19/05/2026
মায়ের কোলে ঈশ্বর" (দ্বিতীয় পর্ব)
অধ্যায় ৪ + ৫ + ৬
মুখের ভেতর ব্রহ্মাণ্ড, দড়িতে বাঁধা ঈশ্বর ও রাতের ঘুম পাড়ানো।
চতুর্থ অধ্যায় — মুখের ভেতর ব্রহ্মাণ্ড
একদিনের কথা।
পাড়ার ছেলেরা এসে যশোদাকে বলল —
"যশোদামাসি! কানাই মাটি খেয়েছে!"
যশোদা ছুটে এলেন। কৃষ্ণকে ধরলেন —
"কানাই! মাটি খেয়েছিস?"
"না মা।"
"মুখ খোল।"
"মা—"
"মুখ খোল বলছি!"
কৃষ্ণ মুখ খুললেন।
যশোদা তাকালেন।
এবং থমকে গেলেন।
সেই ছোট্ট মুখের ভেতরে তিনি দেখলেন — পুরো ব্রহ্মাণ্ড। সূর্য, চন্দ্র, তারা, পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন, গ্রাম — সব কিছু। গোকুল দেখলেন। নিজেকে দেখলেন।
মাথা ঘুরে গেল।
তারপর সেই দৃষ্টি মিলিয়ে গেল। সামনে আবার শুধু ছোট্ট কানাই।
যশোদা কী দেখলেন বুঝলেন না। শুধু বুকটা কেঁপে উঠল।
কৃষ্ণ মুখ বন্ধ করে বললেন — "দেখলে মা? মাটি নেই।"
যশোদা কাঁপতে কাঁপতে কৃষ্ণকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
বললেন — "আর কখনো মাটি খাবি না।"
কৃষ্ণ মায়ের বুকে মুখ লুকালেন।
মনে মনে হাসলেন।
মহামায়া এসে যশোদার স্মৃতি মুছে দিয়েছিলেন — কারণ ঈশ্বর চাননি মা তাঁকে ভয় পাক। তিনি চেয়েছিলেন মা শুধু ভালোবাসুক।
পঞ্চম অধ্যায় — দড়ি দিয়ে বাঁধা ঈশ্বর
সেই বিখ্যাত দিনের কথা।
মাখন চুরি বেড়েই চলেছে। শুধু নিজে খাচ্ছেন না — বন্ধুদের খাওয়াচ্ছেন, বানরদের দিচ্ছেন, হাঁড়ি ভাঙছেন।
পাড়ার গোপিনীরা প্রতিদিন যশোদার কাছে নালিশ করে যাচ্ছে।
যশোদা ঠিক করলেন — আজ শাস্তি দেবেন।
কৃষ্ণকে ধরলেন। দড়ি আনলেন। বললেন —
"আজ তোকে বেঁধে রাখব।"
কৃষ্ণ পালাতে গেলেন। যশোদা ধরলেন।
দড়ি দিয়ে বাঁধতে গেলেন উরলখলের সাথে।
কিন্তু দড়ি ছোট হয়ে যাচ্ছে — দুই আঙুল কম।
আরেকটু দড়ি জোড়া দিলেন — আবার দুই আঙুল কম।
আরো দড়ি — আবার দুই আঙুল কম।
সারা গোকুলের দড়ি জোড়া দিলেন। তবুও দুই আঙুল কম।
যশোদা ঘামছেন। হাঁপাচ্ছেন।
কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন। মুখে সেই দুষ্টু হাসি।
তারপর হঠাৎ কৃষ্ণ দেখলেন — মায়ের কপালে ঘাম। মায়ের হাত কাঁপছে। মায়ের চোখে পরিশ্রমের ক্লান্তি।
কৃষ্ণের বুকে কিছু একটা নড়ে উঠল।
তিনি যদি চান — এই দড়ি কখনো তাঁকে বাঁধতে পারবে না। তিনি ত্রিলোকের অধীশ্বর।
কিন্তু মায়ের পরিশ্রম দেখে তাঁর মন গলে গেল।
তিনি ঠিক করলেন — আজ ধরা দেবেন।
পরের বার যশোদা দড়ি বাঁধলেন — ঠিক মিলে গেল।
যশোদা অবাক। তারপর খুশি।
বললেন — "এই দেখ! বাঁধা পড়েছিস!"
কৃষ্ণ বাঁধা অবস্থায় হাসলেন।
স্বর্গে সেদিন দেবতারা বিস্মিত হয়েছিলেন।
যিনি সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করেন — তিনি আজ একটা দড়িতে বাঁধা।
কারণ মায়ের ভালোবাসার কাছে ঈশ্বরও হার মানেন।
এই ঘটনার নাম দামোদর লীলা। দাম মানে দড়ি, উদর মানে পেট — মায়ের দড়িতে বাঁধা পেটের কৃষ্ণ।
ষষ্ঠ অধ্যায় — রাতের ঘুম পাড়ানো
রাতের বেলা।
গোকুল ঘুমিয়ে পড়েছে। যমুনার জল বইছে নিঃশব্দে। জোনাকি জ্বলছে উঠানে।
যশোদা কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বসেছেন। ছোট্ট মাথায় আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছেন। আস্তে আস্তে গান গাইছেন —
"ঘুমাও হে ঘুমাও কানাই,
মায়ের কোলে ঘুমাও।
সারাদিন দুষ্টুমি করে
এবার চোখ বুজে যাও।"
কৃষ্ণ মায়ের কোলে শুয়ে আছেন। চোখ বুজেছেন।
কিন্তু ঘুম আসছে না।
কারণ মায়ের গানের সুর এত মিষ্টি — ঘুমিয়ে পড়লে মিস হয়ে যাবে।
যশোদা গাইতে গাইতে তাকালেন ছেলের মুখের দিকে।
কী নিষ্পাপ মুখ! দিনের বেলায় এত দুষ্টুমি করে — রাতে ঘুমালে মনে হয় স্বর্গের দেবশিশু।
যশোদার মনে হলো — এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ তিনি।
কোলে শুয়ে আছেন তাঁর সব সুখ, সব আনন্দ, সব জীবন।
তিনি একটু নিচু হয়ে কৃষ্ণের কপালে একটা চুমু খেলেন।
কৃষ্ণ চোখ না খুলে মুচকি হাসলেন।
দেবলোকে সেদিন নীরবতা নেমেছিল।
সমস্ত দেবতা চুপ করে দেখছিলেন —
তাঁদের প্রভু, জগতের অধীশ্বর, একজন সাধারণ গ্রামের মায়ের কোলে শুয়ে — চুপচাপ।
সেখানে থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মানছেন।
চলবে...
(শেষ পর্বে দেখুন বিদায়ের রাত ও মায়ের ভালোবাসার চিরন্তন দর্শন)" 🔔