26/03/2024
সুধী,
আসছে আগামী ২রা বৈশাখ ১৪৩১বাং (১৫ই এপ্রিল ২০২৪ইং) সোমবার হইতে ৩রা বৈশাখ ১৪৩১বাং (১৬ই এপ্রিল ২০২৪ইং) মঙ্গলবার পর্যন্ত মহাতীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দ তীর্থস্নান উৎসব অনুষষ্ঠীত হবে।
স্নানের তিথি সমূহঃ
২রা বৈশাখ সোমবার- মহেন্দ্রযোগ: দিবা ৪/২২ মিঃ গতে ৫/৪০ মিঃ মধ্যে ও অমৃতযোগ রাত্রি ৭/১৬ মিঃ গতে ৯/৩০ মিঃ পুনঃ রাত্রি ১১/৪১ মিঃ গতে রাত্রি ২/৩৭ মিঃ মধ্যে।
৩রা বৈশাখ মঙ্গলবার- অমৃতযোগ: সকাল ৮/১০ মিঃ গতে ১০/৪৫ মিঃ মধ্যে ও মধ্যাহ্ণ ১/২১ মিঃ গতে ৩/০৫ মিঃ মধ্যে
।।উক্ত অনুষ্ঠানে আপনারা স্ব-বান্ধবে আমন্ত্রিত।।
স্নান মন্ত্রঃ
ওঁ ব্রহ্মপুত্র মহাভাগ শান্তনোঃ কুলনন্দন। অমোঘা-গর্ভসম্ভূত পাপং লোহিত্য মে হর ॥
মন্ত্রের অর্থঃ হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র ! তুমি শান্তনু মুনির কুলতিলক, তুমি অমোঘা দেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। হে লৌহিত্য , তুমি আমার পাপ হরণ কর।
ত্বং ব্রহ্মপুত্র ভুবন তারণতীর্থরাজ। গম্ভীর -নীর পরিপুরত সর্বদেহ ॥
ত্বদ্দর্শনাদ্ হরতু মে ভব ঘোর -দুঃখং। সংযোগতঃ কলিযুগে ভগবন্ নমস্তে ॥
মন্ত্রের অর্থঃ হে ব্রহ্মপুত্র ! তুমি ভুবন পরিত্রাণকারী তীর্থরাজ , তোমার সর্বদেহ গম্ভীর সলিল রাশিদ্বারা পরিপুরিত। তোমার দর্শন ও কলিযুগ সংযোগ দ্বারা আমার ভবব্যাধিজনিত ঘোর দুঃখ হরণ কর। হে ভগবান্ ! তোমাকে প্রণাম।
উক্ত মন্ত্র পাঠপূর্বক স্নানার্থীগণ স্ব স্ব অভিলাষ অনুসারে পুষ্প , ধান্য , দূর্বা , হরীতকী, ডাব, আম , আম্রপল্লব ইত্যাদি সহকারে তর্পণপূর্বক স্নান করেন।
লাঙ্গলবন্দের কাহিনীঃ
ত্রেতাযুগের প্রথম দিকে মগধদেশে ভাগীরথী নদীর কৌশিকী তীরে ভোজকোট নামক নগরীর অধিপতি ছিলেন চন্দ্রবংশীয় রাজর্ষি গাধি। রাজর্ষি গাধির বিশ্বামিত্র নামে এক পুত্র ও সত্যবতী নামে এক সুন্দরী কন্যা ছিল। সত্যবতীর বিবাহ হয় ভৃগুমুনি নামে পরিচিত ভৃগুবংশীয় ব্রাহ্মণকুমার রিচিকের সাথে। সত্যবতীর গর্ভে জমদগ্নি নামে এক মুনির জন্ম হয়। জমদগ্নি বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে প্রসেনজিৎ রাজার কণ্যা রেণুকাকে বিবাহ করেন। রেণুকার গর্ভে জমদগ্নির পাঁচটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। কনিষ্ঠ সন্তান পরশুরাম ছিলেন বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। জন্মলগ্নে এই পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল রাম। ইনি কুঠার দ্বারা একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেন।
কুঠার ধারণের জন্য তার নাম পরশুরাম (কুঠারধারী রাম ) রূপে খ্যাত হয়। ভৃগুবংশের সন্তান - এজন্য তাকে ভার্গব এবং জমদগ্নির পুত্র বলে তাকে জমদগ্ন্য নামেও সম্বোধন করা হয়। একদিন জমদগ্নির পাঁচপুত্র ফল সংগ্রহার্থে বনে গেলে তাদের মাতা অমোঘাদেবী (রেণুকাদেবী) স্নানপূর্বক পানীয় জল আনয়নের জন্য নিকটস্থ গঙ্গানদীতে যান। তিনি যখন নদীর ঘাটে জল আনতে যান তখন শতবাহু নামে এক রাজা তাঁর শত -স্ত্রী সনে গঙ্গা নদীতে জলকেলি করছিলেন। রাজা তাঁর শতবাহুতে নদীর জল আকর্ষণ করলে অবলীলাক্রমে স্ত্রীগণ তাঁর বাহুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করেন। হঠাৎ রাজা সমস্ত জল একবারে ছেড়ে দেন। স্ত্রীগণ তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে থাকলে রাজা পূনর্বার জল আকর্ষণ করেন। এমত জলকেলি চলাকালে জমদগ্নি ঋষি-পত্নী অমোঘা দেবী (রেণুকাদেবী ) নদীর ঘাটে গিয়ে শতবাহু রাজার কৌতুকপূর্ণ নয়নাভিরাম জলকেলি দর্শনে অন্তরে এক বিচিত্র পুলক অনুভব করেন। কিছুক্ষণ এ দৃশ্য দর্শনান্তে জল নিয়ে ঘরে ফিরলে ঋষি জমদগ্নি স্ত্রীর বিলম্ব ও শরীর রোমাঞ্চিত হবার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু অমোঘা দেবীকে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি যোগবলে পত্নীর পূর্বাপর সকল ঘটনা অবগত হন। ঋষি স্ত্রীর এই বিধ মানসিক বিকৃতিতে ক্রোধাম্বিত হয়ে পড়েন। রূঢ়স্বরে তৎক্ষণাৎ স্বীয় পুত্রদেরকে তাদের মাতাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু জ্যেষ্ঠ চার পুত্রই মাতাকে হত্যা করতে অস্বীকার করেন-পিতার আদেশ অমান্য করেন। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে চার পুত্রকেই পশু - পক্ষীর মত জড় ও হীনবুদ্ধিসম্পন্ন নিকৃষ্ট জীবন প্রাপ্তির অভিশাপ দেন।
সর্বশেষ তিনি তাঁর পঞ্চম পুত্র রামকে মাতৃ হত্যার আদেশ দেন। বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার মহামুনি ভৃগুর প্রপৌত্র পরশুরাম (জমদগ্নি) কম্পিত হৃদয়ে শঙ্কিত চিত্তে পিতৃ আজ্ঞা সম্পন্ন করেন। পিতৃআজ্ঞা পালন করার আশীর্বাদস্বরূপ জমিদগ্নি ঋষি পরশুরামকে বর চাইতে বললেন। অনুশোচনায় দগ্ধ হৃদয় পরশুরাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে (৪) চারটি বর চাইলেন-
(১ ) তপঃপ্রভাবে আমাদের মা যেন আবার জীবিত হয়ে আমাদের সাথে বসবাস করেন।
(২ ) হত্যার ঘটনা যেন মায়ের স্মরণে না থাকে।
(৩ ) জ্যেষ্ঠভ্রাতাগণ যেন মনুষ্যবৎ পূর্বাবস্থা ফিরে পান।
(৪ ) এই হতাকান্ডে তাঁর যেন পাপস্পর্শ না হয়।
কিন্তু যেইমাত্র মাতার দেহ কুঠারে দ্বিখন্ডিত হয়েছে সেই মুহুর্তেই পরশুরাম মাতৃহত্যা ও নারী হত্যাজনিত দ্বিবিধ পাপে আক্রান্ত হলেন। পরশুরাম হতবাক। - একি! তাঁর তাহের কুঠার যে হাতেই লেগে আছে। তিনি উদ্বিগ্নাকুলচিত্তে পিতৃদেবকে জিজ্ঞেস করলেন- পিতা ! আমিতো আজ্ঞাবহ- মাত্র, তবে কেন কুঠার আমার হাতে লেগে আছে?
পিতা বললেন- ‘ তুমি মাতৃহত্যা আর নারীহত্যা দ্বিবিধ পাপেই আক্রান্ত হয়েছো। আর জেনে রেখো , পাপ ছোট বা বড় যা - ই হোক না কেন , কৃতকর্মীকে তা’ স্পর্শ করবেই। ঋষি পুত্রকে আশ্বস্ত করে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিলেন। আর উদ্বিগ্ন না হয়ে অবিলম্বে সর্বতীর্থ পরিভ্রমণের উপদেশ দিয়ে বললেন- ‘ যে তীর্থ গমনে বা স্নানে তোমার হাতের কুঠার স্খলিত হবে , জানবে যে ঐ পুণ্যস্থানই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থক্ষেত্র। পিতৃ আজ্ঞা প্রাপ্ত হয়ে জামদগ্ন্য ( পরশুরাম) পৃথিবী পর্যটনে বের হয়ে নানা তীর্থ পরিভ্রমন করতে লাগলেন। অবশেষে একদিন তিনি হিমালয় পর্বতের উত্তর -পূর্ব কোণে , মানস সরোবরের সন্নিকটে এক বৃহৎ কুপ সমীপে উপনীত হলেন। এবং পরমেশ্বরকে স্মরণ করে পরশুরাম ব্রহ্মকুন্ডে অবগাহন করলেন। অবগাহন করার সাথে সাথে তার হাতে লেগে থাকা কুঠারখানা স্খলিত হয়ে গেল , তিনি সর্ববিধ পাপ থেকে অব্যাহতি পেলেন আর মহাপাপ থেকে মুক্তি লাভ করলেন । পরশুরাম মনে মনে স্থির করলেন- এমন সুমহান পুণ্যজল (সলিল ) যা আমাকে মহাপাপ থেকে মুক্ত করেছে সেই পুণ্যজল সর্বসাধারণের নিত্য সহজলভ্য করার জন্য এর ধারা পৃথিবীতে প্রবাহিত করব। ত্রেতাযুগে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থানুযায়ী নারী - পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে কোন না কোন আশ্রম নিবাসী থাকতে হতো।
এসব আশ্রমে (গোত্রে ) মুনি ঋষিগণ লেখাপড়া থেকে আরম্ভ করে গৃহকর্ম , কৃষিকার্য , রাজনীতি, ধর্মনীতি , সমাজনীতি , যুদ্ধনীতি , অর্থনীতি ও গার্হস্থ্য নীতি প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। আশ্রমের আওতাধীন সম্পত্তিতে উৎপাদিত ফসলের দ্বারা আশ্রমবাসীদের জীবিকা ও সমস্ত ব্যয় ভার স্বচ্ছন্দে নির্বাহ হতো। সে ধারাবাহিকতায় পরশুরাম হাল কর্ষণ করতেন পিতার আশ্রমে। তাই আশ্রম থেকে হাতে কুঠার এবং হাল নিয়ে পিতৃ আজ্ঞায় বহির্গত হন। কুঠার হস্তচালিত হলে হাল দিয়ে কঠিন পাথরের বক্ষ বিদীর্ণ করে ব্রহ্মকুণ্ডের জলধারাকে হিমালয়ের পাদদেশে সমভূমিতে আনতে সক্ষম হন। তারপর উক্ত কর্ষণের লাঙ্গল দিয়ে মাটি চষে নিয়ে ক্রমাগত চলতে চলতে ব্রহ্মকুণ্ডের জলধারাকে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে নিয়ে আসেন। ফলে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা অন্তর্গত সোনারগাঁও মহেশ্বরদি পরগণাকে দু ’ ভাগে বিভক্ত করে ব্রহ্মপুত্রের এই ধারা ধলেশ্বরী নদীতে পতিত হয়। সুদূর হিমালয় থেকে একাধিকক্রমে হাল চালনায় ক্লান্ত হয়ে পরশুরাম বিশ্রাম করার জন্য যেখানে কর্ষণের লাঙ্গল বদ্ধ রাখেন সে স্থানের নাম হয় ‘ লাঙ্গলবন্দ’ । আর তা এ চৈত্রের বুধবার ও অষ্টমী তিথি ছিল, যা বুধাষ্টমী নামে খ্যাত। ২০১৬ তে এরকম বুধাষ্টমী ছিল এবং ২০২০ইং তেও বুধাষ্টমী ছিল!
লাঙ্গলবন্দস্নান মাহাত্ম্যঃ সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও ব্রহ্মপুত্র স্নান ব্রহ্মপুত্র স্নানের মাহাত্ম্য ও ঐতিহ্য আছে!
লাঙ্গল বন্দের দর্শনীয় স্থান সমূহঃ লাঙ্গল বন্দের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছেঃ
১৩টি স্নান ঘাট
১০টি মন্দির
৬টি আশ্রম ও
৩টি আশ্রয় স্থল।
উক্ত ১৩টি স্নান ঘাটের একটি মাত্র ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব পারে অবস্থিত। বাকি সমস্ত স্নান ঘাট ও প্রতিষ্ঠাগুলোই পশ্চিম পারে অর্থাৎ স্নান স্থলে।
উত্তর থেকে দক্ষিণে একাধিক্রমে স্নানঘাটগুলো হলোঃ
১। অন্নপূর্ণা ঘাট
২। রাজঘাট
৩। শংকর ( সাধুর) ঘাট
৪। মাকরী ( শান্তি ) ঘাট
৫। গান্ধীঘাট বা মহাশ্মশান ঘাট
৬। বরদেশ্বরী ঘাট
৭। জয়কালী ঘাট
৮। রক্ষাকালী ঘাট
৯। পাষাণকালী ঘাট
১০। প্রেমতলা ঘাট
১১। চর শ্রীরামপুর ঘাট
১২। দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ী ঘাট
১৩। কালীগঞ্জ ঘাট।
লাঙ্গল বন্দের মন্দির সমূহঃ
১। অন্নপূর্ণা মন্দির
২। রক্ষাকালী মন্দির
৩। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির
৪। আদি ব্রহ্মপুত্রের মন্দির
৫। শ্মশানকালী মন্দির
৬। জয়কালী মন্দির
৭। শিব মন্দির
৮। পাষাণকালী মন্দির
৯। বরদেশ্বরী কালী মন্দির
১০। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির।
লাঙ্গল বন্দের আশ্রম সমূহঃ
১। মহাত্মা ললিত সাধুর আশ্রম
২। বেণীমাধম ব্রহ্মচারী আশ্রম
৩। শংকর সাধুর আশ্রম
৪। শান্তি আশ্রম
৫। বৃন্দাবন সাধুর সমাধি মন্দির ও আশ্রম
৬। দ্বিগি জয় সাধুর আশ্রম
৭। পরেশ সাধুর আশ্রম
৮। রাধা গোবিন্দ মন্দির (তিলক যাত্রী নিবাস)
হরে কৃষ্ণ
সবাই আসিবেন।