25/06/2024
দোয়া ইউনুসের ফজিলত
দোয়া ইউনুস। গুরুত্বপূর্ণ এক দোয়া। এ দোয়ার মাহাত্ম্য অনেক। হযরত ইউনুস আ. কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পরীক্ষায় নিপতিত করেছেন। মাছের পেটে অবস্থানকালে তিনি এ দোয়াটি পড়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হযরত ইউনুস আ. কে মাছের পেট থেকে মুক্তি দান করেছেন। তাই এ দোয়াটির নাম দোয়ায়ে ইউনুস।
হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, আমি রাসুল সা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! এই দোয়ার গ্রহণযোগ্যতা কি কেবল ইউনুস আ.-এর জন্যই প্রযোজ্য, না সব মুসলিমের জন্য? জবাবে প্রিয়নবী সা. বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তার জন্য দোয়াটি বিশেষভাবে কবুল হলেও এটা সব মুসলিমের জন্য সবসময় কবুলের ব্যাপারে প্রযোজ্য। তুমি কি কোরআনে পাঠ করোনি, ‘ওয়া কাজালিকা নুনজিল মুমিনিন- আর এভাবেই আমি আল্লাহ মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি। (তিরমিজি ৩৫০৫)
দোয়া ইউনুস
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ، إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ-লিমিন।
দোয়া ইউনুসের অর্থ: তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তুমি পবিত্র সুমহান। আমি নিশ্চয়ই জালিমদের দলভুক্ত।
দোয়া ইউনুস পাঠের ফজিলত
দোয়া ইউনুসের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহর নবী ইউনুস আ. এই দোয়া পাঠ করেই আল্লাহর রহমতে মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। যদি কেউ দোয়া ইউনুস কয়েকবার পড়ে দোয়া করে তার দোয়া কবুল হয়। কেউ যদি বিপন্ন বা বিপদগ্রস্ত অবস্থায় এই দোয়া পাঠ করে, আল্লাহর রহমতে সে বিপদ থেকে উদ্ধার পায়।
দোয়া ইউনুস প্রতিদিন ১০০০ বার পাঠের ফজিলত
অন্য বর্ণনায় রয়েছে, দৈনিক এক হাজার বার দোয়া ইউনুস পড়লে পদমর্যাদা সমুন্নত হয়। আল্লাহ তার রুজি-রোজগারে সমৃদ্ধি দান করেন। দুঃখ-যন্ত্রণা, পেরেশানি, অশান্তি ও কষ্ট-প্রভৃতি দূর করেন। তার জন্য সব রকম কল্যাণের দ্বার খুলে দেন। শয়তানের প্ররোচনা থেকে তাকে রক্ষা করেন।
এ দোয়া এক লাখ পঁচিশ হাজার বার পড়লে (যেটা খতমে ইউনুস হিসেবে পরিচিত) সব ধরনের অপকার থেকে রক্ষা, বিপদ-আপদ থেকে দূরে থাকা, রোগ-শোক থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় রয়েছে।
মাছের পেটে ইউনুস আ.
আল্লাহর প্রসিদ্ধ নবী হযরত ইউনুস আ.। কোরআনের একটি সুরার নাম সুরা ইউনুস। এ নবীর নামেই নামকরণ করা হয়েছে। অন্যান্য নবীদের মতো তারও সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল, আল্লাহর প্রতি তার জাতিকে আহ্বান করা। তাওহিদ ও পরকালের কথা পৌঁছিয়ে দেওয়া।
হযরত ইউনুস আ. মানুষকে দীর্ঘ নয় শত বছর আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। কিন্তু খুব অল্প মানুষই তার উপর ঈমান আনে। আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপাসনা ছেড়ে অদ্বিতীয় আল্লাহ কাছে ফিরে আসতে তিনি তাদের আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তারা তার ডাকে সাড়া দেয়নি। এতে নিরাশ হয়ে তিনি তাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। (তাফসিরে মাজহারি)
তিনি উম্মতকে রেখে চলে যাওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে পরীক্ষা করেন। তিনি সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হন। একটি বিশাল মাছ তাকে গিলে ফেলে। তবে আল্লাহ তাআলার রহমতে মাছটি তাকে হজম করেনি। এমনকি তার দেহের সামান্যতম অংশেও কোনোরূপ ক্ষতের সৃষ্টি হয়নি।
সেই মাছের উদর-অন্ধকারে বসে ইউনুস আ. অত্যন্ত বিনয়-নম্রতা ও কাতরস্বরে আল্লাহর কাছে অনবরত দোয়া করেন। মাছের পেটে পড়া দোয়াটিই দোয়া ইউনুস নামে সবার কাছে পরিচিত।
কোরআনে ইউনুস আ. এর ঘটনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা হযরত ইউনুস আ.-এর কাহিনি বর্ণনা করে বলেন, ‘মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন, তিনি রাগ হয়ে চলে গিয়েছিলেন। অতঃপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাকে পাকড়াও করবো না। অতঃপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহবান করলেন- তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র, আমি গুনাহগার। (সুরা: আম্বিয়া ৮৭)
পবিত্র কোরআনে হযরত ইউনুস আ.-এর নামে একটি সুরা রয়েছে। কোরআনের পাঁচ জায়গায়‘ইউনুস নামটিও উল্লেখ হয়েছে। ইউনুস (আ.)-কে কোরআনে ‘জুন্নুন-সাহিবুল হুত’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। জুন্নুন শব্দের অর্থ মাছের সঙ্গে সম্পৃক্ত আর সাহিবুল হুত শব্দের অর্থ মৎস্য সহচর বা মাছওয়ালা।
আল্লাহর নবী ইউনুস আ. প্রাচিন সভ্যতার একটি শহর নিনেভায় প্রেরিত হন। এটি তৎকালীন ইরাকের মসুলে অবস্থিত। তিনি নিনেভার লোকজনকে আল্লাহর দিকে ডেকেছিলেন। কিন্তু তারা তার ডাকে সাড়া দেয়নি। এতে তিনি মর্মাহত হয়ে তাদের আল্লাহর গজবের খবর দেন। আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিনেভা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে রওনা হন।
পথে সমুদ্র পড়লে, তা পাড়ি দেওয়ার জন্য তিনি একটি জাহাজে ওঠেন। জাহাজটি মাঝসমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে। তখন জাহাজের চালক ধারণা করে যে, জাহাজে কোনো অপরাধী আছে, যে জাহাজের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে। পরে সেকালের নিয়ম অনুযায়ী লটারির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু লটারিতে বারবার হযরত ইউনুস আ.-এর নাম ওঠে। তখন বাধ্য হয়ে তাকে সমুদ্রে ফেলে দিলে জাহাজটি বিপদ থেকে রক্ষা পায়, আর একটি বিরাট মাছ নবীকে গিলে ফেলে। (ফাতহুল বারি, ১০ম খণ্ড ২১২পৃষ্ঠা)
এ প্রসঙ্গে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,‘ইউনুসও রাসুলদের একজন ছিল। স্মরণ করো, যখন সে পালিয়ে বোঝাই নৌযানে পৌঁছল, অতঃপর সে লটারিতে যোগদান করে পরাভূত হলো। পরে একটি মাছ তাকে গিলে ফেলে, তখন সে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত, তাহলে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত ওই উদরে থাকতে হতো।’ (সুরা: সাফফাত ১৩৯-১৪৪)
হযরত ইউনুস আ. অক্ষত অবস্থায় মাছের পেটে ৪০ দিন ছিলেন। দোয়ায়ে ইউনুস পাঠ করতে থাকলে আল্লাহ সেখান থেকে মুক্ত করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তখন আমি তার (ইউনুসের) ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম। তাকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের নাজাত দিয়ে থাকি।’ (সুরা: আম্বিয়া ৮৮)
পরের ঘটনা কোরআনেই বর্ণিত হয়। আল্লাহ বলেন, আমি ইউনুসকে এক বিস্তীর্ণ-বিজন প্রান্তরে নিক্ষেপ করালাম এবং তখন তিনি রুগ্ন ছিল। আর আমি তার ওপর লতাবিশিষ্ট একটি লাউগাছ উদ্গত করলাম। এবং তাকে লক্ষ বা ততোধিক লোকের প্রতি প্রেরণ করলাম। অতঃপর তারা ঈমান এনেছিল, অতঃপর আমি তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবনোপভোগ করতে দিলাম।’ (সুরা: সাফফাত ১৪৫-১৪৮)