10/10/2025
🌿 আবরার ফাহাদ: এক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণের অসমাপ্ত গল্প
🕊️ অধ্যায় ১: জন্ম ও বেড়ে ওঠা
১৯৯৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামের এক সাধারণ ঘরে জন্ম নেয় এক অসাধারণ মেধাবী ছেলে — আবরার ফাহাদ।
পিতা বরকত উল্লাহ ও মাতা রোকেয়া খাতুন, দুজনেই চেয়েছিলেন ছেলেটা মানুষ হোক সততার পথে, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে।
ছোট ভাই আবরার ফায়াজ ছিল তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
শৈশব থেকেই ফাহাদ ছিলেন নরম স্বভাবের, কিন্তু চিন্তায় ছিলেন দৃঢ়।
কুষ্টিয়া মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল পর্যন্ত তিনি ছিলেন শ্রেণিতে সবার শীর্ষে।
পরে ভর্তি হন দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নটর ডেম কলেজে — যেখানে তার মেধা আরও প্রস্ফুটিত হয়।
সহপাঠীরা বলত, “ফাহাদ পড়াশোনায় যেমন, মনেও তেমন—চুপচাপ, কিন্তু দৃঢ়।”
---
⚡ অধ্যায় ২: স্বপ্নবাজ তরুণ বুয়েটিয়ান
২০১৮ সালে ফাহাদ ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে।
বুয়েট—যে নামটি স্বপ্নের প্রতীক, ফাহাদ সেটি অর্জন করেছিলেন নিজের মেধা আর পরিশ্রমে।
ক্লাসে ছিলেন মনোযোগী, আর হলের ঘরে বইয়ের সঙ্গে ছিল তার সবচেয়ে বেশি সময়।
তিনি শুধুই ছাত্র ছিলেন না; ছিলেন একজন চিন্তাশীল নাগরিকও।
দেশ, স্বাধীনতা, এবং ন্যায্যতা নিয়ে ভাবতেন।
ফেসবুকে প্রায়ই নিজের মত প্রকাশ করতেন যুক্তি ও তথ্যভিত্তিকভাবে।
তার স্ট্যাটাসগুলো অনেক সময় দেশের নীতি, অর্থনীতি বা পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করত—কিন্তু কোনো বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং দেশপ্রেম থেকে।
---
🌑 অধ্যায় ৩: সেই ভয়াল রাত
২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর রাতে আবরার একটি স্ট্যাটাস দেন—
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদী ও জ্বালানি সংক্রান্ত একটি চুক্তি নিয়ে তার মতামত প্রকাশ করে।
সেই লেখাটি ভাইরাল হয়।
কিন্তু এর কিছু ঘন্টা পরেই ঘটে যায় দেশের শিক্ষাঙ্গনের ইতিহাসে এক ভয়াবহ ঘটনা।
৬ অক্টোবর গভীর রাতে, শেরেবাংলা হলের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয় ফাহাদকে।
কারণ—তার স্ট্যাটাস।
যে বন্ধুরা কখনও একসঙ্গে খাবার খেত, হাসত—সেই বন্ধুরাই সেই রাতে তার শত্রু হয়ে ওঠে।
একটি ছোট কক্ষে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতে থাকে নির্মম নির্যাতন।
স্টাম্প, রড, তারে মোড়ানো লাঠি—সব দিয়ে তাকে পেটানো হয়।
রাত ৩টার দিকে, নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে এক অমানবিক সত্য—
আবরার ফাহাদ আর নেই।
---
⚖️ অধ্যায় ৪: ন্যায়বিচারের লড়াই
দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ।
“আমরা আবরারের বিচার চাই” — এই স্লোগান যেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ কাঁপিয়ে দেয়।
বুয়েটের শিক্ষার্থীরা রাজনীতি ও র্যাগিং নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়।
সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়;
২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়, এবং
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আদালত ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
আদালতের রায়ে বলা হয়—
“এই হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, এবং ন্যায়ের পরিপন্থী।”
কিন্তু ফাহাদের বাবা-মা বলেন,
“বিচার পেলেও, ছেলে তো আর ফিরে আসবে না…”
---
🌺 অধ্যায় ৫: আবরারের উত্তরাধিকার
আবরার শুধু একজন ছাত্র ছিলেন না—তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতীক।
তার মৃত্যুর পর ক্যাম্পাসে তৈরি হয় “আবরার কর্নার”, যেখানে শিক্ষার্থীরা বসে আলোচনায় মেতে ওঠে সত্য ও স্বাধীনতার কথা নিয়ে।
বুয়েট প্রশাসন স্থায়ীভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
আবরারের নামে প্রস্তাবিত হয় “আবরার আইন”—যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী র্যাগিং বা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার না হয়।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি এক চেতনার নাম—
যিনি বলেছিলেন না, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার সাহস শিখিয়েছিলেন।
---
🌹 অধ্যায় ৬: অসমাপ্ত আলো
যে তরুণ একদিন দেশের বিদ্যুৎ প্রকৌশলে নতুন দিগন্ত আনতে চেয়েছিলেন,
তার জীবন থেমে গেল অন্যায়ের হাতে।
কিন্তু তার আদর্শ এখনো বেঁচে আছে —
প্রতিটি ন্যায়প্রেমী তরুণের চোখে, প্রতিটি মায়ের প্রার্থনায়, প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্নে।
আবরার ফাহাদ আজ শুধু এক নাম নয়,
তিনি এক প্রতিরোধের প্রতীক,
এক বিবেকের জাগরণ,
আর এক চিরজাগ্রত শিখা,
যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় —
> “সত্যকে বলো, যদিও তা বিপদের কারণ হয়;
কারণ, সত্যই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।”