01/05/2026
" আজ রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা দিবস। "
---স্বামী বলভদ্রানন্দ
(পূজনীয় মহারাজের ভাষণ ও প্রবন্ধ থেকে সংকলিত।)
সহধর্মিণী সারদা দেবীকে ষোড়শীদেবী রূপে পূজা করার মাধ্যমেই শ্রীরামকৃষ্ণের সমস্ত সাধনা কার্যত শেষ হয়।
এরপর জগজ্জননী তাঁকে জানিয়ে দেন: তিনি অবতার, তাই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ক্রমে ক্রমে মুক্ত হয়ে গেলেও , তাঁর কখনো মুক্তি নেই। কারণ তিনিই সেই ভগবান, যিনি ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হলে ধর্ম পুনঃস্থাপন করার জন্য ও সাধু-প্রকৃতির মানুষকে পরিত্রাণ করার জন্য যুগে যুগে আসেন। যুগে যুগে তিনি এসেছেন এবং যুগে যুগে আবারও তাঁকে আসতে হবে অনুরূপ পরিস্থিতি হলে
এই অবতারে তাঁকে কি কি মহান ব্রত পালন করতে হবে, তাও জগজ্জননী তাঁকে জানিয়ে দিলেন, যেমন:---সব ধর্মই এক ঈশ্বরে পৌঁছানোর বিভিন্ন পথ, 'যত মত তত পথ', এই চিরন্তন সত্য তাঁর মাধ্যমেই সর্বপ্রথম জগতের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হবে। কর্মযোগ অবলম্বন করে মানুষ এই যুগে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। এই যুগে নারী জাতির প্রগতি হবে, ইত্যাদি।
এর মধ্যেই আরো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্বন্ধে জগজ্জননী তাঁকে অবহিত করিয়ে দিলেন, সেটি হল:
যে সমস্ত উদারভাব তিনি তাঁর নিজ জীবনে স্বয়ং আচরণ করে উপলব্ধি করেছেন, সেগুলির ধারক ও বাহক স্বরূপ এক নবীন ভাবের উদার ধর্মসম্প্রদায় তাকে গড়ে দিয়ে যেতে হবে। এই সম্প্রদায়ের মাধ্যমেই তিনি চলে যাওয়ার পরেও তাঁর ভাবরাশি জগতে থেকে যাবে। পরবর্তীকালে এই সম্প্রদায় সম্বন্ধেই স্বামী বিবেকানন্দ বলবেন: এটি একটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়, যার মধ্যে সম্প্রদায়ের গুণগুলি আছে কিন্তু দোষগুলি নেই। সম্প্রদায়ের গভীরতা ও নিষ্ঠা আছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা নেই, সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতা, গোড়ামি, অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ প্রমুখ নেতিবাচক দিকগুলি নেই। এই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রদায়ই রামকৃষ্ণ সংঘ।
" উদার ও নবীন ভাবে একটি সংঘ গড়তে হবে" জগজ্জননী শ্রীশ্রীঠাকুরকে শুধুমাত্র এই নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি। একইসঙ্গে ঠাকুরকে তিনি কিছু কিছু রত্নসদৃশ মানুষের মুখচ্ছবি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যাঁদেরকে স্তম্ভ করে এই সংঘ গড়ে উঠবে। সেই রত্নসদৃশ মানুষগুলির মধ্যে নরেন, রাখাল, শরৎ, শশী প্রমূখ ভবিষ্যতের সন্ন্যাসীবৃন্দ যেমন আছেন,তেমনি আছেন নাগমশাই, মাস্টারমশাই, পূর্ণচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ গৃহী শিষ্যবৃন্দ।
আজ যাকে আমরা রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন নামক দুটি যুগ্মসংস্থা হিসেবে জানি, তাদের দুটিকে নিয়েই বর্তমান পৃথিবীর রামকৃষ্ণ সংঘ। এই সংঘই সেই উদার, সাম্প্রদায়িকতা-বিহীন, নবীন সম্প্রদায়---যাকে গড়ে যাওয়ার আদেশ শ্রীরামকৃষ্ণ জগজ্জননীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন এবং এরপর দক্ষিণেশ্বর-পর্ব থেকেই যিনি সেই সংঘ নিজের হাতে তৈরি করার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন।
জগজ্জননীর কাছ থেকে এই নির্দেশ লাভের পর এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতিদিন আকুল ভাবে তার ভাবী শিষ্যদের জন্য কেঁদেছেন: "ওরে তোরা কে কোথায় আছিস আয়, আমি যে তোদের না দেখে থাকতে পারছি না।" মা কালীর দর্শন লাভের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন ব্যাকুল ভাবে কেঁদেছেন, ভাবীসংঘের এই চিহ্নিত শিষ্যবৃন্দের জন্য তাঁর ক্রন্দন ব্যাকুলতায় তার চেয়ে কম ছিল না।
তাঁর এই ব্যাকুল আহ্বানেই সম্ভবত কলকাতার শিক্ষিত যুবকের দল একে একে তাঁর পদপ্রান্তে এসে উপস্থিত হতে থাকেন--- শ্রীঅরবিন্দের মতে, যে ঘটনাটি থেকেই ভারতের নবজাগরণেরও সূচনা ।
শ্রীরামকৃষ্ণ প্রথম থেকেই সেই যুবক বৃন্দকে তাঁর অপার্থিব ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে ফেলেন।এবং এইভাবেই সেই যুবকবৃন্দ তাঁদেরও অজ্ঞাতসারে ভবিষ্যতের সংঘমালিকায় গাঁথা হয়ে যান।
একই সঙ্গে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ সঙ্ঘের নেতা এবং সংঘজননীও। নহবতের নিভৃত ঘেরাটোপে সেই সংঘ জননী লোক চক্ষুর আড়ালে, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের অদৃশ্য অঙ্গুলীহেলনে কখন তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সন্তানদের আপন সন্তানরূপে বরণ করে নিয়েছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ-পরিবারকে নিজেরই পরিবার করে তুলেছেন,এককথায় ভবিষ্যতের "সংঘজননী" হয়ে উঠেছেন--- তা বোধ হয় তিনি সেইসময় বুঝতে পারেননি। সুস্পষ্টভাবে বুঝেছেন ঠাকুরের দেহত্যাগের পরে, যখন তিনি দৃঢ় স্বরে বলেছেন:" ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে সকলেই আমার সন্তান", "পাপী তাপীদের ভার আমরা নেব না তো কারা নেবে?" "ঠাকুর কি শুধু রসগোল্লা খেতেই এসেছিলেন?"
ঠিক একই সময়ে শিষ্যবৃন্দের মধ্য থেকেও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যতের সংঘনেতা। তিনি নরেন্দ্রনাথ, নরশ্রেষ্ঠ। ঠাকুরের ভালবাসা ও আস্থারও তিনি শ্রেষ্ঠতম ও যোগ্যতম ভাগীদার। প্রতিভায় শ্রেষ্ঠ, আধ্যাত্মিকতায় শ্রেষ্ঠ, গান- বাজনা- মনীষা সবেতে শ্রেষ্ঠ, সর্বোপরি শ্রেষ্ঠ ভালোবাসায়, স্বার্থত্যাগে , নেতৃত্বশক্তিতে। তিনি ভবিষ্যতের স্বামী বিবেকানন্দ।।
তাই লেডি মিন্টো যখন বেলুড় মঠ দর্শন এসেছিলেন , তখন মহাপুরুষ মহারাজ তাঁকে বলেছিলেন: স্বামী বিবেকানন্দ নন, শ্রীরামকৃষ্ণই বেলুড় মঠসহ সমগ্র রামকৃষ্ণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা।
তাহলে স্বামী বিবেকানন্দের কি ভূমিকা? তাঁরও ভুমিকা অনন্য। যেমন শ্রীরামকৃষ্ণকে বাদ দিলে এই সংঘ আমরা কল্পনা করতে পারি না--- কারণ তিনিই হলেন এই সংঘের উৎস ও পরিকল্পক ,তেমনি স্বামী বিবেকানন্দকে বাদ দিয়ে এই সঙ্ঘকে ধারণা করা অর্থহীন। কারণ, এই সংঘের আদর্শ, বাস্তব রূপ, ভবিষ্যৎ কর্তব্য ও উপযোগিতা ---এইগুলি শ্রীরামকৃষ্ণ দেহত্যাগের আগে একমাত্র তাঁকেই বিশেষ করে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং বারবার স্বামী বিবেকানন্দর জীবন ও কর্ম থেকে ভবিষ্যতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে, শ্রীরামকৃষ্ণ এই সংঘকে যে অনন্য উদারতা ও গভীরতায় মন্ডিত দেখতে চেয়েছেন, তা স্বামীজিই একমাত্র সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি ছাড়া আর যিনি সেটি বুঝেছেন তিনি হলেন সংঘজননী শ্রীমা সারদা দেবী, আধ্যাত্মিকতায় যিনি একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণেরই সমতুল এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অপর প্রতিমা।
রামকৃষ্ণ মঠের প্রকৃত সূচনা শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের ঠিক পরেই বরানগর মঠে---যদিও "রামকৃষ্ণ মঠ" নামটি প্রচলিত হয়ে উঠেছে আরো অনেক পরে।
১৮৯৩ এর জুলাই-অগাস্ট মাস থেকে ১৮৯৬ সালব্যাপী স্বামী বিবেকানন্দের পাশ্চাত্য জীবনের প্রথম পর্ব। বিদেশে খ্রিস্টীয় চার্চ এবং অন্যান্য সংগঠন দেখে স্বামীজীর মনে দৃঢ় ধারণা জন্মে, শ্রীরামকৃষ্ণ যে তাঁকে বারবার করে বলে গেছিলেন তাঁর গুরুভাইদের সবাইকে একত্র করে ভালবাসা দিয়ে এক জায়গায় বেঁধে রাখতে অর্থাৎ সঙ্ঘবদ্ধ করে রাখতে, সেই সংঘের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা আধুনিক যুগে কত বেশী।
তাই "পাশ্চাত্য বিজয়" শেষে ভারত তথা কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিতপরেই তিনি তাঁর গুরুদেবের স্বপ্নদৃষ্ট সংঘকে গুরুদেবের নামেই প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৮ ৯৭ তারিখে তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১ মে ১৮৯৭ তারিখে তিনি বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী ও গৃহি অনুরাগীদের মিলিত একটি সভায় রামকৃষ্ণ মিশনের অনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেন।
সংঘের সূচনা বীজাকারে হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরে, সেই বীজ ক্রমশ চারারূপে বড় হয়েছে শ্যামপুকুর এবং কাশীপুরে, ঠাকুরের জীবনের অন্ত্যলীলা পর্বে। কিন্তু বাস্তব জগতে তার প্রথম দৃশ্যমান রূপ বরানগর মঠে।
"মঠ" আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও তা প্রশাসনিক দিক থেকে "স্ট্রাকচার্ড" বা গোছালো হয়ে ওঠে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠার পর। স্বামীজীর জীবদ্দশাতেই ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে "রামকৃষ্ণ মঠ" আইনগতভাবে একটি ট্রাস্ট হিসাবে রেজিস্ট্রি-কৃত হয় এবং স্বামীজীর দেহত্যাগের সাত বছর পর ১৯০৯ সালে "রামকৃষ্ণ মিশন" আইনগতভাবে একটি সোসাইটি রূপে রেজিস্ট্রি-কৃত হয়। উদ্দেশ্য হিসাবে যদিও ঠিক হয় যে, রামকৃষ্ণ মঠ প্রধানত আধ্যাত্মিক কর্মে লিপ্ত থাকবে এবং রামকৃষ্ণ মিশন বিশেষভাবে নিযুক্ত হবে সেবা মূলক কর্মে, বাস্তব ক্ষেত্রে মঠ ও মিশনের কার্যাবলীর এই দুটি ভাগ সাধারণত একাকার হয়ে যায়। এর কারণ, রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শ অনুযায়ী মানুষের সেবাও ঈশ্বরেরই আরাধনা এবং ঠাকুরঘরের পূজা যেমন পূজা, প্রতিটি কাজও তেমনি পূজা।
রামকৃষ্ণ মঠ শুধুমাত্র সাধু-ব্রহ্মচারীদের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশন সন্ন্যাসী ও গৃহীর সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান, যাঁরা সকলেই শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদাদেবী ও বিবেকানন্দের আদর্শকে মিশনের ভিত্তি ও নিয়ামক বলে গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু সূচনার আগেও সূচনা আছে। ১ মে, ১৮৯৭ তারিখে বলরাম মন্দিরে স্বামীজি যে সভাটির মাধ্যমে রামকৃষ্ণ মিশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন, এই সভা শুরুর একটু আগেই স্বামীজি বলেন: শ্রীশ্রীমায়ের কোন থাকার নির্দিষ্ট জায়গা নেই, তাঁর ভরণপোষণেরও কোন নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। সঙ্ঘপ্রতিষ্ঠার জন্য যে স্থায়ী তহবিল হয়েছে তা থেকে মাসিক কিছু টাকা আমি মায়ের ভরণপোষণের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে চাই। সকলেই স্বামীজীর এই প্রস্তাবকে সমর্থন করলে স্বামীজী তখন বলেন:" তাহলে তোমরা বলো প্রতি মাসে মাকে কত টাকা দেওয়া যায়?" তখন কেউ কেউ বললেন: মাসে দু টাকা ,কেউ বললেন ৫ টাকা বা ৭ টাকা, দশ টাকার উপরে কেউ উঠতে পারলেন না; কারণ তিনি ব্রাহ্মণের বিধবা ও একা মানুষ, এর বেশি তাঁর কি প্রয়োজন! স্বামীজীর মুখটা তখন দুঃখে কালো হয়ে গেল। তিনি আবেগ-দীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন: "শ্রীশ্রীমাকে কি তোমরা শুধু তোমাদের গুরুপত্নী, শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিনী বলেই মনে করো? মা অতটুকু নয় রে ভাই। মা হচ্ছেন আদ্যাশক্তি, জগজ্জননী, এই যে সংঘ হতে যাচ্ছে, মা এই সংঘের রক্ষাকর্ত্রী পালনকারিণী, মা এই সংঘের সঙ্গজননী। মাসে ২৫ টাকার কমে কিছুতেই দেওয়া চলবে না। "
এইভাবে সারদাদেবীকে সংঘের জননী রূপে বরণ করে, সংঘজননীর শ্রীচরণে সঙ্ঘনেতার শ্রদ্ধার্ঘ্য-অর্পণের মাধ্যমে রামকৃষ্ণ মিশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা।
🙏🏼🪷🙏🏼