শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাই একজন আধ্যাত্মিক সিদ্ধ মহাপুরুষ। পরমেশ্বরের অবতার হিসেবে ভক্তদের কাছে পূজিত হোন। সিদ্ধ মহাপুরুষ শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাইর আবির্ভাব হতেই রশ্মিপাত ঘটেছে অন্ধকারবৃত এ জগতে। তিনি ভক্তিবাদ প্রচার করেছেন। আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর পূর্বে শ্রীহট্ট অঞ্চলে সনাতন ধর্ম অন্ধকারাচ্ছন্ন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী গুরুজী নিত্যানন্দ গোঁসাই সনাতন ধর্মকে সেই বিপ
র্যয় থেকে রক্ষা করেছিলেন। সিদ্ধামহাপুরুষ ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাই চন্ডালেও সমান সম্মান করেছিলেন। ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাই’র আবির্ভাব তিথি মাঘী শুক্লা ষষ্ঠী বা শীতল ষষ্ঠী অর্থাৎ শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজার পর দিন। এই উপলক্ষে প্রতি বৎসর প্রাগুক্ত সিদ্ধ আমলি তলায় ও শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী’র শ্রীধাম, হরিস্মরণে মেলা ও মহোৎসব হয়ে থাকে। উক্ত মহোৎসবের সজীবতা ও মধুরতা নীরস প্রাণেও জলন্ত উৎসাহের ও সুস্নিগ্ধ প্রেমের সঞ্চার করে থাকে।
ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাই সর্ব্ব ধর্মের প্রতি সম অনুরাগী ছিলেন। বর্তমানে যে সকল ধর্ম সমন্বয়ের ডঙ্কা সজোরে নিনাদিত হচ্ছে শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী গুরুজী গোসাই-ই সর্বাগ্রে তা করে গিয়েছিলেন। এইদেশে তখন খৃষ্টীয় ধর্ম প্রচলিত ছিল না। তাছাড়া আর সমুদয় ধর্মের অনুষ্ঠান করে তিনি দেখিয়েছিলেন ধর্ম সবই সত্য। নিজে কলমা পড়ে পীরের শিন্নির যাজকতা করতেও কুন্ঠিত হতেন না। তা দেখে সামাজিক ব্রাহ্মণগণ ঠাকুরবাণী’কে জাত্যান্তরিত করতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,
"ঈশ্বরের ধন্যবাদ যে বাক্যে মিশ্রিত
লোকে উচ্চারিলে কেন হবে গর্হিত"
এসব করে তিনি প্রথমে দিনারপুরের পরগণাধিপতি বুরহান উদ্দিন খাঁ চৌধুরীর সভায় তারপর শ্রীহট্টের মৌজদার আমীর উজির আলীর ও শেষে মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁর অটল ভক্তি ও অদ্ভুত যোগবল দেখিয়ে সপ্রমাণ করেছিলেন যে,
তাঁর ধর্ম পৃথিবীর কোনও ধর্ম অপেক্ষা ন্যূন ছিল না।
শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাই’র আচরণ নিষ্ঠাবান বৈষ্ণবের মতোই ছিল কিন্তু অনুদারতা ছিল না। তিনি বলতেন,
"সেই কৃষ্ণ সেই কালী সেই ত্রিলোচন,
উপাসনা পথে সব পন্থা সংস্থাপন ।।
যার যেই বিষয় সাধনে রুচি হয়,
সেই পথে পরমেশ্বর পাইবে নিশ্চয় ।।"
অর্থাৎ,"যেকোন মতেই ঈশ্বর প্রাপ্তি সম্ভব"
একদা সনাতন ধর্মকে আক্রমণ করিয়া প্রশ্ন করলে, তিনি নবাবকে বলেছিলেন-
“তব শাস্ত্রে নিরাকায় ঈশ্বর ভাবনা,
রসশূন্য জন্য তাহা মানিয়া ও মানি না
নিরাকারে শুষ্কভাব সাকারেতে প্রেম
উভয়ে তাৎপর্য্য যেন লৌহ আর হেম”
ঠাকুরবাণীর পিতার নাম হরিশ্চন্দ্র, নিবাস দিনারপুর। ঠাকুরবাণী যখন কিশোর বয়সে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। বাণী বয়ঃপ্রাপ্ত হলে, তাঁর মাতা ই যোগাড়যন্ত্র করে তাঁকে বিবাহ দেন। মাতা বিবাহ দিয়ে বধূ ঘরে আনলেন বটে, কিন্তু উদাসচিত্তে পুত্র কোন প্রকারেই কাজ কৰ্ম্ম দেখতেন না। কিঞ্চিৎ জমিজমা ছিল, মাতা ই তার “বিলিবন্ধন” করতেন।
কিছুদিন পর, ঠাকুরবাণী গৃহত্যাগ করে নানাস্থান ভ্রমণ করেন। শ্রীহট্ট শহরে উপস্থিত হলে তিনি পাগল বলে বন্দিশালে নীত হয়েছিলেন, কিন্তু ঠাকুরবাণীর বন্ধন পুনঃ পুনঃ মুক্ত হয়ে পড়ায় কাবারক্ষক বিস্মিত হন। তিনি এই অলৌকিকতা নবাবকে জ্ঞাপন করেন। শ্রীহট্টের নবাব এই সংবাদ অবগত হয়ে বাণীকে সিদ্ধপুরুষ জ্ঞানে অনেক অর্থদান করেন। তিনি সেই অর্থ পথে পথে বিতরণ করে সেখান থেকে চলে আসেন। শহরের লোকেরা ঠাকুরবাণী গুরুজী গোঁসাইর মহিমা জ্ঞাত হয়ে, তাঁকে অন্যত্র যেতে দিল না, তিনমাস কাল পরম যত্নে সেখানে বেঁধে দিল এবং অনেকেই তাঁর নিকট হতে মন্ত্রগ্রহণ করে কৃতাৰ্থ হলো।
শ্রীহট্ট শহর হতে ৪০ মাইল উত্তর পূর্বে জয়ন্তিয়া পাহাড় অবস্থিত। সেখানের একটি স্থান রুপনাথ। জনমানবহীন স্থানটি গভীর অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত ছিলো। সে কালে রাস্তাঘাটও ছিল না বললেই চলে। রূপনাথে পৌঁছানোটা ছিলো বেশ জটিল। কিন্তু শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী সেই দূর্গম অরণ্যের পথশ্রম তুচ্ছ জ্ঞান করে অবিলম্বে রূপনাথে পৌঁছালেন। জয়ন্তীয়াতে তিনি সাত দিন ছিলেন। সেখানে তিনি আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করে শিব শিব নাম কীর্ত্তনে মত্ত হয়ে থাকতেন। জনমানবহীন সেই ভীষণ অরণ্যে মহাদেবের মন্দিরে রাতে কেউ একাকি অবস্থান করতে সাহস পেতেন না। কিন্তু বাণী কি এসবে ভয় পাবেন? সেখানে তিনি একাকি ই অবস্থান করতেন। কারো নিষেধ আজ্ঞা শুনতেন না। এক রাতে তিনি পূজা করতে করতে অনাহার ও অনিদ্রায় অবসন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেই সময় হঠাৎ ঠাকুরবাণী স্বপ্নের মত দেখতে পেলেন স্বয়ং মহাদের তাঁর শিয়রে বসে তাঁর কানে একটি মন্ত্র প্রদান করে বললেন, “বাণী, পাগল শঙ্কঁরের সমীপে সত্বর উপস্থিত হও, তিনিই তোমাকে তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দিবেন।”
কিন্তু কে এই পাগল শঙ্কঁর? কোথায় বা তাঁর অবস্থান! কিছুই জানতেন না বাণী। তারপরও পাগল শঙ্কঁরের সন্ধানে বের হলেন তিনি।
পাগল শঙ্কঁরের অবস্থান তখন নবীগঞ্জে। দিবা-রাত্র উন্মাদের মত হরিনাম গান করে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ একদিন সকালে তিনি যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। তিনি একটি দোকানীর কাছে এসে অতি গম্ভীরভাবে একখানা কাপড় চাইলেন। তখন সকলে বিস্মিত হয়ে এর কারণ জিঙ্গাসা করলে তিনি বললেন, এতদিন আমার চারিদিকে মানুষ দেখতে পেতাম না। কিন্তু আজ একজন যথার্থ মানুষ আসছে। সুতরাং লজ্জা নিবারনের জন্য আমার বস্ত্রের প্রয়োজন।
পাগল শঙ্কঁর তখন বস্ত্র পরিধান করে বক্র নদীর তটে বসে বেশ ধীর ভাবে নাম জপ করতে লাগলেন। এমন সময় শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী ঝড়ের মত সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। আজন্ম অপরিচিত হলেও একে অন্যকে চিনতে পারলেন বেশ ভালোভাবেই। বাণী যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন; পাগল শঙ্কঁরও বাণীর ন্যায় মহাত্মার সঙ্গলাভে পরম সুখী হলেন। পাগল শঙ্কঁরও একজন পরম সিদ্ধপুরুষ ছিলেন। পাগল শঙ্কঁরের জন্মস্থান সতরশতী পরগণার বরাকপার গ্রামে।
পাগল শঙ্কঁরকে তখন শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী নিজের গুরু রূপে বরণ করেছিলেন। বাণী এবং পাগল শঙ্কঁর এরপর বিভিন্ন স্থানে যাত্রা করলেন এবং লীলা করে চললেন। ঠাকুরবাণী এক মাস কাল পাগল শঙ্কঁরের কাছে অবস্থান করেছিলেন। এই একমাস উভয়ে কেবল হরিনাম প্রসঙ্গে মত্ত থাকতেন। শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী এবং পাগলা শঙ্কঁর বহু স্থান ভ্রমন শেষে একসময় গঙ্গাস্নানের উপলক্ষে মুর্শিদাবাদ গমন করেন। সেখানেও বহু লীলা দেখান তাঁরা। একসময় নবাবের দরবারে গিয়ে উপস্থিত হোন তাঁরা এবং সেখানেও অলৌকিক লীলা প্রকাশ করেন।
নবীগঞ্জ এর "পথে পথে নানা ভঙ্গি নৰ্ত্তন কীৰ্ত্তন। পঞ্চদশদিনে পাইলা দর্শন।” —চরিত্র চিন্তারত্ন।
সেখান থেকে কণ্টকনগর, অম্বিক প্রভৃতি দ্বাদশ পাঠ পরিভ্রমণপূৰ্ব্বক নবদ্বীপে উপস্থিত হোন। তারপর, পাগলা শঙ্কঁর শ্রীবৃন্দাবনে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণীও পাগল শঙ্কঁরের সঙ্গী হওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন কিন্তু শঙ্কঁর তাতে সম্মত হলেন না। শঙ্কঁর উদাসী। বাণী গৃহী। গৃহীর কর্তব্য সংসার প্রতিপালন করা।
সেখান থেকে প্রত্যাগমন কালে পাগল শঙ্কঁর ও ঠাকুরবাণীর ‘বঙ্গাধিপতি যবনরাজের’ সাথে সাক্ষাৎ হয়; তিনি তাঁদের দৈবশক্তির পরিচয় পেয়ে, ঠাকুরবাণীকে সম্মান করে শ্রীহট্টে প্রেরণ করলেন এবং পাগল শঙ্কঁর বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।
“শ্রীহট্টাধিপের স্থানে এক পত্ৰ দিয়া বাণীকে পাঠাইলা দেশে সম্মান করিয়া।” —চরিত্র চিন্তারত্ব।
তারপর, প্রসিদ্ধ বঞ্চিত ঘোষ, অজ্ঞান ঠাকুর, মালী ধৰ্ম্মদাস ও অনেক মহাপুরুষ, সাধু, পীর, আউলিয়ার সহিত ঠাকুরবাণীর পরিচয় হয়।
একদা বাণীর এক শিষ্য কালীপূজার আয়োজন করেন। তার নিতান্ত ইচ্ছা হলো, বাণীকে দিয়ে পূজা করাবেন। কিন্তু একথা পূৰ্ব্বে বাণীকে বলা হয় নি। যেদিন পূজা হবে সেদিনই তা মনে হলো এবং তার প্রাণ বড়ই আকুল হয়ে উঠলো। সিদ্ধপুরুষ শিষ্যের আকুলতা নিজ প্রাণে অনুভব করতে পারলেন, তাঁর মনও চঞ্চল হয়ে উঠল ও অনতিবিলম্বে তিনি শিষ্যালয়ে উপনীত হলেন;
“দৈববলে জানিয়া সেবকের মনোরথ।
চারিদণ্ডে গেলা এক দিবসের পথ।
শিষ্যালয়ে উত্তরিয়া কল্যাণে তাহার।
কালীপূজা করিয়া দেখাইলা চমৎকার।
নভুত নভবিষ্যতি—জীবের অসাধ্য।
প্রতিমাকে ভক্ষাইল পূজার নৈবেদ্য।” — চরিত্র চিন্তারত্ব।
সিদ্ধপুরুষ ঠাকুরবাণী কি শক্তিবলে একদিবসের পথ চারিদণ্ড সময়ের মধ্যে গিয়েছিলেন, সেই আলোচনা নিম্প্রয়োজন। “আমরা প্রকৃত মানুষ, তা কি রূপে বুঝবো?” আর শিশু প্রকৃতি সরল ভক্তের আবদার রক্ষার্থ চিন্ময়ী শক্তি, জড় প্রতিমার বিকাশ প্রাপ্ত হয় কিনা এবং সেই প্রতিমা নৈবেদ্য গ্রহণ করিতে পারে কি না, তাহাও আমরা সংসারের মায়ামোহিত মানুষ কিরূপে বুঝবো?
ঠাকুরবাণী'র অনন্ত ও রাজেন্দ্র নামে দু'জন পুত্র ছিলেন। পুত্ররা যখন উপযুক্ত হয়েছেন, সেই সময়ে অকস্মাৎ একদিন পাগলশঙ্কর বাণীগৃহে উপস্থিত হলেন। দুইজনে বহু কথাবার্ত্তা হলো; পাগলশঙ্কর বিদায় নিয়ে পুনঃ তীর্থ যাত্রা করলেন; বহুতীর্থ দর্শনান্তর কুরুক্ষেত্রে গেলে তাঁর দেহপাত হলো। সিদ্ধপুরুষ বাণীর নিৰ্ম্মল হৃদয়-দর্পণে ঐ ঘটনার ছায়াপাত হলো। ইহা তাঁর জ্ঞানগোচর হলে, আর গৃহে থাকতে তাঁর ইচ্ছা রইলো না, তিনি নিজ পুত্রদ্বয়কে ডেকে মনোভাব ব্যক্ত করলেন ও এক মহামহোৎসবের আয়োজন করতে বললেন। পিতৃবাক্য শ্রবণে পুত্রেরা অত্যন্ত অধীর হয়ে পড়লে তিনি তাঁদেরকে আশ্বাস দিয়ে বললেন— “আমি সময়ে সময়ে তোমাদের দেখা দিব, তোমরা হরিপদে মনস্থির রেখে স্বচ্ছন্দে সংসার যাত্রা নির্বাহ কর।”
মহামহোৎসবের আয়োজন হলো; অবিরত কীৰ্ত্তন চলতে লাগলো, যখন কীৰ্ত্তনে সকলে মত্ত, তখন হঠাৎ ঠাকুরবাণী অদৃশ্য হলেন, তাহাকে আর পাওয়া গেল না। পুত্ৰগণ পিতার মৃত্যু কল্পনা করে শোকাভিভূত হলেন। সেই রাত্রে রাজেন্দ্র স্বপ্নে দেখলেন, পিতা বলছেন,
“রাজেন্দ্ৰ! ভ্রান্তধারণা ত্যাগ করো, আমি মরি নাই, আমার শ্রাদ্ধ করিও না। তবে লোকনিন্দা পরিহারের জন্য কিছু করা কৰ্ত্তব্য, আমার উদ্দেশ্যে কিছু চিড়া, গুড়, কদলী, দধি ও দুগ্ধ দিও। এসব দ্রব্য গোপালের কাছে ভোগ দিয়া প্রসাদস্বরূপ আমাকে প্রদান করিও; ইহাই যথেষ্ট।” পুত্ৰগণ পিতার শ্রাদ্ধ না করে, পিতার উদ্দেশ্যে গোপালের প্রসাদ মাত্র নিবেদন করে দিলেন।
কালক্রমে, রাজেন্দ্র’র হরিরাম নামে একটি পুত্র জাত হয়, জন্মের ৬ষ্ঠ দিনে ষষ্ঠীপূজা উপলক্ষে যখন আত্মীয় স্বজন সকলে সমবেত হয়েছেন, তখন তারা দেখতে পাইলেন যে এক যোগীপুরুষ ধীরে ধীরে আগমন করছেন। যোগী আর কেহ নহেন—ঠাকুরবাণী। পুত্রেরা এবং অন্যান্য সকলে বহুকাল পরে তাকে পেয়ে পরম আনন্দে বসতে আসন দিলেন; কিন্তু তিনি না বসে সূতিকালয়ে গেলেন। তাঁর ইঙ্গিতে বধূ কর্তৃক শিশু তৎসমীপে আনীত হলে, তিনি শিশুর মাথায় দক্ষিণ পদাঙ্গুষ্ঠ স্থাপন করে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন; কোথায় গেলেন, আর কেহ খুঁজে পেলো না। এই হরিরামের পৌত্র, ঠাকুরবাণীর বৃদ্ধ প্রপৌত্র জয়গোবিন্দের মনে হয়েছিলো যে ঠাকুরবাণীর শ্ৰাদ্ধাদি হয় নি; ইহা শাস্ত্রসঙ্গত নয় এবং তদ্বংশীয়গণের প্রত্যবায় স্বরূপ। এই দীর্ঘকালের মধ্যে অবশ্যই ঠাকুরবাণীর মৃত্যু হয়ে যাবে, অতএব গয়াতে গিয়া তাঁর উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা কৰ্ত্তব্য। তিনি মনে মনে ভেবে গয়াতে যাবেন স্থির করলেন। প্রকাশ্যে গয়ার কথা কাউকে না বলে, তীর্থে যাবেন বলে প্রকাশ করলেন। এতৎশ্রবণে তিনজন শিষ্য তার সহিত সাক্ষাৎ করার মানসে পুড়াইন্ধা নামক পাহাড়তলির পথে আসতে আসতে পথভ্রমে বড়ই বিপদগ্রস্ত হলেন; এমন সময়ে তারা দেখতে পেলেন যে, জটা বন্ধলধারী এক ঋষি বন হতে বহির্গত হয়ে তাদের সম্মুখীন হচ্ছেন, পথিকত্ৰয় বিস্মিত ও কিঞ্চিৎ ভীত হয়ে স্তম্ভিতপ্রায় হলেন; তাদের গতিশক্তি যেন রহিত হয়ে আসলো ও তারা ঋষির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাপসের হাতে বিম্বফল (মতান্তরে দাড়িম্বফল); তিনি পথিকদের নিকটে এসে সহস্যে বললেন “পথভ্রষ্ট পথিক, তোমাদের মঙ্গল হউক!” তারপরে দূরে একটি পথের রেখা দেখিয়ে বললেন--"এই পথে তোমরা দিনারপুরে যেতে পারবে।” হাতের ফলটি একজনকে দিয়ে বললেন "এই ফলটি জয়গোবিন্দকে দিও; বলিও বাণী মরে নাই, গয়াতে তাঁর পিণ্ড দেওয়া নিম্প্রয়োজন।” এই বলে মহাপুরুষ পুনঃ পৰ্ব্বতে আরোহণ করলেন। তাপস চলে গেলে পথিকত্ৰয় তৎপ্রদর্শিত পথে প্রফুল্লচিত্তে প্রস্থান করলেন। অল্প দূরে গিয়েই পরিচিত পন্থা প্রাপ্ত হয়ে দিনারপুরে পৌছলেন। তারা আপনা’দের গুরু জয়গোবিন্দকে ঋষিদত্ত ফল প্রদানান্তর তৎকথিত কথাগুলি অবিকল বললেন। শুনে জয়গোবিন্দ গয়া গমনের সঙ্কল্প পরিত্যাগ করলেন। এই জটাবন্ধলধারী ঋষি যে ঠাকুরবাণী ব্যতীত আর কেউ নন, তা সকলেই বুঝলো। জয়গোবিন্দ আপন মনে গয়া-গমনের যে সঙ্কল্প করিয়াছিলেন, তাহা সেই সময়ই তার মুখে প্রকাশ পাইলো। সকলেই বুঝলো যে তপঃ প্রভাবে শ্রী শ্রী ঠাকুরবাণী এখনও জীবিত রয়েছেন। এও বুঝলো যে, সিদ্ধ মহাপুরুষদের কিছুই অগোচর থাকবার নয়।