14/12/2025
📚📚যমপুরী ও ধর্মরাজের বিচারসভা📚📚
বৈতরণী নদী ও ১৬টি ভয়ংকর নগর পার হয়ে দীর্ঘ ৪৭ দিন পর (মৃত্যুর পর থেকে) জীবাত্মা অবশেষে যমপুরীতে পৌঁছায়। এই যমপুরী বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, যার চারটি প্রধান দরজা রয়েছে।
শ্রীবিষ্ণু গরুড়কে বললেন,
"হে তাক্ষ্য! যমপুরী দেখতে অত্যন্ত সুন্দর কিন্তু পাপীদের জন্য তা ভয়ের কারণ। সেখানে গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের গান-বাজনা চলে, সাধু-সন্তরা সেখানে সম্মানিত হন, কিন্তু পাপীরা সেখানে প্রবেশ করলেই ভয়ে কাঁপতে থাকে।"
যমরাজের দ্বার ও চিত্রগুপ্তের খাতা
যমপুরীর প্রধান ফটকে পৌঁছে আত্মা দেখতে পায় বিশাল সব দ্বাররক্ষী (যমদূত) দাঁড়িয়ে আছে। তারা আত্মাকে ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে সিংহাসনে বসে আছেন চিত্রগুপ্ত—যিনি যমরাজের প্রধান হিসাবরক্ষক।
চিত্রগুপ্তের কাছে 'অগ্রসন্ধানী' নামে একটি বিশাল খাতা বা গ্রন্থ থাকে। এই খাতায় প্রতিটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তের হিসাব লেখা থাকে।
চিত্রগুপ্তো মহাপ্রাজ্ঞঃ সর্বশাস্ত্রবিশারদঃ ।
গণয়ত্যুভয়ং রাশিং পাপং পুণ্যং চ সর্বদা ॥
মহাজ্ঞানী ও সর্বশাস্ত্রে বিশারদ চিত্রগুপ্ত সর্বদা মানুষের পাপ এবং পুণ্য—এই দুই রাশিরই গণনা বা হিসাব নিখুঁতভাবে রাখেন।
আত্মা যখন সেখানে দাঁড়ায়, তখন চিত্রগুপ্ত যমরাজকে বলেন,
"হে ধর্মরাজ! এই জীব পৃথিবীতে অমুক কাজ করেছে, এর পাপ ও পুণ্যের তালিকা এই।"
সাক্ষী কারা দেয়? (লুকানো পাপের প্রকাশ)
অনেক সময় পাপী আত্মা মিথ্যা কথা বলে। সে বলে, "আমি এই পাপ করিনি, কেউ তো দেখেনি!" তখন যমরাজ তাকে মনে করিয়ে দেন যে, মানুষ পাপ করার সময় মনে করে কেউ দেখছে না, কিন্তু ১৪ জন সাক্ষী সর্বদা উপস্থিত থাকে।
সূর্যোঽগ্নিঃ খং মরুদ্দেবঃ সোমঃ সন্ধ্যা হ্যহঃ ক্ষপা ।
দিশশ্চ কালঃ ধর্মশ্চ সর্বে সাক্ষ্যপ্রদায়িনঃ ॥
সূর্য, অগ্নি, আকাশ, বাতাস, চন্দ্র, সন্ধ্যা, দিন, রাত, দিকসমূহ, কাল (সময়) এবং স্বয়ং ধর্ম—এরা সবাই মানুষের পাপকর্মের সাক্ষী দেয়।
যমপুরীতে এই সাক্ষীদের সাক্ষ্য শুনে পাপী আত্মা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার আর অস্বীকার করার উপায় থাকে না।
ধর্মরাজ যমের দুই রূপ (ভয়ংকর ও শান্ত)
গরুড় প্রশ্ন করলেন, "হে প্রভু! যমরাজকে দেখতে কেমন?"
শ্রীবিষ্ণু বললেন, "যমরাজ বা ধর্মরাজ নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারেন। তিনি পাপীদের কাছে একরকম এবং পুণ্যবানদের কাছে আরেকরকম।"
পাপীদের জন্য ভয়ংকর রূপ:
যখন বিচার শুরু হয় এবং দেখা যায় আত্মা মহাপাপী, তখন যমরাজ প্রলয়কালের মেঘের মতো গর্জন করে ওঠেন।
কৃষ্ণং অঞ্জনবর্ণাভং প্রলয়ম্বুদনিঃস্বনম্ ।
জ্বলদগ্নিসমং নেত্রং দণ্ডহস্তং মহাবলম্ ॥
পাপীরা দেখে—যমরাজ কাজলের মতো কালো, প্রলয়কালের মেঘের মতো তাঁর গর্জন। তাঁর চোখ দুটি জ্বলন্ত আগুনের মতো লাল, হাতে বিশাল দণ্ড (গদা), এবং তিনি মহাবলশালী মহিষের ওপর বসে আছেন। তাঁর বিশাল দাঁত ও ভ্রুকুটি দেখে পাপী আত্মা ভয়ে মূর্ছিত হয়ে যায়।
পুণ্যবানদের জন্য সৌম্য রূপ:
কিন্তু যারা জীবনে সত্য কথা বলেছে, দান করেছে এবং ভক্তি করেছে, তারা যমরাজকে দেখে ভয় পায় না। তাদের কাছে যমরাজ বিষ্ণুর মতো সৌম্য মূর্তিতে দেখা দেন।
শ্রীবিষ্ণু বলেন, "পুণ্যবানরা দেখে—যমরাজ সৌম্য দর্শন, তাঁর মুখে হাসি, তিনি রত্নখচিত অলংকার পরে আছেন এবং তিনি তাদের 'বন্ধু' বা 'মিত্র' বলে সম্বোধন করছেন।"
বিচারের রায় (স্বর্গ না নরক?)
চিত্রগুপ্তের খাতা এবং সাক্ষীদের প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্মরাজ রায় দেন।
পাপীদের রায়: যমরাজ তখন যমদূতদের আদেশ দেন, "এই পাপীকে নিয়ে যাও! একে কুম্ভীপাক নরকে ফেলো (ফুটন্ত তেলের কড়াই) অথবা অসিপত্রবনে (ধারালো পাতার জঙ্গল) নিক্ষেপ করো।" তখন যমদূতরা তাকে মারতে মারতে নরকের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আত্মারা তখন আর্তনাদ করে বলতে থাকে, "হা দৈব! আমি কেন পাপ করলাম!"
পুণ্যবানদের রায়: আর যদি পুণ্য বেশি হয়, তবে যমরাজ বলেন, "হে পুণ্যাত্মা! তুমি ধন্য। তুমি এখন স্বর্গের সুখ ভোগ করো।" তখন স্বর্গ থেকে দিব্য বিমান আসে এবং গন্ধর্বরা গান গাইতে গাইতে সেই আত্মাকে স্বর্গে নিয়ে যায়।
একটি বিশেষ শিক্ষা: কর্মফল অমোঘ
এই কথার শেষে শ্রীবিষ্ণু গরুড়কে একটি ধ্রুব সত্য বলেন।
অবশ্যমেব ভোক্তব্যং কৃতং কর্ম শুভাশুভম্ ।
নাভুক্তং ক্ষীয়তে কর্ম কল্পকোটিশতৈরপি ॥
মানুষকে তার কৃত শুভ বা অশুভ কর্মের ফল ভোগ করতেই হবে। শত কোটি কল্প বা যুগ পার হয়ে গেলেও, ভোগ না করা পর্যন্ত কর্মফল ক্ষয় হয় না।👏