28/09/2024
আল্লাহ তায়ালা সাত শ্রেণীর মানুষকে আরশের ছায়া দান করবেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ الإِمَامُ الْعَادِلُ وَشَابٌّ نَشَأَ بِعِبَادَةِ اللَّهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ . وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لاَ تَعْلَمَ يَمِينُهُ مَا تُنْفِقُ شِمَالُهُ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা এমন একদিন (কিয়ামতের দিন) তার (আরশের) ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া অবশিষ্ট থাকবে না।
(১) ন্যায়পরায়ণ শাসক।
ন্যায়পরায়ণ শাসক এর সংজ্ঞাঃ কোন বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি ছাড়া যে প্রত্যেকটি জিনিসকে যথাযথ স্থানে রাখে এবং নিজেও একজন ইনসাফ ওয়ালা হুকুমও করে ইনসাফের সাথে।
ন্যায়পরায়ণ শাসকের মৌলিক চারটি কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
اَلَّذِیۡنَ اِنۡ مَّکَّنّٰہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ وَاَمَرُوۡا بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَنَہَوۡا عَنِ الۡمُنۡکَرِ ؕ وَلِلّٰہِ عَاقِبَۃُ الۡاُمُوۡرِ
তারা এমন যে, আমি যদি দুনিয়ায় তাদেরকে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে। সব কাজে পরিণতি আল্লাহরই হাতে। সুরা আল হাজ্জ্ব - ৪১
ব্যাখ্যাঃ
আল্লাহ্ তা’আলা যখন কোন জাতিকে কোন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন, তখন তাদের নিম্নোক্ত বিষয় সমূহ কার্যকর করা বিশেষ প্রয়োজন- (১) নামায কায়েম করা, (২) যাকাত আদায় করা (৩) সৎকাজের আদেশ দেয়া (৪) অসৎ কাজে নিষেধ করা।
ন্যায়পরায়ণ শাসকের ফজিলতঃ
(ক) ন্যায়পরায়ণ শাসক কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকটে নূরের মেম্বারে বসবে।
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ الْمُقْسِطِينَ عِنْدَ اللَّهِ عَلَى مَنَابِرَ مِنْ نُورٍ عَنْ يَمِينِ الرَّحْمَنِ عَزَّ وَجَلَّ
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ন্যায়পরায়ণ শাসক (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর নিকটে নূরের মিম্বারসমূহে মহামহিম দয়াময় প্রভুর ডানপাৰ্শ্বে উপবিষ্ট থাকবেন। মুসলিম: ১৮২৭
(খ) ন্যায় পরায়ন শাসক জান্নাতি।
وَأَهْلُ الْجَنَّةِ ثَلاَثَةٌ ذُو سُلْطَانٍ مُقْسِطٌ مُتَصَدِّقٌ مُوَفَّقٌ وَرَجُلٌ رَحِيمٌ رَقِيقُ الْقَلْبِ لِكُلِّ ذِي قُرْبَى وَمُسْلِمٍ وَعَفِيفٌ مُتَعَفِّفٌ ذُو عِيَالٍ
রাসূলুল্লাহ্ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন প্রকারের লোক জান্নাতি । (এক) এমন শাসক যে ইনসাফ কারী, দানশীল এবং যাহাকে সৎ কাজের যোগ্যতাদান করা হইয়াছে। (দুই) এমন ব্যক্তি যিনি দয়ালু, নিকটতম ও অন্যান্য মুসলমানের প্রতি কোমল প্রাণবিশিষ্ট। (তিন) যে সৎচরিত্রের অধি- কারী এবং পারিবারিক দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা হইতে বাঁচিয়া থাকে। মুসলিম: ২৮৬৫
(গ) আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ ফিরিয়ে দেন না।
ثَلاَثَةٌ لاَ تُرَدُّ دَعْوَتُهُمُ الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ وَالإِمَامُ الْعَادِلُ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللَّهُ فَوْقَ الْغَمَامِ وَيَفْتَحُ لَهَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ وَعِزَّتِي لأَنْصُرَنَّكَ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ধরনের লোকের দু’আ কখনও ফিরিয়ে দেয়া হয় না। রোযাদার যতক্ষণ ইফতার না করে, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ এবং মজলুমের দু’আ। আল্লাহ তা’আলা ঐ দু’আগুলি মেঘমালার উপরে (আকাশের) তুলে নেন এবং এর জন্য আকাশের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়। রববুল আলামীন বলেনঃ আমার মর্যাদার শপথ! আমি নিশ্চয়ই তোমার সাহায্য করব কিছু দেরি হলেও। তিরমিজি: ৩৫৯৮
(২) ঐ যুবক, যে আল্লাহ তা’আলার ইবাদাতে মশগুল থেকে বড় হয়েছে।
যৌবন কাল অত্যন্ত মূল্যবান একটি সম্পদ। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ
اغتنِمْ خمسًا قبل خمسٍ : شبابَك قبل هَرَمِك، وصِحَّتَك قبل سَقَمِك، وغناك قبل فقرِك، وفراغَك قبل شُغلِك، وحياتَك قبل موتِك
তোমরা পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসকে মূল্যায়ন করো। ১. যৌবনকে মূল্যায়ন করো বার্ধক্যের আগে; ২. সুস্থতাকে মূল্যায়ন করো অসুস্থতা আসার আগে; ৩. সচ্ছলতাকে মূল্যায়ন করো দারিদ্র্য আসার আগে; ৪. অবসরকে মূল্যায়ন করো ব্যস্ততা আসার আগে এবং ৫. জীবনকে মূল্যায়ন করো মৃত্যু আসার আগে। মুস্তাদরাকে হাকেম-৭৮৪৬
আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন যৌবন কালের হিসাব নিবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
لاَ تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ
কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। তিরমিজি: ২৪১৬
(৩) সে ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সাথে লেগে রয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার কাছে সব চাইতে প্রিয় জায়গা হলো মাসজিদ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
أَحَبُّ الْبِلاَدِ إِلَى اللَّهِ مَسَاجِدُهَا وَأَبْغَضُ الْبِلاَدِ إِلَى اللَّهِ أَسْوَاقُهَا
আল্লাহ তা’আলার কাছে সব চাইতে প্রিয় জায়গা হলো মাসজিদসমূহ আর সব চাইতে খারাপ জায়গা হলো বাজারসমূহ। মুসলিম: ৬৭১
মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
المساجد بيوت الله في الأرض تضيء لأهل السماء كما تضيء نجوم السماء لأهل الأرض
দুনিয়ার মধ্যে মসজিদগুলো আল্লাহ তায়ালার ঘর। দুনিয়ার মসজিদগুলো আসমানকে আলোকিত করে যেমনি ভাবে আসমানের তারা দুনিয়াকে আলোকিত করে।
অন্য বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ
المسجدُ بيتُ كلِّ تقيٍّ، وتكفَّلَ اللهُ لمَن كان المسجدُ بيتَهُ بالرُّوحِ والرَّحمةِ، والجَوازِ على الصِّراطِ إلى رِضوانِ اللهِ، إلى الجنَّةِ
মসজিদ প্রত্যেক পরহেযগার (ধর্মভীরু) ব্যক্তির ঘর। যে ব্যক্তি মসজিদকে তার ঘর বানিয়ে নেয় ওই ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা দয়া করে মায়া করে নিজ দায়িত্বে পুলসিরাত পার করে জান্নাতে পৌঁছে দিবেন। বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ২৯৫০
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ
إِذَا رَأَيْتُمُ الرَّجُلَ يَعْتَادُ الْمَسَاجِدَ فَاشْهَدُوا لَهُ بِالإِيمَانِ
তোমরা কোন ব্যাক্তিকে মসজিদে যাতায়াত করতে দেখলে তার ঈমানের পক্ষে সাক্ষ্য দিও। ইবনু মাজাহ ৮০২
(৪) সে দু’ব্যক্তি, যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে একে অপরকে ভালবাসে ও পরস্পর মিলিত হয় এবং এ জন্যেই (পরস্পর) বিচ্ছিন্ন হয।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَجَبَتْ مَحَبَّتي لِلْمُتَحَابِّينَ فِيَّ، وَالمُتَجَالِسينَ فِيَّ، وَالمُتَزَاوِرِينَ فِيَّ، وَالمُتَبَاذِلِينَ فِيَّ
আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যারা পরস্পরের মধ্যে মহব্বত রাখে, একে অপরের সঙ্গে বসে, একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ এবং একে অপরের জন্য খরচ করে, তাদের জন্য আমার মহব্বত ও ভালবাসা ওয়াজেব হয়ে যায়। আহমাদ ২১৫২৫
(৫) যে ব্যক্তিকে কোন অভিজাত এবং সুন্দরী রমণী (ব্যভিচারের জন্য) আহবান জানায় আর তার জবাবে সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।
عَنْ أَبِيْ سَعِيْدٍ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّ رَجُلًا كَانَ قَبْلَكُمْ رَغَسَهُ اللهُ مَالًا فَقَالَ لِبَنِيْهِ لَمَّا حُضِرَ أَيَّ أَبٍ كُنْتُ لَكُمْ قَالُوْا خَيْرَ أَبٍ قَالَ فَإِنِّيْ لَمْ أَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ فَإِذَا مُتُّ فَأَحْرِقُونِيْ ثُمَّ اسْحَقُونِيْ ثُمَّ ذَرُّونِيْ فِيْ يَوْمٍ عَاصِفٍ فَفَعَلُوْا فَجَمَعَهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ فَقَالَ مَا حَمَلَكَ قَالَ مَخَافَتُكَ فَتَلَقَّاهُ بِرَحْمَتِهِ
আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তোমাদের আগের এক লোক, আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল তখন সে তার ছেলেদেরকে জড় করে জিজ্ঞেস করল আমি তোমাদের কেমন পিতা ছিলাম? তারা বলল আপনি আমাদের উত্তম পিতা ছিলেন। সে বলল, আমি জীবনে কখনও কোন নেক আমল করতে পারিনি। আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমার লাশকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিও এবং প্রচন্ড ঝড়ের দিন ঐ ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিও। সে মারা গেল। ছেলেরা ওসিয়াত অনুযায়ী কাজ করল। আল্লাহ্ তা‘আলা তার ছাই জড় করে জিজ্ঞেস করলেন, এমন ওসিয়াত করতে কে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, হে আল্লাহ্! তোমার শাস্তির ভয়। ফলে আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে নিল।বুখারী ৩৪৭৮
(৬) যে ব্যক্তি এতটা গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করে তা তার বাম হাত টের পায় না।
(৭) যে ব্যক্তি একাকী বসে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার চোখ দু’টো (আল্লাহর ভয় বা ভালবাসায়) অশ্রুপাত করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
اُدۡعُوۡا رَبَّکُمۡ تَضَرُّعًا وَّخُفۡیَۃً ؕ
তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। আ'রাফ - ৫৫
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উক্ত গুনগুলো অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।