25/08/2026
ওঁ নমঃ শ্রী ভগবতে প্রণবায়
|| কপালপাণিং প্রণবং ভজামি ||
~ স্বামী নির্মলানন্দ।
ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রাণপুরুষ শিবাবতার আচার্য্য শ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ কেবল ত্রিশূলপাণিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন কপালপাণি। তাই শিবস্তুতির অনুসরণে তাঁকেও "কপালং ত্রিশূলং করাভ্যাং দধানং" ব'লে প্রণতি জানাতে ইচ্ছা হয়। স্বামীজী মহারাজের যে বহুপ্রচারিত শ্রীমূর্তি আমরা দর্শন করি, তা জটাজুটধারী, রুদ্রাক্ষমাল্যভূষিত, গৈরিকমণ্ডিত, ত্রিশুলধারী মূর্তি। তাঁর দীপ্ত নয়নে যেন শিবেরই ন্যায় বহ্নি প্রজ্জ্বলিত। পাথরে খোদাই করা যেন একখানি নিখুঁত শিবমূর্তি। শিবেরই ন্যায় তিনি ছিলেন আবাল্য শ্মশানচারী ও মহাযোগী। তদীয় গর্ভধারিণীর স্বপ্ন-শিশুরূপে শিবের আবির্ভাব-সার্থক হয়েছিল।
কৈশোরে সাধনকালে তাঁর শ্রীহস্তে ত্রিশূলের সঙ্গে দেখা যেত একখানি মৃত খর্পর। শুনা যায় ঐ খর্পরটি নাকি তাঁরই ভ্রাতুষ্পুত্র গদাই এর। গদাই ছিল স্বামীজী মহারাজের দ্বিতীয় ভ্রাতা যামিনী ভুইঞার পূত্র *। অতি শৈশবে তার আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। আচার্য্যদেবের সহপাঠী শ্রীকিরণ শশি নাগ (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাব্রতী)। একদা আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন-"আমরা উভয়ে এবং ক্ষিতীশ চৌধুরী (স্বামী শুদ্ধানন্দজী), যে বৎসর প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে ঢাকা যাই, গদাই এর মৃত্যু সেই বৎসরের (ইং ১৯১৬) ঘটনা; বাড়ী থেকে বেরুবার সময় গদাইকে সম্পূর্ণ সুস্থই দেখে গিয়েছিলাম। পরীক্ষা উপলক্ষ্যে দিন দশেক আমাদিগকে ঢাকা থাক্তে হয়েছিল। হঠাৎ একদিন তিনি বলে উঠলেন-"বাড়ী গিয়ে দেখখো, গদাই নাই।” আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলুম তাঁর ভবিষ্যৎ উক্তিতে। এই উক্তির সত্যতা যাচাই করার জন্য যে দিন যে সময়ে তিনি একথা বলেছিলেন, খাতার এক কোণে সেই তারিখ ও সময়টা লিখে রেখেছিলাম। বাড়ী ফিরে শুনে আশ্চর্য্য হয়েছিলাম, ঠিক সেই দিন সেই সময়েই গদাই মাতৃ-অঙ্ক অন্ধকার করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। একই পল্লীর অধিবাসী এবং একই বিদ্যালয়ের সহপাঠীরূপে স্বামীজীকে শিশুকাল থেকে দেখেছি ও তাঁর চরিত্র লক্ষ্য করেছি। তাঁকে জিতেন্দ্রিয়, সাধনশীল, সংসারনিস্পৃহ, স্বল্পভাষী, সত্যনিষ্ঠ, সাধুচরিত্রের মানুষ ব'লেই জানতাম । কিন্তু এ ঘটনা তাঁর অধ্যাত্ম ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে আমার মনে নূতন শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম বুদ্ধি জাগিয়েছিল । আমি বুঝেছিলাম-এতদিন তাঁকে যে-ভাবে জেনেছি, তিনি তাঁর চেয়েও অনেক উচ্চ ভূমির দেবমানব। তিনি অন্তঃচক্ষুবিশিষ্ট, ক্রান্তদর্শী: তিনি অন্তর্যামী পুরুষ। আমাদের মধ্যে আমাদেরই একজন হয়ে কোন্ লোকাতীত পুরুষটি এমন ক'রে আত্মগোপন ক'রে আছেন, তা জানিবার জন্য ক্রমেই আগ্রহ ও কৌতূহলবৃদ্ধি পেয়েছিল।”
কিরণবাবু পরবর্তী জীবনে শ্রীশ্রীআচার্য্যদেবের শ্রীচরণে আত্মসমর্পণপূর্ব্বক সাধন ও দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
সঙ্ঘনেতা শ্রীশ্রীস্বামী প্রণবানন্দজী তখন 'সাধু' বা 'ব্রহ্মচারী বিনোদ' নামে সাধারণের নিকট পরিচিত। তিনি শ্মশান থেকে ঐ মৃত খর্পরটি সংগ্রহ করেছিলেন। ওটি তাঁর সাধন-কুটীরে থাক্তো এবং সাধনার অবলম্বনরূপে ব্যবহৃত হতো। একদা তাঁর অগ্রজা ভগ্নী হেমাঙ্গিনী বসু (ওরফে বুড়ি) ঐ অশুচি মৃত খর্পরটি সম্বন্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন। যা ছুঁলে স্নান করা উচিত। সেটাকে ঘরে এনে এমন অনাচার করা কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, "এই তো মনুষ্য দেহের চরম পরিণাম। যাকে তোমরা আদর ক'রে কোলে নিয়েছ, খাইয়েছ, কত স্নেহভরা চুম্বন তার কচি কমল-মুখখানিতে মধুর মধুর হাসি ফুটিয়ে তুলেছ, সে আজ কোথায়? তার শরীরই কি আজ অস্পৃশ্য, অশুচি হলো? সে-ই আজ ঘৃণ্য, পরিত্যজ্য হলো? মনে রেখো-প্রতি মনুষেরই এক দিন এই দশা হবে। এ দেহ নশ্বর। জীবন-যৌবন ক্ষণভঙ্গুর। যে দেহের ভোগের জন্য মানুষ পাগল, সে দেহ মাটিতে মিশে মাটি হয়ে যাবে, না হয় চিতানলে পরিণত হবে দুই মুষ্টি ভস্মে। " এ বৈরাগ্যদৃপ্ত আপ্তবাণী শ্রবণে আবাল্য ব্রতপরায়ণা বিধবা ভগ্নীরও জ্ঞানোদয় হয়েছিল। প্রত্যুত্তর তো দূরের কথা, তিনি হয়ে গিয়েছিলেন যেন নিরুত্তর ছবি।
আত্মনিষ্ঠ স্বামী প্রণবানন্দজী স্বয়ং ছিলেন বিবেক ও বৈরাগ্যের ঘনীভূতা মূর্তি। জীবের চরম লক্ষ আত্ম-তত্ত্বোপলব্ধির সাধনার পথে মহাশত্রু হচ্ছে-আলস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা, জড়তা, রিপু ও ইন্দ্রিয়গণ। ইন্দ্রিয়ের উত্তেজনা ও রিপুর উৎপীড়ন থেকে আত্মরক্ষাপূর্ব্বক নিয়ত প্রাণে আত্মস্মৃতি জাগিয়ে রাখতে হলে কি প্রয়োজন? তিনি বার বার বলতেন-মৃত্যুচিন্তা কর, দেহের নশ্বরতা ও জগতের অবাস্তবতা সম্বন্ধে ভাবো। তা হলে আর রিপু-ইন্দ্রিয় প্রবল হবে না, মায়া-মোহের ঘোরে বিভ্রান্ত হবে না, আলস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা, জড়তা তোমার সাধনায় শৈথিল্য আনয়ন করতে পারবে না। তাঁর নিজ শ্রীমুখের উক্তি-“যে ব্যক্তি নিয়ত মৃত্যুচিন্তা করে সে কদাপি কোন প্রলোভনের দ্বারা প্রলুব্ধ হয় না, কোন মায়ামোহের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। যে ব্যক্তি প্রতি নিমিষে নিমিষে, প্রতি পলকে পলকে, প্রতি ভাবনায়, প্রতি চিন্তায়-শয়নে, স্বপনে, জাগরণে মৃত্যুর স্মৃতিকে প্রাণে জাগাইয়া রাখিতে পারে, সে অচিরে মহামুক্তি লাভে সমর্থ হয়।”
আরো বলেছেন-“মৃত্যুচিন্তা রিপুর উত্তেজনা ও ইন্দ্রিয়ের উৎপীড়ন হইতে মানুষকে রক্ষা করে। মৃত্যুচিন্তা বিষয় বাসনাকে বিধ্বংস করিয়া মানুষের অন্তরে বিবেক- বৈরাগ্য জাগাইয়া তোলে, ভোগ-বিলাসের স্পৃহাকে নষ্ট করিয়া মানবপ্রাণে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগাইয়া দেয়।” তিনি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছিলেন- "মৃত্যুচিন্তাই তো সিদ্ধার্থকে বুদ্ধত্ব লাভের পথ প্রদর্শন করিল। মৃত্যুচিন্তাই তো শঙ্করকে শৈশবে সন্ন্যাসী করিয়াছিল।” এ যুগে আর এক দৃষ্টান্ত আচার্য্য স্বামী প্রণবানন্দজী স্বয়ং। তাঁকে শুধু ত্রিশূলপাণিরূপে ভজনা করলেই চলে না, তাঁর কপালপাণি স্বরূপটিও উপলব্ধি করতে হবে। তাইতো বিনম্র প্রার্থনাপ্লুত অন্তরে স্তুতি করতে ইচ্ছা হয়-“কপালপাণিং প্রণবং ভজামি।”
আচার্য্যদেবের শ্রীহস্তে রচিত ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ আজ ধর্মভিত্তিতে জাতিগঠনের পরিকল্পনা নিয়ে ভারত ও বহির্ভারতে ব্যাপক ভাবে কর্তব্যরত। সেবা, শিক্ষা, ব্যক্তিগঠন, সমাজগঠন, তীর্থসংস্কার, অনুন্নতোন্নয়ন, আদিবাসী কল্যাণ, শুদ্ধি আদি নানা বিভাগে সঙ্ঘের কর্মসাফল্য আজ কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করছে। তাঁর স্থূলদেহের অবসানেও সঙ্ঘের কলেবর উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপরায়ণ। সঙ্ঘের এই সাফল্য, স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির প্রকৃত রহস্য কি? উত্তর-এ সঙ্ঘের পশ্চাতে আছে যুগপুরুষের অলৌকিক তপঃশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির মহান্ আশীর্ব্বাদ। এ সঙ্ঘের জন্ম তপস্যায়, স্থিতি তপস্যায়, গতিও তপস্যায়। সঙ্ঘনেতার তপোলব্ধ সত্যানুভুতির দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এই সঙ্ঘ। যোগেশ্বর শিবের অবতারী পুরুষ লোকরক্ষার্থে ও লোকশিক্ষার্থে স্বয়ং দুস্তর তপশ্চরণ করেছেন এবং তাঁর উত্তর সাধকগণের জীবনগুলিকেও ত্যাগ, সংযম, সত্য ব্রহ্মচর্য্যের তপস্যার আদর্শে সুগঠিত ক'রে গেছেন।
দধীচির অস্থিতে ইন্দ্রের হস্তে বজ্র তৈরী হয়েছিল; তাতেই দেবগণ বৃত্রাসুরের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিলেন। স্বামী প্রণবানন্দজীও উপলব্ধি করেছিলেন- ভারতের মুক্তি আত্মত্যাগে। তাই এ যুগের পরিত্রাতা স্বয়ং ত্যাগীর মূর্ত্তি পরিগ্রহ ক'রে আবির্ভূত এবং নিজ পরিকরগণকেও গড়ে তুললেন ত্যাগ-বৈরাগ্যের ভাস্বর আলোকে এবং তাদিগকে উদ্বুদ্ধ ও নিয়োজিত ক'রে গেলেন সহস্র বৎসরের পরপদানত স্বধর্মভ্রষ্ট ভারতবাসীর মহামুক্তির জন্য তিলে তিলে নিজেদের শরীরের রক্তমোক্ষণে ত্যাগ ও বৈরাগ্যের উদ্দীপ্তি মৃত্যুচিন্তায়, মৃত্যুচিন্তার উদ্দীপ্তি মৃত-খর্পর অবলম্বনে জীবন-যৌবনের পরিণাম বিচারে। যোগেশ্বর শিব এ জন্যই তো শ্মশানের মৃত-খর্পর নিয়েছিলেন বেছে, শিবাবতার স্বামী প্রণবানন্দজীরও সাধন-জীবনের করভূষণ ছিল ত্রিশূলের সঙ্গে একটি মৃতের কপাল। ঐ মৃত কপালটির অবদান কম নয়। কপালপাণি স্বামী প্রণবানন্দজী ভারতের শ্বাশত আদর্শ ত্যাগ ও বৈরাগ্যের দৃপ্ত প্রসাদে সঙ্ঘের অন্তর্জীবনকে করেছেন পরিপুষ্ট এবং ত্রিশূলপাণি স্বামী প্রণবানন্দ শিবের রুদ্রশক্তির সমাশ্রয়ে অন্যায়ের প্রতিকার ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য সঙ্ঘের জাতিগঠন ও লোককল্যাণমূলক বহুমুখী ব্রতকে প্রসারিত ক'রে দিয়েছেন বিশ্বময়। ত্রিশূলপাণি স্বামী প্রণবানন্দকে যথার্থরূপে বুঝতে হলে কপালপাণি স্বামী প্রণবানন্দের তপস্যাদৃপ্ত জীবনের অনুধ্যান অবশ্যই করা চাই।
শ্রীশ্রীপ্রণবানন্দ-শতরূপে, শতমুখে-তৃতীয় খণ্ড:- স্বামী নির্মলানন্দ।
ওঁ গুরু কৃপাহি কেবলম্