ভালো নাগরিক হওয়া আর আল্লাহর কাছে সফল হওয়া— এই দুইটা এক জিনিস নয়।
একজন মানুষ দুনিয়ার চোখে খুব ভালো হতে পারে,
কিন্তু আখিরাতের পাল্লায় শূন্য হাতে দাঁড়াতে পারে।
আরেকজন মানুষ অনেক দুর্বল, অনেক সীমাবদ্ধ,
কিন্তু নামাজের ওয়াক্তে সিজদায় মাথা রাখে—
সেই মাথাটাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে দামী।
বাংলাদেশ নিখুঁত না। এই দেশ অনেক ব্যথার, অনেক কষ্টের। কিন্তু এই মাটিতে সিজদা করা সহজ। এই বাতাসে আজান মিশে আছে। এই সমাজ এখনো আল্লাহকে অস্বীকার করেনি। আপনি চাইলে এখানে ঈমান আগলে রাখতে পারেন। আপনি চাইলে সন্তানকে শেখাতে পারেন— আল্লাহ আছে, হিসাব আছে, ফিরে যাওয়া আছে।
আমি জাপানে প্রচুর ট্রাবল করেছি। শহর থেকে শহর, পাহাড় থেকে সমুদ্র—সবকিছুই ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো। ট্রেন এক মিনিট দেরি করে না,
রাস্তায় কেউ ধাক্কা দেয় না, রাতে একা হাঁটলেও ভয়ের নামগন্ধ নেই। সবকিছু এতটাই নিরাপদ ছিল যে, কখনো মনে হয়েছে—
মানুষ এখানে মরার আগে সব ভোগ করার সুযোগ পায়।
কিন্তু সেই ভোগটা ছিল আশ্চর্য রকম একাকী। সুন্দর শহরগুলো দেখেছি একা। চেরি ব্লসমের নিচে দাঁড়িয়েছি একা। শান্ত সমুদ্রের ধারে বসে থেকেছি একা। সাথে ছিল ক্যামেরা, কিন্তু পাশে ছিল না পরিবার।
স্মৃতি জমেছে, কিন্তু সেই স্মৃতি ভাগ করার মানুষ ছিল দূরে—হাজার হাজার মাইল দূরে।
তখন বুঝেছি—
নিরাপত্তা আর শান্তি এক জিনিস না। আরাম আর পরিপূর্ণতা এক জিনিস না। মানুষ শুধু নিরাপদ হলেই সুখী হয় না, মানুষ চায় আপনজন।
চায় কাউকে দেখিয়ে বলতে— “এই দেখো, আমি আজ কোথায় এসেছি।”
উন্নত দেশগুলো আমাদের শেখায়—
কিভাবে একা একা ভালো থাকা যায়।
কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়—
কিভাবে একসাথে বাঁচা যায়।
ওখানে জীবন খুব গোছানো, কিন্তু হৃদয়গুলো অনেক সময় আলাদা আলাদা বাক্সে বন্দী।
আপনি সব পেয়ে যাবেন— কিন্তু কাউকে পাবেন না,
যাকে নিয়ে দোয়া করতে পারেন, যার সাথে কাঁদতে পারেন, যার সাথে আল্লাহর কথা বলতে পারেন।
ধীরে ধীরে একসময় মনে হয়— এই নিখুঁত জীবনের ভেতরে কোথাও যেন একটা বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
আরেকটা দার্শনিক প্রশ্ন তখন মাথায় আসে—
মানুষ আসলে কী চায়? নিরাপদ ভবিষ্যৎ, না অর্থপূর্ণ বর্তমান?
জাপানে আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক নিরাপদ ছিলাম।
কিন্তু বর্তমানটা ছিল অনেক সময় ফাঁকা। বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু বর্তমানটা জীবন্ত।
এখানে মানুষ ডাকে নাম ধরে। এখানে মা–বাবার দোয়া পাশে থাকে। এখানে ঈদের সকালে একসাথে নামাজ পড়া যায়। এখানে সুখ–দুঃখ ভাগ করার মানুষ হাতের কাছেই থাকে। উন্নত দেশে আপনি মানুষ হিসেবে সম্মান পাবেন, কিন্তু মুসলিম হিসেবে অনেক সময় একা হয়ে যাবেন।
আর মানুষ যতই শক্ত হোক, ঈমান যতই মজবুত হোক— একাকীত্ব দীর্ঘদিন সহ্য করা যায় না।
কারণ মানুষ শুধু দেহ না, মানুষ আত্মা।
আর আত্মার খাবার টাকা না, নিরাপত্তা না—
আত্মার খাবার সম্পর্ক, দোয়া, সিজদা। এই জন্যই হয়তো আল্লাহ আমাদের পরিবার দিয়েছেন, উম্মাহ দিয়েছেন, সমষ্টির ভেতরে ঈমান বাঁচানোর পথ দেখিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মানুষ একদিন মরবেই। কেউ নিরাপদ বিছানায়, কেউ অনিশ্চিত রাস্তায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আসলে দেশ নিয়ে না। আরাম নিয়ে না। নিরাপত্তা নিয়ে না।
প্রশ্নটা একটাই—
আমি কোথায় আমার ঈমানটা নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারবো?
জীবন হয়তো সেখানে কঠিন হবে, কিন্তু মৃত্যুটা হবে অর্থবহ।
মরার সময় আমার পাশে কী থাকবে?
ব্যাংক ব্যালেন্স, না মা–বাবার দোয়া?
পাসপোর্ট, না ঈমান?
আমি জাপানে অনেক কিছু দেখেছি।
অনেক নিরাপদ জীবন দেখেছি।
কিন্তু দেশে ফিরে এসে বুঝেছি—
নিরাপদ জীবন সবকিছু না।
ঈমানসহ, পরিবারসহ, সম্পর্কসহ জীবন—
সেটাই পরিপূর্ণ।
©️ শাহরিয়ার আসিফ
নিয়মিত লেখা পেতে পেজটা ফলো করার অনুরোধ করছি