14/04/2026
আমাদের বৈষ্ণব শাস্ত্রে বলে, সৃষ্টির মধ্যে পুরাতন কিছু নেই। তাই ভক্ত কবি গেয়ে গেছেন - নব নবরে নিতুই নব।
অর্থাত এ সংসার নিত্য নবীনতার আকর। এখানে যা পুরাতন, তা টিকতে পারে না, একেবারেই লোপ পায়। মানুষের দেহ নিত্য নতুন হচ্ছে। গাছ-লতা-গুল্ম নিত্য নবীনতা ধারণ করছে। সৃষ্টি শক্তি অনবরত নতুন নিয়েই খেলা করে। আর এই নতুনের মধ্যে নব নটবর নিতুই নব নব লীলার প্রকাশ করছেন।
যদি সবই নতুন, তবে এর মধ্যে পুরাতন কি? পুরাতনের বোধটা যে আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে রয়েছে। কেমন করে সে জ্ঞানটি হল? ঐ বৈষ্ণব শাস্ত্রই উত্তর দিচ্ছেন যে, এই নতুন সৃষ্টির নবীন লীলার মধ্যে আমিই পুরাতন। এই আমার আমিত্ব বোধটাই সনাতন। আমি আছি, আমি ছিলাম, আমি থাকব-এই জ্ঞান থেকেই কালের পরিমাণ, এই জ্ঞান থেকেই পুরাতনের বোধ। আমি যখন লীলাময় তখন ‘নব নবরে নিতুই নব’। তখন প্রতি পলে প্রতি ক্ষণে আমার থেকে নঈনতার প্রস্রবণ যেন ছুটে বের হতে থাকে। তখন পুরাতনের বোধও থাকে না, পুরাতনের ভাবনাও থাকে না। কিন্তু যখন আমি আছি, এই জ্ঞানটা ফুটে উঠে, আমার আমিত্বের সনাতন তত্ত্বটা যখন বুঝতে পারি, তখন পুরাতন ছাড়া, কেবল অতীত কালের বোধ ছাড়া অন্য অনুভূতি মনে লাগে না। এমন অনুভব হলে সৃষ্টি রক্ষা সম্ভপর হয় না। তখন মনে হয় আমি নিষ্ক্রিয়, নির্গুণ, নিরালম্ব সত্য-স্বরূপ। তখন মনে হয় জগতের এ লীলা মায়া, এটা যাদুকরের ইন্দ্রজাল মাত্র। তাই সমাজ রক্ষার জন্য মানুষকে কর্মি করার উদ্দেশ্যে পুরাতনে ও নতুনে পর্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে। মালা জপ কর তো? একবার মালাটা ঘুরানোর পর, হিসাব রাখার উদ্দেশে মাটির উপর একটি যব রেখে দিতে হয়। এমনি করে কেউ শত যব মালা করে, কেউ বা সহস্র যব মালা ঘুরায়। মানুষ মাত্র অহরহ তেমনি স্মৃতির মালা ঘুরাচ্ছে। কাল কি ছিল, আজ কি হল, আমাগী কাল কি হবে, এই চিন্তার মালা মানুষের মনে অহরহ ঘুরছে। একবার সে মালা ঘুরানো শেষ হলে একটা বর্ষ শেষ হল মনে করতে হয়। ইংরেজের পুরাতন বর্ষ শেষ হয় ৩১শে ডিসেম্বর।
আমাদের পুরাতন বর্ষ শেষ হল আজ চৈত্র সংক্রান্তির দিনে। এই দিনই অজ্ঞাত ভবিষ্যতের বুকে একটা আশার যব রাখতে হয়। যেন কাল থেকে সব নতুন হবে, নতুন বর্ষ, নবীন আশা, নবীন উদ্যোগ, সবই যেন নতুন হবে। তাই আজ পুরাতনের শেষ, কাল নবীনতার সূচনা। জীবনটাকে স্বাদু করার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা হয়ে থাকে। এক একটা উৎসব, এক একটা পূজা, এক একটা জন্মতিথি যেন নতুনের সূচক ও প্রবর্তক হয়ে আমাদের একটু সজ্ঞান করে তোলে। তাই এই সকল দিনকে ‘বৎসরকার দিন’ বলা হয়। অর্থাত, এই সকল আমাদের জীবন প্রবাহের যেন এক একটা ছেদ, এক একটা পুরাতন অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি এবং নতুনের সূচনা।
কবিগুরুর এমনই আকুতি আমাদের বাঙালি সত্তাকে প্রতি বছরে জাগিয়ে তোলে-
মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
শুভ চৈএ সংক্রান্তি 💛