বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দির

  • Home
  • Bangladesh
  • Narsingdi
  • বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দির

বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দির Religious Organisations

রাধা কৃষ্ণের ঝুলনযাত্রার আন্তরিক অভিনন্দন বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দির হরে কৃষ্ণ
23/08/2026

রাধা কৃষ্ণের ঝুলনযাত্রার আন্তরিক অভিনন্দন
বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দির
হরে কৃষ্ণ

অষ্টনাগ ১/অনন্ত নাগ ২/বাসুকি নাগ ৩/পদ্ম নাগ৪/মহাপন্ম নাগ৫/কুলিক নাগ ৬/কর্কট নাগ ৭/তক্ষক নাগ ৮/শঙ্খপাল নাগ
13/08/2026

অষ্টনাগ
১/অনন্ত নাগ
২/বাসুকি নাগ
৩/পদ্ম নাগ
৪/মহাপন্ম নাগ
৫/কুলিক নাগ
৬/কর্কট নাগ
৭/তক্ষক নাগ
৮/শঙ্খপাল নাগ

জীবই জীবের খাদ্য ও জীবন।  সনাতন জৈবধর্ম সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা নেই। তারা জানে না যে, জীবই জীবের জীবন। একটি জীবক...
07/08/2026

জীবই জীবের খাদ্য ও জীবন।

সনাতন জৈবধর্ম সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা নেই। তারা জানে না যে, জীবই জীবের জীবন। একটি জীবকে ভক্ষণ করেই অন্য জীব বেঁচে থাকে। প্রতিনিয়ত জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে না চাইলেও বৃহৎজীব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। শাস্ত্রে অহেতুক প্রাণীহত্যা নিষেধ করা হয়েছে। ভক্ষ্য প্রাণীকে ভক্ষক প্রাণীরা জীবন ধারণের জন্য খেতে পারে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন ভক্ষ্য প্রাণিসকল ভক্ষণ করে ভোক্তা প্রাণী কোন প্রকারের পাপভাগী হয় না। কারণ বিধাতাই এ জগতে একই সাথে ভক্ষ্য ও ভক্ষককে সৃষ্টি করেছেন।

নাত্তা দূষ্যত্যদন্নাদ্যান্ প্রাণিনোহহন্যহন্যপি ।
ধাত্রৈব সৃষ্টা হ্যাদ্যাশ্চ প্রাণিনোঽত্তার এব চ ৷৷
(মনুসংহিতা:৫.৩০)

"প্রতিদিন ভক্ষ্য প্রাণিসকল ভক্ষণ করে ভোক্তা দোষভাগী হয় না। বিধাতাই ভক্ষ্য প্রাণী ও ভক্ষকগণকে সৃষ্টি করেছেন ।"

শ্রীমদ্ভাগবতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "জীবো জীবস্য জীবনম্"। জীবই জীবের জীবন তত্ত্বটি আধুনিক জীববিজ্ঞানের প্রধানতম সূত্র।যে সূত্রের উপরে ভিত্তি করে পরবর্তীতে বহুসূত্র তৈরি হয়ে জীব বিজ্ঞান বিকশিত হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যে আধুনিক জীববিজ্ঞানের এই খাদ্যশৃঙ্খল তত্ত্বটি শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধেই রয়েছে:

কালকর্মগুণাধীনো দেহোঽয়ং পাঞ্চভৌতিকঃ।
কথমন্যাংস্তু গোপায়েৎ সর্বগ্রস্তো যথা পরম্ ৷৷
অহস্তানি সহস্তানামপদানি চতুষ্পদাম্।
ফল্গূনি তত্র মহতাং জীবো জীবস্য জীবনম্॥
তদিদং ভগবান্ রাজন্নেক আত্মাঽত্মনাং স্বদৃক্। অন্তরোঽনন্তরো ভাতি পশ্য তং মায়য়োরুধা৷৷
সোঽয়মদ্য মহারাজ ভগবান্ ভূতভাবনঃ।
কালরূপোঽবতীর্ণোঽস্যামভাবায় সুরদ্বিষাম্॥
( শ্রীমদ্ভাগবত: ১ ১৩.৪৫-৪৮)

"অজগর যাকে গ্রাস করেছে সে যেমন অন্যকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কাল, কর্ম ও ত্রিগুণের অধীন পাঞ্চভৌতিক এই দেহের পক্ষে অন্য কাউকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। চতুষ্পদ পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ তৃণ-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। এইভাবে এক জীবই অন্য জীবের খাদ্য - এই নিয়ম।

এ জগৎ ভগবানই। তিনিই সর্বজীবের আত্মা, অথচ অদ্বিতীয়, ঐভাবে স্বপ্রকাশ। তিনিই অন্তরস্থ, তিনিই বহিঃস্থ। এক ঈশ্বরই মায়াপ্রভাবে দেব, মানুষ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রতীয়মান হচ্ছেন। তুমি কেবল তাঁরই ধ্যান কর। হে মহারাজ! সেই মহামায়াময় প্রাণীগণের জীবনদানকারী সেই ভগবান বর্তমানে এ পৃথিবীতে দেবদ্রোহীদের নিধনের জন্য কালরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন।"

এখানে বলা হয়েছে, ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। এ খাদ্য শৃঙখলের বিষয়টি অত্যন্ত স্বাভাবিক। অর্থাৎ আমরা চাই বা না চাই ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক আমরা প্রাণীহত্যা করছি। হয়ত নিজেরা টেরও পাচ্ছি না। আধ্যাত্মিক অথবা মানবিক মূল্যবোধের দৃষ্টিতে জগতে অনেকেই নিরামিষ আহার করে। নিরামিষ আহার স্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণের। কারণ এ খাবারটি সহজপাচ্য। কে কি খাবে তা নিয়ে জোরজবরদস্তি না করে সে বিষয়টি যার যার ব্যক্তিগত রুচি এবং খাদ্যাভ্যাসের উপরেই ছেড়ে দেয়া মঙ্গল। ব্যক্তিই তার নিজস্ব রুচিবোধ অনুসারে খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস নির্বাচন করে নিবেন। তিনি প্রবৃত্তির মার্গে চলবেন নাকি নিবৃত্তির মার্গে চলবেন। তাই অহেতুকী খাদ্যাভ্যাস অকারণে আলোচনা সমালোচনার প্রয়োজন নেই। অবশ্য যে আমিষ এবং নিরামিষ নিয়ে এত কথা বলা হল, ভালো করে তলিয়ে দেখলে দেখা যায় সম্পূর্ণ নিরামিষ বলতে আসলে কিছুই নেই। জগতের প্রায় সকল খাবারেই আমিষ আছে। তাই বাক্যটি হওয়া উচিত উদ্ভিজ্জ আমিষ ও প্রাণীজ আমিষ। শ্রীমদ্ভগবদগীতার সপ্তদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, নিজ নিজ প্রকৃতি অনুসারে খাদ্য তিন প্রকারের। সাত্ত্বিক খাদ্য, রাজসিক খাদ্য এবং তামসিক খাদ্য। নিরামিষভোজীগণ কোন প্রাণী হত্যা করেন না বলে তারা উদ্ভিজ্জ আমিষ গ্রহণ করেন। কিন্তু তারা অনেকেও ভেবে দেখেন না যে, নিরামিষ বলতে আমরা চিনি সেই ধান, গম, জব, ভুট্টাসহ বিবিধ প্রকারের শাকসবজি বৃক্ষের প্রাণ রয়েছে। হয়ত মনুষ্যের মত বুদ্ধিসত্ত্বা না থাকলেও তাদের প্রাণ রয়েছে এবং চেতনা রয়েছে। এরাও অনেক কিছুই বুঝতে পারে। উদ্ভিদের যে প্রাণ রয়েছে এ বিষয়টি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছেন। বিষয়টি সমগ্র পৃথিবীর জন্য নতুন তত্ত্ব হলেও ভারতবর্ষের জন্যে নতুন নয়। উদ্ভিদের যে প্রাণ রয়েছে, এ বিষয়টি বেদ-পুরাণাদি শাস্ত্রে সৃষ্টির শুরু থেকেই রয়েছে। সেই পুরাতন তত্ত্বই শুধু আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় প্রকাশ করেছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।

বিবিধ শাস্ত্রে বিষয়টি রয়েছে। এরমধ্যে অষ্টাদশ পুরাণের অন্যতম ভবিষ্যপুরাণে সৃষ্টি অংশে আমরা দেখতে পাই, অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে সকল প্রকারের জীব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা বলা হয়েছে।জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ভিজ্জ এই চারপ্রকার সৃষ্টি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে উদ্ভিদ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা নিজের মধ্যে অল্পজ্ঞান রাখার জন্য জড় সৃষ্টি বলে পরিচিত কিন্তু এদেরও সুখ এবং দুঃখের অনুভব রয়েছে। অর্থাৎ একটি ছাগল, ভেড়াকে হত্যা করলে যে অনুভব হয়, সেই অনুভব একটি বৃক্ষ, গুল্মলতাকে করলেও হয়। শুধু কম আর বেশি। ছাগল, ভেড়াকে হত্যা করলে তার কষ্ট যাতনা দৃশ্যমান হয়, পক্ষান্তরে বৃক্ষ, গুল্মলতার কষ্ট যাতনা দৃশ্যমান নয়। তবে তাদের কষ্ট যাতনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে উপলব্ধি করা যায়।

ভবিষ্যপুরাণ অনুসারে পরমেশ্বর সৃষ্টির ইচ্ছায় প্রথমত তিনি দশজন মহর্ষি প্রজাপতির সৃষ্টি করেলেন। দশজন প্রজাপতি মহর্ষিরা হলেন- নারদ, ভৃগু, কম্, প্রচেতস, পুলহ, ঋতু পুলস্ত্য, অত্রি, অঙ্গিরস এবং মরীচি। মরীচি হলেন প্রথম প্রজাপতি। এঁকে এবং অন্যদের প্রচুর তেজ দ্বারা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন।এরপরে পর্যায়ক্রমে তিনি দেবতা, ঋষি, দৈত্য, রাক্ষস, যক্ষ, পিশাচ, গন্ধর্ব, অপ্সরা এবং অসুরদের সৃষ্টি করেন।

মনুষ্যানাং পিতৃণাংশ্চ সর্পাণাং চৈব ভারত।
নগানাং চ মহাবাহো সসৰ্জ বিবিধান্ গণান্।।
ক্ষণরুচোহশনিগণাত্রৌহিতেন্দ্ৰধনুংষি চ ।
ধূমকেতূং স্তথাচৌল্কানির্বাতা জ্যোতিষাংগণান্।।
মনুষ্যাক্নিন্নরান্ মস্ত্যান্বরাহাংশ্চ বিহংগ মান্।
গজানশ্চানথ পশুন মৃগান্ব্যালাংশ্চ ভারত।।
কৃমিকীর্তপতংগাংশ্চ মুকালিক্ষকমৎকুণান।
সর্ব চ দংশমশকং স্থাবরংচ পৃথগ্বিধম্।।
এবং স ভাস্করো দেব সসর্জ ভুবনত্রয়ম্।
যেযাং তু যাদৃশং কর্ম ভূতানামিহ কীৰ্তিতম্।।
কথয়িষ্যামি তৎ‍সর্বং ক্রমযোগং চ জন্মনি।
গজা ব্যালা মৃগাস্তাত পশবয়চ পৃথগ্বিধাঃ।।
পিশাচা মানুষা তাত রক্ষাংসি চ জরায়ুজাঃ।
দ্বিজাস্ত্য অণ্ডজাঃ সৰ্পা ণক্রা মৎস্যাঃ সকচ্ছপাঃ।।
এবং বিধানি মানীহ স্থলজান্যৌদকানি চ।
স্বেদজং দংশমংশকং কালিক্ষ কমৎকুণাঃ।।
উষ্মণা চোপজায়ন্তে সচ্চান্যক্তিচিদীদশম্।
উদ্ভিজ্জাঃ স্থাবরাঃ সর্বে বীজকাণ্ড প্ররোহিণঃ।।
ঔষধ্যঃ ফলপাকান্তা নানাবিধফলোপগাঃ ।
অপুষ্পাঃ ফলবন্তৌ যে তে বনস্পতয়ঃ সমৃতাঃ।।
পুষ্পিণঃ ফলিণশ্চৈব বৃক্ষাস্তূভয়তঃ সমৃতাঃ।
গুচ্ছগুল্মং তু বিবিধং তথৈব তৃণজাতয়ঃ।।
বীজকাণ্ডরু হান্যেব প্রতানা বল্লয় এব চ ।
তমসা বহুরূপেন বেষ্টিতাঃ কর্মহেতুনা।।
অন্তঃ সংজ্ঞা ভবন্ত্যে তে সুখদুঃখসমন্বিতাঃ।
এতাবত্যস্তু গতয়ঃ প্রোদ্ভূতাঃ কুরুনন্দন।।
তসমাদ্দেবাদ্দীপ্তি-মন্তৌ ভাস্করচ্চ মহাত্মনঃ।
ঘোরেসিমংস্তাত সংসারে নিত্যং সততয়ায়িনি।৷
এবং সর্বং সসৃষ্ট্রেদং রাজল্লেঁকগুরুং পরম্।
তিরোভূতঃ স ভূতাত্মা কালং কালেন পীড্যণ্।।
(ভবিষ্যপুরাণ: ব্রাহ্মপর্ব, সৃষ্টি, ৬৪-৭৮)

"হে ভারত! মহাবাহ মনুষ্য, পিতৃগণ, সর্পবর্গ, নাগ এবং বিবিধগণেরসৃষ্টি করেছেন।।

বিদ্যুৎ, অশনি, রেহিতেন্দ্র ধনু, ধূমকেতু, উল্কা নিপাত, জ্যোতিগণ, মানুষ, কিন্নর, মৎস্য, বরাহ এবং বিহঙ্গের সৃষ্টি করেছেন। হাতি, ঘোড়া, পশু, মৃগ এবং হিংস্র জন্তুর সৃষ্টি করেছেন।।

কৃমি, কীট, পতঙ্গ, জোঁক, লিক্ষা এবং ছারপোকা সৃষ্টি করেছেন। দংশ (ডাঁশ) এবং বিবিধ মশার সৃষ্টি করেছেন।।
এই ভাবেই সূৰ্য্যদেব এই ভুবনত্রয় নির্মাণ করেছেন, যেখানে প্রাণীদের বিভিন্ন কর্ম নির্দেশ করা হয়েছে।

এরপর ভবিষ্যজন্মের সব ক্রমযোগ বলা হবে, হে পিতা! হস্তি, হিংস্র জন্তু, মৃগ এবং অন্য প্রকারের পশুবর্গ, পিশাচ, মানুষ, রাক্ষস সব কিছু জরায়ুজ। পক্ষী, সর্প, মৎস্য এবং কচ্ছপ হল অণ্ডজ। জরায়ুতে উৎপন্ন হলে জরায়ুজ এবং অণ্ড (ডিম) থেকে উৎপন্ন হলে সেই জীবকে বলা হয় অণ্ডজ।

কিছু জীব আছে যারা স্থলভাগে জন্মায় এবং কিছু জীব আছে যারা জলে জন্মায়। দংশনকারী মশা, জোঁক, লিক্ষা এবং ছারপোকা এদের স্বেদজ বলা হয়। কারণ এরা স্বেদ থেকে উৎপন্ন হয় আর এক প্রকারের জীব আছে যাদের উদ্ভিজ্জ বলা হয় কারণ এরা ভূমিতে সৃষ্ট হয় এবং বীজ কাণ্ড পরিণত হয়।

এইভাবে জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ভিজ্জ এই চারপ্রকার সৃষ্টি হয়েছে। ওষধি, ফল অন্তে পক্ব হয়, নানাপ্রকার ফলযুক্ত এবং পুষ্প রহিত, তাকে বনস্পতি বলা হয়।।

বৃক্ষ দুই প্রকারের হয়। কিছু বৃক্ষ আছে শুধুমাত্র যাতে ফুল হয় এবং কিছুবৃক্ষ আছে যার ফুল ও ফল দুই-ই হয়। গুচ্ছ, গুল্ম অনেক প্রকারের হয়। এভাবে তৃণেরও বিভিন্ন জাতি উৎপন্ন হয়।

বীজ এবং কাণ্ডতে প্ররোহণ প্রাপ্ত বৃক্ষকে বল্লী বলে। অনেকপ্রকার কর্মস্বরূপ হেতুর অন্ধকারে সব বেষ্টিত হয়ে আছে।।

এরা নিজের মধ্যে অল্পজ্ঞান রাখার জন্য জড় সৃষ্টি বলে পরিচিত কিন্তু এদেরও সুখ এবং দুঃখের অনুভব অবশ্যই থাকে। অতএব এরা সুখ-দুঃখ সমন্বিত হয়। হে কুরুনন্দন! এই গতি উদ্ভূত হয়। মহান আত্মা সূর্য্যদেবের আলোয় দীপ্ত হয় এবং নিরন্তর গমনশীল এই ঘোর সংসারে প্রকট হয়।

এইভাবে তিনি জগত সৃষ্টি করে একসময় থেকে অন্য সময়কে পীড়িত করেন এবং তিনি ভূতাত্মা পরমলোকে তিরোভূত হয়ে যান।"

ভবিষ্য পুরাণের সৃষ্টি বর্ণনের ৭১ থেকে ৭৬ শ্লোকে সম্পূর্ণ বৃক্ষ, গুল্মসহ উদ্ভিদ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এবং সেই উদ্ভিদদের সুখ-দুঃখ সমন্বিত জীব হিসেবে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। মহর্ষী বেদব্যাস কোন প্রকার এসকোনোগ্রাফার ছাড়াই বলেছেন যে, উদ্ভিদের উপর বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে ইলেক্ট্রন প্রবাহের ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে উদ্ভিদও সুখ দুঃখের আবর্তনে প্রবাহিত হয়। ভবিষ্য পুরাণে আরও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে যে, সূর্যের বিকিরণের কারণেই উদ্ভিদের মধ্যে ইলেক্ট্রনের প্রাবাহ ঘটে। বর্তমান বায়োকেমিস্ট বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেছেন বৃক্ষের কোষ মেমব্রেন বিভবের পরিবর্তন ও ইলেক্ট্রন প্রবাহের জন্য বেশি দায়ী সূর্যের রশ্মি।

"জীবো জীবস্য জীবনম্" এ শাস্ত্রীয় এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি আমরা মহাভারতের বনপর্বেও পাই। সেখানে ধর্মব্যাধ ব্রাহ্মণ কৌশিককে বিবিধ উদাহরণে মাধ্যমে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি বলেন। অনেকে কৃষিকাজকে উত্তম বলে মনে করেন, তাদের ধারণা কৃষিকাজে কোন জীব হিংসা নেই। কিন্তু তারা হয়ত জানেন না যে কৃষিকাজেও গুরুতর হিংসা রয়েছে। কৃষিকাজ করার সয়য়ে কারণ, মানুষ লাঙ্গলের দ্বারা ভূমি কর্ষণ করার সময়ে অজ্ঞাতসারে ভূমির মধ্যে অবস্থিত বহু প্রকারের ক্ষুদ্র জীব হত্যা করে। এ সকল অধিকাংশ ক্ষুদ্র জীবকে খালি চোখে দেখা যায় না। তাই তাদের হত্যায় কেউ বিচলিত হয় না। শাস্ত্রীয়ভাবে উদ্ভিদ তো জীব বটেই, এমনকি ধান, গম, জব প্রভৃতি শস্যের বীজও। কারণ এই বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদের জন্ম হয়। অথচ সেই ধানকে খাদ্যশস্য হিসেবে নির্দ্বিধায় খেয়ে যাই। মানুষেরা প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে বৃক্ষ-লতা ছেদন করে। এতেও জীব হত্যা হয়। কারণ তাদেরও চেতনসত্ত্বা আছে। বৃক্ষে যেমন প্রাণ রয়েছে, তেমনি বৃক্ষের ফলেও প্রাণ রয়েছে। একারণেই ফল থেকে আরেকটি বৃক্ষের জন্ম হয়। বীজের ভেতরে ফলের ভেতরে চেতন সৃষ্টি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় তাদের থেকে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। ভাবতে অবাক লাগে যে, অণুবীক্ষণযন্ত্রসহ আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বর্তমান আমরা জানতে পেরেছি যে জলের মধ্যে অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে। প্রতি গ্লাস জল খাওয়ায় সাথে সাথে আমরা এ অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকেও দৃষ্টির অজান্তে মনের অজান্তে খেয়ে ফেলছি। ভাবতে অবাক লাগে যে, জলে যে বহু প্রকারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে, এ অত্যন্ত আধুনিক তত্ত্বটি মহাভারতে রয়েছে। যা সত্যি অত্যন্ত বিস্ময়ের। আমাদের শাস্ত্রগ্রন্থাদি ত্রিকালদর্শী মুনি ঋষিদের প্রণীত। তাঁরা ছিলেই সেই কালের সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বদ্রষ্টা এবং বৈজ্ঞানিক বিষয় আজ বহুক্ষেত্রেই পশ্চিমা বৈদেশিক বিজ্ঞানীদের দ্বারা প্রমাণিত। এ সমগ্র জগত প্রাণিভোজী প্রাণিগণদ্বারাই পরিব্যাপ্ত। জ্ঞানত অথবা অজ্ঞাতসারে প্রাণী ভক্ষণ করেই সকল প্রাণী বেঁচে আছে। এমনকি জলের মধ্যে একই মৎস্য বংশের হওয়ার পরেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মৎস্যদেরকে বৃহত্তর মৎস্যরা ভক্ষণ করে তাদের জীবন নির্বাহ করে। স্বজাতীয়দের ভক্ষণের যে স্বভাব মৎস্যদের, এর জন্যে তারা নিজেরা দায়ি নয়। এ স্বভাব বা অভ্যাসটি তারা জন্মগতভাবেই পেয়েছে। মৎস্য স্বজাতি মৎস্যকে খেয়ে বেঁচে থাকার বিষয়টি বেদেও বর্ণিত হয়েছে :

স হােবাচ। যাবদ্বৈ ক্ষুল্লকা ভবামাে বহ্বী বৈ নস্তাবন্নাষ্ট্রা ভবত্যুত মৎস্য এব মৎস্যং গিলতি কুম্ভ্যাং মাগ্রে বিভরাসি স যদা তামতিবর্ধাs অথ কর্ষুং খাত্বা তস্যাং মাং বিভরাসি স যদা তামতিবর্ধাsঅথ মা সমুদ্রমভ্যবহরাসি
তৰ্হি বা অতিনাষ্ট্রো ভবিতাশ্মীতি৷৷
(শতপথব্রাহ্মণ: মাধ্যন্দিন, ১.৮.১.৩)

"মৎস্যটি বললো, যতক্ষণ আমরা ক্ষুদ্র থাকি ততক্ষণই আমাদের বহুবিধ বিপদ হয়, এমনকি মৎস্যই মৎস্যকে গিলে ফেলে। অতএব আমাকে প্রথমে কলসীতে আলাদাভাবে পালন কর। যখন আমি কিছুটা বড় হয়ে সেই কলসিকে ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠব, তখন একটি খাল খনন করে আমাকে সেখানে পােষণ করবে। এরপরে যখন সেই খালকেও ছাড়িয়ে অনেক বড় হব, তখন আমাকে সমুদ্রে নিয়ে যাবে।এভবেই আমি বিপদকে অতিক্রম করে বেঁচে যেতে পারবাে।”

প্রাণীকুলে এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যারা অন্য প্রাণীদের আত্মসাৎ করেই জীবিত থাকে। মানুষ এবং বিভিন্ন প্রকারের পশুপাখি ইত্যাদি জঙ্গম প্রাণীরা, চলাফেরা করতে পারে। তারা যখন ভূতলে অনবরত বিচরণ করে, তখন তাদের পায়ের আঘাতে বহু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব নিহত হয়। এমনকি অনেক জ্ঞানী এবং মহান ব্যক্তিরাও, যাদের হৃদয়ে সমগ্র জীবের প্রতি করুণার ভাব প্রবল; তারাও তাদের অজান্তেই চলাফেরা, উপবেশন এবং শয়নসহ বিবিধ প্রকারের কর্ম করার সময়ে অসংখ্য প্রাণীকে বিনাশ করে থাকেন। এই সমগ্র আকাশ এবং পৃথিবী প্রাণীদ্বারাই ব্যাপ্ত রয়েছে। জ্ঞানত বা অজ্ঞানত প্রাণীরাই প্রাণীদের হিংসা বা বধ করে বেঁচে থাকে। তাই প্রাণী হত্যা না করে একদণ্ডও কোন প্রাণী বেঁচে থাকতে পারবে না। কোন প্রাণী যখন জীবন ধারণের জন্য নিঃশ্বাস গ্রহণ করে, তখনও অসংখ্য প্রাণী নিঃশ্বাসের সাথে সেই প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে মৃত্যুবরণ করে।

কৃষিং সাধ্বিতি মন্যন্তে তত্র হিংসা পরা স্মৃতা।
কর্ষন্তো লাঙ্গলৈর্মত্যা ঘ্নন্তি ভূমিশয়ান বহূন্।
জীবানন্যাংশ্চ বহুশস্তত্র কিং প্রতিভাতি তে ॥
ধান্যবীজানি যান্যাহুর্ব্রীহ্যাদীনি দ্বিজোত্তম।
সর্বাণ্যেতানি জীবানি তত্র কিং প্রতিভাতি তে ॥
অধ্যাক্রম্য পশুংশ্চাপি ঘ্নন্তি বৈ ভন্নয়ন্তি চ।
বৃক্ষাংস্তথৌষধীশ্চাপি ছিন্দন্তি পুরুষা দ্বিজ ॥
জীবা হি বহুবো ব্ৰহ্মণ বৃক্ষেষু চ ফলেষু চ ।
উদকে বহবশ্চাপি তন্ত্র কিং প্রতিভাতি তে ॥
সবং ব্যাপ্তমিদং ব্ৰহ্মন্ প্রাণিভিঃ প্রাণিজীবনৈঃ ।
মৎস্যান্ গ্রসন্তে মৎস্যাশ্চ তত্র কিং প্রতিভাতি তে।।
সত্ত্বৈঃ-সত্ত্বানি জীবন্তি বহুধা দ্বিজসত্তম।
প্রাণিনোঽন্যোন্যভক্ষ্যাশ্চ তত্র কিং প্রতিভাতি তে।।
চংক্রম্যমাণান্ জীবাংশ্চ ধরণীসংশ্রিতান্ বহূন্ ।
পদ্ভ্যাং ঘ্নন্তি নরা বিপ্র তত্র কিং প্রতিভাতি তে ॥
উপবিষ্টাঃ শয়ানাশ্চ ঘ্নন্তি জীবাননেকেশঃ।
জ্ঞানবিজ্ঞানবন্তশ্চ তত্র কিং প্রতিভাতি তে ॥
জীবৈর্গ্রস্তমিদং সর্বমাকাশং পৃথিবী তথা।
অবিজ্ঞানাচ্চ হিংসন্তি তত্র কিং প্রতিভাতি তে ॥
(মহাভারত: বনপর্ব,৭৬.২৩-৩১)

"অনেকে কৃষিকাৰ্য্যটাকে উত্তম বলে মনে করেন; কিন্তু তাতেও গুরুতর হিংসা রয়েছে। কারণ, মানুষ লাঙ্গলের দ্বারা ভূমি কর্ষণ করার সময়ে অজ্ঞাতসারে ভূমিস্থিত বহুতর জীব হত্যা করে ; সে বিষয়ে আপনার কি মনে হয়?

হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! ধান্য প্রভৃতি যে সকল বস্তুকে শস্যের বীজ বলে, সে সমস্তও ত জীব; সে বিষয়ে আপনার কি মনে হয়?

হে ব্রাহ্মণ! ধাৰ্ম্মিক মনুষ্যেরাও আক্রমণপূর্ব্বক পশু বধ করে ও তা ভক্ষণ করে এবং বৃক্ষ-লতা ছেদন করে থাকে।

হে ব্রাহ্মণ ! বৃক্ষ, ফল এবং জলেও বহু প্রকারের জীব রয়েছে, সে বিষয়েই বা আপনার কি মনে হয়?

প্রাণিভোজী প্রাণিগণদ্বারাই এই জগৎ ব্যাপ্ত রয়েছে এবং মৎস্যগণ অপর মৎস্যদেরকে ভক্ষণ করে; সে বিষয়েই বা আপনার কি মনে হয়?

হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ। বহুতর দ্রব্য অপর দ্রব্যসমূহকে আত্মসাৎ করেই জীবিত থাকে এবং প্রাণীরা পরস্পর পরস্পরকে ভক্ষণ করে, সে বিষয়েই বা আপনার কি মনে হয়?

হে ব্রাহ্মণ ! বহুতর প্রাণী ভূতলে অনবরত বিচরণ করে; কিন্তু মানুষেরা চরণযুগলদ্বারা তাদেরকে বধ করে থাকে; সুতরাং সে বিষয়ে আপনার কি মনে হয় ?

এর এপর, জ্ঞানবান্, ও বিজ্ঞানবান্ লোকেরাও উপবেশন এবং শয়ন করে অনেক প্রাণী বিনাশ করে থাকেন; সেই বিষয়েই বা আপনার কি মনে হয়?

এই সমগ্র আকাশ এবং পৃথিবী প্রাণীদ্বারাই ব্যাপ্ত রয়েছে, অথচ অজ্ঞানতঃ অপর প্রাণীরা তাদেরকে হিংসা বা বধ করছে; সে সম্পর্কেই বা আপনার কি মনে হয়?"

জীব বেঁচে থাকতে জীব হত্যা স্বাভাবিক একটি বিষয়। শুধু বড় প্রাণী যাদের বুদ্ধি এবং অনুভূতি প্রবল; তাদের অহেতুক হত্যায় সংস্কার এবং বিবেকে বাঁধে। এবং বিবেকে বাঁধা উচিতও। একথা যেমন সত্য যে, "জীবই জীবের খাদ্য ও জীবন"। আবার পক্ষান্তরে সকলের যথাসম্ভব প্রচেষ্টা করা উচিত বুদ্ধি এবং অনুভূতি প্রবল জীবদের হত্যা না করে বেঁচে থাকা।আগুনে ধুপ দিলে ধুপের ঘ্রাণ যেমন আসবে, ঠিক একইভাবে খাদ্যাভ্যাস মানুষের দেহমনের উপরে অত্যধিক প্রভাব বিস্তার করে এতে কোন সন্দেহ নেই। ধান্যাদিসহ শাকসবজীরও চেতনা রয়েছে। তবে স্থাবর জীব ধান্যাদি শাকসবজীর চেতনার বিপরীতে জঙ্গমজীব মৎস্য, মুরগি, পাখি, গরু এবং সর্বোপরি মনুষ্যের চেতনা এক নয়। যার বুদ্ধি এবং চেতনা যত বেশি বিকশিত, তার বেদনাও তত বেশি। যখন কোন জীবকে হত্যা করা হয়, তখন তার বেদনা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বেদনা ছড়িয়ে পড়া দেহের মাংসটি যখন ভক্ষণ করা হয়; তখন মনুষ্য অবচেতনভাবেই সেই বেদনার অংশীদার হয়ে যায়। তাই যারা বেদাদি শাস্ত্রচর্চা, বিদ্যাচর্চা, মেধাচর্চায় নিয়োজিত, তাদের প্রাণীজ আমিষ ভক্ষণ না করাই সর্বোত্তম। জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য উদ্ভিদ আমিষ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং ফলদায়ক।পক্ষান্তরে যারা, সেনাবাহিনী সহ দেশরক্ষার কায়িকশ্রমে নিয়োজিত, তাদের জন্যে প্রাণীজ আমিষ প্রয়োজনীয় বলে সমাজে স্বীকৃত। অর্থাৎ এ বিষয়টি স্মর্তব্য যে, জগতে সকলের এক খাদ্য নয়। এ বৈশ্বিক সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক বিষয়টি সনাতন শাস্ত্রে বহু পূর্বেই বলা হয়েছে।শাস্ত্রে যেমন একদিকে বলা হয়েছে, প্রাণীই প্রাণীর খাদ্য ও জীবন; ঠিক তেমনি মনুষ্যের ভক্ষণের অযোগ্য অমেধ্য তালিকাও দেয়া রয়েছে। সে অনুসারে মনুষ্যমাংস, গোমাংস, কৃমি, বিষ্ঠা প্রভৃতি অমেধ্য; তাই সে সকল ভক্ষণ নিষিদ্ধ।

✍️ ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
Dr. Kushal Baran Chakraborty

শিব ওঁ তৎ সৎ।।জীবই জীবের খাদ্য ও জীবন।

সনাতন জৈবধর্ম সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা নেই। তারা জানে না যে, জীবই জীবের জীবন। একটি জীবকে ভক্ষণ করেই অন্য জীব বেঁচে থাকে। প্রতিনিয়ত জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে না চাইলেও বৃহৎজীব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। শাস্ত্রে অহেতুক প্রাণীহত্যা নিষেধ করা হয়েছে। ভক্ষ্য প্রাণীকে ভক্ষক প্রাণীরা জীবন ধারণের জন্য খেতে পারে। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন ভক্ষ্য প্রাণিসকল ভক্ষণ করে ভোক্তা প্রাণী কোন প্রকারের পাপভাগী হয় না। কারণ বিধাতাই এ জগতে একই সাথে ভক্ষ্য ও ভক্ষককে সৃষ্টি করেছেন।

নাত্তা দূষ্যত্যদন্নাদ্যান্ প্রাণিনোহহন্যহন্যপি ।
ধাত্রৈব সৃষ্টা হ্যাদ্যাশ্চ প্রাণিনোঽত্তার এব চ ৷৷
(মনুসংহিতা:৫.৩০)

"প্রতিদিন ভক্ষ্য প্রাণিসকল ভক্ষণ করে ভোক্তা দোষভাগী হয় না। বিধাতাই ভক্ষ্য প্রাণী ও ভক্ষকগণকে সৃষ্টি করেছেন ।"

শ্রীমদ্ভাগবতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "জীবো জীবস্য জীবনম্"। জীবই জীবের জীবন তত্ত্বটি আধুনিক জীববিজ্ঞানের প্রধানতম সূত্র।যে সূত্রের উপরে ভিত্তি করে পরবর্তীতে বহুসূত্র তৈরি হয়ে জীব বিজ্ঞান বিকশিত হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে যে আধুনিক জীববিজ্ঞানের এই খাদ্যশৃঙ্খল তত্ত্বটি শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধেই রয়েছে:

কালকর্মগুণাধীনো দেহোঽয়ং পাঞ্চভৌতিকঃ।
কথমন্যাংস্তু গোপায়েৎ সর্বগ্রস্তো যথা পরম্ ৷৷
অহস্তানি সহস্তানামপদানি চতুষ্পদাম্।
ফল্গূনি তত্র মহতাং জীবো জীবস্য জীবনম্॥
তদিদং ভগবান্ রাজন্নেক আত্মাঽত্মনাং স্বদৃক্। অন্তরোঽনন্তরো ভাতি পশ্য তং মায়য়োরুধা৷৷
সোঽয়মদ্য মহারাজ ভগবান্ ভূতভাবনঃ।
কালরূপোঽবতীর্ণোঽস্যামভাবায় সুরদ্বিষাম্॥
( শ্রীমদ্ভাগবত: ১ ১৩.৪৫-৪৮)

"অজগর যাকে গ্রাস করেছে সে যেমন অন্যকে রক্ষা করতে পারে না, তেমনি কাল, কর্ম ও ত্রিগুণের অধীন পাঞ্চভৌতিক এই দেহের পক্ষে অন্য কাউকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। চতুষ্পদ পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ তৃণ-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। এইভাবে এক জীবই অন্য জীবের খাদ্য - এই নিয়ম।

এ জগৎ ভগবানই। তিনিই সর্বজীবের আত্মা, অথচ অদ্বিতীয়, ঐভাবে স্বপ্রকাশ। তিনিই অন্তরস্থ, তিনিই বহিঃস্থ। এক ঈশ্বরই মায়াপ্রভাবে দেব, মানুষ প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রতীয়মান হচ্ছেন। তুমি কেবল তাঁরই ধ্যান কর। হে মহারাজ! সেই মহামায়াময় প্রাণীগণের জীবনদানকারী সেই ভগবান বর্তমানে এ পৃথিবীতে দেবদ্রোহীদের নিধনের জন্য কালরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন।"

এখানে বলা হয়েছে, ভগবানই সকলের উপযুক্ত জীবিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই হাতযুক্ত মানুষ হাত নেই এমন প্রাণীদের খায়, পা যুক্ত পশুরা পা নেই এমন খাদ্য অর্থাৎ ঘাস-লতাপাতা খায়। এভাবে বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে। এ খাদ্য শৃঙখলের বিষয়টি অত্যন্ত স্বাভাবিক। অর্থাৎ আমরা চাই বা না চাই ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক আমরা প্রাণীহত্যা করছি। হয়ত নিজেরা টেরও পাচ্ছি না। আধ্যাত্মিক অথবা মানবিক মূল্যবোধের দৃষ্টিতে জগতে অনেকেই নিরামিষ আহার করে। নিরামিষ আহার স্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণের। কারণ এ খাবারটি সহজপাচ্য। কে কি খাবে তা নিয়ে জোরজবরদস্তি না করে সে বিষয়টি যার যার ব্যক্তিগত রুচি এবং খাদ্যাভ্যাসের উপরেই ছেড়ে দেয়া মঙ্গল। ব্যক্তিই তার নিজস্ব রুচিবোধ অনুসারে খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস নির্বাচন করে নিবেন। তিনি প্রবৃত্তির মার্গে চলবেন নাকি নিবৃত্তির মার্গে চলবেন। তাই অহেতুকী খাদ্যাভ্যাস অকারণে আলোচনা সমালোচনার প্রয়োজন নেই। অবশ্য যে আমিষ এবং নিরামিষ নিয়ে এত কথা বলা হল, ভালো করে তলিয়ে দেখলে দেখা যায় সম্পূর্ণ নিরামিষ বলতে আসলে কিছুই নেই। জগতের প্রায় সকল খাবারেই আমিষ আছে। তাই বাক্যটি হওয়া উচিত উদ্ভিজ্জ আমিষ ও প্রাণীজ আমিষ। শ্রীমদ্ভগবদগীতার সপ্তদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, নিজ নিজ প্রকৃতি অনুসারে খাদ্য তিন প্রকারের। সাত্ত্বিক খাদ্য, রাজসিক খাদ্য এবং তামসিক খাদ্য। নিরামিষভোজীগণ কোন প্রাণী হত্যা করেন না বলে তারা উদ্ভিজ্জ আমিষ গ্রহণ করেন। কিন্তু তারা অনেকেও ভেবে দেখেন না যে, নিরামিষ বলতে আমরা চিনি সেই ধান, গম, জব, ভুট্টাসহ বিবিধ প্রকারের শাকসবজি বৃক্ষের প্রাণ রয়েছে। হয়ত মনুষ্যের মত বুদ্ধিসত্ত্বা না থাকলেও তাদের প্রাণ রয়েছে এবং চেতনা রয়েছে। এরাও অনেক কিছুই বুঝতে পারে। উদ্ভিদের যে প্রাণ রয়েছে এ বিষয়টি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছেন। বিষয়টি সমগ্র পৃথিবীর জন্য নতুন তত্ত্ব হলেও ভারতবর্ষের জন্যে নতুন নয়। উদ্ভিদের যে প্রাণ রয়েছে, এ বিষয়টি বেদ-পুরাণাদি শাস্ত্রে সৃষ্টির শুরু থেকেই রয়েছে। সেই পুরাতন তত্ত্বই শুধু আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় প্রকাশ করেছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।

বিবিধ শাস্ত্রে বিষয়টি রয়েছে। এরমধ্যে অষ্টাদশ পুরাণের অন্যতম ভবিষ্যপুরাণে সৃষ্টি অংশে আমরা দেখতে পাই, অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে সকল প্রকারের জীব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা বলা হয়েছে।জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ভিজ্জ এই চারপ্রকার সৃষ্টি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে উদ্ভিদ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা নিজের মধ্যে অল্পজ্ঞান রাখার জন্য জড় সৃষ্টি বলে পরিচিত কিন্তু এদেরও সুখ এবং দুঃখের অনুভব রয়েছে। অর্থাৎ একটি ছাগল, ভেড়াকে হত্যা করলে যে অনুভব হয়, সেই অনুভব একটি বৃক্ষ, গুল্মলতাকে করলেও হয়। শুধু কম আর বেশি। ছাগল, ভেড়াকে হত্যা করলে তার কষ্ট যাতনা দৃশ্যমান হয়, পক্ষান্তরে বৃক্ষ, গুল্মলতার কষ্ট যাতনা দৃশ্যমান নয়। তবে তাদের কষ্ট যাতনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে উপলব্ধি করা যায়।

ভবিষ্যপুরাণ অনুসারে পরমেশ্বর সৃষ্টির ইচ্ছায় প্রথমত তিনি দশজন মহর্ষি প্রজাপতির সৃষ্টি করেলেন। দশজন প্রজাপতি মহর্ষিরা হলেন- নারদ, ভৃগু, কম্, প্রচেতস, পুলহ, ঋতু পুলস্ত্য, অত্রি, অঙ্গিরস এবং মরীচি। মরীচি হলেন প্রথম প্রজাপতি। এঁকে এবং অন্যদের প্রচুর তেজ দ্বারা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন।এরপরে পর্যায়ক্রমে তিনি দেবতা, ঋষি, দৈত্য, রাক্ষস, যক্ষ, পিশাচ, গন্ধর্ব, অপ্সরা এবং অসুরদের সৃষ্টি করেন।

মনুষ্যানাং পিতৃণাংশ্চ সর্পাণাং চৈব ভারত।
নগানাং চ মহাবাহো সসৰ্জ বিবিধান্ গণান্।।
ক্ষণরুচোহশনিগণাত্রৌহিতেন্দ্ৰধনুংষি চ ।
ধূমকেতূং স্তথাচৌল্কানির্বাতা জ্যোতিষাংগণান্।।
মনুষ্যাক্নিন্নরান্ মস্ত্যান্বরাহাংশ্চ বিহংগ মান্।
গজানশ্চানথ পশুন মৃগান্ব্যালাংশ্চ ভারত।।
কৃমিকীর্তপতংগাংশ্চ মুকালিক্ষকমৎকুণান।
সর্ব চ দংশমশকং স্থাবরংচ পৃথগ্বিধম্।।
এবং স ভাস্করো দেব সসর্জ ভুবনত্রয়ম্।
যেযাং তু যাদৃশং কর্ম ভূতানামিহ কীৰ্তিতম্।।
কথয়িষ্যামি তৎ‍সর্বং ক্রমযোগং চ জন্মনি।
গজা ব্যালা মৃগাস্তাত পশবয়চ পৃথগ্বিধাঃ।।
পিশাচা মানুষা তাত রক্ষাংসি চ জরায়ুজাঃ।
দ্বিজাস্ত্য অণ্ডজাঃ সৰ্পা ণক্রা মৎস্যাঃ সকচ্ছপাঃ।।
এবং বিধানি মানীহ স্থলজান্যৌদকানি চ।
স্বেদজং দংশমংশকং কালিক্ষ কমৎকুণাঃ।।
উষ্মণা চোপজায়ন্তে সচ্চান্যক্তিচিদীদশম্।
উদ্ভিজ্জাঃ স্থাবরাঃ সর্বে বীজকাণ্ড প্ররোহিণঃ।।
ঔষধ্যঃ ফলপাকান্তা নানাবিধফলোপগাঃ ।
অপুষ্পাঃ ফলবন্তৌ যে তে বনস্পতয়ঃ সমৃতাঃ।।
পুষ্পিণঃ ফলিণশ্চৈব বৃক্ষাস্তূভয়তঃ সমৃতাঃ।
গুচ্ছগুল্মং তু বিবিধং তথৈব তৃণজাতয়ঃ।।
বীজকাণ্ডরু হান্যেব প্রতানা বল্লয় এব চ ।
তমসা বহুরূপেন বেষ্টিতাঃ কর্মহেতুনা।।
অন্তঃ সংজ্ঞা ভবন্ত্যে তে সুখদুঃখসমন্বিতাঃ।
এতাবত্যস্তু গতয়ঃ প্রোদ্ভূতাঃ কুরুনন্দন।।
তসমাদ্দেবাদ্দীপ্তি-মন্তৌ ভাস্করচ্চ মহাত্মনঃ।
ঘোরেসিমংস্তাত সংসারে নিত্যং সততয়ায়িনি।৷
এবং সর্বং সসৃষ্ট্রেদং রাজল্লেঁকগুরুং পরম্।
তিরোভূতঃ স ভূতাত্মা কালং কালেন পীড্যণ্।।
(ভবিষ্যপুরাণ: ব্রাহ্মপর্ব, সৃষ্টি, ৬৪-৭৮)

"হে ভারত! মহাবাহ মনুষ্য, পিতৃগণ, সর্পবর্গ, নাগ এবং বিবিধগণেরসৃষ্টি করেছেন।।

বিদ্যুৎ, অশনি, রেহিতেন্দ্র ধনু, ধূমকেতু, উল্কা নিপাত, জ্যোতিগণ, মানুষ, কিন্নর, মৎস্য, বরাহ এবং বিহঙ্গের সৃষ্টি করেছেন। হাতি, ঘোড়া, পশু, মৃগ এবং হিংস্র জন্তুর সৃষ্টি করেছেন।।

কৃমি, কীট, পতঙ্গ, জোঁক, লিক্ষা এবং ছারপোকা সৃষ্টি করেছেন। দংশ (ডাঁশ) এবং বিবিধ মশার সৃষ্টি করেছেন।।
এই ভাবেই সূৰ্য্যদেব এই ভুবনত্রয় নির্মাণ করেছেন, যেখানে প্রাণীদের বিভিন্ন কর্ম নির্দেশ করা হয়েছে।

এরপর ভবিষ্যজন্মের সব ক্রমযোগ বলা হবে, হে পিতা! হস্তি, হিংস্র জন্তু, মৃগ এবং অন্য প্রকারের পশুবর্গ, পিশাচ, মানুষ, রাক্ষস সব কিছু জরায়ুজ। পক্ষী, সর্প, মৎস্য এবং কচ্ছপ হল অণ্ডজ। জরায়ুতে উৎপন্ন হলে জরায়ুজ এবং অণ্ড (ডিম) থেকে উৎপন্ন হলে সেই জীবকে বলা হয় অণ্ডজ।

কিছু জীব আছে যারা স্থলভাগে জন্মায় এবং কিছু জীব আছে যারা জলে জন্মায়। দংশনকারী মশা, জোঁক, লিক্ষা এবং ছারপোকা এদের স্বেদজ বলা হয়। কারণ এরা স্বেদ থেকে উৎপন্ন হয় আর এক প্রকারের জীব আছে যাদের উদ্ভিজ্জ বলা হয় কারণ এরা ভূমিতে সৃষ্ট হয় এবং বীজ কাণ্ড পরিণত হয়।

এইভাবে জরায়ুজ, অণ্ডজ, স্বেদজ এবং উদ্ভিজ্জ এই চারপ্রকার সৃষ্টি হয়েছে। ওষধি, ফল অন্তে পক্ব হয়, নানাপ্রকার ফলযুক্ত এবং পুষ্প রহিত, তাকে বনস্পতি বলা হয়।।

বৃক্ষ দুই প্রকারের হয়। কিছু বৃক্ষ আছে শুধুমাত্র যাতে ফুল হয় এবং কিছুবৃক্ষ আছে যার ফুল ও ফল দুই-ই হয়। গুচ্ছ, গুল্ম অনেক প্রকারের হয়। এভাবে তৃণেরও বিভিন্ন জাতি উৎপন্ন হয়।

বীজ এবং কাণ্ডতে প্ররোহণ প্রাপ্ত বৃক্ষকে বল্লী বলে। অনেকপ্রকার কর্মস্বরূপ হেতুর অন্ধকারে সব বেষ্টিত হয়ে আছে।।

এরা নিজের মধ্যে অল্পজ্ঞান রাখার জন্য জড় সৃষ্টি বলে পরিচিত কিন্তু এদেরও সুখ এবং দুঃখের অনুভব অবশ্যই থাকে। অতএব এরা সুখ-দুঃখ সমন্বিত হয়। হে কুরুনন্দন! এই গতি উদ্ভূত হয়। মহান আত্মা সূর্য্যদেবের আলোয় দীপ্ত হয় এবং নিরন্তর গমনশীল এই ঘোর সংসারে প্রকট হয়।

এইভাবে তিনি জগত সৃষ্টি করে একসময় থেকে অন্য সময়কে পীড়িত করেন এবং তিনি ভূতাত্মা পরমলোকে তিরোভূত হয়ে যান।"

ভবিষ্য পুরাণের সৃষ্টি বর্ণনের ৭১ থেকে ৭৬ শ্লোকে সম্পূর্ণ বৃক্ষ, গুল্মসহ উদ্ভিদ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এবং সেই উদ্ভিদদের সুখ-দুঃখ সমন্বিত জীব হিসেবে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। মহর্ষী বেদব্যাস কোন প্রকার এসকোনোগ্রাফার ছাড়াই বলেছেন যে, উদ্ভিদের উপর বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে ইলেক্ট্রন প্রবাহের ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে উদ্ভিদও সুখ দুঃখের আবর্তনে প্রবাহিত হয়। ভবিষ্য পুরাণে আরও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে যে, সূর্যের বিকিরণের কারণেই উদ্ভিদের মধ্যে ইলেক্ট্রনের প্রাবাহ ঘটে। বর্তমান বায়োকেমিস্ট বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেছেন বৃক্ষের কোষ মেমব্রেন বিভবের পরিবর্তন ও ইলেক্ট্রন প্রবাহের জন্য বেশি দায়ী সূর্যের রশ্মি।

"জীবো জীবস্য জীবনম্" এ শাস্ত্রীয় এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি আমরা মহাভারতের বনপর্বেও পাই। সেখানে ধর্মব্যাধ ব্রাহ্মণ কৌশিককে বিবিধ উদাহরণে মাধ্যমে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি বলেন। অনেকে কৃষিকাজকে উত্তম বলে মনে করেন, তাদের ধারণা কৃষিকাজে কোন জীব হিংসা নেই। কিন্তু তারা হয়ত জানেন না যে কৃষিকাজেও গুরুতর হিংসা রয়েছে। কৃষিকাজ করার সয়য়ে কারণ, মানুষ লাঙ্গ

মাতা পার্বতী অত্যন্ত শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আত্মার সত্য তার নিজের স্থানে রয়েছে, কিন্তু যতক্ষণ দেহ জীবিত, ততক্ষণ অন্নই ...
05/08/2026

মাতা পার্বতী অত্যন্ত শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আত্মার সত্য তার নিজের স্থানে রয়েছে, কিন্তু যতক্ষণ দেহ জীবিত, ততক্ষণ অন্নই তার প্রধান ভিত্তি। ক্ষুধার্ত মানুষ ভক্তি করতে পারে না, তপস্যা করতে পারে না, সেবা করতে পারে না, এমনকি ধর্ম পালন করাও তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। যদি অন্নের মর্যাদা নষ্ট হয়, তবে সৃষ্টির ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাবে।
জয় মা

গুরুপূর্ণিমা মাহাত্ম্য  আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিকে ব্যাসপূর্ণিমা ও গুরুপূর্ণিমা নামে অবিহিত করা হয়। এ পবিত্র তিথিতেই জন্ম নিয়...
29/07/2026

গুরুপূর্ণিমা মাহাত্ম্য


আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিকে ব্যাসপূর্ণিমা ও গুরুপূর্ণিমা নামে অবিহিত করা হয়। এ পবিত্র তিথিতেই জন্ম নিয়েছেন অখিল বেদবিদ্যার ধারক, বাহক এবং প্রচারক ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। তাঁর প্রকৃত নাম শ্রীকৃষ্ণ। তিনি যমুনা নদীর কূলে এক দ্বীপে জন্মেছেন, তাই তাঁর নামের সাথে এসে যুক্ত হয় দ্বৈপায়ন এবং তিনি বেদকে সম্পাদনা করেছেন তাই তাঁর নামের সাথে একটি উপাধি যুক্ত হয় ‘বেদব্যাস’। শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। ঋষি পরাশর এবং জেলে কন্যা সত্যবতীর পুত্র। যিনি পৃথিবীতে ‘ব্যাসদেব’ নামেই প্রাতঃস্মরণীয়। শ্রীমদ্ভাগবতে তাঁর সম্পর্কে বলা আছে:

ততঃ সপ্তদশো জাতঃ সত্যবত্যাং পরাশরাৎ।
চক্রে বেদতরোঃ শাখা দৃষ্ট্বা পুংসঃ অল্পমেধসঃ।।
(শ্রীমদ্ভাগবত: ০১.০৩.২১)

"এরপর তিনি সপ্তদশ অবতারে সত্যবতীর গর্ভে এবং পরাশর মুনির ঔরসে বেদব্যাসরূপে অবতীর্ণ হন। পৃথিবীর মানুষের মেধাশক্তি দিনদিন ক্ষীণ হয়ে আসছে দেখে অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানবের প্রতি কৃপাপূর্ণ হয়ে তিনি বেদরূপ বৃক্ষের শাখা বিভাজন করেন (তাই তাঁর নামের সাথে অনন্তকালের জন্যে একটি উপাধি যুক্ত হয় বেদব্যাস)।"

ব্যাসদেব চিন্তা করলেন অনন্ত এ বেদবিদ্যা একত্রে গ্রহণ করা মানবের পক্ষে দুঃসাধ্য। তাই তিনি বেদবিদ্যাকে চারভাগে সসম্পাদিত করে তাঁর প্রধান চার শিষ্যকে ভেদজ্ঞান প্রদান করলেন। শিষ্য পৈলকে দিলেন ঋগ্বেদ, শিষ্য জৈমিনিকে দিলেন সামবেদ, শিষ্য বৈশম্পায়নকে দিলেন যজুর্বেদ এবং পরিশেষে শিষ্য সুমন্তকে দিলেন অথর্ববেদ। ব্যাসদেবের প্রধান এ চার শিষ্য জগতে বেদবিদ্যার প্রচার করেন তাঁদের শিষ্য-প্রশিষ্যের মাধ্যমে। এভাবেই গুরুশিষ্য পরম্পরায় বেদজ্ঞান শত-সহস্র শাখায় বিকশিত হয়ে জগতে বেদবিদ্যার অমৃতধারাকে দিকে দিকে প্রবাহিত করে তোলে। বেদ কোন একটি গ্রন্থ নয়, অসংখ্য গ্রন্থের সমষ্টি। এরপরেই ব্যাসদেবের অনন্য কীর্তি বৃহত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাসের মহাগ্রন্থ মহাভারত রচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গ্রন্থকে বলেছেন–ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।একলক্ষ শ্লোকের এ মহাভারতের ভীষ্মপর্বের আঠারোটি অধ্যায় নিয়েই রচিত হয়েছে ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ, যাকে বেদান্ত দর্শনের স্মৃতিপ্রস্থান বলা হয়। আঠারোটি পুরাণ এবং আঠারোটি উপ-পুরাণের সকলই ব্যাসদেবের রচনা বলে প্রচলিত। যদিও পুরাণগুলোর মধ্যে অনেক পরস্পর বিরোধী, অবাস্তব, কাল্পনিক, বালখিল্য কথা রয়েছে; এ সত্যেও পুরাণগুলোর মধ্যে অনেক মণি-মুক্তা খচিত অমৃতময় কথাও বিদ্যমান। তাই আমাদের এ পুরাণগুলোকে গ্রহণ এবং বর্জনের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে হবে।ব্যাসদেবের আরেকটি সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি সম্পূর্ণ বৈদিক সিদ্ধান্তগুলোকে মাত্র ৫৫৫ টা সূত্রে প্রকাশিত করা; যার নাম ব্রহ্মসূত্র। এ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের সকল মত-পথের উৎপত্তি। শ্রীশঙ্করাচার্য থেকে আমাদের যত আচার্যবৃন্দ আছেন তাঁরা সকলেই এ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য লিখে আপন আপন সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেছেন। এ কারনেই ব্যাসদেব গুরু পরম্পরায় সবার গুরু এবং তাই তাঁর জন্মতিথিকে গুরুপূর্ণিমা বলা হয়। মমহাভারতেও শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাসকে গুরু বলে অবিহিত করা হয়েছে:

যোহ্যস্মাকং গুরুশ্রেষ্ঠঃ কৃষ্ণদ্বৈপায়নো মুনিঃ।
জগৌ পরমকং জপ্যং নারায়ণমুদীরয়ন্ ॥
(মহাভারত:শান্তিপর্ব, ৩২৫.১৩০)

"মুনিশ্রেষ্ঠ যে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস আমাদের সকলের গুরু, তিনিও নিজে 'নারায়ণ' শব্দ উচ্চারণ করে উত্তম নারায়ণমন্ত্র প্রচার করেছিলেন।"

ব্যাসদেবের জন্মজয়ন্তী গুরুপূর্ণিমা তিথিতে, ব্যাসদেবের অর্চনার সাথে সাথে যার যার গুরুকেও সম্মান জানানোর প্রথা রয়েছে প্রাচীনকাল থেকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ তিথিতে সকলেই যে যার যার গুরু নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। এ তিথিতে যে শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের জন্ম হয়েছিল এবং এই কারণেই এ তিথিটি এত মাহাত্ম্যপূর্ণ তা হয়ত অনেকেই জানেনা। শুধু শিষ্যদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, গুরুরাও হয়তো শিষ্যদের তিথিটির মাহাত্ম্য বলেন না। পাছে তাদের ভাগে কম পরে যায়!গুরুপূর্ণিমায় আধ্যাত্মিক গুরুদের সাথে সাথে সকলেরই স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগুরুদেরও যথাযথ সম্মানিত করা বা শ্রদ্ধার্ঘ্য দেয়া প্রয়োজন। জগতে বিদ্যা দুইপ্রকার -পরাবিদ্যা এবং অপরাবিদ্যা। পরাবিদ্যা হল অধ্যাত্মবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা, যার গুরু ব্যাসদেব। কিন্তু অপরাবিদ্যা হল, যে জ্ঞান স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে লাভ করা হয়। এবং যে জাগতিক জ্ঞান লাভ করে জীবন নির্বাহ করা হয়।সেই জাগতিক অপরাবিদ্যার যারা শিক্ষক তারাও গুরু। অবশ্য তারা জাগতিক বিদ্যার গুরু। তাই তাদেরকেও এ দিনে যথাসাধ্য সম্মানিত করতে হয়। দক্ষিণ ভারতসহ বিভিন্ন স্থানে শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং সংগীতের শিক্ষাগুরুকে গুরুপূর্ণিমা তিথিতে তাদের ছাত্রদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার্ঘ্যসুমন নিবেদন করে সম্মানিত করতে দেখা যায়। নেপালে এ দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। গুরুপূর্ণিমা আসলে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বৃহত্তর ভারতবর্ষের শিক্ষক দিবস।

অতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে এসেছে এ গুরুপূর্ণিমা স্মরণের রীতি। তাইতো গৌতমবুদ্ধ এ দিনেই সারনাথের ঋষিপত্তন মৃগদাবে তাঁর পঞ্চবর্গীয় শিষ্য কৌন্ডন্য, বপ্প,ভদ্দীয়, মহানাম ও অসসজিতের কাছে তাঁর নবমত প্রচার করেন এবং ধর্ম রক্ষার্থে 'ধর্মচক্র' প্রবর্ত্তন করে ব্যাসদেবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। বৌদ্ধদের মত জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ দিনটি অত্যন্ত পবিত্র ও মাহাত্ম্যপূর্ণ । শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের পরে তাদের ধর্মগ্রন্থ গুরুগ্রন্থ সাহেবকেই অনন্তকালের জন্যে গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছেন। ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষের বহু আর্য হিন্দু, হিন্দুজাতির স্বাভিমানের প্রতীক বৈদিক গৈরিক ধ্বজাকে গুরুরূপে এবং সন্মার্গদর্শনকারী রূপে বরণ করে আজ গৈরিকধ্বজার গুরুরূপে বিশেষ পূজা করেন এক একতাবদ্ধ হিন্দু জাতির আকাঙ্ক্ষায়।এ দিনে দান করা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য। প্রকৃত সৎগুরুর কখনো বিরোধিতা করা উচিত নয়। মুক্তিলাভের জন্য সদগুরুর অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা আছে; কিন্তু বেদাদি শাস্ত্রে তা বাধ্যতামূলক করা হয় নি। আপনার যদি ইচ্ছে হয়, তবে আপনি একটি কেন একশটি গুরুরও শরণ নিতে পারেন। তাতে কোন বাধা নেই। কিন্তু আপনি বলতে পারবেন না যে গুরু ছাড়া মুক্তিলাভ অসম্ভব। এ কথাটি সত্য নয় । অর্থাৎ ইচ্ছে হলে কোন ব্যক্তি যেমন মানুষ গুরুর শরণ নিতে পারেন, আবার তেমনি পাতঞ্জলদর্শন অনুসারে পরমেশ্বরকে এবং বেদাদি শাস্ত্রগ্রন্থকে গুরুরূপে মনে করতে পারে শিখদের ন্যায়। এ সকল বিষয়েরই স্বীকৃতি রয়েছে শাস্ত্রে। মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রের সমাধিপাদে জগতের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকেই গুরু বলেছেন:

তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞবীজম্।
স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ।
তস্য বাচকঃ প্রণবঃ।
(যোগসূত্র : ১.২৫-২৭)

"ঈশ্বরই নিরতিশয়ত্ব প্রাপ্ত সর্বজ্ঞবীজ।তিনি কালের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন পূর্ব পূর্ববর্তী অনাদিকাল থেকেই গুরু। প্রণব বা ওঁকারই তাঁর বাচক।"

গুরু যদি শ্রীবাল্মিকী, শ্রীবেদব্যাস, শ্রীশঙ্করাচার্য, শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীনিম্বার্কাচার্য, আচার্য শ্রীরামানন্দ, আচার্য শ্রীরবিদাস, শ্রীমাধবাচার্য, শ্রীচৈত্যন্যদেব, সমর্থ শ্রীরামদাস, শ্রীশঙ্করদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, শ্রীনিগমানন্দ এঁদের মতো জাজ্বল্যমান সদগুরু হয়, তবে তাদের শ্রীচরণে আশ্রয় নিতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু গুরু নামধারীরা, গুরু লেবাসধারীরা যদি রজনীশ, আসারাম, রামরহিম, রাধে মা, নির্মলা মায়ের মতো আত্মপ্রচারকামী, ভণ্ড, লোভী, দুশ্চরিত্র, পাষণ্ড হয়; তাহলে একবার হলেও আপনি চিন্তা করুন তো, তাদের চরণে আশ্রয় নিলে আপনার কি গতি হবে? একটা বৃক্ষে পূর্বে শ্রীফল দিত, কিন্তু বর্তমানে সেই বৃক্ষই দিচ্ছে বিষফল। আপনি কতদিন বা কতকাল এই গাছকে বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? বিষে জর্জরিত হয়ে আপনারই বা কি গতি হবে ভাবতে পারেন একবার?

সকল সাধুই সাধু না। সকল গুরুই গুরু না।সাধুত্ব এবং পাণ্ডিত্য সবার থাকে না; কিন্তু এরপরেও গেরুয়া বস্ত্র সর্বদা প্রণম্য। যে গুরু ঈশ্বরের বাণী বাদ দিয়ে শিষ্যদের শুধু নিজের প্রচার করতে বলবে; তাকেই দান করতে বলবে; মরে গেলে তার উত্তরপুরুষ বংশধরদের দান করতে বলবে; মন্দিরে দেবতার বিগ্রহাদি বাদ দিয়ে নিজের ছবি পূজা করতে বলবে; গ্রাফিক্স ডিজাইন করে, নিজের পদ্মের উপরে বসা ছবি পেছনে সূর্যের আলো - এই টাইপের আত্মপ্রচারকামী অশাস্ত্রীয় ছবি শিষ্যদের দিয়ে প্রচার করাবে; শিষ্যদের বেদবেদান্তের জ্ঞানের পথে যেতে বাধা দিবে; ব্যক্তিস্বার্থে শাস্ত্রহীন অশাস্ত্রীয় নির্দেশনা দিবে; সাধারণ মানুষ থেকে দূরত্বে থেকে রাজার মত বিলাসবহুল জীবনযাপন করবে; হিন্দুদের আপদে বিপদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে; অকারণ সর্বধর্ম সমন্বয়ের নামে সাধারণ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করবে; কোন স্টেজে অথবা রাজপথে অন্ধ শিষ্যদের দিয়ে শোডাউন করে ক্ষমতার প্রদর্শন করবে; এ সকল কাজ যে যে গুরুনামধারী ব্যক্তিরা করবে, বুঝতে হবে তিনি সদগুরু নন, তিনি আত্মপ্রচারকামী ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরু ব্যবসায়ী। একজন সদগুরু কখনই নিন্দনীয় এ সকল কাজ মরে গেলেও করবে না এবং তার শিষ্যদেরও করতে দিবে না।

ভাবতে অবাক লাগে গুরু যদি ঈশ্বরের পথদ্রষ্টা হয় তবে গুরুই কেন ঈশ্বর সেজে বসে যান পূজার আসনে? ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে আমরা পরবর্তীতে তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পরি। আর এই সকল ভণ্ড গুরুরা শিষ্যদের পকেট মারতেই সদা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পরেন। নিজের সাথেসাথে তার বউপোলাপান-নাতিপুতির সহ ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্যে অন্নসংস্থানের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা করে যান।শ্রীগোবিন্দাচার্যের মতো গুরু হলে আপনি শ্রীশঙ্করাচার্যের মতো শিষ্য পাবেন। সমর্থ শ্রীরামদাসের মতো গুরু পেলে আপনি ছত্রপতি শিবাজীর মতো রাজা পাবেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মতো গুরু পেলে আপনি স্বামী বিবেকানন্দের মত বিশ্বদরবারে ভারতবর্ষ এবং সনাতন ধর্মের মুখ উজ্জ্বল করা বিশ্বজয়ী শিষ্য পাবেন। কিন্তু এই গুরু নামধারী ভণ্ডদের থেকে কি পাবেন আপনি? কিছুই নয় শূণ্য।

সকলেরই বেদ বেদান্তের মূল রাজপথে ফেরা প্রয়োজন। শাস্ত্রীয় কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমস্যা হলে, সমাধান খুঁজতে হবে বেদাদি শাস্ত্রগ্রন্থের কাছে। কোন মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য বা বর্তমানকালের কোন বাবা-গুরুদের লেখা বাণীর সংকলন, চিঠির সংকলন, গানের বই, ছড়ার বই থেকে নয়।কারণ জগতে পরমেশ্বরের বাণী বেদবেদান্তই একমাত্র প্রমাণ। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে রাস্তা থেকে লোক ধরে ধরে এনে গুরু নামে মানুষ পূজা শুরু করা হচ্ছে, এ বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং যুগপৎ অশাস্ত্রীয়। গুরুর কাজ হল শিষ্যকে বৈদিক সন্মার্গ দেখিয়ে মানুষকে মুক্তির পথে অগ্রসর করা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুরাই বেদ-বেদান্ত বাদ দিয়ে শিষ্যদের শুধুমাত্র নিজেদের এবং নিজের ছেলেমেয়ে বংশধরদের পূজা করাতেই ব্যস্ত। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুদের প্রধান লক্ষ্যই থাকে ধনী শিষ্যদের পকেটের দিকে। এই সকল গুরু নামধারী ধান্ধাবাজ ভাইরাসদের কারণেই অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা ধর্মের উপরে বিরক্ত হয়ে ধর্মান্তরিতের পথে পা বাড়াচ্ছে এবং এই ভণ্ডদের বিভিন্ন ছলাকলা যুক্ত ভণ্ডামির কারণে অনেক মানুষই প্রকৃত গুরুদের ভুল বুঝে অবজ্ঞা করছে। তবে আশার কথা, ব্যাসদেব প্রচারিত এবং প্রদর্শিত পথে, পরমেশ্বরের নামে কুসংস্কার মুক্তভাবে বৈদিকরাজপথে ফিরতে তরুণ প্রজন্মের সন্তানেরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাদের দিনেদিনেই ঐক্যের বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে। কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনাতো থাকবেই। এর মাধ্যমেই সমাধানের পথের দিকে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে অগ্রগামী হিসেবে আছে শিক্ষিত একঝাক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া তরুণ সম্প্রদায়।এ তরুণেরাই আগামীতে জাতিকে সত্যিকার অর্থে কুসংস্কার মুক্ত মঙ্গলময় পথ দেখাবে।

বেদাদি শাস্ত্রানুসারে জাতপাত নির্বিশেষে সকলেই গুরু হতে পারে; শুধুমাত্র গুরুকে যোগ্য অধিকারী, নিষ্কাম এবং আত্মপ্রচার বিমুখ ব্রহ্মময় হতে হবে। এ প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্যদেবের একটি অত্যন্ত সুন্দর স্পষ্ট নির্দেশ আছে, তিনি ব্রাহ্মণ-শূদ্র নির্বেশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকেই গুরু হবার, আচার্য্য হবার, তত্ত্ববেত্তা হবার অধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

কিবা বিপ্র কিবা ন্যাসী শূদ্র কেনে নয়।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয়।।
(চৈতন্যচরিতামৃত : মধ্য, অষ্টম পরিচ্ছেদ)

বর্তমান কালের মানুষের মধ্যে ছদ্মবেশী মানসিকতা প্রবলভাবে দেখা যায়। তাই তার যখন নিজের জীবন এবং নিজের সম্পর্কে কোথায় কিছু লেখে বা বলে, তখন জীবনের সকল ঘটনাগুলোকে ধুয়েমুছে কালিমাকে গোপন করে তবে প্রকাশ করে । কিন্তু ব্যাসদেবের জীবনে দেখা যায় উল্টোটি, তিনি সর্বদা সত্যে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর লেখায় নিজের জীবন নিয়ে সকল বিষয়ে ছিল তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি। বাবা পরাশর এবং মা জেলেকন্যা সত্যবতীর হঠাৎ মিলনে কিভাবে তাঁর জন্ম হয়েছে, তা তিনি না লিখলেও পারতেন। বংশরক্ষায় মায়ের আদেশে কুরুবংশের ক্ষেত্রজ পুত্র পাণ্ডু, ধৃতরাষ্ট্র এবং বিদুরের কিভাবে জন্ম হয়েছে, তাও না লিখলেও পারতেন। তিনি কি জানতেন না একথাগুলি আগামীতে তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, তবুও সত্যরক্ষার্থে তিনি লিখেছেন। অথচ বর্তমানকালে যখন ডাইরি সহ নিজের জীবন নিয়ে কেউ লেখে, যাকে আত্মজীবনী বলা হয়। সেই ডাইরি বা আআত্মজীবনীর অধিকাংশ তথ্যই থাকে সাজানো-গোছানো মিথ্যা কথা। প্রাচীন রাজবংশগুলিতে নিয়ম ছিল, যদি কোন কারণে বংশের প্রদীপ নিভে যায়, তবে সকলের পরামর্শে এবং সম্মতিতে কোন জ্ঞানী পণ্ডিত ব্যক্তিকে দিয়ে সন্তান উৎপাদন করতে পারবে। যিনি ক্ষেত্রজ হয়ে আসবেন, তাঁর যৌনতা উপভোগের কোন বিষয় ছিল না। তাকে সারা শরীরে ঘি মেখে দেহকে তৈলাক্ত করে নিতে হত। রাজপরিবারের পুরুষরা মারা গেলে বা নপুংসক হলে তবেই ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের রীতি ছিল। রাজমহিষীদের গর্ভে ক্ষেত্রজ সন্তান যার থেকেই উৎপন্ন হোক না কেন সন্তান সেই রাজবংশের হোত। বর্তমানে যেমন ভাবে, আমরা নিজেরা যদি জমি চাষ করতে অপারগ হই, তবে ধানের জমিতে অন্যকে দিয়ে বর্গাচাষ করাই। বর্গাচাষি সকল শ্রম দিয়ে ধান উৎপাদন করলেও ধানের মালিক হয় জমির মালিক; বর্গাচাষি নয়, তিনি শুধু ভাগ পান। ক্ষেত্রজ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আমরা না বুঝেই কটুক্তি করি, কিন্তু একবার নিগূঢ়ভাবে ভেবে দেখলে দেখতে পাব চন্দ্রবংশের মত সুপ্রাচীণ বংশ যখন সন্তান না থাকার কারণে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন রাজমাতা সত্যবতীর চন্দ্রবংশের সন্তানধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে এটা ছাড়া আর কোন পথই তাঁর সামনে খোলা ছিল?

হিন্দুদের সাকার নিরাকার সকল মতপথের পক্ষেই লিখেছেন ব্যাসদেব। তাঁকে বা তাঁর চিন্তাকে খণ্ডিত করা যায় না। তখনও তাঁকে মনে হয় নিরাকার ব্রহ্মবাদী, কখনও বৈষ্ণব, কখনও শাক্ত, কখনও শৈব।অর্থাৎ তিনি সকল মতপথের সমন্বয়ের প্রতীক।পরবর্তীকালে এ সমন্বয় দেখা যায় শ্রীশঙ্করাচার্যের মধ্যে। তাই ব্যাসদেব শ্রীশঙ্করাচার্যের চিন্তাকে সংকীর্ণ করা যায় না। ব্যাসদেব যে পুরাণ লিখেছেন, সেই পুরাণের কেন্দ্রীয় উপাস্যকেই পরমেশ্বররূপে স্তোত্র করেছেন। যে কোনভাবে এবং যেকোন রূপেই যে তাঁকে পাওয়া যায় এ ব্রহ্মতত্ত্বটি বোঝাতে।

আজ অনেক সময় ব্যক্তিকে তাঁর সৌন্দর্য দিয়ে, দেহের গঠন দিয়ে মূল্যায়ন করতে চায় সমাজ।কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনন্য অদ্বিতীয় মেধাজগতের কাজ করা ব্যাসদেবের গায়ের বর্ণ ছিল কুচকুচে কাল। প্রচলিত অর্থে খুব একটা সুদর্শন ছিলেন না, কিন্তু এরপরেও তিনি তাঁর মেধা যোগ্যতাবলে সকল বিদ্যার আদিগুরু বলে আজও বিশ্বব্যাপী সম্মানিত পূজনীয়। রূপ নয়, কর্ম এবং যোগ্যতা যে মানুষকে মহান করে, এ আধুনিক মানবিক কথাগুলি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের জীবনেই দেখতে পাই। যা আজ জগতের জন্যে শিক্ষনীয়। কুরুবংশের ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনে অম্বিকা এবং অম্বালিকা যখন ব্যাসদেবের কাছে আসে তখন তাঁর চেহারা দেখে অম্বিকা সারাক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিলেন এবং অম্বালিকা ভয়ে ফ্যাকাসে বা পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। কথাগুলো ব্যাসদেব নিজের সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন। ভাবা যায়, নিজের লেখাতে নিজেকে নিয়েই কতটা সরল নিষ্কপট স্বীকারোক্তি। এরকম অসংখ্য কারণেই তিনি পূজনীয়, বরণীয় এবং মহান।

ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

Address

বরাব, পলাশ, নরসিংদী
Narsingdi

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দির posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category