28/09/2022
আসছে মা,❤️
দুর্গাপুজোর একটা আলাদা গন্ধ আছে। বাঙালি হয়ে জন্ম নিলে সম্ভবত এই গন্ধ কখনো অচেনা হয় না। শরতের প্রথম ফোঁটা কাশফুল কিংবা শিউলি সম্ভবত জানে না ওদের জন্য পৃথিবীতে কিছু মানুষ গোটা একটা বছর অপেক্ষা করে থাকে।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা মানুষগুলোর জীর্ণ-শীর্ণ, ক্লান্ত দেহ আর মনে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করে শরতের আকাশ, বাতাস, মাঠ, ঘাট আর প্রান্তর।
তারপর কোনো এক শরতের ভোরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় রেডিও থেকে ভেসে আসা কোনো অপার্থিব সুরে। এ সুর চেনে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মহালয়ার ভোরে আমাদের সাথে সাথে বোধহয় উমারও ঘুম ভাঙ্গে বীরেন্দ্র বাবুর চণ্ডী পাঠের শব্দে। দেবী বুঝতে পারেন সময় হয়ে এসেছে। ছানাপোনা নিয়ে বাপের বাড়ি রওনা দিতে হবে।
মহালয়ার পরের দিনগুলো কাটে দোটানায়। এক লাগামহীন আনন্দে ভেসে যাওয়ার অপেক্ষা আর পুজো শুরু হলেই শেষ হয়ে যাবে এই নিয়ে মন খারাপের টানাপোড়েন। এক একটা দিন যেন এক একটা বছরের সমান দীর্ঘ।
এরপর আসে এক আশ্চর্য সন্ধ্যে। বোধনের সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠা প্রথম আলোয় ভেসে যায় আমার ঘর, আমার পাড়া, আমার গ্রাম, আমার মফঃস্বল, আমার শহর। ঢাকে প্রথম কাঠির আওয়াজ আমার ভেতরের স্বত্ত্বায় প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
ষষ্ঠীর সকালে পাড়ার মাইকের মিষ্টি অত্যাচারে ভাঙ্গা আমার ঘুম, অলস দুপুর কিংবা টইটই করে উদেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানো রাত এসব আমার জীবনের কাটানো সুন্দর দিনগুলোর মধ্যে জায়গা পায় নিঃসন্দেহে।
সপ্তমীতে ঘোরাঘুরির নীলনকশা, পুজোর তোড়জোড় কিংবা বছরভোর দেখা না হওয়া মানুষ গুলোর সাথে আড্ডা চলে হৈ-হৈ করে।
অষ্টমীতে অঞ্জলী দিতে গিয়ে মন্ত্র উচ্চারন না করতে পেরে শুধু ঠোঁট নেড়ে যাওয়া, দেবীর পায়ের ফুল প্রেমিকার গায়ে অর্পণ কিংবা সদ্য ভেঙে যাওয়া হৃদয় নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে একা একা ঘুরে বেড়ানো। এমনেই দিন যায়।
অষ্টমীর রাতভোর এক করে ঠাকুর দেখে নবমীর দুপুর পর্যন্ত ঘুম দিয়ে উঠে চায়ের কাপ হাতে নিয়েই শুরু হয় বেজায় মন খারাপ। আর একটা রাত। তারপরেই এত আনন্দ, এত আয়োজন, এত জল্পনা-কল্পনার অবসান করে মন্দিরের শেষ আলোটাও নিভিয়ে দেবী চলে যাবেন স্বামীর ঘরে। আবার সবাইকে ফিরে যেতে হবে গদবাঁধা যান্ত্রিক জীবনে, ধুলো-বালির জীবনে, ধার-দেনার জীবনে।
শেষমেষ মন খারাপ চায়ের কাপে গুলে খেয়ে আবার চলে উৎসবে মেতে ওঠা। নবমীর রাতভোর এক করে চলে প্যান্ডেলে হপিং। দশমীর সকালে অঞ্জলী শেষে চলে দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। একসময় বেদীতে বেধে রাখা লাল সুতোয় টান পড়ে, দেবী ফিরে যায় নিজের গন্তব্যে। বিজয়ার সন্ধ্যার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে সিঁদুর, ধুনুচির ধোঁয়া আর মানুষের বিষণ্ণতায়। ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন। মানুষের আকুল আর্তি উপেক্ষা করে দেবী প্রতিমা ভেসে যায় অথৈ জলে।
হুমায়ূন আহমেদ একবার লিখেছিলেন "পৃথিবীতে ফিনিক ফোটা জোছনা আসবে। শ্রাবণ মাসে টিনের চালে বৃষ্টির সেতার বাজবে। সেই অলৌকিক সঙ্গীত শোনার জন্য আমি থাকব না। কোনো মানে হয়?"।
বিসর্জনের পরে আমার কি মনে হয় জানো, "বছর কয়েক পর শরতের প্রথম শিউলি আর কাশফুল ফুটবে, মহালয়ার ভোরে রেডিওতে বেজে উঠবে চিরচেনা সুর, ঢাকে প্রথম কাঠি পড়বে, প্যান্ডেলে চোখ ধাঁধানো আলো জ্বলবে, ধুনুচির গন্ধ মিশে যাবে বাতাসে, চেনা পাড়া অচেনা হয়ে উঠবে মানুষের ভিড়ে, ভাসানে মানুষের উল্লাস, আনন্দ আর মন কেমনের আহাজারি দেখার জন্যে আমি থাকবো না, আরেকবার মানুষ হয়ে জন্মানোর জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। ধ্যাত! কোনো মানে হয়?