09/03/2025
৯ম রমযানের পাঠ-
জবান হেফাজত : জবান সংযমী হলে জীবন সংযমী হয়।
★কুরআনুল কারীম থেকে-
১. সবকথাই পর্যবেক্ষণ করা হয়-
مَّا يَلۡفِظُ مِن قَوۡلٍ إِلَّا لَدَيۡهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তার নিকট একজন তীক্ষ্ণদৃষ্ট বিশিষ্ট পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকে।"
—(সূরা ক্বাফ ৫০:১৮)
২. ভালো কথা বলার নির্দেশ-
وَقُل لِّعِبَادِي يَقُولُواْ ٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُۚ إِنَّ ٱلشَّيۡطَٰنَ يَنزَغُ بَيۡنَهُمۡ
"আর আপনি আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন সদ্ব্যবহারপূর্ণ কথা বলে। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করে।"
—(সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৫৩)
৩. মিথ্যা ও গীবত থেকে বেঁচে থাকা-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا ٱجۡتَنِبُوا كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক অনুমান থেকে বেঁচে থাকো, কেননা কিছু অনুমান গুনাহ। এবং পরস্পর গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং কেউ কারও গীবত করো না।"
—(সূরা হুজুরাত ৪৯:১২)
৪. নরমভাবে কথা বলা-
وَقُولُواْ لِلنَّاسِ حُسۡنٗا
"আর তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বলো।"
—(সূরা বাকারা ২:৮৩)
৫. অহেতুক কথা না বলা-
وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَنِ ٱللَّغۡوِ مُعۡرِضُونَ
"(মূমিন) যারা অনর্থক বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।"
—(সূরা মু’মিনুন ২৩:৩)
৬. অজানা বিষয়ে কথা বলতে নিষেধাজ্ঞা -
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কথা বলবে না।
(সূরা ইসরা : ৩৬)
★হাদীসে নববী থেকে :
১. নাযাতের পথ-
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا النَّجَاةُ؟ قَالَ: أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
উকবা ইবন আমের (রাযি.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মুক্তির পথ কী? তিনি বললেন, তোমার জবান সংযত রাখো, তোমার ঘরেই অবস্থান করো এবং তোমার পাপের জন্য কাঁদো।
(তিরমিজি: ২৪০৬)
২. উত্তম মুসলিম কে-
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الْمُسْلِمِينَ أَفْضَلُ؟ قَالَ: مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
আবু মুসা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “উত্তম মুসলিম কে?” তিনি বললেন, “যার জবান ও হাত থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।”
(বুখারি: ১১, মুসলিম: ৪২)
৩. জান্নাতের নিশ্চয়তা-
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
সাহল ইবন সা‘দ (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার কাছে তার মুখ ও যৌনাঙ্গের হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।”
(বুখারি: ৬৪৭৪)
৪. কথা বলার পরিণাম-
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللَّهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَرْفَعُهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ، وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ
আবু হুরাইরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “একজন বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বলে, যা তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়, কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন। আবার একজন বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা বলে, যা সে গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু এর ফলে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়।”
(বুখারি: ৬৪৭৮, মুসলিম: ২৯৮৮)
★ সালাফের ভাষ্যে:
১. কথার পরিমাণ নির্ধারণ করা চাই-
عَنْ عَمْرِو بْنِ العَاصِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: الْكَلَامُ كَالدَّوَاءِ؛ إِنْ أَقَلَلْتَ مِنْهُ نَفَعَ، وَإِنْ أَكْثَرْتَ مِنْهُ قَتَلَ
আমর ইবন আস (রাযি.) বলেছেন, “কথা ওষুধের মতো; কম বললে উপকার করে, বেশি বললে ক্ষতি করে।”
(রবীউল আবরার ২/১৩৬)
২. জবান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা-
وَعَنْ الحَسَنِ قَالَ: مَا عَقَلَ دِينَه مَن لَمْ يَحْفَظْ لِسَانَه
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার জবান সংযত রাখতে পারে না, সে তার দ্বীন বোঝেনি।”
(ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন ৩/১১১)
৩. অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বাঁচা-
عَنْ حُمَيْدِ بْنِ هِلَالٍ، قَالَ: قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو: دَعْ مَا لَسْتَ مِنْهُ فِي شَيْءٍ، وَلَا تَنْطِقْ فِيمَا لَا يَعْنِيكَ، وَاخْزُنْ لِسَانَكَ كَمَا تَخْزُنُ وَرَقَكَ
হুমায়দ ইবন হিলাল (রহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আমর (রাযি.) বলেছেন, “যে বিষয়ে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই, তা থেকে দূরে থাকো। যা তোমার জন্য প্রয়োজন নয়, সে বিষয়ে কথা বলো না। এবং তোমার জবানকে ঠিক সেভাবে সংরক্ষণ করো, যেমন তুমি মূল্যবান দলিল সংরক্ষণ করো।”
(ইবনে আবি শাইবা: ৩৫৮৫৮, হিলিয়াতুল আওলিয়া ১/২৮৮)
৪. নীরবতার শক্তি-
قَالَ أَبُو اللَّيْثِ السَّمَرْقَنْدِيُّ: اعْلَمْ أَنَّ الإِنْسَانَ لَا يَغْلِبُ الشَّيْطَانَ إِلَّا بِالسُّكُوتِ؛ فَيَنْبَغِي لِلْمُسْلِمِ أَنْ يَكُونَ حَافِظًا لِلِسَانِهِ، حَتَّى يَكُونَ فِي حِرْزٍ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَيَسْتُرَ اللَّهُ عَلَيْهِ عَوْرَتَهُ
আবুল লায়স সামরকন্দি (রহ.) বলেছেন, “জেনে রাখো, মানুষ শয়তানকে পরাজিত করতে পারে না, যদি না সে নীরব থাকে। তাই মুসলিমের উচিত তার জবান সংযত রাখা, যাতে সে শয়তানের হাত থেকে নিরাপদ থাকতে পারে এবং আল্লাহ তার গোপন দোষ ঢেকে দেন।”
(তানবীহুল গাফিলীন, পৃষ্ঠা: ২১২)
৫. কথা বলার আগে চিন্তা করা-
قَالَ الشَّافِعِيُّ: إِذَا أَرَادَ الْكَلَامَ فَعَلَيْهِ أَنْ يُفَكِّرَ قَبْلَ كَلَامِهِ، فَإِنْ ظَهَرَتِ الْمَصْلَحَةُ تَكَلَّمَ، وَإِنْ شَكَّ لَمْ يَتَكَلَّمْ حَتَّى تَظْهَرَ
ইমাম শাফিয়ী (রহ.) বলেছেন, “যদি কেউ কথা বলতে চায়, তবে তার আগে চিন্তা করা উচিত। যদি কল্যাণ দেখতে পায়, তবে বলবে; আর যদি সন্দেহ থাকে, তবে না বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।”
(আল-আযকার, নববী, পৃষ্ঠা: ৩৩২)
★আমাদের করনীয়-
জবানের কারণেই অনেক ফিতনা ও ঝগড়া বিবাদের সূচনা হয়। তাই সর্বাবস্থায় জবানের হেফাজত করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয়, অহেতুক এবং অর্থহীন কথাবার্তা থেকে সবসময় বেঁচে থাকতে হবে। জবানের লাগাম টেনে ধরতে পারলে জীবনের লাগামও টেনে ধরা যাবে এবং জীবনের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের জবানের হেফাজত করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
#রমযান_রিমাইন্ডার