01/09/2026
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের একমাত্র জীবনসঙ্গী ধর্মপত্নী রুক্মিণী
চিরন্তন সনাতন ধর্মে যতজন মহাপুরুষ জন্মেছেন তারমধ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ কালিমালিপ্ত করেছেন তারই ভক্তরা। সনাতন ধর্মে পবিত্র বেদ এক পতি-পত্নীর ব্রত থাকার কথা বলে এমন কি পত্নী ব্যতীত অন্য নারীর কথা চিন্তাতেও না আনার কথা বলে পবিত্র বেদ।সনাতন ধর্মাবলম্বী দম্পতির বিবাহযজ্ঞের প্রতিজ্ঞাই তার প্রমাণ -
এই সভামধ্যে প্রতিজ্ঞা করছি তুমি শুধু আমার হবে, অন্য দ্বিতীয় কারো কথা বলা তো দূরে থাক চিন্তাও করবেনা-অথর্ববেদ ৭.৩৮.৪।
আর তা উল্লঙ্ঘন করেনি কোন মহাপুরুষ,মাতা সীতাকে যখন অপহরণ করা হয় তখন শ্রীরাম চাইলে নতুন পত্নী গ্রহন করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা না করে বিবাহ যজ্ঞের প্রতিজ্ঞা পত্নীধর্ম বাস্তবায়ন করেছেন। রাবণের মতো রাক্ষসরুপী জানোয়ারের থেকে গুটিকয়েক বনবাসী নিয়ে বীরের মতো উদ্ধার করেছেন মাতা সীতাকে,এইজন্যই শ্রীরামকে উত্তম পুরুষ বলা হয়। যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ ও তাই সমগ্র জীবন লড়াই করেছেন অত্যাচারী রাজাদের বিরুদ্ধে। রাজধর্ম-সমগ্র বিশ্বের ন্যায়ের শাসন, আত্মবিজ্ঞান ব্রহ্মবিজ্ঞান ছিল যার ব্রত।
হিমালয় পর্বতের পার্শ্বে ১২ বছর কঠোর তপস্যা করলেন শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতি রুক্মিণী দেবী তাঁদের ব্রহ্মচর্য পালনের অর্জিত গুণে তাঁদের ঘর আলো করে এল সনৎকুমারের ন্যায় তেজস্বী পুত্র শ্রী প্রদ্যুম্ম-মহাভারত সৌপ্তিকপর্ব ১২/২৯,৩০
আর তিনি নাকি বৃন্দাবনে লীলা করিয়ে বেড়িয়েছে অথচ শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন ত্যাগ করেছে ১২ বছর বয়সে। কখনো ফিরেই নি আর বৃন্দাবনে তাহলে তথাকথিত লীলা কখন করলো। এই অনর্থের সূচনা আমাদের এক ভ্রমের গ্রহে নিয়ে আসছে আজ।
বাঙালি ভক্তিসাহিত্যে প্রেমের প্রতীক হিসেবে রাধাকৃষ্ণ যুগল বঙ্গ সংস্কৃতিতে স্থান অধিকার করেছে কিছু কাল যাবৎ এর ইতিহাস বেশি দূরের না।
চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস প্রভৃতি কবির পদাবলি থেকে শুরু করে জয়দেবের গীতগোবিন্দ, পরবর্তীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলন সবকিছু মিলিয়ে রাধাকৃষ্ণ যুগল বাংলার বৈষ্ণবদের হৃদয়ে আসনে বসে আছে। ইসকনসহ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় আজও এই প্রেমকাহিনীকেই সর্বোচ্চ আদর্শ বলে মান্য করে।
কিন্তু এই রাধাকৃষ্ণ-ভাবনা সর্বভারতীয় বা সনাতন শাস্ত্রীয় ইতিহাস অনুযায়ী নয় বরং নব্য বিকৃত পুরাণসমূহ ব্যতীত প্রামাণ্য শাস্ত্রে কোথাও নেই । ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষত শ্রীসম্প্রদায় ও মাধ্বসম্প্রদায়ে, রাধার কোনো উল্লেখযোগ্য স্থান নেই। সেখানে মহান যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের চিরসঙ্গিনী হিসেবে পূজিতা হন রুক্মিণী।মাধ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে কৃষ্ণ-রুক্মিণী প্রেম মাধ্বাচার্যের দ্বৈত বেদান্ত দর্শন মূলত ভক্তি ও ভগবানের ভিন্নতাকে জোর দেয়।
এই দর্শনে রুক্মিণীকে কৃষ্ণের শাশ্বত পত্নী ও শক্তিরূপা হিসেবে মানা হয়। বদিরাজ তীর্থ ১৫শ শতকে এই ভাবনাকে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছিলেন তার “রুক্মিনীশ বিজয়” কাব্যে। এখানে রুক্মিণী-কৃষ্ণের প্রেমকে মহিমান্বিত করা হয়েছে, এবং এই মতবাদে তাদের যুগলকে আদর্শ ভক্ত-ভগবান সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বন্দনা করা হয়েছে।
এই ধারায় রাধাকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, কারণ তিনি ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণের পত্নী নন, বরং সাহিত্য ও কল্পনার ফসল।দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের উপাসনায় আজও দক্ষিণ ভারতে কৃষ্ণ-রুক্মিণী যুগলই পূজিত হন। মহারাষ্ট্রের পান্ধরপুরে এখানে কৃষ্ণ পূজিত হন বিঠোবা নামে, আর তার সঙ্গে সর্বদা বিরাজ করেন রুকমাই বা রুক্মিণী।
শ্রীসম্প্রদায় (রামানুজাচার্য প্রচলিত) ও মাধ্বসম্প্রদায় উভয় ক্ষেত্রেই কৃষ্ণ-রুক্মিণীর যুগল ভক্তিধারার কেন্দ্রে। এই উপাসনায় রুক্মিণী কেবল পত্নী নন; তিনি ভক্তের পক্ষে ঈশ্বরের করুণা লাভের অন্যতম মাধ্যম। এমনকি বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যে ও রুক্মিণী। বাংলায় আজ কাল্পনিক রাধার ছায়ায় রুক্মিণী প্রায় বিস্মৃত হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন অন্য কথা বলে। পাহাড়পুরের প্রত্নখননে ৬ষ্ঠ–৭ম শতকে কৃষ্ণ-রুক্মিণীর যুগল মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলার প্রাচীন সমাজে রুক্মিণী পূজা প্রচলিত ছিল। দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরে স্থাপিত যুগল মূর্তিও মূলত কৃষ্ণ-রুক্মিণীর রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু মধ্যযুগীয় সাহিত্যের প্রভাবে ও লোকসমাজের ব্যাখ্যায় সেগুলি আজ রাধাকৃষ্ণ মূর্তি হিসেবে পরিচিত। রাধার আবির্ভাব ও প্রভাব রুক্মিণীর এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায় মধ্যযুগীয় রসসাহিত্যের কারণে। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জয়দেবের মতো কবিরা কৃষ্ণকে রাধার সাথে মিলিয়ে এমন এক প্রেমকাহিনি গড়ে তোলেন যা ভক্তিরসের অশ্লীল চূড়ান্ত প্রকাশ।যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের মতো এক জগৎশ্রেষ্ঠ যোগীকে এই কাল্পনিক সাহিত্যরস কালিমালিপ্ত করেছে। মধ্যযুগে চৈতন্য মহাপ্রভুর নেতৃত্বে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারায় রাধাকে কৃষ্ণভক্তির কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়। ভক্তি মানে রাধার প্রেমানুভূতি কৃষ্ণ মানে ভগবানের অনন্ত লীলা। এর ফলে বাংলার মানুষের মনে রাধা হয়ে ওঠেন কৃষ্ণপ্রেমের প্রতীক, আর রুক্মিণী ধীরে ধীরে বিস্মৃত হন।
সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক বৈপরীত্যে রুক্মিণী ঐতিহাসিক, শাস্ত্রসম্মত, বৈদিক ও কৃষ্ণের পত্নী । তিনি সংসারধর্মের প্রতীক, শাশ্বত পত্নীর রূপ, ভক্তের আদর্শ। আর রাধা হলো সাহিত্যিক কল্পনার সৃষ্ট এক চিরন্তন প্রেমিকা, যিনি বঙ্গ বৈষ্ণবদের তথাকথিত ভক্তিরসের প্রতীক। তিনি ঐতিহাসিক চরিত্র নন, কিন্তু বঙ্গ ভক্তিসাহিত্যে প্রেমের সর্বোচ্চ স্থান পেয়েছেন। রাধা বাঙালি বৈষ্ণবদের কাল্পনিক অমর প্রেমিকার প্রতীক যিনি সাহিত্য ও ভক্তিরসে আরাধ্য। কিন্তু রুক্মিণী ভারতীয় ইতিহাসে এক চিরন্তন দেবী, যিনি কৃষ্ণের পত্নী, শক্তি ও আদর্শএবং মহিয়সী নারীদের অনুপ্রেরণা। বাংলায় রাধা-ভাবনার প্রবল প্রভাবের কারণে আমরা বিস্মৃত হয়েছি এই ঐতিহাসিক সত্যকে,যে কৃষ্ণ-রুক্মিণী যুগলই বহু প্রাচীনকাল ধরে ভারতীয় ভক্তির কেন্দ্রের আদর্শ ছিলেন। আজ রুক্মিণী পুনরাবিষ্কারের প্রয়োজন, যাতে আমরা বুঝতে পারি ভক্তিআদর্শে ঐতিহাসিক গভীরতা কেবল কাল্পনিক রাধাতেই সীমাবদ্ধ নয় এর থেকে শ্রেষ্ঠ আদর্শ মাতা রুক্মিণী যিনি সমগ্র জীবন ব্রহ্মব্রত এবং সাংসারিক সেবায় কাটিয়ে দিয়েছেন সেইহোক আমাদের সমগ্র হৃদয় মন্দিরে পূজিত তবেই কলুষমুক্ত হবে জগৎ শ্রেষ্ঠ যোগী শ্রীকৃষ্ণ। মহাভারত তাই নির্দেশ দেয় আমাদের-
যেমন শ্রীরামের সহিত দেবী সীতা, তেমন শ্রীকৃষ্ণের সহিত দেবী রুক্মিণী। -মহাভারত, উদ্যোগপর্ব ১১৭/১
কোন বিবাহিত নারী চাইবেনা তার স্বামীর সাথে অন্য নারীর প্রেমকাহিনী রচিত হোক এটা অবৈধ সম্পূর্ণ। এইসমস্ত মুখরোচক কল্পিত কাহিনি পরিহার করাই ধর্ম হবে আমাদের। এই ভয়াবহ করালগ্রাস থেকে তথাকথিত সাহিত্যিকরা আমাদের মহান চরিত্রের আদর্শ শ্রেষ্ঠ পুরুষদের ও বাদ দেয়নি। একটা মিথ্যা বার বার প্রচারিত হলে তা যেকোন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু সত্য শাস্ত্র ধর্ম কিন্তু বারংবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সত্য যে কোন কালে প্রকাশিত হবেই আজ বা কাল ঠিক এভাবেই।
Reason is the torch of truth.History stands on evidence, not on imagination. The eternal bond of Krishna and Rukmini is rooted in scriptures.Fiction may inspire hearts, but truth sustains Dharma.
✍️ সজীব বিদ্যার্থী
বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক