29/03/2026
🤍🖤
🖤🤍
চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমাম’এ আহ্লে সুন্নাত ইমাম আহ্মাদ রেযা খান বারেল্ভী (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) ১২৭২ হিজরী (১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) সালের ১০ শাওয়ালুল মুকাররাম তারিখে উত্তর ভারতের বেরেলী শহরে একটি আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা নাক্বী আলী খান (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) এবং দাদা রেযা আলী খান (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) নিজ নিজ যুগের আহ্লুস সুন্নাহ্’র প্রসিদ্ধ আলিম’এ দ্বীন ছিলেন। ইমাম আহমাদ রেযা খান (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) তাঁর পিতার ছত্রছায়ায় দ্বীনী শিক্ষা শুরু করেন যিনি তাঁর যুগের জায়্যিদ আলিম'এ দ্বীন ছিলেন এবং পিতার সাহচর্যে সায়্যিদী আ'লা হযরত (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) অতি অল্প বয়সে মুফতী সনদ অর্জন করেন। সায়্যিদী আ'লা হযরত (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) জ্ঞানচর্চার বহু ক্ষেত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। বিশেষত তাঁর সমকালীন কেউ হানাফী ফিক্ব্হে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীরাও এই ক্ষেত্রে তার পাণ্ডিত্যকে বিনাবাক্যে স্বীকার করেন।
হানাফী ফিক্বহের অনেক ইজাযাহ্ অর্জন করেন সায়্যিদী আ'লা হযরত (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) যার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হলো- মুফতী’এ মক্কা শাইখ আব্দুর রহমান আস-সিরাজ ইবনে আব্দুল্লাহ্ আস-সিরাজ (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ)’র ইজাযাহ্। এই সনদের সিলসিলা ২৭ ধাপ উপরে গিয়ে ইমাম আবু হানিফা رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং আরো চার ধাপ উপরে সায়্যিদুল মুরসালীন রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছে। সায়্যিদী আ'লা হযরত (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) মক্কার সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলিম, মালিকুল উলামা, সায়্যিদ আহ্মাদ যাইনী দাহ্লান আশ শাফিয়ীর (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ)’র কাছ থেকে হাদীসের সনদ লাভ করেন। ইমাম আহ্মাদ রেযা (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) খ্রীষ্টীয় ২০ শতকের বিদআতী ও স্বেচ্ছাচারী ধর্ম-সংস্কারকদের এবং তৎকালীন চলমান সমস্ত ফিতনা এবং ভ্রান্ত ফির্কার খণ্ডন করে ইসলামের বিশুদ্ধ ধারা আহ্লে সুন্নাত ওয়া জামাআতকে পুনর্জীবিত করায় অবদান রেখে প্রসিদ্ধ হয়েছেন।
“আ’লা হযরত” উপাধিটি ১৩-১৪ হিজরী শতকে সম্মানসূচক খেতাব হিসেবে প্রচলিত ছিলো। তিনি যেহেতু বিদআতীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি এবং তৎকালীন সুন্নী আলিমদের মধ্যে অন্যতন প্রধান আলিম’এ দ্বীন ছিলেন তাই তাঁর অনুসারীরা তাঁকে আ’লা হযরত বলে সম্বোধন করতেন। এই খেতাব এতোই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে এটাই ইমাম আহমাদ রেযা খান (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ)’র নামের সমার্থক হয়ে ওঠে।
১৩২৪ হিজরীতে আরবে তাঁর দ্বিতীয় ও ঘটনাবহুল সফরের সময়ে হারামাইন অর্থাৎ পবিত্র মক্কা ও মদীনার শীর্ষস্থানীয় আলিমগণ তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও আহ্লে সুন্নাত ওয়া জামাআতকে সংরক্ষণে তাঁর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখে তাঁকে দ্বীনের মুজাদ্দিদ ঘোষণা করেন। উপমহাদেশের সর্বজন মান্য আলিমগণও এতে একমত হন যে একজন মুজাদ্দিদ হওয়ার ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় সকল গুণাবলীই তাঁর মাঝে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিলো, সুতরাং এতে কোনো সন্দেহ নেই, যে হিজরী চতুর্দশ শতাব্দির মুজাদ্দিদ ছিলেন তিনি।
ইমাম আহমাদ রেযা খান (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ) নিজেকে আবদুল মুস্তাফা বলতেন অর্থাৎ সর্বশেষ নবী ও মনোনীত রাসূল (ﷺ)’র গোলাম। ফক্বীহ্ এবং মুফতী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি তাঁর অন্য সকল গুণকে ছাড়িয়ে যায়। মূলত তাঁর কাজের প্রধান অংশ হলো তাঁর ফতোয়া সংকলন। অনেক দীর্ঘ গ্রন্থ তিনি লিখেছেন মূলত প্রশ্নের উত্তর হিসেবে, সুতরাং সেগুলোও ফাতাওয়া। তাঁর অনেকগুলো রায় খোদ তিনি নিজেই সংগ্রহ, বিন্যস্ত ও সংকলিত করে এর নাম রাখেন আল-আতায়া আন নাবাওয়িয়্যাহ ফি ফাতাওয়া আর-রাযাওয়িয়্যাহ্ যা উপমহাদেশে ফাতাওয়ায়ে রাযাভিয়্যাহ নামে অধিক পরিচিত (ফতোয়ার মাজমুআটি ত্রিশ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে)।
তাফসীর ও বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ ছাড়াও দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে বহু রিসালা এবং গ্রন্থ তিনি লিখেছেন তাফসীর ও বিভিন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ ছাড়াও দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে বহু রিসালা এবং গ্রন্থ তিনি লিখেছেন।
তিনি আল্লামা সায়্যিদ আলে রাসূল মারেহ্রাওয়ী (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ)’র হাতে ১২৯৪ হিজরীতে সিলসিলা’এ আলিয়া ক্বাদিরিয়ায় বাইয়াতবদ্ধ হন। আলিম’এ দ্বীন, সুফী, ফক্বীহ্ হওয়ার পাশাপাশি আরবী, ফার্সী, উর্দু কাব্যেও ছিলো তাঁর অনন্য পান্ডিত্য। হাদাইক্ব’এ বখশিশ নামে প্রকাশিত হয় তাঁর উর্দু ও ফারসী নায্ম্গুলোর মাজমুআ। অনেক নাত, ক্বাসীদা বিভিন্ন মজলিসে পাঠ করা হয়, যার মধ্যে ক্বাসীদা’এ সালাম উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে বিপুলভাবে জনপ্রিয়।
কোনো প্রকার অতিরঞ্জন ব্যতীত বলা যায় সায়্যিদি আ’লা হযরত ইমাম আহ্মাদ রেযা খান (رَحْمَةُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ)’র সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন এবং খিদমাতের পরিপূর্ণ আলোচনার জন্য ৪-৫ খন্ডের বইও যথেষ্ট না, إِنْ شَاءَ اللَّهُ تَعَالَى অদূর ভবিষ্যতে চতুর্দশ শতাব্দীর এই মহান মুজাদ্দিদের জীবনী ও কর্ম নিয়ে বিস্তারিত তাসানিফ আপনাদের খিদমাতে উপস্থাপন করা হবে।
এই মহান ইমাম ৬৮ বছর বয়সে ১৩৪০ হিজরি ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে ইন্তিক্বাল করেন। মহান আল্লাহ্ (ﷻ) তাঁর উপর রহমত নাযিল করুন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং যুগশ্রেষ্ঠ এই ওলীর ফয়েজ নসীব করুন, আমিন সুম্মা আমিন।