22/04/2023
ঈদ উদযাপন ও তার হাকীকত
মেহেরবান আল্লাহ আমাদের দুটি ঈদ দান করেছেন। ঈদ হল খুশির দিন, আনন্দের মৌসুম। ঈদে আমরা খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করব এবং দরিদ্র ও অসহায়দের সুখ ও আনন্দদানের চেষ্টা করব। তবে স্মরণ রাখতে হবে, মুসলিমের আনন্দ-উদ্যাপন আর অমুসলিমের আনন্দ-উদ্যাপন এক হতে পারে না। মুমিনের আনন্দ-উদ্যাপন হয় আল্লাহর পছন্দনীয় আমলের মাধ্যমে আর অমুসলিমের আনন্দ-উদ্যাপন হয় তাঁর নাফরমানির মাধ্যমে। মুসলিমের জীবন ও চিন্তা আখেরাতকেন্দ্রিক আর কাফেরের সবকিছু দুনিয়াকেন্দ্রিক। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ فَرِحُوْا بِالْحَیٰوةِ الدُّنْیَا وَ مَا الْحَیٰوةُ الدُّنْیَا فِی الْاٰخِرَةِ اِلَّا مَتَاعٌ.
তারা (অর্থাৎ কাফেরগণ) পার্থিব জীবনেই উল্লসিত, অথচ আখেরাতের তুলনায় পার্থিব জীবন তো মামুলি ভোগমাত্র। -সূরা রা‘দ (১৩) : ২৬
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উদ্দেশে বলেন-
قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَ بِرَحْمَتِهٖ فَبِذٰلِكَ فَلْیَفْرَحُوْا هُوَ خَیْرٌ مِّمَّا یَجْمَعُوْنَ.
(হে নবী!) বলুন, এসব আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতেই হয়েছে। সুতরাং এতেই তাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। তারা যা-কিছু পুঞ্জীভূত করে, তা অপেক্ষা এটা শ্রেয়! -সূরা ইউনুস (১০) : ৫৮
আনাস রা. বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন তখন দেখেন, মদীনাবাসী বছরে দুই দিন উৎসব করে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এই দুই দিন আনন্দ-ফুর্তি কর কেন? তারা বলল, জাহেলী যুগে এ দুইটি দিন আমরা উৎসব-আনন্দ করতাম। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-
إِنّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ.
আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এ দুই দিনের বদলে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। ঈদুল আযহা ও ঈদুর ফিতর। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৪; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১৫৫৬
হাদীসটি থেকে স্পষ্ট যে, অমুসলিমদের পর্ব-উৎসব বর্জন করার জন্যই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুটি ঈদ দান করেছেন। সুতরাং আমরা আমাদের ঈদ উদ্যাপন করব, অমুসলিমদের পর্ব-উৎসব থেকে বিরত থাকব। সাথে সাথে আমাদের ঈদ যেন অমুসলিমদের পর্ব-উৎসবের মত নিছক পার্থিব আমোদ-প্রমোদের ক্ষেত্র না হয়, সেদিকেও খুব খেয়াল রাখব। হাসান বসরী রাহ.-এর বক্তব্য অনুযায়ী আমাদের ঈদ তো হল-
أما يوم الفطر فصلاة وصدقة وأما يوم الأضحى فصلاة ونسك.
ঈদুল ফিতর হল, ঈদের নামায পড়া ও সদাকাতুল ফিতর আদায় করা এবং ঈদুল আযহা হচ্ছে ঈদের নামায পড়া ও কুরবানী করা। -ফাযাইলুল আওকাত, বায়হাকী, পৃ. ৩০৩-৩০৪ (১৪৪); শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৫/৩৮৬ (৩৪৩৭)
ইবনে রজব হাম্বলী রাহ.-এর ভাষ্যমতে আমাদের ঈদ হল-
وإنما كان يوم الفطر من رمضان عيدا لجميع الأمة، لأنه تعتق فيه أهل الكبائر من الصائمين من النار، فيلتحق فيه المذنبون بالأبرار، كما أن يوم النحر هو العيد الأكبر، لأن قبله يوم عرفة وهو اليوم الذي لا يرى في يوم من الدنيا أكثر عتقا من النار منه، فمن أعتق من النار في اليومين فله يوم عيد، ومن فاته العتق في اليومين فله يوم وعيد.
ঈদুল ফিতরের দিন সমস্ত উম্মতের জন্য ঈদ ও আনন্দের দিন হওয়ার কারণ হল- ঐ দিন আল্লাহ তাআলা রোযাদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। ফলে যারা গোনাহগার তারাও নেককারদের দলে শামিল হয়ে যায়। আর ঈদুল আযহার দিন বড় ঈদ হওয়ার কারণ হচ্ছে- এর আগের দিন হল আরাফার দিন, যেদিন এত বিপুল পরিমাণ লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, সারা বছরের আর কোনো দিন এত লোককে মুক্তি দেওয়া হয় না।
সুতরাং ঈদের দিন যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তার জন্য সেদিন ঈদ ও খুশির দিন আর ঐ দিন যে মুক্তি পায়নি তার জন্য সেদিন কান্না ও বিলাপের দিন। -লাতাইফুল মাআরিফ, পৃ. ২৩৭-২৩৮
এই হল ঈদের হাকীকত। পুরো এক মাস রোযা রাখা ও তারাবী পড়ার পর ঈদের দিন আল্লাহ রোযাদারদেরকে তাদের মেহনতের সওয়াব ও পুরস্কার দান করবেন। জাহান্নামীদের তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে দেবেন। তাই রোযাদাররা খুশি হয়ে শুকরিয়া স্বরূপ দান-সদকা করবে এবং ঈদের নামায আদায় করবে।
আরাফার দিন (কুরবানী ঈদের আগের দিন) হাজ্বীগণ উকুফে আরাফা করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দেন। ঈদের দিন সামর্থ্যবানরা কুরবানী করে, সকল মুসলমান এক ময়দানে একত্র হয়ে ঈদের নামায আদায় করে। এভাবে হজ¦, কুরবানী ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের গোনাহ মাফ করেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মেহমানদারি করেন। ফলে ঈদের আনন্দ গুনাহ মাফ হওয়ার আনন্দ, জাহান্নাম থেকে মুক্তির আনন্দ, মহান আল্লাহ তাআলার মেহমানদারি কবুল করার আনন্দ, সবোর্পরি আল্লাহ প্রদত্ত নিআমতের শুকরিয়া প্রকাশের আনন্দ। বান্দা এসবের জন্য খুশি প্রকাশ করবে, ঈদের দিনগুলো অনন্দে অতিবাহিত করবে। এই হল ঈদের স্বরূপ। এটাই হল একজন মুসলিমের ঈদ ও আনন্দ।
মোটকথা, মুমিনের সুখ-শান্তি ও হাসি-আনন্দ হল দ্বীন ও আখেরাত কেন্দ্রিক। সুতরাং মুমিনের ঈদ ও আনন্দ অমুসলিমের উৎসব-বিনোদনের, আমোদ-ফুর্তির মত হবে না। মুমিন তার ঈদ উদ্যাপনে আল্লাহর নাম ভুলবে না, শরীয়তের সীমা অতিক্রম করবে না এবং বিজাতির উৎসব ও আমোদ-প্রমোদের অনুসরণ করবে না, গুনাহে লিপ্ত হবে না। মুসলিম অন্যান্য সকল বিষয়ে যেমন নবীজীর সুন্নাহর অনুসরণ করে এবং সালাফে সালেহীন তথা মহান পূর্বসূরিদের আদর্শের অনুসরণ করে, ঈদের আনন্দ উদ্যাপনেও তাঁদেরই অনুকরণ করবে। আসুন, জেনে নিই আমাদের মহান পূর্বসূরিগণ কীভাবে ঈদ উদ্যাপন করতেন।
লিখেছেন -মাওলানা মুহাম্মাদ ইমরান হুসাইন