04/05/2026
যখন সূরা নমলের সেই পিঁপড়ার ঘটনাটা পড়েন, তখন কি কখনো থেমে ভেবেছেন—কেন আল্লাহ তাআলা কোটি কোটি প্রাণীর মধ্যে এই ছোট্ট প্রাণীটিকেই বেছে নিলেন? আপনি হয়তো বড় কিছু খুঁজেন—বড় মানুষ, বড় ক্ষমতা, বড় প্রভাব। কিন্তু আল্লাহ আপনাকে দেখান একেবারে বিপরীত চিত্র: একটা ক্ষুদ্র পিঁপড়া, যার শরীর প্রায় অদৃশ্য, কিন্তু যার চিন্তা, দায়িত্ববোধ আর সচেতনতা বিশাল পাহাড়ের মতো।
একটু কল্পনা করেন—সুলাইমান (আ.)-এর বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে। এমন এক বাহিনী, যার সামনে দাঁড়ানোর সাহস কারো নেই। সেই মুহূর্তে একটি পিঁপড়া কী করল? সে চুপ থাকেনি, পালায়নি, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েনি। বরং সে দাঁড়িয়ে নিজের পুরো জাতিকে বলল—“তোমরা সবাই তোমাদের ঘরে ঢুকে পড়ো, না হলে সুলাইমান ও তার বাহিনী তোমাদের পিষে ফেলবে—অথচ তারা বুঝতেও পারবে না।” এই একটি বাক্যের ভেতর এমন কিছু স্তর লুকিয়ে আছে, যেগুলো আপনি যদি বুঝতে পারেন, তাহলে আপনার নিজের জীবনটার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে।
প্রথমত, এই পিঁপড়া আপনাকে শিখায়—ক্ষুদ্রতা কোনো অজুহাত না। আপনি হয়তো ভাবেন, “আমি তো কিছুই না, আমার কথা কেউ শুনবে না।” কিন্তু সেই পিঁপড়াটাও তো কিছুই ছিল না এই বিশাল দুনিয়ার তুলনায়। তবুও সে নিজের দায়িত্ব বুঝেছিল। সে জানত—আমি যদি চুপ থাকি, তাহলে ক্ষতি হবে। এখানেই তার মহত্ত্ব। আপনি যদি সত্য জানেন, যদি বিপদ দেখতে পান, তাহলে চুপ থাকা আপনার জন্য নিরাপদ হতে পারে, কিন্তু তা সঠিক নয়। আপনার অবস্থান ছোট হতে পারে, কিন্তু আপনার সচেতনতা ছোট হওয়ার কোনো কারণ নেই।
দ্বিতীয়ত, আপনি পিঁপড়ার সমাজের দিকে তাকান—এখানে একটা গভীর “পিঁপড়া কালচার” আছে। তারা কখনো একা বাঁচে না, তারা একা ভাবে না, তারা একা কাজ করে না। তাদের পুরো অস্তিত্বটাই “আমরা” কেন্দ্রিক। একজন খাবার পেলে অন্যদের জানায়, একজন বিপদ দেখলে সবাইকে সতর্ক করে। এখানে স্বার্থপরতার জায়গা নেই। এখন আপনি নিজের জীবনের দিকে তাকান—আপনি কি “আমি” নিয়ে বাঁচছেন, নাকি “আমরা” তৈরি করার চেষ্টা করছেন? আপনি হয়তো সফল হতে পারেন একা, কিন্তু শক্তিশালী হতে পারবেন না। পিঁপড়ারা ছোট হয়েও শক্তিশালী—কারণ তারা একসাথে।
তৃতীয়ত, পিঁপড়ার ভাষায় আপনি যে সৌন্দর্য দেখেন, সেটা আজকের অনেক মানুষের মধ্যে নেই। সে বলেনি—“ওরা আমাদের ধ্বংস করতে আসছে।” সে বলেনি—“ওরা খারাপ।” বরং সে বলেছে—“তারা বুঝতেও পারবে না।” এখানে আপনি এক অসাধারণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পান। সে পরিস্থিতি বুঝেছে, বিপদ চিনেছে, কিন্তু ঘৃণা ছড়ায়নি। আপনি যখন সমস্যায় পড়েন, তখন কি এমনভাবে ভাবতে পারেন? নাকি আপনি দোষারোপে ব্যস্ত হয়ে পড়েন? পিঁপড়া আপনাকে শেখায়—সমস্যাকে চিহ্নিত করুন, কিন্তু ঘৃণা তৈরি করবেন না; সমাধানের পথ দেখান।
চতুর্থত, এখানে নেতৃত্বের আসল সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে। নেতৃত্ব মানে সামনে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেওয়া না; নেতৃত্ব মানে বিপদের সময় অন্যদের কথা আগে ভাবা। সেই পিঁপড়াটা চাইলে একাই নিজের গর্তে ঢুকে বেঁচে যেতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। সে নিজের নিরাপত্তার আগে পুরো জাতির নিরাপত্তার কথা ভেবেছে। আপনি নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি শুধু নিজের জন্য চিন্তা করেন, নাকি অন্যদের জন্যও দাঁড়াতে পারেন? কারণ প্রকৃত নেতৃত্ব আসে দায়িত্ববোধ থেকে, পদ বা পরিচয় থেকে না।
পঞ্চমত, এই ঘটনাটি আপনাকে আল্লাহর এক বিস্ময়কর দিক দেখায়। বিশাল বাহিনীর শব্দের ভিড়ে, এই ক্ষুদ্র পিঁপড়ার কণ্ঠস্বরও হারিয়ে যায়নি। আল্লাহ তা শুনেছেন এবং তা মূল্য দিয়েছেন। আপনি হয়তো মনে করেন—আপনার ছোট প্রচেষ্টা, আপনার ছোট ভালো কাজ—এসব কেউ দেখে না। কিন্তু মনে রাখবেন, কোনো ভালো কাজই হারিয়ে যায় না। আপনি যদি সত্য ও কল্যাণের পথে থাকেন, তাহলে আপনার কণ্ঠস্বর যত ক্ষীণই হোক, তা আল্লাহর কাছে পৌঁছায়।
সবশেষে, এই পিঁপড়া আপনার অহংকার ভেঙে দেয়। আপনি নিজেকে বড় ভাবেন? আপনি নিজের গুরুত্ব নিয়ে গর্ব করেন? তাহলে মনে রাখুন—যে প্রাণীকে আপনি পায়ের নিচে পিষে ফেলেন, আল্লাহ তাকে কুরআনে জায়গা দিয়েছেন। কারণ তার অন্তরে ছিল দায়িত্ব, মায়া, আর সচেতনতা। বড় হওয়া শরীরের আকারে না, পদবীতে না—বড় হওয়া চিন্তায়।
তাই আপনি নিজেকে ছোট ভাববেন না। আপনি অকেজো না, অপ্রয়োজনীয় না। আপনার একটি কথা, একটি সতর্কবার্তা, একটি সঠিক সিদ্ধান্ত—কারো জীবন বাঁচাতে পারে, একটি সমাজকে সচেতন করতে পারে। হয়তো আপনি তা দেখবেন না, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যাবে।
নিজেকে শুধু একটা প্রশ্ন করুন—
“আমি কি সেই পিঁপড়ার মতো সচেতন?”
কারণ ইতিহাস বড়দের দিয়ে নয়—সচেতনদের দিয়েই লেখা হয়।
© মিরাজুল ইসলাম ছৈয়াল