18/03/2025
আজ ১৭ ই রমজান ‘বদর দিবস’ ।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে, সীমাহীন অত্যাচার সইতে না পেরে বিশ্বনবী সা: বুকভরা ব্যথা নিয়ে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন । ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ বা ২য় হিজরির রমজান মাসের আজ এই দিনে সত্য আর মিথ্যর সবচে বড় যুদ্ধটি বাঁধে । মুসলিমদের হ্রদয় স্পন্দন ‘বদর যুদ্ধ’ । আল-কুরআনে এই দিনকে ‘ইয়াওমুল ফুরক্বান’ বলা হয়েছে।
অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক হাজারের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে রোজায় অভুক্ত দারিদ্র নিপীড়িত তিনশ তেরো জনের একটা দল যাদের শক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ।
১০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী, একশ অশ্বারোহী, ৭০০ উষ্ট্রারোহী, দু'শতাধিক পদাতিক, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত গোটা বাহিনীর বিপরীতে আল্লাহর সেনাদলে ঘোড়া ছিলো মাত্র দু'টি, ৭০টি উট, ৮টি তরবারি-তাও কিছু তরবারি ছিলো ভাঙ্গা, ৬টি তীর ধনুক, আর সাথে একটি আওয়াজ 'আল্লাহু আকবার' । এ এমন এক আওয়াজ কেয়ামত পর্যন্ত যা অবিশ্বাসীর সব লন্ডভন্ড করে দেয় ।
আসলে বদর যুদ্ধের সবচে বড় শিক্ষা হলো ‘সংখ্যা কোন বিষয় না’ - আল্লাহকে ভয় আর বিশ্বাস করে দু কদম আগাও । বাকি কাজ তো মহান আল্লাহর ।
বদরে (যুদ্ধে) আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বিজয় ও সাহায্য দান করেছিলেন অথচ তোমরা কত দুর্বল ছিলে। অতএব, আল্লাহকে ভয় করো। আশা করা যায়, তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায় করতে সক্ষম হবে ।সূরা আলে ইমরান : ১২৩ ।
এই যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে ৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসারসহ ১৪ জন শহীদ হন। কাফিরদের পক্ষে ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দী হন। এটি ছিল একটি মহা অলৌকিক বিজয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
(যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছে) তাদের তোমরা কেউই হত্যা করোনি; বরং আল্লাহ তায়ালাই তাদের হত্যা করেছেন। আর তুমি যখন (তাদের প্রতি) তীর নিক্ষেপ করেছিলে, মূলত তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং করেছেন আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ।
সূরা আনফাল : ১৭ ।
বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে সাহাবিদের মধ্যে বিভিন্ন সন্দেহের সঞ্চার হচ্ছিল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সা:-এর নেতৃত্বে যুদ্ধ চলছে, তখন আবু বকর রা: দেখতে পেলেন মহানবী সা: ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। আর আল্লাহর দরবারে বলছেন- হে আল্লাহ! হাতেগোনা মুসলমানদের এই ছোট্ট দলটি যদি আজ নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে এই দুনিয়ার বুকে ইবাদতের জন্য আর কেউ থাকবে না। সুতরাং হে আল্লাহ! আপনি আপনার সেই সাহায্য অবতরণ করুন, যা দেয়ার অঙ্গীকার আমার সাথে করেছেন।’ রাসূল সা:-এর এই দোয়ার পরেই আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেন,
যখন তোমরা তোমাদের মালিকের কাছে ফরিয়াদ পেশ করেছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ফরিয়াদ কবুল করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আমি তোমাদের (এ যুদ্ধের ময়দানে) পরপর এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করব।
সূরা আনফাল : ৯ ।
মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুসারে জিব্রাঈল (আঃ) বদর প্রান্তরে আসলেন। মহানবী সা: মাথা তুলে বললেন, আবু বকর খুশি হও। জিব্রাঈল এসেছেন, ধুলোবালির মধ্য এসেছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, নবীজী (সাঃ) বলেন, আবু বকর খুশি হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছেছে। জিব্রাঈল ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়ার আগে আগে আসছেন। ধুলোবালি উড়ছে।
নবীজী (সাঃ) এরপর কামরা থেকে বর্ম পরিহিত অবস্থায় বের হলেন এবং উদ্দীপনাময় ভঙ্গিতে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্যে সাহাবীদেরকে বললেন। আর তিনি এক মুঠো ধূলি কাফেরদের প্রতি নিক্ষেপের সময় বললেন, 'শাহাতিল উজুহ' অর্থাৎ ওদের চেহারা আচ্ছন্ন হোক। এই নিক্ষিপ্ত ধুলি প্রত্যেক কাফেরের চোখ, মুখ, নাক ও গলায় প্রবেশ করলো। একজনও বাদ গেলনা। যা বর্তমান সময়ের মারনাস্ত্র, ক্ষেপনাস্ত্র, চালকবিহীন ড্রোন থেকেও হাজার হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ছিলো। এ সর্ম্পকে আল্লাহ তায়ালা সূরা আনফালের ১৭ নং আয়াতে বলেন।
এবং তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহ তায়ালাই নিক্ষেপ করেছিলেন।
বদর যুদ্ধে ফেরেশতাগণ অংশগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু কিভাবে শত্রু নিধন করতে হয় তা তাদের জানা ছিলনা। আল্লাহ্ তায়ালা সূরা আনফালের ১২নং আয়াতে তাঁদেরকে শত্রুর উপর আঘাত হানার কৌশল বলে দেন,
হে ফেরেশতাগণ, তোমরা শত্রুদের গর্দানের উপরিভাগে আঘাত করো; আরো আঘাত হানো প্রত্যেক গিরায় গিরায়।
ফেরেশতাগণ কর্তৃক শত্রু নিধনের আলামত ছিল গলায় কালো দাগ। সাহাবায়ে কেরাম বলেন, আমরা তরবারি দ্বারা আঘাত করার পূর্বেই কাফেরদের মস্তক দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়তো। এভাবে ৭০ জনের মধ্যে ৬৪ জন ছিল ফেরেশতাদের আঘাতে নিহত হয়েছে । আমাদের হাতে মাত্র ৬ জন নিহত হয়েছে। (তাফসীরে রুহল বয়ান)।
যুদ্ধে ওকাশা (রাঃ) নামক এক সাহাবীর তরবারি ভেঙ্গে যায়। নবীজী (সাঃ) তাকে খেজুরের একটি শুকনো ডাল দিয়ে বললেন, তুমি এটা দিয়ে যুদ্ধ করো। আল্লাহ্র কুদরতে খেজুরের ডাল ইস্পাতের তলোয়ারে পরিণত হয়ে গেলো। সুবহানাআল্লাহ এই তলোয়ারের নাম রাখা হয় আউন বা আল্লাহর সাহায্য। যা দিয়ে ওকাশা (রাঃ) জীবনভর যুদ্ধ করেছেন।
কেমব্রিজ হিস্ট্রি অব ইসলামের অনুসারে, বদর যুদ্ধের রাজনৈতিক , সামরিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, আঞ্চলিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
কেমব্রিজের তথ্যমতে, বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বাসীদের ঈমান বাড়িয়ে দেয় এই যুদ্ধ, এই যুদ্ধে বিজয়ের পর ইসলাম প্রচার বেড়ে যায়, ইসলামের অনুসারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে ।
এই যুদ্ধের পর মুসলিমরা ওই অঞ্চলে একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা ওই সময়ে পুরো পৃথিবী আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয় । যা রাষ্ট্র হিসেবে মদিনাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে ।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বদরের যুদ্ধ। কারণ, এই প্রথমবার মুসলমানরা আল্লাহর রাসূল সাঃ এর নেতৃত্বে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
ছোট্ট একটা যুদ্ধ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ? মুসলমানরা পরাজিত হলে ইসলাম অস্তিত্ব সংকটে পড়তো। এমনকি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াও অসম্ভব ছিল না ।
তাই এ দিনটিকে কোরআনে 'ইয়াউমুল ফুরকান, সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী বলা হয়েছে।
বদরের যুদ্ধকে বিশ্বের ইতিহাস নির্ধারক যুদ্ধের একটি মনে করা হয় ।
তারিক বিন জিয়াদ ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১২,০০০ সৈন্য নিয়ে স্পেন (তৎকালীন আন্দালুসিয়া) আক্রমণ করেন এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গুয়াদালেতে যুদ্ধ (Battle of Guadalete) জয়লাভ করেন।
তার প্রতিপক্ষ ছিল রাজা রডরিকের, বিশাল সেনাবাহিনী প্রায় ১,০০,০০০ সৈন্য ।
এই বিজয়ের ফলে মুসলমানরা পরবর্তী প্রায় ৮০০ বছর স্পেন শাসন করে, যা ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত।
মোহাম্মদ বিন কাসেম ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু বিজয়ের জন্য ভারত আক্রমণ করেন। তিনি প্রায় ১২,০০০ সৈন্য নিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন।
তার বিপক্ষে ছিলেন তৎকালীন প্রতাপশালী রাজা দাহির, যার সৈন্য সংখ্যা ছিল এই যুদ্ধে ৫০০০০ ।
এই বিজয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের সূচনা, যা পরে বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত হয়।
.
ইতিহাস সাক্ষী, বদর ঘুরে ঘুরে বারবার এসেছে । মুসলিমদের জন্য সংখ্যা কোন ফ্যাক্ট না । বুকের ভেতরের ঈমানটা কতখানি মজবুত এটাই মূল বিষয় । আমাদের রব আমাদের সাথে এখনো আছেন, থাকবেন বিশ্বাসীদের সাথে সব সময় । আমরা আবার বদর দেখব, ইনশাআল্লাহ ।।
©