26/05/2026
জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখের ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখের আছর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামাযের পর মসজিদে জামাআত সহকারে আদায়রত নামাযীদেরকে একবার উচ্চ আওয়াজে তাকবীর বলা ওয়াজীব এবং তিনবার বলা উত্তম। আর একেই তাকবীরে তাশরীক বলা হয়। (হেদায়া : ১/২৭৫)
▪️তাকবীরে তাশরীক:
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
▪️তাকবীরে তাশরীকের পটভূমি:
বুখারি শরীফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি হানাফী (রহ.) বলেন, যখন হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গলায় ছুরি রাখলেন, এদিকে আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিব্রাঈল (আ.) আসমান থেকে একটি দুম্বা নিয়ে দুনিয়ায় আগমন করছিলেন। কিন্তু জিব্রাঈল (আ.)-এর আশঙ্কা ছিল, তিনি দুনিয়াতে পৌঁছার আগেই ইব্রাহিম (আ.) জবাইপর্ব সমাপ্ত করে বসবেন।
ফলে তিনি আসমান থেকে উঁচু আওয়াজে বলে উঠলেন : ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার।’
ইব্রাহিম (আ.) আওয়াজ শুনে আসমানের দিকে নজর ফেরাতেই দেখতে পেলেন জিব্রাঈল (আ.) একটি দুম্বা নিয়ে আগমন করছেন। ফলে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর।’ পিতার কণ্ঠে এই কালিমা শুনতেই ইসমাঈল (আ.) উচ্চারণ করলেন : ‘আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
একজন ফেরেশতা আর দুজন প্রিয় নবীর এ বাক্যমালা আল্লাহর খুব পছন্দ হয়। তাই কিয়ামত পর্যন্ত এই বাক্যমালা আইয়ামে তাশরীকে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পড়াকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ২/১৭৮, ইনায়া শরহুল হিদায়া : ১/৪৬৪)
▪️তাকবিরে তাশরিকের ফজিলত:
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেন তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ (সূরা হজ, আয়াত : ২৮)
রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত সাইয়্যেদুনা ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, এখানে ‘নির্দিষ্ট দিন বলতে ‘আইয়ামে তাশরিক’ ও ‘আল্লাহর স্মরণ’ বলতে তাকবিরে তাশরিক বোঝানো হয়েছে। (বুখারি, অধ্যায় দুই ঈদ)
এখানে নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা আইয়ামে তাশরিক উদ্দেশ্য এবং জিকির দ্বারা তাকবিরে তাশরিক উদ্দেশ্য। (ইবনে কাসির)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ " مَا الْعَمَلُ فِي أَيَّامِ الْعَشْرِ أَفْضَلَ مِنَ الْعَمَلِ فِي هَذِهِ ". قَالُوا وَلاَ الْجِهَادُ قَالَ " وَلاَ الْجِهَادُ، إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ يُخَاطِرُ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ بِشَىْءٍ "
এই দিনগুলোতে তাকবীরে তাশরীকের আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমল উত্তম নয়। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী করিম (ﷺ) বলেন, 'জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও সম্পদের ঝুঁকি নিয়ে জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।' (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৬৯)
▪️তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত কিছু মাসায়েল:
তাশরীকের দিনগুলোতে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পুরুষদের ওপর উচ্চ স্বরে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। আর নারীরা নিচু স্বরে পড়বে, যাতে নিজে শোনে। (শামি : ২/১৭৮)
ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়া হোক বা একাকী, ওয়াক্তের মধ্যে পড়া হোক বা কাজা, নামাজি ব্যক্তি মুকিম হোক বা মুসাফির, শহরের বাসিন্দা হোক বা গ্রামের-সবার ওপর ফরজ নামাজের পর একবার তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। (দুররে মুখতার : ২/১৮০)
একাকী নামায আদায়কারীর উপর ওয়াজীব
নয়। (আল জাওহারাতুন নাইয়িরাহ্, ১২২ পৃষ্ঠা)
তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এর মতে ওয়াজীব। (বাহারে শরীয়াত, ১ম অংশ, ৭৭৬ পৃষ্ঠা)
তাই একাকী নামায আদায়কারী ব্যক্তির জন্য তাকবীরে তাশরীক পড়ে নেয়াই উত্তম।
ফরজ নামাজের পর তাকবীর বলতে ভুলে গেলে, স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকবির পড়ে নেবে। তবে হ্যাঁ, নামাজের বিপরীত কোনো কাজে লিপ্ত হয়ে গেলে, যেমন-কথা বলা, নামাজের স্থান থেকে উঠে পড়া ইত্যাদি হলে তাকবির বলতে হবে না, বরং ওয়াজিব ছুটে যাওয়ার কারণে আল্লাহর কাছে তওবা করবে। (শামি: ৬/১৭৯