11/01/2026
খাদ্য–সংস্কার ও আধ্যাত্মিক শক্তি
স্বামী বিবেকানন্দ ও শিষ্যের সংলাপ
শিষ্য: স্বামীজী, খাদ্যের সঙ্গে মানুষের মন ও চরিত্রের কি সত্যিই সম্পর্ক আছে?
স্বামীজী: আছে বইকি। শরীর যেমন খাদ্যে গঠিত, মনও তেমনই খাদ্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। অন্ন শুধু শরীর গড়ে না— চিন্তা ও প্রবৃত্তিও গড়ে তোলে।
শিষ্য: তবে কি খাদ্য শুদ্ধ না হলে মন শুদ্ধ হয় না?
স্বামীজী: শুদ্ধতার কথা বলতে গিয়ে তোমরা একেই ভাতের হাঁড়িতে এনে ফেলেছ। খাদ্যশুদ্ধি চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই মনশুদ্ধি। কেবল কী খেলে আর কী খেল না— এই বিচারেই যদি ধর্ম শেষ হয়, তবে তা বড়ই দীন ধর্ম।
শিষ্য: অনেকে বলেন, নিরামিষ আহারেই মন পবিত্র হয়।
স্বামীজী: কে বলেছে? পেটভর্তি ঘাসপাতা খেয়ে যদি মানুষ অলস, ভীরু আর জড় হয়ে যায়— তবে সে পবিত্রতা নয়, সে তমোগুণ। পবিত্রতার লক্ষণ হচ্ছে— উজ্জ্বল মুখ, দৃঢ় চরিত্র, অদম্য কর্মশক্তি।
শিষ্য: তবে মাছ-মাংস খাওয়াটা দোষের নয়?
স্বামীজী: অধিকারীভেদে বিচার করতে হয়। শিশুকে যা খাওয়ানো যায়, বৃদ্ধকে তা নয়। দুর্বল জাতিকে শক্ত করতে হলে পুষ্টিকর খাদ্য দরকার। আগে শরীর শক্ত হোক, তারপর সত্ত্বগুণের কথা ভাবা যাবে।
শিষ্য: কিন্তু শাস্ত্রে তো অহিংসার কথা বলা হয়েছে।
স্বামীজী: অহিংসা মহৎ আদর্শ, কিন্তু তা বলপূর্বক সকলের ওপর চাপালে বিপদ। যে নিজে দুর্বল, সে অহিংসার কথা বললে তা ভণ্ডামি হয়। শক্তিমান ব্যক্তি সংযম অবলম্বন করলে সেটাই সত্য অহিংসা।
শিষ্য: খাদ্যের কোন কোন দোষ শাস্ত্রে বলা হয়েছে?
স্বামীজী: তিন প্রকার দোষ—
১) জাতিদোষ— যা স্বভাবতই মনকে জড় করে।
২) নিমিত্তদোষ— অশুচি পরিবেশে প্রস্তুত খাদ্য।
৩) আশ্রয়দোষ— অসৎ ও দুষ্কৃত ব্যক্তির স্পর্শিত অন্ন।
কিন্তু তোমরা সব ছেড়ে কেবল শেষ দোষ নিয়েই মারামারি করছ— কে ছুঁল, কে ছুঁল না! এতে ধর্ম নয়, সমাজের ক্ষয় হয়।
শিষ্য: তবে খাদ্যসংস্কারের আসল উদ্দেশ্য কী?
স্বামীজী: ইন্দ্রিয়সংযম। খাদ্য এমন হওয়া চাই, যা শরীরকে সবল করে এবং মনকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করে। যে খাদ্য মানুষকে অলস ও ভীত করে, তা যত ‘পবিত্র’ নামেই পরিচিত হোক— সে ধর্মের সহায় নয়।
শিষ্য: সত্ত্বগুণের বিকাশ হলে খাদ্যাভ্যাস কী হয়?
স্বামীজী: তখন স্বভাবতই ভোগস্পৃহা কমে যায়। কিন্তু সেটা জোর করে নয়— অন্তরের পরিবর্তনের ফল। আগে চরিত্র বদলাও, তারপর খাদ্য আপনিই বদলাবে। উল্টোটা নয়।
শিষ্য: শেষ কথা কী বলবেন স্বামীজী?
স্বামীজী: মনে রেখো—
-খাদ্য ধর্মের সহায়, ধর্মের বিকল্প নয়।
- শক্তিহীন সংযম ভণ্ডামি।
-আগে মানুষ হও, পরে সাধু হও।
*সূত্র
স্বামী বিবেকানন্দ
(স্বামী-শিষ্য সংবাদ, বক্তৃতা ও কথোপকথনের ভাবানুবাদ)
বেলুড় মঠ, ১৮৯৭–১৮৯৯ পর্ব
🪷 জয় স্বামীজী 🪷